ভারত ছাড় আন্দোলন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে স্বাধীনতাপন্থীদের আন্দোলন

ভারত ছাড় আন্দোলন বা আগস্ট আন্দোলন (ইংরেজি: Quit India Movement) হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তীকালে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কর্তৃক ইংরেজ সরকারের আশু ভারত পরিত্যাগ ও দেশের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে সৃষ্ট আন্দোলন। প্রধানত ভারতীয় জনগণের শত্রু সংগঠন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতাকে জমিদার ও শিল্পপতিদের করায়ত্ত করবার জন্য ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতারণাপূর্ণ আন্দোলন আরম্ভ করে তাই এই আগস্ট আন্দোলন নামে পরিচিত।

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশক থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দাবি প্রবল হতে শুরু করে। বিশের এবং ত্রিশের দশকে বিভিন্ন প্রকার আইন অমান্য আন্দোলনের মধ্যে এবং তার চেয়েও জঙ্গী শ্রমিক-কৃষকদের জীবিকার সংঘবদ্ধ আন্দোলন এবং মধ্যবিত্তের বিপ্লবী কার্যক্রমে এই স্বাধীনতার দাবির তীব্রতা প্রকাশ পেতে থাকে। কিন্তু একদিকে ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি এবং অপরদিকে ভারতের প্রধান রাজনীতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অনৈক্যের কারণে ভারতে স্বাধীনতার আন্দোলন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত সফলতা অর্জন করতে পারে নি।

ভারত ছাড় আন্দোলন বিষয়টি বােঝার সুবিধার্থে পূর্ববর্তী প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলির সামান্য উল্লেখ প্রয়ােজন। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজ অধিবেশনের সময় থেকেই কংগ্রেস দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের আশঙ্কায় সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে যুদ্ধে ভারতের জড়িয়ে পড়ার বিরােধী ছিল। কিন্তু ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ তারিখে ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ক্রমান্বয়ে এই যুদ্ধ এশিয়াতে বিস্তারিত হয়। জাপান অক্ষশক্তি, অর্থ্যাৎ জার্মানি ও ইতালির পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে। মিত্রপক্ষের প্রধান শক্তি ছিল সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার পর জনমত এবং বিশেষ করে কেন্দ্রীয় আইনসভার অভিমত না নিয়েই বড়লাট যুদ্ধে ভারতের যােগদানের সিদ্ধান্ত ঘােষণা করেন।

সরকারের যুদ্ধনীতির ব্যাখ্যা এবং ভারতকে স্বাধীনতাদানের আশু সম্ভাবনার বিষয়ে ইংরেজ সরকারের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় এগারােটি প্রদেশে কংগ্রেসের মন্ত্রিসভাসমুহ পদত্যাগ করে। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ বাদানুবাদ ও আপসমূলক আলােচনা নিস্ফল হয়ে যাওয়ায় মোহনদাস গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ব্যাপক আইন অমান্যের পথে না গিয়ে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ শুরু করে (১৭ অক্টোবর ১৯৪০)। নেতৃবৃন্দসহ কয়েক সহস্র কংগ্রেস কর্মী পর্যায়ক্রমে কারাবরণ করেন। সত্যাগ্রহ ফলপ্রসূ না হওয়ায় বছরখানেক পরে প্রত্যাহর করে নেওয়া হয়।

১৯৪২-এ এশিয়াতে যুদ্ধের সীমানা ব্রহ্মদেশে অতিক্রম করে বাংলার নিকটে এসে পড়ে। ব্রহ্মদেশও তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন। ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ব্রহ্মদেশ পরিত্যাগ করে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। জাপান কলকাতা নগরী ও চট্রগ্রামের উপর বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। ব্রিটিশ সরকার তখন একটা সামরিক বিপর্যয়ের সষ্মুখীন এবং যুদ্ধের পরিস্থিতিও সংকটজনক। ইত্যবসরে বিভিন্ন দল ও নেতার মধ্যে দেশের পরিবর্তন সম্পর্কে মতভেদ প্রবল হয়ে ওঠে।

