প্রহসন বা ফার্স হচ্ছে সমাজের খারাপ রীতি শোধনার্থে হাস্যরস প্রধান একাঙ্কিকা

প্রহসন বা ফার্স (ইংরেজি: Farce) হচ্ছে সমাজের খারাপ রীতি শোধনার্থে রহস্যজনক ঘটনা সম্বলিত হাস্যরস প্রধান একাঙ্কিকা নাটক। প্রহসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ Farce. ভারতীয় নাট্যসাহিত্যে প্রহসনের একটি বিশিষ্ট ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। ইংরেজি Farce যে ভারতীয় প্রহসনের প্রতিশব্দ, একথা সম্ভবত প্রথম বলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তাঁর পত্রাবলীতে। ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ রচনাটির আখ্যাপত্রে তিনি ‘প্রহসন’ অভিধাটির ব্যবহার করেছেন।

কারো কারোর অনুমান, সম্ভবত ফ্রান্সেই Farce-এর উদ্ভব হয়। তার একটি কারণ, লাতিন ‘Faracire (= to staff) শব্দটি ফরাসি ভাষায় Farce রূপেই প্রচলিত হয়। গ্রাম্য লাতিন ভাষায় বলা হত ‘Farsa’। প্রাথমিক স্তরে Farce ছিল এক ধরনের প্রস্তুতিবিহীন নাটক। গুরুগম্ভীর বা অন্য যে কোনো নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যের ফাঁকে-ফাঁকে যা staff করে দেওয়া বা ভরে দেওয়া হতো। ফলে পরবর্তীকালে হৈ-চৈ গণ্ডগোল পূর্ণ উদ্দামতাময় Comic Action রূপে এগুলির বিবর্তন ঘটে।

ফার্স এর মূল লক্ষ্য ছিল, বাহ্যিক দৃশ্য-ঘটনা দ্বারা মানুষকে হাসানো। কোনো পরোক্ষ ভাবে নয়, খাঁটি কমেডিতে যা হয়ে থাকে। হাসির মাত্রাভেদের দিক থেকে এখানেই প্রহসন ও কমেডির মধ্যে মূল পার্থক্য। প্রহসনের মধ্যে থাকে আকস্মিকভাবে কোনো কিছুর আবির্ভাব বা উপস্থিতি, দৈহিক অঙ্গভঙ্গি, পুনরাবৃত্তি, চরিত্রগত অতিশয়োক্তি। এর জগৎ সম্ভব-অসম্ভবের এক মিশ্র জগৎ। ফরাসি নাট্যকার মলিয়ের নানাভাবে এই প্রাথমিক ও সম্পূর্ণ নাট্যধারাটির উন্নতি সাধন করেন। নানা অভিঘাতের মধ্য দিয়ে ধারাটি বেঁচে থাকে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সেটি ছড়িয়ে পড়ে।

ষোড়শ শতাব্দীতে ইংলণ্ডের নাটকের মধ্যে একটি মিশ্র ধারার প্রবর্তন ঘটল, প্রহসনের ধারাটি তার মধ্যে একটি বড় দিক। এর বৈশিষ্ট্য হলো কোনো গুরুগম্ভীর বিষয়ের নাটকের মধ্যে কিংবা অন্য যে কোনো বিষয়ের নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে কোনো ‘Farcial Episode’ অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়া। শেকসপিয়রের বিভিন্ন কমেডি নাটকে যথা Comedy of Errors, A Midsummer Night’s Dream, The Twelfth Night প্রভৃতি নাটকে। এই Episode বা খণ্ডকাহিনীগুলিকে বলা হতো Burlesque,—যার পরিচয় লিখেই দেওয়া হয়েছে, এগুলির প্রয়োগ দেখা যায়।

আরো পড়ুন:  গীতিকা বা গাথা হচ্ছে লোকসাহিত্যের সর্বশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবর্গ

ইংরেজি সাহিত্যে প্রহসন

ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে Commonwealth Period-এ প্রহসন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নাট্যধারা হয়ে উঠলেও অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিক থেকেই প্রহসন অন্য কোনো নাটকের শেষে অভিনীত হতে থাকে Afterpiece রূপে। After-piece রূপে প্রহসন নাটকের চাহিদা বেড়ে যেতেই ইংরেজি নাট্যধারায় এর নিজস্ব বিশিষ্ট প্রয়োগ প্রচলিত হলো, রচনা রীতিতেও পরিবর্তন এলো। সেজন্য Sentimental Comedy, Melodrama প্রভৃতির সঙ্গে প্রহসনের মিশ্রণ ঘটে গেল। Farce বা প্রহসনের রচনানীতির মধ্যে Parody, Burlesque, Travesty বা কোনো কিছুর হাস্যকর অনুকরণ করা প্রভৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনটির সঙ্গেই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সংযোগ আছে, প্রহসনেও তা আছে।

