মেকিয়াভেলিবাদ (ইংরেজি: Machiavellianism) হচ্ছে শাসককে দয়া-দাক্ষিণ্য, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতাকে আঁকড়ে থেকে ধর্ম ও নৈতিকতাকে নির্মমভাবে পদদলিত করার রাজনৈতিক নীতি। এই মতবাদ দিয়েছেন নিকোলো মেকিয়াভেলি নামে ইতালির একজন জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ, এবং তাঁর এই চিন্তা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে “মেকিয়াভেলিবাদ” নামে পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর এ মতবাদ ঘৃণিত ও কুখ্যাত অপবাদের সাথে জড়িত।
মেকিয়াভেলিবাদ শব্দটির অর্থ হচ্ছে শঠতা, কপটতা ধোকাবাজি ও দ্বিমুখী নীতি। মেকিয়াভেলিবাদ শব্দটি নিন্দনীয় অর্থের সাথে জড়িত হলেও আধুনিক রাষ্ট্রনায়কদের কাছে এটিকে কেউ কেউ ইতিবাচক বলে মনে করেন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে গণ্য করেন।[১]
মেকিয়াভেলি নিজ মাতৃভূমি ইতালির সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে অনুধাবন করেন। একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসকের অধীনে পঞ্চধা বিভক্ত ইতালিকে ঐক্যের বাঁধনে বাঁধতে তিনি শাসককে দিয়েছেন তার চলার পথে অনেক পরামর্শ বা উপদেশ।
মেকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত দ্য প্রিন্স (ইংরেজি: The Prince) গ্রন্থে রাজনীতি থেকে ধর্ম ও নৈতিকতাকে আলাদা করেছেন এবং শাসক সম্পর্কে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তাই মেকিয়াভেলিবাদ নামে পরিচিত। অবশ্য মেকিয়াভেলির তৎকালীন ইটালির আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে শাসক সম্পর্কে এ ধরণের মন্তব্য করেছিলেন। তিনি শাসক সম্পর্কে বলেন, শাসককে ভালোবাসা, প্রেম-প্রীতি, দয়া-দাক্ষিণ্য সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে প্রয়োজনে প্রতারণা, কপটতা, নিষ্ঠুরতার আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে এবং নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে জনগণের কল্যাণে বা রাষ্ট্রের কল্যাণে শাসক সব কিছুই করতে পারবেন। শাসকের এ ধরণের অবাধ স্বাধীনতা দানের মতবাদই মেকিয়াভেলিবাদ (Machiavellism) নামে পরিচিত। মেকিয়াভেলির শাসক সম্পর্কে এধরণের মন্তব্যের জন্য রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে তাঁকে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
অনেক সমালোচক মেকিয়াভেলিকে শয়তানের সাথে তুলনা করেছেন। এ মতবাদের মূলকথা হচ্ছে “শঠতা, কপটতা, প্রতারণা, ধোকাবাজি ও দ্বিমুখী নীতি।” অর্থাৎ শাসক প্রয়োজনে যে কোনো কাজ করতে পারবেন। এমনকি শাসক হিসেবে মিথ্যা কথা বলতেও দ্বিধা নেই। কিন্তু একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, যদিও আধুনিক যুগে মেকিয়াভেলিকে অনেকেই ঘৃণা করেন তথাপি অনেক শাসকই তাঁর আদর্শকে মনে মনে বেছে নিয়েছেন। কেননা মেকিয়াভেলিবাদের মাধ্যমেই শাসক দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। যদিও এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক স্যাবাইন বলেন: “Since the ruler is outside the group or at least in every special relation to it, he is above the morality to with in the group.” প্রকৃত প্রস্তাবে এটাই রাজনীতিতে মেকিয়াভেলিবাদ নামে পরিচিত।
জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে মেকিয়াভেলি রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে পৃথক করেছেন। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে আর কোনো বড় স্বার্থ থাকতে পারে না। নৈতিকতার প্রশ্নে দুটি বিপরীতধর্মী মানের কথা তিনি বলেছেন। জনগণকে ব্যক্তিগত জীবনে নৈতিকতার চার দেয়ালে বন্দি করে শাসককে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নীতি বিবর্জিত হবার পরামর্শ দিয়েছেন। মেকিয়াভেলিবাদের শিক্ষাকে নৈতিকতার দ্বিমুখী নীতি (Double Standard of Morality) বলা হয়। কিন্তু তাই বলে তিনি নীতিহীন ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডার্নি বলেন, “Machiavelli is not immoral but immoral in his politics.” অর্থাৎ মেকিয়াভেলি রাজনীতিতে নীতি নিরপেক্ষ, নীতিহীন নয়।
তৎকালীন ইতালির বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মেকিয়াভেলি স্পষ্টতই বুঝতে পেরেছিলেন— ধর্ম ও নৈতিকতার অনুশাসন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। স্বভাবজাত স্বার্থপর ও কুপ্রবৃত্তি সম্পন্ন মানুষকে ধর্ম ও নৈতিকতার বাণী দিয়ে শাসন করা যাবে না। কেননা তারা সুযোগ পেলেই সকল বন্ধন ছিন্ন করে আত্মস্বার্থে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শনের পথই উত্তম। এ জন্য একজন শাসককে যা করণীয় তাই করতে বলেছেন তিনি। মেকিয়াভেলির এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
আরো পড়ুন
- অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতা বা অধিকারের আইনি, সামাজিক, অথবা নৈতিক নীতি
- অগাস্ট কোঁত দৃষ্টবাদী ও অভিজ্ঞতাবাদী সমাজতত্ত্বের প্রবর্তক
- ফেবিয়ানবাদ বা ফেবিয়ান সমিতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী সমিতি
- জাতীবি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চতুর্থ বর্ষের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ২০২০ সালের প্রশ্নপত্র
