দাদাবাদ বা খেয়ালবাদ ছিল একটি আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যবাদী শিল্প আন্দোলন

দাদা বা দাদাবাদ বা খেয়ালবাদ (ইংরেজি: Dadaism) ছিল একটি আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যবাদী শিল্প আন্দোলন যা প্রথম মহাযুদ্ধ ও ভবিষ্যবাদের প্রেক্ষাপটে বিকশিত হয়েছিল। প্রথমে এটি ইউরোপ ও পরবর্তী সময়ে আমেরিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিছুসংখ্যক শিল্পী ও সাহিত্যিকের মধ্যে প্রচারিত ও গৃহীত হয়। এটা প্রথমে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরে দ্রুত বার্লিন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক শহর এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শৈল্পিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ে। দাদা আন্দোলনের নীতিমালা প্রথম ১৯১৬ সালে হুগো বলের দাদা ইশতেহারে সংগৃহীত হয়েছিল। বলকে দাদা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখা হয়।[১]

প্রথম মহাযুদ্ধের বিভীষিকায় আতঙ্কগ্রস্ত এবং জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কিছু সংখ্যক ফরাসী বুদ্ধিজীবী সুইজারল্যাণ্ডের জুরিখ শহরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁদের নিজেদের মতের হতাশা এবং আতঙ্ককে শিল্প ও সাহিত্যে প্রকাশ করার জন্য তাঁরা অ-চিন্তিত এবং অসাধারণ মাধ্যমের আশ্রয় নেন।

এই আন্দোলনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন এমি হেনিংস, জিন আর্প, জোহানেস বাডার, মার্সেল ডুচ্যাম্প, ম্যাক্স আর্নস্ট, এলসা ভন ফ্রেইট্যাগ-লরিংহোভেন, জর্জ গ্রোস, রাউল হাউসম্যান, জন হার্টফিল্ড, হান্না হচ, রিচার্ড হুয়েলসেনবেক, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, ম্যান রে, হ্যান্স রিখটার, কার্ট শোইটার্স, সোফি টেউবার-আর্প, ট্রিস্টান জারা এবং বিয়েট্রিস উড। এই আন্দোলন পরবর্তীকালের শৈলী যেমন ‘অগ্রযাত্রী’ (ইংরেজি: Avant garde) ও শহর-মুখী সঙ্গীত (ইংরেজি: Downtown music) আন্দোলন এবং পরাবাস্তববাদ, নয়া বাস্তববাদ, লোকপ্রিয় শিল্প ও প্রবহশিল্পকে (Fluxus) প্রভাবিত করেছিল।

ব্যুৎপত্তি এবং নামকরণ

কবি ও ঔপন্যাসিক জাঁ ককতু’র মতে, প্রতিটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মই আসলে এক একটি ‘বিশৃঙ্খলার অভিধান’। দাদাবাদ মূলত ‘খেয়ালবাদ’ হিসেবেই পরিচিত, কারণ ফরাসি ‘দাদা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শখের কাঠের ঘোড়া’ বা ‘খেয়াল ঘোড়া’।

দাদাবাদের ইতিহাস

জুরিখের খেয়ালবাদীদের মতে সমাজজুড়ে বিদ্যমান যুদ্ধ, ধ্বংস, অসাম্য আর অত্যাচারের মূল কারণ হলো মানুষের সহজাত পাশবিক প্রবৃত্তি। এই রূঢ় সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাদের বিশ্বাস ছিল, সমাজ যেহেতু কোনো আদর্শ নীতি মেনে চলে না, তাই শিল্পীর পক্ষেও প্রচলিত নিয়ম-কানুনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার প্রয়োজন নেই। শিল্প সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত, তা কোনো নিয়ম, শৃঙ্খলা, ঐতিহ্য ও আদর্শের শিকলে বন্দি নয়। তাদের কেন্দ্রীয় শব্দ ছিল ‘নাথিং’। এই শিল্পীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বা অন্বিষ্ট ছিল মানুষের আবেগের বিমূর্ত রূপকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলা।[২]

এই অরাজক ও বৈপ্লবিক মানসিকতা থেকেই তাঁরা প্রচার করেন—মনে যা আসে, ঠিক তা-ই করো; শিল্পের মাধ্যম হিসেবে বেছে নাও যা খুশি। দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অক্ষরের প্রচলিত রূপকেও তাঁরা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন; প্রশ্ন তুলেছিলেন—অক্ষরগুলো উল্টিয়ে লিখলে ক্ষতি কী? প্রথা ভাঙার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই জাঁ ককতু, হানস আর্প এবং মার্সেল দুকাম্পের মতো শিল্পী ও সাহিত্যিকরা শিল্প-সাহিত্যের চিরাচরিত সব নিয়মকে লঙ্ঘন করে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন।

আধুনিক শিল্প ও সাহিত্যের প্রভাবশালী ধারা ‘সুররিয়ালিজম’ বা ‘পরাবাস্তববাদ’-এর মূল উৎস হিসেবে কাজ করেছে এই দাদাবাদই। শিল্প ও সাহিত্যে প্রথা ভাঙার এই অরাজক ও বৈপ্লবিক আন্দোলন ১৯২২ সালের দিকে এসে স্তিমিত হয়ে পড়ে।[৩]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ১৪ মে ২০১৯; রোদ্দুরে.কম, ঢাকা; “দাদাবাদ বিশ শতকের ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভেতরকার শিল্প আন্দোলন”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/literary-glossary/dadaism/
২. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ৪৮।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১২২।

Leave a Comment