মানব প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে টমাস হবস তাঁর প্রকৃতির রাজ্যের (ইংরেজি: Thomas Hobbes‘ state of nature) যে চিত্র অঙ্কন করেছেন, তাতে প্রকৃতির রাজ্য হচ্ছে বিশৃঙ্খল, সমাজবিহীন, অসভ্য, নোংরা, কদর্য ও নিষ্ঠুর। তাঁর প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা নিম্নরূপ:
১. ন্যায় অন্যায়ের স্থান ছিল না: প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেকেরই শত্রু ছিল। তারা সর্বক্ষণ দ্বন্দ্বকলহ, খুন খারাবি ইত্যাদিতে লিপ্ত ছিল। এ রকম ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা সেখানে সবসময়ই বিরাজ করত। এরূপ ভয়ংকর অবস্থায় মানুষের বুদ্ধি বিবেকের চর্চা, যুক্তিকে কাজে লাগাবার অবকাশ সেখানে মোটেই ছিল না। কাজেই ন্যায় অন্যায়বোধ তখন মানুষের মধ্যে ঘটে নি। টমাস হবসের ভাষায়, যেখানে সাধারণ ক্ষমতা নেই, সেখানে আইন নেই, সেখানে বিচারও নেই। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধীন সভ্য সমাজেই একমাত্র ন্যায় অন্যায় বোধ থাকতে পারে। টমাস হবস বর্ণিত প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ বন্য পশুদের মত জীবনযাপন করত।
২. সমাজবিহীন অসভ্য অবস্থা: রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে মানুষ যে অবস্থায় বাস করত তাকে বলা হতো প্রকৃতির রাজ্য। মানব প্রকৃতির সাথে সঙ্গতি রেখেই টমাস হবস তার প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। প্রকৃতির রাজ্যে কোনো সমাজব্যবস্থা বা রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। কাজেই নিয়মশৃঙ্খলার অভাবে মানুষ সেখানে অসভ্য ও বর্বর জীবনযাপন করত। জীবনের নিশ্চয়তা বা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কোনো ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। প্রত্যেক মানুষই যেহেতু স্বার্থপর ও লোভী, তাই প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থ ও লোভ চরিতার্থ করতেই ব্যস্ত ছিল।
৩. মানুষের জীবন ছিল নিঃসঙ্গ, কদর্য, নিষ্ঠুর, সংক্ষিপ্ত: টমাস হবস বর্ণিত প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল পশুতুল্য। তখন কেবল সমাজ বা রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। নিয়মশৃঙ্খলার অভাবে মানুষ সেখানে অসভ্য ও বর্বর জীবনযাপন করত। নিশ্চয়তাবিহীন জীবনে মানুষ একে অপরকে সন্দেহ করত বলে নিঃসঙ্গভাবে জীবনযাপন করত।
৪. সমানে সমানে লড়াই: হবসের প্রকৃতির রাজ্যে কেউ নিজেকে অন্য কারও অপেক্ষা ছোট ভাবত না। তার মতে প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ স্বাধীন ও সমান। এ ধারণা থেকেই সবকিছু সমানভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রত্যেকের মনে জাগে। ফলে একই সাথে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পরস্পরের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি করে। তারা পরস্পরের সাথে সন্দেহ ও অবিশ্বাসে লিপ্ত হয়। ফলে লাভ, নিরাপত্তা ও খ্যাতির আশায় উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে থাকে। হবসের ভাষায়, “War of every man againt every man.”
প্রকৃতির রাজ্য চিন্তার সমালোচনা
রাষ্ট্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রেক্ষিতে টমাস হবস মানব প্রকৃতি, ভয়াবহ ও নৈরাজ্যপূর্ণ প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। এর সবটাই তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্য বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়েছে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো:
১. নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই: মানুষ যে কোন সময়ে প্রাকৃতিক অবস্থায় বাস করত তার কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। নৃতত্ত্ববিদগণের মতে, আদিম মানুষেরা পর্যন্ত কোনো না কোনো প্রকারের সামাজিক জীবন ও নৈতিক এক সংহতির মধ্যে কালাতিপাত করত।
২. বিকল্প ব্যবস্থা: তার প্রকতির রাজ্য ছিল রাষ্ট্রনৈতিক সমাজের এক বিকল্প ব্যবস্থা। তবে মানুষের যে দাবি তিনি অঙ্কন করেছেন তা যদি সত্য হয়, তবে তাদের আচরণ ও কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজন এক শক্তিশালী শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর।
৩. সামাজিক জীব: প্রকৃতির রাজ্য কল্পনাপ্রসূত বলে টমাস হবসের যুক্তিকে খণ্ডন করা চলে না, বরং যদি বলা হয় যে এরিস্টটলের মতানুযায়ী মানুষ সামাজিক এক জীব, তাহলে টমাস হবসের আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক বলা যেতে পারে।
৪. মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার: টমাস হবস মানুষকে জড় পদার্থের সাথে তুলনা করেছেন। আবার কখনও বা জঙ্গলের সাথে। এভাবে মানব প্রকৃতি রাজ্য বিশ্লেষণে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে অস্বীকার করেছেন।
৫. কল্যাণকর ও অকল্যাণকর বস্তু: টমাস হবসের মতে, মানুষ কল্যাণকর বস্তুর প্রতি আকর্ষণবোধ করে এবং অকল্যাণকর বস্তুর প্রতি বিতৃষ্ণাবোধ করে। কিন্তু মানুষ কল্যাণকর বস্তুর প্রতি আকর্ষণবোধ না করে অকল্যাণকর বস্তুর প্রতিও আকর্ষণবোধ করতে পারে, তাই মানব প্রকৃতির বিশ্লেষণে তার এ ধারণা ভুল।
৬, ব্যক্তি বিকাশের পথরুদ্ধ করেছেন: টমাস হবস ইচ্ছার স্বাধীনতা অস্বীকার করে ব্যক্তির সুপ্ত বিকাশের পথ বন্ধ করেছেন।
৭. আকাঙক্ষা দ্বারা পরিচালিত: টমাস হবসের মতে, মানুষ আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত কিন্তু তার এ ধারণা সঠিক নয়।
৮. পরার্থ গুণকে অস্বীকার: টমাস হবসের মতে, মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর। পরার্থপরতার মত সদগুণকে তিনি অস্বীকার করেছেন।
৯. ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই: টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন বিশ্রী, সঙ্গীহীন, অসহায়, নোংরা, পাশবিক ও ক্ষণস্থায়ী বলে যে বিশ্লেষণ করেছেন তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
