অছিবাদ বা সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কত্ব (ইংরেজি: Trusteeship) হচ্ছে ভারতবর্ষের ও শিল্পপতি ও জমিদারদের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিক্রিয়াশীল গান্ধীবাদী ভুল-আর্থনীতিক চিন্তার মূলকথা; এবং পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে বিবেচিত। অছিবাদ জমিদারতন্ত্র ও সামন্তবাদের সংস্কার করে তাকে ভারতের জনগণের উপর চাপিয়ে রাখার একটি সুগভীর চক্রান্ত।[১]
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে আগা খাঁর প্রাসাদে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যখন বন্দি ছিলেন সে সময়ে অছিবাদের খসড়া প্রস্তুত হয়। গান্ধী রাজা জমিদার প্রভৃতিকে তাদের সম্পত্তির ট্রাস্টি বা তত্ত্বাবধায়করূপে গণ্য করেন। গান্ধীর মতে ‘‘যোগ্য লোকদের দ্বারা জনগণের সম্পদের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার কি করে করা যায় অছিবাদ তারই এক প্রচেষ্টা’’।[২] তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ তারিখে হরিজন পত্রিকায় লেখেন, ‘‘আমি পরামর্শ দিই যে, ধনবানরা কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতে পারে কিন্তু তা সকলের সেবায় উৎসর্গ করার জন্যেই করবে’’।
অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রচলিত যাবতীয় ধারা থেকে স্বতন্ত্র এক কর্মপন্থা হিসেবে অছিবাদ নামে তিনি এক প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী ব্যবস্থার সুপারিশ করেন। তার সমুদয় চিন্তাভাবনা “সর্বোদয়” জীবনদর্শনে সমন্বিত হয়েছে যার মূলকথা হচ্ছে কৃষক ও শ্রমিকের বিপ্লবের বিরোধী থেকে, সকল ধরনের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিরোধী থেকে, শিল্পবিপ্লবের বিরোধী থেকে দেশকে দীর্ঘদিনের জন্য উপনিবেশবাদী-সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের অধীনস্থ ও পঙ্গু করা।
তিনি আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার নিন্দা করেছেন, বর্ণপ্রথা থেকে মুক্তির জন্য যন্ত্রশিল্পের নিন্দা করেছেন। তার মূলে তিনি লোভ, নিপীড়ন, শোষণ, নির্বিবেক ভোগস্পৃহা ও অপরের উপর আক্রমণের লিপ্সা প্রত্যক্ষ করেন। গান্ধী তাই প্লেটো, রুশো, তলস্তয়ের মতো প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের উপদেশ দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে পশ্চিমি যন্ত্রসভ্যতার বিনাশ অনিবার্য। তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্বের আধ্যাত্মিক রূপায়ণ চাইতেন। গান্ধী পুঁজিবাদের রূপান্তর ও সমাজে তার বিষাক্ত প্রভাবের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে অছিবাদ তত্ত্বের উদ্ভাবন করেন।[৩]
গান্ধীর নৈতিকতা ও প্রীতিপরায়ণতা ছিলো টাটা-বিড়লাদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তুলে দেয়া, জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা। তিনি প্রাচীন সনাতন আদর্শের অনুবর্তনে ও রূপায়ণে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ অবলম্বনের এক ভড়ং ধরতেন যাতে তার ভণ্ডামোকে দরিদ্র মানুষ সহজে চিহ্নিত করতে না পারে।
অছিবাদ চিন্তার বৈশিষ্ট্য
গান্ধীর জীবনীকার প্যারেলাল তাঁর ‘লাস্ট ফেজ’ নামক গ্রন্থে নিম্নলিখিত মর্মে সেটি উল্লেখ করেছেন:
১. বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজকে কল্যাণকারী সমাজে (Equalitarian Society) রূপান্তরিত করার উপায় হচ্ছে ট্রাস্টিশিপ, যা পুঁজিবাদকে প্রশ্রয়দান করে, কিন্তু বর্তমান মালিক শ্রেণিকে নিজেদের সংশোধন করে নেওয়ার সুযোগ দেয়। ট্রাস্টিশিপ এই বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত যে মানুষের স্বভাব সংশোধনের অতীত নয়।
২. সমাজের কল্যাণের জন্য ও সমাজের বিনানুমতিতে ট্রাস্টিশিপ সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকার স্বীকার করে না।