পাশ্চাত্য প্রহসনের উদ্ভব ও রচনাগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে দেশের সামাজিক অবস্থা বিপর্যয়ের সংযোগের কথা বিশেষভাবে বলা হয়ে থাকে। ‘প্রহসন-সামাজিক উপপ্লবের ও অশান্তির নির্দেশক’। অর্থাৎ যখনই কোনো দেশে বা সমাজে কোনো বিরুদ্ধ-বিরূপ রীতি-নীতির অনুসরণ দেখা যায়, তখনই তার প্রতিক্রিয়ায় সে দেশে প্রহসন ও Farce রচিত হয়। সমাজের এই বিপর্যয়ের কথাটি মনে রেখেই প্রহসনের প্রসঙ্গে Comedy of Manners-এর কথাটি উঠে পড়ে। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে মলিয়ের এই ধারাটির প্রবর্তন করতে শুরু করেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মলিয়েরের ‘The Cit Turned Gentleman’ এবং ‘Marriage Force’, এ দুটি প্রহসনের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন, যথাক্রমে ‘হঠাৎ নবাব’ এবং ‘দায়ে পড়ে দারগ্রহ’ নামে।

দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যে প্রহসন

প্রাচীন ভারতীয় নাট্যধারার অন্তর্গত প্রহসনের কথাও এখানে বলা প্রয়োজন। দীর্ঘায়ত সংস্কৃত নাটকের সমান্তরাল ধারায় হাস্যোদ্রেকের জন্য এক ধরনের স্বল্পায়তন নাটকের কথা সংস্কৃত আলংকারিকেরা বলেছেন, যার নাম প্রহসন। বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর ‘সাহিত্যদর্শন’ গ্রন্থের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে প্রহসন সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, প্রহসন হবে একটি অঙ্কে প্রসারিত, কখনো বা দুই অঙ্কের।

হাস্যরস হবে তার মুখ্যরস, আখ্যান বৃত্তটি হবে কোনো নিন্দার্হ ব্যক্তিকে নিয়ে। নাটকে যদি একটি মাত্র ধৃষ্ট চরিত্র থাকে তবে তা হবে ‘শুদ্ধ’ স্তরের। আর যদি একাধিক ধৃষ্ট চরিত্র থাকে, তবে তা ‘সংকীর্ণ’ স্তরের প্রহসন। তবে, নায়ক চরিত্র হবে একজন তপস্বী বা বিপ্র। সংস্কৃত প্রহসনের দৃষ্টান্তরূপে ‘কৌতুকসর্বস্ব’, হাঁস্যার্ণব প্রভৃতির নাম করা যায়।

আরো পড়ুন:  লোকসাহিত্য বা মৌখিক সাহিত্য হচ্ছে এমন ধরনের সাহিত্য যা কথ্য বা গীত হয়

সংস্কৃত প্রহসনগুলির ধৃষ্ট বা নিন্দনীয় চরিত্রগুলি হতো নাট্যকারের কল্পিত। বাংলা প্রহসনগুলির মধ্যে বাস্তবতা এবং এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত বিষয়ই গৃহীত হতো। প্রহসনের ধারাটিকেই আশ্রয় করেই বাংলা সাহিত্যে বাস্তবতার প্রাথমিক বিকাশ ঘটে। হাস্যরসাত্মক চরিত্র পরিস্থিতি, খণ্ডকাহিনী, নকশাধর্মী আখ্যান সৃষ্টি করে সমাজ-শোধনের প্রয়াস বাংলা প্রহসনের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য। সমাজ-শোধন বিশ্বের অন্যান দেশের প্রহসনেরও উদ্দেশ্য।

প্রহসনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিবর্তনটি এই রকমের: প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে কোনো চরিত্রকে ব্যঙ্গ-উপহাস, তারপর নিছক ও আমোদমূলক হাস্যরসের যোগান দেওয়া, শেষে হাস্য ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে সমাজ-শোধন করা। বাংলায় প্রহসনের নানা প্রতিশব্দ মেলে: ‘সমাজচিত্র, ‘সামাজিক নকশা’, ‘পঞরং’। সুকুমার সেন ‘পঞরং’-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এই বলে: বিদ্রুপাত্মক প্রহসন। কাজেই প্রহসনের উদ্দেশ্য কখনো বিদ্রুপ প্রকাশ, কখনো নিছক রঙ্গ-কৌতুক, আবার কখনো বা সমাজ শোধন।