সুতরাং বলা যায়, টমাস হবস মানুষে মানুষে মৌলিক কোনো পার্থক্য না করে জ্ঞানীদের জ্ঞানচর্চাকে নিরুৎসাহিত করেছেন।
উপরিউক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, হবস মানব প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক রাজ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করে যৌক্তিক মতবাদ প্রদান করেন। তিনি বাস্তব অবস্থার নিরিখে তার চিন্তাধারা উপস্থাপন করেন। সামাজিক চুক্তির প্রেক্ষাপট হিসেবে মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য যুক্তিযুক্ত ছিল।
আরো পড়ুন
- প্রগতিশীলবাদ কী? সমাজবিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের আলোকে প্রগতিশীলতার সংজ্ঞা
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- আনুগত্য হলো একটি দেশ, দর্শন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠা
- অভিজ্ঞতাবাদ সমস্ত জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে
- প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মানবিকভাবে তৈরি নিয়ম ও রীতিনীতির একটি কাঠামো
- ফ্যাসিবাদের শ্রেণি চরিত্র
- বর্ণবাদ কাকে বলে
- জাতি কাকে বলে?
- শ্রেণি উদ্ভব হবার কারণ ও বিলুপ্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- সমাজ হচ্ছে মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপের উৎপাদন
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব মানব প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে
- বিপ্লব সম্পর্কে তত্ত্ব কয়েক ধরনের তত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন
- হ্যারল্ড লাস্কি সাম্যের প্রশ্নে উদারনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সামাজিক সাম্যের পক্ষে
- আর্নেস্ট বার্কার সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী মতামত প্রদান করেন
- সাম্যের নয়া উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী মুক্ত বাজারী প্রতিযোগিতা
- সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা
- সাম্যের উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে আইন ও সাংবিধানিক সাম্য যা পুঁজিবাদ রক্ষাকারী
- উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী জান্তব মতবাদ
- সাম্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ হচ্ছে সাম্য ধারনাটির বিকাশের ধারাবাহিক ইতিহাস
- সাম্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে সাম্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক অনুশীলনে
- সাম্য কী? সাম্য সামাজিক বিকাশের চালিকাশক্তি, স্বাধীনতা ও অধিকারের গ্যারান্টি
- সাম্যের বিভিন্ন রকমের প্রকারভেদ হচ্ছে স্বাভাবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি
- সামাজিক সাম্য হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সমস্ত লোকের সমান অধিকার
- সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ
- আনন্দবাদ এমন এক চিন্তাধারা যাতে সকল আনন্দ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে
- জাঁ জ্যাক রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব হচ্ছে সামাজিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়
- সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ
- আদিম সাম্যবাদ হচ্ছে শিকার-সংগ্রহকারীদের উপহারের অর্থনীতিকে বর্ণনার উপায়
- হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব হচ্ছে শাসক চরম, অবিভাজ্য ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী
- প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবসের ধারণা হচ্ছে সমাজবিহীন অসভ্য নোংরা
- মানব প্রকৃতি সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা হচ্ছে স্বার্থপর, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক
- রাষ্ট্রদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রকৃতি ও বিকাশের আলোচনা
- সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকদের সম্মেলন
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ ও এর বৌদ্ধিক উত্তরধিকার: মার্কস থেকে গ্রামসি পর্যন্ত বিবর্তন
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ (Civil Society): চাহিদার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সংহতির মধ্যবর্তী স্তর
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির অবস্থান: পরম সত্তার বিবর্তনে ব্যষ্টি ও সমষ্টির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
- হেগেলীয় রাজনৈতিক কাঠামো: সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের জৈব ঐক্য
- হেগেলীয় স্বাধীনতা তত্ত্ব: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংহতির নৈতিক রূপায়ণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন: জীবনতত্ত্বের আঙ্গিক একত্ব ও উচ্চতর সত্তার সংশ্লেষণ
- হেগেলের আইনতত্ত্ব: পরম সত্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সমাজ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের স্বরূপ: সার্বভৌম নৈতিক সত্তা, বিশ্ব-আত্মার মূর্তায়ন ও পরম লক্ষ্য
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শন: পরম ইচ্ছার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং আইন ও নৈতিকতার সংশ্লেষণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তা: জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক নিয়তি এবং বিশ্ব-আত্মার মূর্ত প্রকাশ
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
তথ্যসূত্র
১. ড. রবিউল ইসলাম, মীর মোশাররফ হোসেন ও অন্যান্য, রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি, গ্রন্থ কুটির ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ সেপ্টেম্বর ২০১৯, পৃষ্ঠা ৩৮৯-৩৯০।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।