সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ তুলে ধরে সাম্যবাদ অভিমুখী পার্টির প্রতি শিল্পীর কর্তব্য

সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ (ইংরেজি: Socialist Realism) বলতে, ব্যাপক অর্থে, এক বিশেষ ধরনের সাহিত্যিক বাস্তববাদ বোঝায়। সোভিয়েত সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ। এটি এমনই এক শৈল্পিক পদ্ধতি বা শৈলী যার পেছনে সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং এই ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ হলো এক বিশেষ শৈল্পিক আন্দোলন।[১]

এই আন্দোলনের শুরু সর্বপ্রথম রুশ দেশে এবং পরে অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশেও এই আন্দোলন সমর্থিত হতে থাকে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাম্যবাদ অভিমুখী সমাজের জন্য লড়াকু পার্টির প্রতি শিল্পী ও সাহিত্যিকের কর্তব্যকে বোঝায়। প্রলেতারিয়েতের মানসজগৎকে তার আপন মহিমা, মর্যাদা, আশা ও সাধারণের কাছে বোধগম্য আকৃতিতে তুলে ধরা শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব, যাতে বৈপ্লবিক চেতনাসম্পন্ন বস্তুগত মানসিকতা গড়ে তোলা যায়। শিল্পীর কাজ বিশ্বের ব্যাখ্যা নয়; পার্টি-মনস্কতা সৃষ্টির উপযোগী পরিবর্তনসাধন তাঁর প্রধান কর্তব্য।[২] বিশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণতন্ত্রী চীনে এই আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা সেখানকার গণতান্ত্রিক সাহিত্যিকেরা করেছেন।

সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের মূল কথা হচ্ছে শিল্পে, সাহিত্যে, নাটকে, সংগীতে, চিত্রকলায়, ভাস্কর্যে বস্তুর বা জীবনের নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তোলা এবং বাস্তব জীবনের এই বিশ্বস্ত চিত্রায়ণের মধ্য দিয়েই সামাজিক সমস্যাগুলি সাধারণ জনগণের কাছে সহজবোধ্য করে তোলা। সেই সঙ্গে শ্রেণিসংগ্রামের কাহিনিতে সর্বহারা শ্রেণির জয়ে তার উপসংহার নির্মাণ।[৩]

সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ ধারনাটির উদ্ভাবক ছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, ক্রিস্টোফার কডওয়েল প্রমুখেরা যারা মনে করেন যে শিল্পীকে বুর্জোয়া চিন্তার ধারাবাহিকতা বহনকারী যাবতীয় কলাকৈবল্যবাদী আদর্শ ত্যাগ করতে হবে। মাক্সিম গোর্কির আগে আলেক্সি তলস্তয় ‘মনুমেন্টাল রিয়ালিজম’ বলে একটি কথা ব্যবহার করেছিলেন ‘এস্থেটিসিজম’ বা ‘নন্দনতত্ত্ব’-এর বিপরীতার্থে। তার মতে, নন্দনতত্ত্ব সৌন্দর্য নয়, মণ্ডন; প্রেম নয়, মোহ। নন্দনতত্ত্ব নীরক্ত, স্থির এক নিষ্প্রেম চিন্তা। শিল্পের তাৎপর্য সম্পর্কে সে নিরুত্তর। অপরপক্ষে ‘মনুমেন্টাল রিয়ালিজম’-এর লক্ষ্য মানুষের পরিবর্তন-সাধন। এর লক্ষ্য আদর্শ বা প্রতীক সৃষ্টি। এর চূড়ান্ত ভাবনা মানুষের সুখ ও বিশুদ্ধি। এর প্রত্যয় মানুষের মহত্ত্বে। আলেক্সি তলস্তয়-কথিত ‘মনুমেন্টাল রিয়ালিজম’ সাহিত্যবিচারের জগতে প্রচলিত হলো না। প্রচলিত হলো গোর্কির ‘সোস্যালিস্ট রিয়ালিজম’ বা ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ কথাটি; যদিও দু’এর অর্থ-তাৎপর্যগত প্রভেদ গভীর নয়।[৪]

সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ তত্ত্বের উদ্ভব

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের সফল রুশ বিপ্লবের মধ্যে দিয়েই সেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের সমাজতন্ত্রকে গড়ে তোলার প্রশ্নে সাহিত্যিকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে ভাবনা চিন্তাও শুরু হয়েছিল। ১৯৩০ থেকেই সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বিষয়টি পার্টির বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা আলোচিত হতে থাকে। এসব আলোচনাগুলিকে একটি সংঘবদ্ধ ও সার্থক প্রয়াসে রূপান্তরিত করার প্রত্যাশা নিয়ে ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে গঠিত হয় ‘সোভিয়েত লেখক সংঘ’। বলা হয়, দেশের সমস্ত লেখক এই সঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এঁরা বাস্তবতার উপস্থাপন ঘটাবেন সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং এদের অভিপ্রায় চালিত হবে ভবিষ্যতের দিকে। তার বৈপ্লবিক বিকাশের স্তরগুলিকে এক নিরন্তর সমগ্রতায় ও কুণ্ঠাহীন সদর্থক উপলব্ধির মধ্যে ধারণ করতে প্রবুদ্ধ হবেন এঁরা। 

আরো পড়ুন:  ছড়া হচ্ছে বিশেষ ধরনের ছন্দের ক্ষুদ্রাকার কবিতা বা পদ্য

গোর্কি বাস্তবতাকে ‘সোস্যালিস্ট’ শব্দের দ্বারা বিশেষিত করেছিলেন যেভাবে তার অর্থ-তাৎপর্য যুগ সমাজ ও অর্থনীতির দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো সেকালে। এমনকি এখনও তার রঙ কিছু ফিকে হয়ে আসে নি, যদিও বিপক্ষে বক্তব্যও কিছু কম জমে ওঠে নি। গোর্কি সাহিত্যের বাস্তববাদকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দের দ্বারা বিশেষিত করার প্রেরণা পেয়েছিলেন কোথা থেকে তা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। গোর্কি বলেছেন, ‘সোস্যালিস্ট রিয়ালিজম’ কথাটি সৃষ্টির প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস-এর এই মন্তব্যটি থেকে যে, জীবন হচ্ছে অবিচ্ছিন্ন গতি ও বিবর্তন। জীবনে চিরস্থির সত্য কিছু নেই। …এঙ্গেলস-এর অভিমত সাহিত্যতত্ত্বে প্রয়োগ করে গোর্কি পূর্বেকার বাস্তবতা-সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলেন। বালজাক বা ডিকেন্সের সঙ্গে একজন সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীর পার্থক্য কোথায় তা সঙ্গত কারণেই মার্কস বা এঙ্গেলস-এর দ্বারা আলোচিত হয় নি। রিয়ালিজম-এর যে ব্যাখ্যা তাদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি, গোর্কির অভিমত খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, তার বিপরীত নয়, তার সূক্ষ্মতর ও বিস্তৃততর বিশ্লেষণ মাত্র।

বাস্তববাদী শিল্পী-সাহিত্যিকের কাছ থেকে মার্কস-এঙ্গেলস যে-ঐতিহাসিক দৃষ্টি কামনা করেছিলেন, গোর্কি সেই ইতিহাস-চেতনা শুধু কামনা করেন নি, তাকে প্রয়োগ করেই ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ কথাটি গঠন করলেন। ইতিহাস নিত্য বিবর্তনশীল, মানবজীবন এবং সাহিত্যও তাই। দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অগ্রগতি। নবীন ও প্রাচীন প্রথার দ্বন্দ্ব এবং দ্বন্দ্বের অবসানে নবীনের প্রতিষ্ঠা, ইতিহাসে স্বাভাবিক নিয়ম যদি এই হয়, তাহলে পৃথিবীতে এমন কোনো সত্য নেই যা এক ও ধ্রুব। ‘বাস্তব’কে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দিক থেকে লক্ষ্য করেই গোর্কি বললেন—সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রাচীন পৃথিবীর টিকে থাকার ও তার ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং সেই প্রভাবকে সমূল উৎপাটিত করা।[৫]

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মে সোভিয়েত সংবাদমাধ্যম Literaturnia Gazeta সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা বিষয়টি জনসমক্ষে আনে। ১৯৩৪ সালের ১৭ অগস্ট ‘সোভিয়েত লেখক সংঘ’-এর প্রথম সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় তত্ত্ব রূপে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’ গৃহীত হল। সম্মেলনে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয় “as a method aimed at giving a truthful reflection of reality in its constant revolutionary development” ‘ সম্মেলনে স্বাগত ভাষণ দিয়েছিলেন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক এ. এ. ঝানভ। সভাপতিরূপে মাক্সিম গোর্কি (১৮৬৮-১৯৩৬) ‘সোভিয়েত সাহিত্য’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতা থেকেই এই সাহিত্যতত্ত্বের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়। তার মতে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা হলো পৃথিবী পুনর্গঠনকারী জনগণের ‘বাস্তবতা’। তা করতে গিয়ে লেখক কেবল ঐতিহ্যবাহী বাস্তবতাবাদীদের মতো ‘প্রকৃতি ও মানবের নিরীক্ষক’ অথবা ‘জীবনের সমালোচক’ মাত্র হবেন না। তাঁর দায়িত্ব হবে “to participate directly in the construction of a new life, in the process of changing the World”।[৬]