বেসামরিক প্রশাসনে অচলাবস্থার দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্য সার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ-আলােচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভারতে পাঠানাে হয়। ক্রিপসের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দের আলােচনা-বৈঠক পক্ষকাল পরে নিষ্ফল হয়ে ভেঙে যায়। যুদ্ধোত্তর শাসন সংস্কার সম্পর্কে ক্রিপস প্রস্তাব কোনও দলই মেনে নিতে পারেনি, অবশ্য নিজ নিজ কারণে। অবিলম্বে কংগ্রেসের হাতে বেসামরিক ক্ষমতার হস্তান্তরই ছিল কংগ্রেসের প্রধান দাবি; নইলে ব্যাপক আকারে আইন অমান্য আন্দোলন তথা প্রকাশ্য বিদ্রোহ শুরু করা হবে বলে জানানাে হয়।

১৪ জুলাই ওয়ার্ধায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় মোহনদাস গান্ধীর প্রস্তাবক্রমে ভারত ছাড় আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু আন্দোলনের রূপ ও কৌশল সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট কোনো ভাবনাচিন্তা ছিল না। কমিটির অন্যান্য সদস্যেরা ছিলেন গান্ধীর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বড়লাট এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস প্রতিনিধিদের সঙ্গে আপস আলােচনার অনুরােধ প্রত্যাখ্যান করেন।

ব্রিটিশ সরকারের এই সঙ্কটকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার শত্রু জমিদার ও শিল্পপতিরা উত্তম সময় বিবেচনা করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের নিকট ৪২-এর আগস্ট মাসের ৭ ও ৮ অগস্ট বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত এআইসিসি অধিবেশনে একটি প্রস্তাব মারফত কতগুলি দাবি উত্থাপন করে। ভারতীয় জাতীয় কমিটির ওয়ার্কিং কংগ্রেসের এই প্রস্তাব আগস্ট প্রস্তাব নামে পরিচিত। স্বাধীন ভারতের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে আলােচনার সঙ্গে অহিংস পথে ভারত ছাড় আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এদিকে ৮ আগস্ট বড়লাটের কার্যনির্বাহী সংসদে গৃহীত এক প্রস্তাবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রচেষ্টায় বিপজ্জনক ব্যাঘাত সৃষ্টি ও দেশবাসীর মনােবল বিনষ্ট করে দেবার অভিযােগ করা হয়। ৯ আগস্ট কংগ্রেস দল বেআইনি ঘােষিত হয়। প্রায় সব নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হন। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবল বিক্ষোভ ও হিংসাত্মক আন্দোলন দেখা দেয়। দেশের পূর্ব সীমান্তে ভূখণ্ড জাপানি ফৌজ হানা দিয়েছে।

অহিংসার নীতিতে বিশ্বাসী বর্বর সাম্প্রদায়িক গান্ধী তখন কারাগারে আবদ্ধ। বিচ্ছিন্ন এবং নেতৃত্বহীন এরূপ স্বতস্ফূর্ত বিক্ষোভ ব্রিটিশ সরকারের সামরিক এবং নির্মম দমনের মুখে অধিক দিন স্থায়ী হতে পারে নি। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই এ আন্দোলন দমিত হয়ে যায়। আগস্ট ৯ এবং ডিসেম্বর ৩১-এর মধ্যে ৬০ হাজারের অধিক লোককে গ্রেপ্তার করা হয়; ১৮০০০ রাজনীতিক কর্মীকে ভারত রক্ষা আইনে আটক রাখা হয়; পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর গুলি বর্ষণে প্রায় এক হাজার নিহত হয়।[২]

স্থানীয় সহিংসতা এবং সমান্তরাল সরকার

কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তারে দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্নস্থানে আন্দোলন জঙ্গী এবং ধ্বংসাত্মক আকার গ্রহণ করে। অসংগঠিত, পরিকল্পনাবিহীন ও নেতৃত্ব ছাড়াই আন্দোলন নানাভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে সরকারি দমননীতি ও ব্যাপক ধরপাকড়, অন্যদিকে প্রবল জনবিক্ষোভ । রেল লাইন, টেলিগ্রাফ তার এবং শাসনযন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আন্দোলনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। মেদিনীপুরের একটি অঞ্চলে ব্রিটিশ সরকারের শাসন ব্যবস্থা অস্বীকার করে স্বাধীন সরকার স্থাপন করা হয়। কিন্তু এ সমস্ত কার্যক্রম খুব সংগঠিত ছিল না। কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে এ আন্দোলন পরিচালিত হয় নি।

