এইটুকু এই জীবনটাতে হাসতে মানা, নিষেধের বেড়াজালে বিষণ্ণ হাসির গান

এইটুকু এই জীবনটাতে হাসতে মানা চলতে মানা’ গানটি আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এক বিরল সংযোজন। ১৯৬০ সালে কিংবদন্তি শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে ধারণকৃত এবং সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের অনবদ্য সুরমূর্ছনায় সমৃদ্ধ এই গানটি বিশিষ্ট গীতিকার সুবীর হাজরা রচনা করেন। এই চৌদ্দ লাইনের নাতিদীর্ঘ গীতিকবিতাটিতে মানুষের জীবনের গভীর অপ্রাপ্তি ও অবদমিত অনুভূতিগুলোকে এক অদ্ভুত বিষাদময় হাস্যরসের (Black Humor) মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সমাজ ও জীবনের নানা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো ‘নিষেধের’ বেড়াজালে মানুষের স্বাভাবিক আবেগগুলো যখন রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেই যন্ত্রণাকে কবি সরাসরি করুণ রসে না ডুবিয়ে বরং এক ধরণের দার্শনিক ব্যঙ্গ ও শ্লেষের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। এই গানটি কেবল একাকীত্বের আর্তনাদ নয়, বরং জীবনের তুচ্ছতা ও মেকি সামাজিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক গীতিময় প্রতিবাদ।

ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট:

এই গানটি মূলত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাঙালির নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের অবদমিত ইচ্ছা এবং সামাজিক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা কৃত্রিম শৃঙ্খলের এক শৈল্পিক দলিল। গানটির প্রেক্ষাপট এমন এক সময়ের চিত্র ধারণ করে, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক আবেগ-অনুভূতিগুলোও ‘সামাজিক শিষ্টাচার’ বা ‘লোকচক্ষুর’ ভয়ে অবরুদ্ধ ছিল। সুবীর হাজরার কলমে উঠে এসেছে সেই একাকীত্বের সুর, যেখানে একটি ক্ষুদ্র জীবনকে ঘিরে হাজারো ‘মানা’ বা নিষেধের দেয়াল তোলা হয়েছে। অভাব আর সামাজিক অনুশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ যখন নিজের ভালোবাসাটুকুও প্রকাশ করতে ভয় পায়, তখনই এই গানের জন্ম। এটি কেবল একটি বিরহী সুর নয়, বরং এটি সমাজ ব্যবস্থার সেই অদৃশ্য খাঁচার বিরুদ্ধে এক মৃদু অথচ গভীর প্রতিবাদ, যেখানে বেঁচে থাকার আনন্দটুকুও খুঁজে পাওয়া দায়।

গভীর কাব্যিক বিশ্লেষণ:

কাব্যিক ব্যঞ্জনায় গানটি এক তীব্র অস্তিত্ববাদী সংকটের প্রতিচ্ছবি। গানের পঙ্ক্তিতে যখন বলা হয়— “হাসতে মানা চলতে মানা কথাটিও কইতে মানা”, তখন তা কেবল আক্ষরিক নিষেধ নয়, বরং মানুষের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য হরণের এক গভীর হাহাকার হয়ে দাঁড়ায়। “কানা ছেলের নাম যেমন পদ্মলোচন হয়”— এই শ্লেষাত্মক উপমার মাধ্যমে গীতিকার জীবনের নির্মম পরিহাস ও বৈপরীত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে ‘সং’ সেজে সংসারে ঘুরে বেড়ানো বা ‘মিথ্যে হাসি দিয়ে কান্না ঢাকা’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম সত্য— আমরা সবাই কোনো না কোনো সামাজিক মুখোশ পরে বেঁচে আছি। জীবনের প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব যখন মেলে না, তখন সবটুকুই ‘দেনা’ বা ঋণের মতো ভারি মনে হয়। ভালোবাসা প্রকাশের অক্ষমতা আর দূরের মানুষকে কাছে টানতে না পারার ব্যর্থতা গানটিকে এক চিরন্তন মানবিক হাহাকারে রূপ দিয়েছে।

সামাজিক প্রভাব ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

সামাজিক প্রভাবে এই গানটি কয়েক দশক ধরে বাঙালির একাকীত্ব ও অব্যক্ত বেদনার প্রধান ভাষ্যকার হয়ে আছে। আজও যখন যান্ত্রিক জীবনের চাপে মানুষ নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে নিজের আবেগ বিসর্জন দেয়, তখন এই গানের প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে কড়া নাড়ে। এটি আমাদের সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে— কেন আমরা আজও মেকি হাসির আড়ালে প্রকৃত কান্নাকে লুকিয়ে রাখি? গানটি সাধারণ মানুষকে তাদের ভেতরের অবদমিত কষ্টগুলোকে চিনতে শেখায় এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনটা অতি ক্ষুদ্র, তাই একে ‘নিষেধের’ বেড়াজালে আটকে রাখা আত্মিক মৃত্যুরই শামিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গানটি এমন এক সান্ত্বনা হয়ে টিকে আছে, যা আমাদের শেখায়— জীবনের সব অপ্রাপ্তির মাঝেও নিজেকে ‘সং’ হিসেবে চিনে নেওয়াটাই হলো এক ধরণের মুক্তি।

এইটুকু এই জীবনটাতে হাসতে মানা গানটির গানের কথা

এইটুকু এই জীবনটাতে
হাসতে মানা চলতে মানা কথাটিও কইতে মানা।
এই মানায় ভরা জীবনটা কেমন করে কাটাব তা
নেই জানা, নেই জানা।।

যদি না হাসতে পারি এই জীবনে খুশির হাসি,
যদি না বলতে পারি আমি তোমায় ভালোবাসি,
তাহলে দূরের মানুষ
কাছে কি আর যায় আনা।।

আমার নেইকো কোনো দাম
রামের মতো হতেও পারি
হতেও পারি শ্যাম-
কানা ছেলের যেমনটি হয় পদ্মলোচন নাম।
আমি যে সং সেজে
এই সংসারে বেড়াই ফিরে
আমি যে মিথ্যে হাসি দিয়ে ঢাকি কান্নাটিরে-
জীবনের পাওনা কিছুই নেই বলে তাই সব দেনা।।

ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া গানটি ইউটিউব থেকে শুনুন

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. লেখাটি ৭ জুলাই ২০২০ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
২. শিশির চক্রবর্তী সংকলিত,পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন, পত্রভারতী, কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ডিসেম্বর ২০১৮, পৃষ্ঠা ১৫৫।

Leave a Comment