আরো পড়ুন:  প্রহসন বা ফার্স হচ্ছে সমাজের খারাপ রীতি শোধনার্থে হাস্যরস প্রধান একাঙ্কিকা

বুর্জোয়া সাহিত্যে যে বাস্তবানুরাগ চোখে পড়ে, গোর্কি বলছেন, তা হচ্ছে সমালোচনামূলক। এই সমালোচনার পিছনে থাকে শ্রেণিস্বার্থ বজায় রাখার জন্যে এক ধরনের রণকৌশল। বুর্জোয়াদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখিয়ে তাদের শাসনব্যবস্থা কায়েম রাখাই মূল কথা। অপরপক্ষে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার লক্ষ্য সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিপ্লবী-সম্ভাবনার উন্নতিসাধন। ১৯৩৫-এর ফেব্রুয়ারিতে গোর্কি এই কথাগুলি বললেন এ. শেরবাকোভের কাছে লেখা এক চিঠিতে। ছ’মাস আগে ১৭ই আগস্ট ১৯৩৪ তারিখে ‘সোভিয়েত লেখকদের প্রথম কংগ্রেস’-এ প্রদত্ত ভাষণে গোর্কি তার দেশের সাহিত্যিকদের ভ্রান্তি, সীমাবদ্ধতা আলোচনা করে দেখিয়ে সাহিত্যের মাধ্যমে পার্টির আদর্শ রূপায়ণ কামনা করলেন। সমালোচনামূলক বাস্তবতা ও সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার পার্থক্য সুন্দর করে আলোচনা করলেন একাধিক অনুচ্ছেদের মধ্যে। তার বক্তব্য হলো—সমালোচনামূলক বাস্তবতার জন্ম জীবনযুদ্ধে অক্ষম সেই সব ব্যক্তিদের দ্বারা যাঁরা বিচ্ছিন্ন হতে হতে শেষ পর্যন্ত নিজেদের জন্যে বেঁচে থাকার ভিতরও অর্থ খুঁজে পায় না এবং সমাজ ও ইতিহাসের প্রগতিকে ‘অ্যাবসার্ড’ বা উদ্ভট বলে মনে করতে থাকে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এদের কোনো গুরুত্ব নেই তা নয়, তবে তা শুধু অতীতকে জানা ও তার ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন থাকাতেই সীমাবদ্ধ। এই ধরনের বস্তুবাদ, গোর্কি মনে করেন, সমালোচনা করতে গিয়ে কিছুই প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অপরপক্ষে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’র বক্তব্য হচ্ছে—জীবন হচ্ছে সৃজনধর্মী কর্মযজ্ঞ, যার লক্ষ্য স্থায়িত্ব ও স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনের সঙ্গে তাল রেখে পৃথিবীতে সুখে বাস করার জন্যে নিজেদের একই পরিবারভুক্ত মানুষ হিসেবে গণ্য করা।[৭]

