ইনকিলাব জিন্দাবাদ ভারতের বামপন্থী আন্দোলনের ব্যবহারবহুল শ্লোগান

ইনকিলাব জিন্দাবাদ (হিন্দি: इंक़लाब ज़िन्दाबाद) একটি দক্ষিণ এশীয় বাক্যাংশ, যার অর্থ হচ্ছে “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হােক”। যদিও মূলত এই স্লোগানটি ব্রিটিশ ভারতে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীরা ব্যবহার করেছিলেন; বর্তমানে এটি বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে বিক্ষোভের সময় নাগরিক সমাজের কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন আদর্শিক পটভূমির রাজনীতিবিদদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ শব্দ দুটি ফারসি ভাষা থেকে আগত। শুরু থেকে বাক্যাংশটি ভারতের বামপন্থী আন্দোলনের একটি সাধারণ ও ব্যবহারবহুল শ্লোগান ছিল, পরে বিভিন্ন ডানপন্থী ও সুবিধাবাদী সংগঠন এটি ব্যবহার করে। এটির উৎপত্তি ও তত্ত্বগত পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো মাওলানা হযরত মোহানি ১৯২১ সালে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” শব্দটি স্লোগান হিসেবে সৃষ্টি করেন। তিনি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির চারজন প্রতিষ্ঠাতার একজন।

বিশ শতকের কুড়ির দশকের মাঝামাঝি ১৯২৪ সালে উত্তর ভারতে বিপ্লবী অনুশীলন দলের কিছু কর্মী হিন্দুস্থান রিপাবলিক্যান অ্যাসোসিয়েশন (এইচআরএ) নামে একটি গোপন সংগঠন তৈরি করেন। তাঁরা প্রধানত ফরাসি বিপ্লব ও রুশ বিপ্লবের আদর্শে চলতেন; তাঁদের প্রচারপত্রে ‘লং লিভ রেভোলুশন’ কথাগুলি মুদ্রিত থাকত। এইচআরএ-র ক্রমবিস্তারসুত্রে তার সঙ্গে পাঞ্জাবের নওজওয়ান ভারতসভা গোষ্ঠী যুক্ত হয়। ওই গোষ্ঠীর অন্যতম বিশিষ্ট নেতা ছিলেন ভগৎ সিং। তাঁদের প্রস্তাবে এইচআরএ নামের সঙ্গে সোসালিস্ট শব্দটি এবং সংগ্রামী আন্দোলনের প্রয়োজনে অ্যাসোসিয়েশনের পরিবর্তে ‘আর্মি’ কথাটি যুক্ত হয়। সময়টা ছিল ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন এবং দেশব্যাপী সংগ্রামী ধর্মঘটী শ্রমিক আন্দোলনে উত্তাল।

উর্দুভাষী পঞ্জাবের নওজওয়ান ভারতসভার সদস্যরা জনসভা ও শোভাযাত্রায় ‘লং লিভ রেভোলুশন’ বাণীকে সহজবোধ্য হিসেবে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেওয়া শুরু করেন এবং অচিরেই ধ্বনিটি জাতীয় আন্দোলনের বিপ্লবী ও বামপন্থী ধারায় সারা দেশে ব্যাপক প্রচলন লাভ করে। উল্লেখ্য যে খিলাফত আন্দোলনের পরে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি সম্পর্কে যাঁদের আপত্তি দেখা দেয় তাঁদের কাছেও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ গ্রহণযোগ্য হয়। ১৯২৮ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ ও ১৯৩১ সালে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণকালে ভগৎ সিং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিয়েছিলেন।[১]

তবে কিছু স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদী এবং অন্যরা ইদানিংকালের যুবসমাজের দ্বারা এই শব্দগুচ্ছের ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এখনো ক্ষমতায় থাকা দলের বিরুদ্ধে এই শ্লোগান প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তবে কেউ কেউ বর্তমান প্রতিবাদী সংস্কৃতিকে ত্রুটিপূর্ণ এবং জাতীয়তাবাদী পদ্ধতির বিরোধী বলে দাবি করেন। কারও কারও মতে, ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগানকে পুঁজিবাদী পণ্যায়নের হাতিয়ার, বাণিজ্যিকীকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ, যেমন টি-শার্ট, দেয়াল পোস্টার ইত্যাদিতে ব্যবহার শ্লোগানটির বিপ্লবের দূরদর্শী এবং গৌরবময় শব্দগুচ্ছের উপর কলঙ্ক লেপন করছে।

আরো পড়ুন

প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সব প্রতিরোধ যুদ্ধের তারুণ্য এই শ্লোগান দিয়েছে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান সময় এবং রাজপথের দূরত্ব অতিক্রম করেছে এবং মার্কসবাদীরাও এই শ্লোগানকে গ্রহণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময় অগ্রগতির আহ্বান জানানোর একটি চেতনা এবং প্রেরণাদায়ক শ্লোগান। সর্বোপরি, আজ, আগামীকাল এবং আগামী শতকেও ক্ষমতাশালী স্বৈরতন্ত্রীদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের কাছ থেকে সুস্থ চেতনা প্রতিধ্বনিত করতে এই শ্লোগান ব্যবহৃত হবে।[২]

তথ্যসূত্র:

১. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৪।
২. উমাইমা খানম, ১১ মার্চ ২০২০, DU Beat, “The Journey of Inquilab”; ইউআরএল: https://dubeat.com/2020/03/11/the-journey-of-inquilab/

Leave a Comment

error: Content is protected !!