পূর্ববঙ্গের পদ্মা তীরবর্তী প্রকৃতির চিত্র ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রে

পূর্ববঙ্গের পদ্মা তীরবর্তী প্রকৃতির (ইংরেজি: Nature on the banks of the Padma in East Bengal) বহু বিচিত্র রূপ ও রেখাচিত্র ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেছিন্নপত্র নামক পত্রসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থে। ১৮৯১ সালে জমিদারির ভার গ্রহণের পরই কেবল রবীন্দ্রনাথের সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহি অঞ্চলের মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের। এই সময়েই তিনি গ্রামের মানুষ ও তার পরিবেশ এবং সমাজকে গভীরভাবে দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন বাংলার প্রকৃতি।

ছিন্নপত্রেই মূলত আমরা পাবো পূর্ববঙ্গের পদ্মা ও অন্যান্য নদী, প্রকৃতি পরিবেশ ও পথের বর্ণনা এবং গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস, রুচি ও দৈন্যের নিবিড় চিত্র। ছোটো নদী্র উপরে কবি সারাটা দিন ভেসে চলেছেন। দুই ধারে গ্রাম ঘাট ফসলের খেত চর, বিচিত্র ছবি, দেখা দিচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে; আকাশে মেঘ ভাসছে এবং সন্ধ্যার সময় নানারকম ফুল ফুটছে; জেলেরা মাছ ধরছে, অহর্নিশি জলের এক প্রকার আদর পরিপূর্ণ তরল শব্দ শোনা যাচ্ছে।[১]  

ছিন্নপত্রে রয়েছে গ্রামের বর্ণনা, বহু প্রজাতির গাছ-পালার নাম। কবি দেখতে পাচ্ছেন টিনের ছাত-ওয়ালা বাজার, বাখারির বেড়া-দেওয়া গোলাঘর, বাঁশঝাড়, আম, কাঁঠাল, কুল, খেজুর, শিমুল, কলা, আকন্দ, ভেরেণ্ডা, ওল, কচু, লতাগুল্ম তৃণের সমষ্টিবদ্ধ ঝোপঝাড় জঙ্গল, ঘাটে বাঁধা মাস্তুলতোলা বৃহদাকার নৌকার দল, নিমগ্নপ্রায় ধান এবং অর্ধনগ্ন পাটের খেত।[২] নৌকো চলছে; বেশ একটু বাতাস দিচ্ছে। তিনি দেখতে পাচ্ছেন

“শৈবালের উপরে অনেকগুলো ছোটো ছোটো কচ্ছপ আকাশের দিকে সমস্ত গলা বাড়িয়ে দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। অনেক দূরে দূরে একটা একটা ছোটো ছোটো গ্রাম আসছে। গুটিকতক খোড়ো ঘর, কতকগুলি চাল-শূন্য মাটির দেয়াল, দুটো একটা খড়ের স্তুপ, কুলগাছ, আমগাছ, বটগাছ এবং বাঁশের ঝাড়, গোটা তিনেক ছাগল চরছে, গোটাকতক উলঙ্গ ছেলে মেয়ে … … ”[৩]

বাংলার মানুষের চেয়েও ছিন্নপত্রে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঝোড়ো হাওয়া, বরিষণ ও বর্ষাকালের বর্ণনা। বাঙলাদেশ নদীর দেশ বলে নয়, বাঙলাদেশ বৃষ্টির দেশ বলে নয়, বাঙলাদেশের প্রাণ বর্ষাকাল বলে; বিশেষ করে যখন বৃষ্টির জলের উপর নির্ভর করে চলতো কৃষকের ফসলের প্রাণ, প্রকৃতির অন্য সব প্রাণি ও উদ্ভিদের প্রাণ। বর্ষা ও বাঙলাদেশ একই সুত্রে গাঁথা; যেমন গাঁথা রবীন্দ্রনাথ-বাঙলাদেশ ও বর্ষা একই সুতোয়।

আরো পড়ুন:  সংলাপ হচ্ছে সাহিত্যিক রচনায় দুটি চরিত্রের মধ্যকার কথোপকথন

বর্ষার কয়েকটি বাক্য খেয়াল করলে দেখবো এক উত্তাল বর্ষার রূপ, “কাল সমস্ত রাত বাতাস পথের কুকুরের মতো হু হু করে কেঁদেছিল_আর বৃষ্টিও অবিশ্রাম চলছে। মাঠের জল ছোটো ছোটো নির্ঝরের মতো নানা দিক থেকে কল কল করে নদীতে এসে পড়ছে…।”[৪] কিংবা “কাল সমস্ত রাত্রি খুব অজস্রধারে বৃষ্টি হয়ে গেছে। আজ ভোরে যখন উঠলুম তখনো অশান্ত বৃষ্টি।[৫]

বর্ষার প্রথম দিনটা কবির কাছে বরঞ্চ ভেজাও ভালো। তবু তিনি অন্ধকূপের মধ্যে দিনযাপন করবেন না। তিনি লিখছেন,

“কাল আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বর্ষার নব রাজ্যাভিষেক বেশ রীতিমত আড়ম্বরের সংগে সম্পন্ন হয়ে গেছে। দিনের বেলাটা খুব গরম হয়ে বিকেলের দিকে ভারি ঘনঘটা মেঘ করে এল। …

