সাম্যবাদী প্রচারণা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া

সাম্যবাদী প্রচারণা (ইংরেজি: Communist campaign) হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কমিউনিস্ট পার্টি ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন দ্বারা বিপ্লবী সাম্যবাদী মতাদর্শ প্রচারণা ও গঠনের উদ্দেশ্যে পার্টি পরিচালিত প্রচারমাধ্যমের কার্যকলাপ। ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী পার্টি গঠনের পথ অনুসরণ করে লেনিন বললেন যে, শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক পার্টি গঠনের কাজ শুরু করতে হলে সারা রুশদেশ জুড়ে একটি জঙ্গি রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করা উচিত। এই সংবাদপত্র বিপ্লবী সোস্যাল ডেমোক্রাসির মতবাদের স্বপক্ষে প্রচার আন্দোলন চালাবে; এই সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই হবে পার্টি গঠনের প্রথম ধাপ।

কার্ল মার্ক্সের মতো লেনিনও বিপ্লবের দুটি দিকের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এই দুটি দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রচারণা যা বর্ধিত মজুরি ও কর্মঘণ্টার ছাড়ের জন্য শ্রমিক ধর্মঘট করে যেটার উপরে জোর দেয় অর্থনীতিবাদীরা এবং রাজনৈতিক প্রচারণা যা সমাজের সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের দাবি জানায়। লেনিন বলশেভিক ভ্যানগার্ড পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিপ্লবী নেতৃত্বকে রাজনৈতিক প্রচারণার উদ্দেশ্যে পার্টি নীতি তুলে ধরেছিলেন।

কী করতে হবে গ্রন্থের কিছুদিন পূর্বে কোথায় আরম্ভ করতে হবে? নামে বিখ্যাত প্রবন্ধে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন পার্টি গঠন সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ছক এঁকে দেন। সেই প্রবন্ধে লেনিন লেখেন:

‘আমাদের মতে সারা রুশদেশের উপযোগী রাজনৈতিক সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করাই হবে আমাদের কাজের আরম্ভ, আমাদের আকাঙ্ক্ষিত সংগঠন সৃষ্টির প্রথম ধাপ; সর্বোপরি এই সংবাদপত্রই হবে প্রধান সূত্র যা অবলম্বন করিয়া আমরা আমাদের সংগঠনকে বাড়াতে পারব, গভীরতর করতে পারব এবং অবিচলিতভাবে বিস্তৃত করত পারব …..। নীতির দিক হইতে সুসঙ্গত সর্বব্যাপক প্রচার ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সাধারণভাবে সোস্যাল ডেমোক্রাটদের প্রধান ও নিরন্তর কর্তব্য; জনসংখ্যার ব্যাপকতম অংশের মধ্যে রাজনীতি ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে উৎসুক্য জাগবার ফলে আজ তা হয়ে উঠেছে বিশেষভাবে জরুরি অথচ এই প্রচার ও আন্দোলন পরিচালনাও সম্ভব নয় যদি একখানি সংবাদপত্র না থাকে।’[১]

লেনিনের বিবেচনায় এই ধরনের সংবাদপত্র যে কেবল মতাদর্শের দিক হতে পার্টিকে সুসংহত করবে তাই নয়, স্থানীয় সংগঠনগুলোকেও সাংগঠনিকভাবে পার্টির মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করবে। স্থানীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ হতে সংবাদদাতা ও এজেন্টদের দল মিলে এমন একটি কাঠামো খাড়া করবে যার চারপাশে পার্টি গড়ে উঠতে পারবে। কারণ, লেনিনের ভাষায় ‘সংবাদপত্র কেবল যৌথ প্রচারক ও আন্দোলনকারীই নয়, সংবাদপত্র যৌথ সংগঠকও বটে’। ঐ একই প্রবন্ধে লেনিন লেখেন,