গোর্কির ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ স্পষ্টতঃ সৃজনধর্মী, শুধুই ছিদ্রান্বেষণে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের ভিতর থেকে ত্রুটি খুঁজে পাওয়া এককের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু সেই ত্রুটি থেকে মুক্তির উপায় ভাবতে গেলে যে সঙঘবদ্ধ মানসিকতার প্রয়োজন সেখানে মানুষকে ত্যাগের পথ বেয়ে গঠনের পাদপীঠে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করতে হয়। অতএব সেখানে ভিতরে ও বাইরে সংগ্রাম করতে করতে মানুষকে শুদ্ধ হতে হয়। ‘অহং’-এর তামসিকতা বর্জন করাই সেখানকার প্রথম সংগ্রাম। অহং-এর মাত্রাতিরিক্ত বিস্তার বিযুক্তি বা ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর কুফল।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষ যেমন পরিবেশ থেকে তেমনি নিজের থেকেও বিযুক্ত হতে থাকে। ইওনেস্কো-র ‘How to get rid of it’ নাটকে, ফ্রানৎস কাফকা-র ‘দি ট্রায়াল’ উপন্যাসে এই বিযুক্ত মানবাত্মার সংকট রূপায়িত। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজের একজন শিল্পী যেমন পরিবেশ-পীড়িত মানুষের ছবি আঁকতে গিয়ে উৎকণ্ঠাতাড়িত জীবনের সত্যতা রূপায়ণের নামে রবার্ট মুশিল কথিত ‘ghostly aspect of reality’ ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তেমনি অন্য কেউ গতিশীল ইতিহাসে সমগ্রতার প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাবনাপূর্ণ জীবনকে রূপ দিতে পারেন। কাফকা প্রমুখ সাহিত্যিকেরা প্রথম পদ্ধতিটিই গ্রহণ করেছিলেন। সম্ভবত অস্তিত্ববাদী দার্শনিক কিয়েকগার্ড-এর দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি যার মূল কথা ছিলো, সভ্য মানুষ বাস করে দুর্বোধ্য ও দুর্ভেদ্য এক ছদ্মবেশের অন্তরালে। সত্তার গভীরে জীবনের সার্থকতা সন্ধান ও পরিবেশ-বিযুক্তভাবে ‘এককের আত্মমগ্নতা’ আপাত দৃষ্টিতে যাকে যথার্থ স্বাধীনতা বলে মনে করা হয় তা যে এক ধরনের অবান্তরতার চর্চা, কাফকা প্রমুখের লেখা সে বিষয়ে আমাদের সচেতন করে রাখে। সাহিত্যিকের এই ধরনের বাস্তববিস্মৃতি বা পরিবেশ ও ইতিহাস বিমুখতা মানুষের অসহায়ত্বের বোধ দু’দিক থেকে তুলে ধরতে পারে।

আরো পড়ুন:  প্রবাদ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উপলব্ধি করা সত্যকে মূর্তভাবে প্রকাশ করে

একদিকে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তার সত্তার বাইরে জগতের কোনো সার্থকতা নেই এই বোধ; অন্য দিকে মানুষের জীবন যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তার উপর তার কোনো কর্তৃত্ব নেই সে পরিবেশের মধ্যে প্রক্ষিপ্ত, এই বোধ। এই দুটি বোধই ক্রমে মানুষের মনের গভীরে এক দুর্মোচ্য বিপন্নতাবোধের জনক হয়। প্রগাঢ় বিষাদ হয় তার পরিণাম। তখন মানুষ হয়ে দাঁড়ায় খণ্ড খণ্ড অভিজ্ঞতার ক্রমবিন্যাস এবং নিজের ও অপরের কাছে ব্যাখ্যাতীত নীরক্ত কিছু ভাবাবাগের সমষ্টিমাত্র। তখন এলিঅটের ‘Cocktail Party’-র মনঃসমীক্ষকের মতো এই সিদ্ধান্তে উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে ওঠে যে, প্রত্যহের খণ্ড খণ্ড মৃত্যু দিয়ে গড়া একের জীবনে অপরের অস্তিত্ব নিতান্তই মুহূর্তকালীন এবং প্রতিটি সাক্ষাৎ-মুহূর্তেই একজন অপরজনের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ।…ব্যক্তিকে পরিবেশ-বিচ্ছিন্ন অহং-শাসিত সত্তা ভাবার প্রবণতা থেকেই এই সিদ্ধান্ত, যাকে বলা হয় ‘আধুনিকতা’, যা ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’ থেকে তা অবশ্যই ভিন্ন একটি বক্তব্য তুলে ধরে। বিযুক্তি বা ‘অ্যালিয়েনেশন’-বিরোধী ধারণার প্রচারই ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা’র প্রথমতম লক্ষণ।[৮]

তথ্যসূত্র:

১. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যের শব্দার্থকোশ, (১৯৯৯) পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১০৮।
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়; রাজনীতির অভিধান; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা; তৃতীয় মুদ্রণ জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩১৬-৩১৭।
৩. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত।
৪. ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়, মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ২০১৮; পৃষ্ঠা ৬২-৬৪।
৫. ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত।
৬. সংলাপ সরকার, “সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা: বাস্তবতার এক অন্য উদ্ভাস”, নবেন্দু সেন সম্পাদিত পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্যভাবনা, রত্নাবলী কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৬২, পৃষ্ঠা ১৮৭।
৭. ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত।
৮. ড. বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়, পূর্বোক্ত।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রবন্ধে ব্যবহৃত ভাস্কর্যটি ভেরা মুখিনার (১ জুলাই ১৮৮৯ – ৬ অক্টোবর ১৯৫৩) নির্মিত মস্কোর ভাস্কর্য “শ্রমিক এবং কলখোজ নারী”। আলোকচিত্রী: Limitchik, সিসি, বাই, এসএ 4.

Leave a Comment

You cannot copy content of this page