বাংলা প্রহসন সাহিত্যের উদাহরণ  

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ এবং ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’—এই দুখানি রচনা বাংলা সাহিত্যের দুটি সেরা প্রহসন। সাহিত্যের ঐতিহাসিক লক্ষ্য করেছেন, এই দুটি রচনার প্রভাবে পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে প্রচুর প্রহসন লিখিত হতে থাকে। ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রো’ প্রহসনটির নামকরণের প্রভাবে ছড়া-প্রবাদের পঙুক্তি দিয়েই বাংলা প্রহসনের নামকরণের প্রথার সৃষ্টি হয়। এতে বাস্তবতা, কৌতুক-রঙ্গ-ব্যঙ্গ ভালোভাবে ফোটে।

‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ প্রহসনটিতে ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর মদ্যপানের অতিরেক এবং আধুনিকতার নামে পান ভোজনের প্রথাকে ব্যঙ্গ করা হলেও রচনাটির মধ্যে সাহিত্যিক কৌশলেরও অনেক দিকের প্রকাশ ঘটেছে। এটি নিছকই একটি প্রহসন নাটক নয়।

‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনটিতে প্রাচীনপন্থী মানুষদের অনাচার এবং তাদের শাস্তি প্রদর্শিত হয়েছে। কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কিঞিৎ জলযোগ’ বিশুদ্ধ প্রহসনের চরম দৃষ্টান্ত, প্রহসনের সংজ্ঞার সব দিক বিচার করে দেখলে নিখুঁত সৃষ্টি,—যদিও ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি একটু প্রাসঙ্গিক তির্যক মন্তব্য মেলে। ‘অলীকবাবু’, সেই তুলনায় ততোখানি সফল সৃষ্টি নয়। এর আগে দীনবন্ধু তাঁর ‘জামাইবারিক’ শ্বশুরবাড়িতে সব ঘর-জামাইদের ব্যারাক’,—তার থেকে বারিক, প্রভৃতি প্রহসনের মধ্যে হাসির শুচিতা যেন রক্ষা করে উঠতে পারেন নি, কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হাসির শুদ্ধতা রক্ষার প্রথম শিল্পী।

আরো পড়ুন:  ইংরেজি সাহিত্য ইংরেজি ভাষায় সপ্তম শতাব্দী থেকে অদ্যাবধি লিখিত সাহিত্য

গিরিশচন্দ্র মূলত সীরিয়াস নাট্যকার, তথাপি তিনি ‘পঞরং’ আখ্যায় কয়েকটি প্রহসন লিখেছিলেন, সেগুলির তেমন সাহিত্যিক সাফল্য নেই। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের শিষ্য অমৃতলাল বসু ব্যঙ্গাত্মক বা Satire ধর্মী প্রহসন রচনা করে বাংলা সাহিত্যে আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। উচ্চ ও অভিজাত সমসাময়িক সমাজের নরনারীদের বিচিত্র কর্মাবলী তাঁর প্রহসনের মূল লক্ষ্য যদিও কখনো কখনো তিনি রক্ষণশীল দৃষ্টিকোণের পরিচয় দিয়ে ফেলেছেন। সংলাপের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ বৈদগ্ধ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। ‘বিবাহ বিভ্রাট’ তাঁর একটি জনপ্রিয় প্রহসন। ‘সম্মতি সঙ্কট’, ‘বাবু’, ‘একাকার’, ‘গ্রামবিভ্রাট’ প্রভৃতি তাঁর অন্যান্য প্রহসন। দ্বিজেন্দ্রলালের প্রহসনের মূলধন তাঁর গান। ‘কল্কি অবতার’ সমকালীন জাতিভেদ প্রথাকে বিদ্রুপ করে রচিত, ‘বিরহ’ বিশুদ্ধ শ্রেণির প্রহসন, ‘আনন্দবিদায়’ রবীন্দ্র সাহিত্যের ‘প্যারডিমূলক’ প্রহসন। বিশুদ্ধ হাস্যরসের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রহসন নাটক ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ এবং ‘গোড়ায় গলদ’ দুটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি।

তথ্যসূত্র

১. নীহার কান্তি মণ্ডল, “নাটকঃ সাহিত্যের রূপভেদ”, নেতাজী সুভাষ বোস মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ষষ্ঠ পুনর্মুদ্রণ জুলাই ২০১৯, পৃষ্ঠা ৪৬৯-৪৭১

Leave a Comment

error: Content is protected !!