‘জালবুনানির মতো এই এজেন্টদের দল ঠিক এমনই একটা সংগঠনের কাঠামো তৈরি করবে যা আমরা চাই। সে সংগঠন হবে গোটা দেশব্যাপী বিরাট সংগঠন- কড়াকড়িভাবে ও পুঙ্খানুপুঙ্খ কর্মবিভাগের উপযোগী যথেষ্ট ব্যাপক ও বহুমুখী; যে কোনো অবস্থাতে, যে কোনো বিপাকে ও যে কোনো আকস্মিক পরিস্থিতিতে নিজের কাজ চালাতে সক্ষম এমনভাবে পরীক্ষিত ও ইস্পাতদৃঢ়; শত্রু যখন বিপুল উদ্যোগে একই স্থানে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে আক্রমণ করবে তখন তার সুযোগ নিয়ে যখন ও সেখানে শত্রু আক্রমণ করে না তখন ও সেখানে তাহাকে আক্রমণ করবার মতো নমনীয়তার ক্ষমতাসম্পন্ন’।[২]

মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে একটি কমিউনিস্ট পার্টি রাজনৈতিক পত্রিকা, পোস্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পুস্তিকাকে কাজে লাগায়। লেনিন ইস্ক্রা পত্রিকাকে বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজে লাগিয়েছিলেন। ইস্ক্রা কাগজটিকে লেনিন সাম্যবাদী মতাদর্শ প্রচারণা ও গঠনের কাজে লাগাতে চেন। ইস্ক্রাকে এই ধরনের শক্তিশালী কাগজই হতে হবে।

আরো পড়ুন:  ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হচ্ছে সমাজ জীবনে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূলনীতিগুলোর প্রয়োগ

ইস্ক্রা ছিলো অবৈধভাবে প্রকাশিত প্রথম সারা রুশ মার্কসবাদী পত্রিকা। অবশ্যই বিপ্লবী পত্রিকা এবং আরো অনেক কিছু। ইস্ক্রা ছিলো শ্রমিক শ্রেণির পার্টি গড়ে তোলার একটি মোক্ষম হাতিয়ারও। এটি ছিলো এমন এক ঝরনাধারা যার মাধ্যমে সাম্যবাদী আন্দোলন হাজারো ধারায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রুশদেশের বিভিন্ন স্থানে কমিউনিস্ট কমিটিগুলো [তখন পার্টির নাম ছিলো সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, ফলে এই কমিটিগুলোকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক কমিটি বলা সংগত] দানা বেঁধে উঠতে পেরেছিলো। ইস্ক্রার সদর দপ্তর থেকে লেনিনের নির্দেশ যেত এই কমিটিগুলোর কাছে আর পার্টির তত্ত্বগত বক্তব্য তাঁদের কাছে পৌঁছাত ইস্ক্রার পৃষ্ঠায়। তত্ত্বগত ও সংগঠনগত সংহতির ফলে পৃথক কমিটিগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলো। রুশ দেশের অগ্রসর শ্রেণি সচেতন মহান শ্রমিকগণ ইস্ক্রার কাছে পাঠ নিয়েছিলো কী করে শত্রুর সংগে লড়াই করতে হয়।[৩]

ইস্ক্রার প্রথম সংখ্যাতেই লেনিন লিখেছিলেন,

“একটি দৃঢ়-সংগঠিত পার্টি যদি আমাদের থাকে তাহলে একটি আঘাতই শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক জয়ের সূচনা করতে পারে। একটি দৃঢ়-সংঘটিত পার্টি যদি আমাদের থাকে তাহলে একটি বিদ্রোহ রূপ নিতে পারে বিজয়মণ্ডিত বিপ্লবের”।[৪]