- প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের বিরোধী হিসাবে নির্বাচিত ব্যক্তি চালিত
- স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মিলের ধারণা হচ্ছে কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা সমস্যার সমাধান
- উপযোগবাদ হচ্ছে আদর্শগত নীতিশাস্ত্রের তত্ত্বের একটি গুচ্ছ
- জন স্টুয়ার্ট মিলের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে উপযোগবাদ, উদারনীতিবাদ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র
- জন স্টুয়ার্ট মিল উনিশ শতকের ইংল্যান্ডের দার্শনিক, যুক্তিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ
- সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ
- আনন্দবাদ এমন এক চিন্তাধারা যাতে সকল আনন্দ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে
- জেরেমি বেনথাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সংস্কারক ও আইনবিদ
- স্বাধীনতা সম্পর্কে মন্টেস্কুর ধারণা দ্য স্পিরিট অফ ল গ্রন্থের স্বাধীনতার আলোচনা
- ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি হচ্ছে মন্টেস্কুর আইন, শাসন ও বিচার ক্ষমতার পৃথকীকরণ
- মন্টেস্কুর আইনতত্ত্ব হচ্ছে দ্য স্পিরিট অব লজ গ্রন্থে প্রদত্ত আইনের ব্যাখা
- মন্টেস্কুর রাষ্ট্রচিন্তা যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের সংমিশ্রণে গড়া সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
- মেকিয়াভেলিবাদ ভীতি সঞ্চার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নীতি
- মেকিয়াভেলি রচনাবলী হচ্ছে তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ
- মেকিয়াভেলি ইতালীয় রেনেসাঁর কূটনীতিক, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী লেখক
- জাঁ জ্যাক রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব হচ্ছে সামাজিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়
- জাঁ জ্যাক রুশো ফরাসি বিপ্লবের তাত্ত্বিক এক পুঁজিবাদী দার্শনিক, লেখক ও সুরকার
- জন লক ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ বস্তুবাদী দার্শনিক ও রাজনৈতিক লেখক
- কার্ল মার্কস বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহান বিপ্লবী ও দার্শনিক
- ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহান বিপ্লবী ও দার্শনিক
- জোসেফ স্তালিন সোভিয়েত রাষ্ট্রনায়ক এবং মানবেতিহাসের মহত্তম নেতা
- মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী
- হার্বার্ট স্পেন্সার ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, জীববিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী
- টমাস হিল গ্রীন ছিলেন উনিশ শতকের ইংল্যাণ্ডের শিক্ষাবিদ এবং দার্শনিক
- অগাস্ট কোঁৎ-এর পরিচয়, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনে অবদান
- টমাস হিল গ্রীনের রাষ্ট্রদর্শনে অবদান রয়েছে ভাববাদ, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকারে
- রাষ্ট্রচিন্তায় রুশোর অবদান প্রকৃতির রাজ্য, সামাজিক চুক্তি, সার্বভৌমত্ব ও ইচ্ছাতত্ত্বে
- লকের রাষ্ট্রদর্শন বা রাষ্ট্রচিন্তায় অবদান প্রকৃতির রাজ্য, সামাজিক চুক্তি ও সম্পত্তি
- টমাস হবসের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে রাষ্ট্র, মানব প্রকৃতি, প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা
- মার্টিন লুথারের ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাবে আধুনিক যুগের সূচনা
- রাষ্ট্রচিন্তায় মেকিয়াভেলির অবদান মানব প্রকৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদে
- ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ আন্দোলনের প্রভাব
- হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব হচ্ছে শাসক চরম, অবিভাজ্য ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী
- প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবসের ধারণা হচ্ছে সমাজবিহীন অসভ্য নোংরা
- মানব প্রকৃতি সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা হচ্ছে স্বার্থপর, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক
- টমাস হবস আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক
- হেগেলীয় রাষ্ট্র হচ্ছে সর্বব্যাপী, সত্য, অভ্রান্ত, ঐশ্বরিক, জাতীয়, জৈব যুদ্ধংদেহী সত্তা
- হেগেলবাদী রাষ্ট্রতত্ত্ব হচ্ছে হেগেলের রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্পর্কে ভাববাদী মত
- হেগেলের জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা হচ্ছে জার্মান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উৎকর্ষ ও শ্রেষ্ঠ শক্তি
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ৩ মার্চ ২০১৯, “মেকিয়াভেলিবাদ প্রসঙ্গে”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/philosophy/machiavellism/
২. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “মেকিয়াভেলি”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ২১৭।
রচনাকাল: ৩ মার্চ ২০১৯, নেত্রকোনা বাংলাদেশ।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।