বিপ্লবী ও নৈরাজ্যবাদী বিভিন্ন গােষ্ঠী এবং কংগ্রেস সােসালিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন বামপন্থী দল অহিংস নীতি পরিহার করে। দেশের প্রায় সর্বত্র প্রকাশ্য বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। মহারাষ্ট্রের কয়েকটি অঞ্চল, উত্তরপ্রদেশের পূর্বাংশ, উত্তর বিহার, বঙ্গদেশের তমলুক মহকুমায় জাতীয় সরকার গঠিত হয়। মাদ্রাজ, বােম্বাই ও মধ্যপ্রদেশে যােগাযােগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ও কলকারখানায় দীর্ঘদিন ধরে ধর্মঘট চলে। স্বাধীন সরকার ও তার বেতারকেন্দ্র কোনও কোনও স্থানে গড়ে ওঠে। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্যে সহস্রাধিক ব্যক্তি নিহত ও তিন সহস্রাধিক ব্যক্তি আহত হন।

সংগঠনের অভাবে ভারত ছাড় আন্দোলন মাস কয়েকের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের পিছনে কার্যত বামপন্থীরাই ছিলেন প্রথমাবধি সক্রিয়। কংগ্রেস সােসালিস্ট পার্টির নেতা আচার্য নরেন্দ্র দেব পরে মন্তব্য করেন যে আন্দোলনের অভীষ্ট লক্ষ্যের সিদ্ধিলাভ হয়নি। তার কারণ হিসাবে আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ জেল থেকে মুক্তির পর বলেন যে কুশল সংগঠন ও জনসমক্ষে কর্মসুচি তুলে ধরার অভাবে আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়। ডানপন্থীরা ভেবেছিলো যে গণশত্রু গান্ধী আন্দোলনের একটি কর্মসূচি তুলে ধরবে। কিন্তু অনতিকাল পরে মুক্তি পেয়ে গান্ধী বড়লাটের সঙ্গে যখন আলােচনায় বসে তখন সে সহিংস আগস্ট আন্দোলনের দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকার করে।

আন্দোলনের ফলাফল

এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল পরবর্তী সকল কষ্টভোগ ও দুর্দশার মধ্যেও কংগ্রেস দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। ভারত-বার্মা সীমান্তে জাপানি সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রায় ইতিমধ্যেই উদ্বিগ্ন ব্রিটিশরা গান্ধীকে কারারুদ্ধ করে প্রতিক্রিয়া জানায়। দলের কার্যকরী কমিটির (জাতীয় নেতৃত্ব) সকল সদস্যকেও কারারুদ্ধ করা হয়। প্রধান নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে, একজন তরুণ এবং ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত অজ্ঞাত অরুণা আসফ আলী ৯ আগস্ট এআইসিসি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন এবং পতাকা উত্তোলন করেন; পরে কংগ্রেস দল নিষিদ্ধ করা হয়। এই পদক্ষেপগুলি জনগণের মধ্যে কেবল ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের লক্ষ্যের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করে। সরাসরি নেতৃত্বের অভাব সত্ত্বেও, সারা দেশে বৃহৎ বিক্ষোভ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কর্মীরা বৃহৎ দলে অনুপস্থিত ছিলেন এবং ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ দেশের উপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বোঝা এবং বিধিনিষেধ আরোপ করে। যুদ্ধের প্রচেষ্টার ফলে দাম বৃদ্ধি পায়, প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি হয় এবং কর বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ভারতীয় জনগণের জন্য প্রচুর কষ্ট হয়। প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহের ঘাটতি এবং চাল রপ্তানির ফলে ব্যাপক বঞ্চনা এবং মৃত্যু ঘটে, যার ফলে ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২১৮-২১৯।
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৬৯-৭০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!