লেনিন একটি কেন্দ্রীকতাবাদী কমিউনিস্ট পার্টি গড়তে রাজনৈতিক পার্টি সাম্যবাদী প্রচারণা হিসেবে ইস্ক্রাকে গড়ে তুলতে যুক্তি উপস্থাপন করেন। পার্টির মতাদর্শগত ও সংগঠনগত সংহতির পথ প্রস্তুত করে নিতে ইস্ক্রা বাস্তবিকই এই ধরনের সারা রুশ সংবাদপত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইস্ক্রা হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির গঠন ও কাঠামো নির্মাণের মতাদর্শ প্রস্তুতি ও অনুশীলনের এক বিশাল কর্মক্ষেত্র।

পার্টি গঠনের তত্ত্বগত সম্পদের অধিকারী হয়ে ‘ইস্ক্রা’ পার্টি গঠন, পার্টির শক্তিসঞ্চয়, দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস আহ্বান এবং বিপ্লবী কমিউনিজমের স্বপক্ষে এবং অর্থনীতিবাদী সংস্কারবাদী ও সর্বপ্রকার সুবিধাবাদীদের বিপক্ষে লেনিনের পরিকল্পনার ভিত্তিতে ব্যাপক প্রচার চালাবার শক্তি পেয়েছিল ও কাজের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে অনুশীলন চালিয়েছিল। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যেসব কাজ ‘ইস্ক্রা’ করেছিল সেগুলির মধ্যে অন্যমত হলো পার্টির জন্য একটি কর্মসূচি প্রণয়ন। আমরা জানি যে শ্রমিক পার্টির কর্মসূচি হলো শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ও বিজ্ঞানসম্মত বিবৃতি।

আরো পড়ুন:  দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হচ্ছে মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি

বাংলাদেশে সাম্যবাদী প্রচারণা

আন্তর্জাতিকতাবাদ সাম্যবাদী আন্দোলনে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, অবদান রাখতে হলে জাতীয় পরিসরে যেসব বিষয়ে কাজ করা যেতে পারে, তা এখানে তুলে ধরা হলো। প্রথমত, দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রচার করতে আমাদের অসুবিধা নেই। এক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দার্শনিক ও নেতাদের মূল পাঠগুলো আমরা প্রচার করব, নিজেরা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বুঝবো। এছাড়া আমরা অভ্যন্তরীণভাবে সুবিধাবাদ, সংশোধনবাদ, মতান্ধতাবাদ, নৈরাজ্যবাদ, অর্থনীতিবাদ, সংস্কারবাদের বিরোধিতা করব; এসব বিষয় জানা বোঝার চেষ্টা করব।

সাম্যবাদী প্রচারণায় আমাদের সতর্ক থাকার দিক হচ্ছে, যদি দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতার সমালোচনা করতে হয়, তবে সেইভাবেই সমালোচনা করব যা সাম্রাজ্যবাদী প্রচারমাধ্যমের মতো না শোনায়। কেননা যে সমালোচনা সাম্রাজ্যবাদীরা লুফে নেবে সেরকম সমালোচনা সাম্রাজ্যবাদ ও তার পক্ষের অন্যান্য মতাদর্শের সহায়ক হবে। এটি ছাড়াও, সমসাময়িক উত্তেজনায় গা না ভাসিয়ে আমাদের মত তুলে ধরব। রাষ্ট্রে ও সমাজে বুর্জোয়ারা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে বড় ঘটনা ঘটায়, আর সব দেশপ্রেমিকেরা (!) ঐটা নিয়ে অনলাইন প্রচারমাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরকম সমসাময়িক উত্তেজনায় গা না ভাসিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির লক্ষে কাজ করার জন্য মতামত প্রদান ও কাজ করব।

তথ্যসূত্র

১. লেনিন, সিলেকটেড ওয়ার্কস, রুশ সংস্করণ, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০।

২. ভি আই লেনিন, পূর্বোক্ত, ১১২।

৩. অমল দাশগুপ্ত, কমরেড লেনিন, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, এনবিএ-র প্রথম সংস্করণ, ২০১৩, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৭৭-৭৮

৪. অমল দাশগুপ্ত, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭৭-৭৮

Leave a Comment

error: Content is protected !!