“স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে” কবিতাগ্রন্থের মূল্যায়ন

অনাবিলা অনা
অনাবিলা অনা, লেখক ও আলোচক

বইয়ের নাম- স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে
ধরন-কবিতা
প্রকাশনা-মনন পাবলিকেশন
প্রথম প্রকাশ – সেপ্টেম্বর, ২০১৭
প্রচ্ছদ – ভ্যান গগ-এর চিত্র অবলম্বে মো. আবদুল ওদুদ
পৃষ্ঠা – ৬৪
মূল্য- ২০০ টাকা

স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে বইটি লেখা হয়েছে মূলত শ্রমিক-কৃষক-মেহনতিদের জীবনচিত্র ও সংগ্রাম নিয়ে। কোনো বই হাতে নেয়ার পরই প্রথমে আমি প্রকাশকের কথাটা পড়ি। দোলন প্রভা রচিত স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে বইটিতে প্রকাশক খুব সামান্য কথায় যা লিখেছেন, তা কাব্যগ্রন্থটা শেষ করার পর বুঝতে পেরেছি। ঠিক তার পরই কবির কথা মনে পড়ে যায়। আমার কাছে কবিতা বরাবরই একটি প্রিয় বিষয়, কিন্তু কবিতা জন্মায় কবির মনের অন্তরাল থেকে। তার জন্যই চেনা উচিত কবির পরেই তাঁর কবিতা। তবে এটাও ঠিক যে, শুধু কবির জীবনী পড়েই কবির চিন্তাকে বুঝা বা মূল্যায়ন করা যায় না।

কবি দোলন প্রভা ভূমিকার প্রথমেই উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে বইটিতে যে কবিতাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে তা ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে লেখা। যে সময়টাতে কৃষক শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলো। ফলস্বরূপ, তাদের জীবনের পরিবর্তন ছিলো ঠুনকো। যুগ যুগ ধরে যে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি প্রতিবাদের আওয়াজ তুলে। কিন্তু রাজনীতির সাথে সাথে প্রতিনিয়ত চাপা পড়ে যাচ্ছে তাদের স্বপ্ন, সেখানে কবির কবিতা হতে পারে নিরব প্রতিবাদ। কৃষক-শ্রমিকের প্রতিবাদগুলো যখন মৃত্যুর মুখে ধাবিত হচ্ছে অনবরত, তখন কবি তার কবিতাকে প্রতিবাদের অস্ত্র ভেবেই লিখেছিলেন।

বইটির রচয়িতা দোলন প্রভা যিনি ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে বি.এ অনার্স সহ এম.এ সম্পন্ন করেন। বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী থাকাকালীন অবস্থায় তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে

আরো পড়ুন:  'আকালি বাড়ি যায়' পূরবী সম্মানিত'র গল্পগ্রন্থের আলোচনা — অনাবিলা অনা

রাজনৈতিক স্থবিরতায় যেখানে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে সেখানে কবি “নাগমতির সুর”-এর মাধ্যমে আশার বিন্দু দেখেন। যে অন্ধকার গ্রহে চলে শ্রমিক কৃষকদের জীবন সংগ্রামের খরা সেখানে “নাগমতির সুর” কবিতায় কবির প্রকাশ এভাবে দেখি – “আলিঙ্গনে খন্ড খন্ড ছায়া জড়িয়ে ধরে রূপালী নদীর জল,/ নাগমতির সুরের পাখিরা মৃত নগরীর ঝড় ঝঞ্চায়/ করুণ কাহিনী নিয়ে বেঁচে থাকে”।

সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই পরিবর্তন হয়ে যায়। গ্রাম হয়ে যায় শহর, তেমনি যুগের সাথে হারিয়ে গেছে কবির সহজ সরল এক কালের গরিব ভূমি। কবির বুকে এখন শুধুই স্মৃতি। “স্মৃতিচারণ” কবিতায় কবি প্রকাশ করেছেন- “রেলের ধুসর পাথরের পাশ ঘেঁষে নীরবে ঘুমিয়ে আছে/ আমার পরিচিত এক কালের গরিব ভূমি।”

“অপরাজিতা” কবিতায় কবি লিখেছেন – “আমার পুরনো মন হারিয়ে যায় চাঁদের সুরে সুরে পাহাড়ের নীলে।” যেখানে প্রকাশ করেছেন কবি পুরনোর সাথে আবদ্ধ না থেকে নতুনের পূবাল হাওয়ায় শিহরিত হয়ে উঠছেন।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শরীরের রক্তকে পানি করা শ্রমিকদের হাতেই তৈরি হচ্ছে সভ্যতা। অথচ তাদের জীবনই খুব তুচ্ছ। আর সে কথাই “সভ্যতা ” কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে- “সভ্যতার এ-পর্বে জীবনকে মাপা হয়/ বাজারের সবজি আর পরিত্যক্ত কৌটার মতো/ শ্রমিকের ঘাম পড়ে থাকে/ উচ্ছিষ্ট আবর্জনার মতো। “

রানা প্লাজা ধ্বসে মৃত শ্রমিকগণকে নিবেদিত কবিতা “নীরবতা “। যে কবিতার মাধ্যমে কবি নীরবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কবি কবিতায় প্রকাশ করেছেন ” এক প্রতিবাদের ছায়া জেগে ওঠে আমার পাশে।”

ছাপ্পান্নটি কবিতার সমন্বয়ে রচিত স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে বইটি। যে বইয়ের প্রচ্ছদটি ভ্যান গগের চিত্র অবলম্বনে মো. আবদুল ওদুদ এঁকেছেন। এই বইয়ের প্রত্যেকটি কবিতা শ্রমিকের কথা বলে, কৃষকের কথা বলে, প্রকৃতির কথা বলে,সমাজ বদলাবার কথা বলে, প্রতিবাদের কথা বলে। এ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই ভিন্ন রকম। বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টিও বলা যায় দোলন প্রভা রচিত স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে বইটিকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!