৩. সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ও ব্যক্তিগত ব্যবহার আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা ট্রাস্টিশিপে নিষিদ্ধ নয়।
৪. এইভাবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ট্রাস্টিশিপে কেউ তাঁর ধন-সম্পত্তি স্বার্থপরের মতো অথবা সমাজের হিত অবজ্ঞা করে ভোগ-দখল করতে পারবেন না।
৫. ট্রাস্টিশিপে একদিকে যেমন জীবনধারণের উপযোগী পারিশ্রমিকের এক শোভন নিম্নতম হার (decent minimum living wages) স্থির করে দেওয়ার কথা বলা হয়, তেমনি অন্যদিকে সমাজের কোনও এক ব্যক্তিকে অধিকতম কত আয় করতে দেওয়া হবে তারও সীমা স্থির করে দেওয়া উচিত বলে ট্রাস্টিশিপ মনে করে। সেই নিম্নতম ও উচ্চতম আয়ের ব্যবধান যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত হওয়া চাই। উপরন্তু মধ্যে মধ্যে এই নিম্নতম ও উচ্চতম আয়ের সীমার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন যার ফলে ওই বাবধান ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।
৬. গান্ধী-নির্দেশিত অর্থনীতিক ব্যবস্থায় কী প্রকারের উৎপাদন করতে হবে তা সমাজের প্রয়োজন অনুসারে নিধারিত হবে। তার মধ্যে ব্যক্তিগত খামখেয়াল বা লোভের কোনও স্থান থাকবে না।[৪]
গান্ধীবাদী ট্রাস্টিশিপ ব্যবস্থার মাধ্যমে জমিদার ও পুঁজিপতিরা তাদের নিজেদের সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে, তারা তাদের সম্পত্তিকে ভোগ বিলাসের কাজে ব্যবহার করবে না। গান্ধী মনে করত, স্থাবর অস্থাবর, চেতন অচেতন, স্থূল সূক্ষ্ম, দৃষ্ট অদৃষ্ট, জগতের সকল কিছুর আসল মালিক ভগবান, মানুষ নয়;— মানুষ কেবল ট্রাস্টি বা তত্ত্বাবধায়কমাত্র। কলকারখানার, জমির, এমনকি মানুষের শক্তির আসল মালিক ভগবান।[৫]
উপরোক্ত বক্তব্যসমূহ বা বিধিব্যবস্থাকে অনেক বিরূপ সমালোচনার স্মমুখীন হতে হয়। অছিবাদে সম্পত্তির মালিকানা স্বীকার করে নেয়া হয়। এটা সুনির্দিষ্টভাবেই সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিরোধী। একইভাবে তা গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিরোধী। এক কথায় গান্ধীর এসব ভুয়োদর্শন তার সামন্তবাদী-পুঁজিবাদী মতাদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। জনগণের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শত্রু গান্ধী জনগণের বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিরও শত্রু।
আরো পড়ুন
- অহিংসা হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির বিরোধীতাকারী এক কৌশল
- গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে জমিদার, মুৎসুদ্দি ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা
- অছিবাদ পুঁজিপতি ও জমিদারদের সম্পত্তি রক্ষাকারী প্রতিক্রিয়াশীল গান্ধীবাদী চিন্তা
- গান্ধীবাদ জমিদার ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অভিমত
- অসহযোগ আন্দোলন ভারতীয় জমিদারশ্রেণির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আন্দোলন
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- স্বৈরতন্ত্র জনগণের মধ্যে অনৈক্য করেই টিকে থাকে
- ইসলামী রাষ্ট্র এমন রাষ্ট্র যেখানে ইসলামী আইনের উপর ভিত্তি করে সরকার রয়েছে
- চীনা জনগণের ধর্মচেতনার উৎস হচ্ছে কনফুসিয়াসবাদ, তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ
- কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ প্রাচীন চীনে উদ্ভূত চিন্তা ও আচরণের ব্যবস্থা
- মানবেন্দ্রনাথ রায়ের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে সমাজতন্ত্র, জাতীয় মুক্তি ও নবমানবতাবাদ
- অহিংসা হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির বিরোধীতাকারী এক কৌশল
- গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে জমিদার, মুৎসুদ্দি ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা
- নব মানবতাবাদ হচ্ছে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মানবতাবাদী দর্শনের শাখা বিশেষ
- সমাজতন্ত্র সম্পর্কে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতামত
- অরবিন্দ ঘোষের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে সাম্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, মানব ঐক্য ও স্বাধীনতা
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
- কামন্দকীয় নীতিসার একটি প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ যা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থা বর্ণনা করে
- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে রচিত একটি প্রাচীন গ্রন্থ
- আল্লামা মহম্মদ ইকবাল ছিলেন একজন মুসলিম লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ
- আল কিন্দি নবম শতাব্দীর মুসলিম দার্শনিক, গণিতবিদ, চিকিৎসক এবং সংগীতজ্ঞ
- ইবনে সিনা ছিলেন সামন্ত যুগের দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কবি
- ইবনে রুশদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা বা রাষ্ট্রচিন্তায় ইবনে রুশদের অবদান
- ইবনে রুশদের দর্শন বিষয়ক চিন্তা হচ্ছে সামন্ত যুগে মানবের ঊর্ধ্বে ভাববাদ
- আল ফারাবির রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবির অবদান সম্পর্কে আলোচনা
- ইমাম আল গাজ্জালী ছিলেন সামন্তবাদী সাধক, ধর্ম বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও দার্শনিক
- ইবনে খালদুন সামন্তযুগের আরব সভ্যতার ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক
- ইবনে রুশদ ছিলেন আরব সভ্যতার সামন্ত যুগের বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক
- আল ফারাবি সামন্তযুগের প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক
- অছিবাদ পুঁজিপতি ও জমিদারদের সম্পত্তি রক্ষাকারী প্রতিক্রিয়াশীল গান্ধীবাদী চিন্তা
- গান্ধীবাদ জমিদার ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অভিমত
- কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তাধারা হচ্ছে সমাজতন্ত্র, স্বাধীকার, গণতন্ত্র ও রবুবিয়াত
- মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুম জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধি নেতা
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
- আল্লামা আবুল ফজলের রাষ্ট্রচিন্তা বিষয়টির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজতন্ত্র
- আইন-ই-আকবরী হচ্ছে আবুল ফজল রচিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ
- আবুল ফজল ছিলেন আকবরের এক নবরত্ন, সুপণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিক
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ১৮ অক্টোবর, ২০১৮, ‘অছিবাদ গান্ধীর প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা’, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা দোলন প্রভা প্রকাশিত, ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/trusteeship/
২. মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, “ব্যক্তি বনাম পদ্ধতি”, সত্যেন্দ্রনাথ মাইতি সম্পাদিত গান্ধী রচনা সম্ভার, গান্ধী মেমোরিয়াল কমিটি, পশ্চিমবঙ্গ, এপ্রিল ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ১২০।
৩. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯।
৪. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১৩।
৫. মো. আবদুল ওদুদ, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমাজ ও রাষ্ট্রের দার্শনিক চিন্তা, মনন পাবলিকেশন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৪ এপ্রিল ২০০৮, পৃষ্ঠা ৭৪৭।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।