জীবনে ‘৯৯ সাল আর দ্বিতীয়বার আসবে না_ভেবে দেখতে গেলে পরমায়ুর মধ্যে আষাঢ়ের প্রথম দিন আর কবারই বা আসবে_ সবগুলো কুড়িয়ে যদি ত্রিশটা দিন হয় তা হলে খুব দীর্ঘজীবন বলতে হবে। মেঘদূত লেখার পর থেকে আষাঢ়ের প্রথম দিনটা একটা বিশেষ চিহ্নিত দিন হয়ে গেছে, নিদেন আমার পক্ষে।”[৬]

তারপর তিনি কালিদাস আর ইতিহাস আর সূর্যাস্ত লোহিতসাগর চন্দননগর দার্জিলিং দ্যুলোক-ভুলোককে একত্রে মিশিয়ে কাব্যিক ভাষায় বরিষণের দীর্ঘ বিবরণ দিচ্ছেন।

রবীন্দ্রনাথের কালো অক্ষরের আঁচড়ে এসেছে পূর্ববঙ্গের পদ্মা নদীর বর্ণনা, গড়াইয়ের রূপ। পদ্মাকে দেখে একসময়ে তার মনে হয়েছে, একটি পাণ্ডুবর্ণ ছিপছিপে মেয়ের মতো, নরম শাড়িটি তার গায়ের সংগে সংলগ্ন। সুন্দর ভঙ্গিতে সে চলে যাচ্ছে এবং তার শাড়িটি তার গতির সংগে বেঁকে যাচ্ছে।[৭] আবার এক সময় এই পদ্মাকেই তার মনে হয় উন্মাদিনীর মতো _খেপে নেচে সে বেরিয়ে যায়। কালীর মতোই সে যেন নৃত্য করে, ভাঙে এবং চুল এলিয়ে দিয়ে ছুটে চলে। … নতুন বর্ষায় পদ্মার খুব ধার হয়েছে। … তীব্র স্রোত যেন চকচকে খড়্গের মতো, পাতলা ইস্পাতের মতো একেবারে কেটে চলে যায়। প্রাচীন ব্রিটনদের যুদ্ধরথের চাকায় যেন কুঠার বাঁধা_দুই ধারের তীরে একেবারে অবহেলা ছারখার করে দিয়ে চলেছে।[৮] নদী একেবারে কানায় কানায় ভরে এসেছে। ও পারটা প্রায় দেখা যায় না। জল এক এক জায়গায় টগবগ করে ফুটছে, আবার এক এক জায়গায় কে যেন অস্থির জলকে দুই হাত দিয়ে চেপে চেপে সমান করে মেলে দিয়ে যাচ্ছে।[৯]

আরো পড়ুন:  সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ বা সাহিত্য রীতি হচ্ছে সাহিত্য লেখার বিষয়শ্রেণি

রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের পদ্মা ও অন্যান্য নদীর সাথে নিজেকে মিশিয়ে নেন, ভালোবাসেন তার রূপ, ক্ষমতা ও তার বহন করবার সামর্থ্য। সারাটা দিন কেটে যায় এই পদ্মার বুকে।

‘বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড় ভালোবাসি। ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত আমার তেমনি পদ্মা—আমার যথার্থ বাহন; খুব বেশি পোষ-মানা নয়, কিছু বুনোরকম; কিন্তু ওর পিঠে এবং কাঁধে হাত বুলিয়ে ওকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে।[১০]

পূর্ববঙ্গের পদ্মা ও অন্যান্য নদীর রূপ দেখে তিনি আঁকেন সেই ছবি যা কালের প্রবাহে গড়াই নদীকে বাঁচিয়ে রাখে না। বর্ষা ছাড়া বাংলাদেশের গড়াই আজ ২০০৮ সালে মরা খাল। চৈত্র মাসে এই নদীতে ২০০৮ সালে হাঁটু পানিও থাকে না। অথচ রবীন্দ্রনাথের লেখায় এখনো বেঁচে আছে গড়াই নদীর এক কোণে নিশ্চিন্ত মুগ্ধ মনে জলিবোটের উপর বিছানা পেতে পড়ে থাকা, আছে গড়াই ব্রিজের নিচে স্রোতের আবর্তে পড়া কবিকে উদ্ধার করা মাঝি-মাল্লাদের সাঁতার, জড় পদার্থের ব্রিজের অবিচল মূর্তি।[১১]  

বাংলার আকাশে বর্ষাকালে ঝড় হয়, পদ্মার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে এবং চরাঞ্চলে ঝড় এসে উপস্থিত হয়। যদিও রবীন্দ্রনাথ বোলপুরের বা সিরাজগঞ্জের চৌহালীর সেই ঝড়ের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখছেন, কিন্তু সেটা গড়াই-পদ্মার তীরের ঝড়ের চেয়ে আলাদা কিছু নয়;

“ধুলোয় আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে গেল, এবং বাগানের যত শুকনো পাতা একত্র হয়ে লাটিমের মতো বাগানময় ঘুরে বেড়াতে লাগলো, যেন অরণ্যের যত প্রেতাত্মাগুলো হঠাত জেগে উঠে ভুতুড়ে নাচন নাচতে আরম্ভ করে দিলে”।[১২] বাঁশগাছগুলো হাউমাউ শব্দে একবার পূর্বে একবার পশ্চিমে লুটিয়ে পড়তে লাগলো, ঝড় যেন সোঁ সোঁ করে সাপুড়ের মতো বাঁশি বাজাতে লাগলো। আর জলের ঢেউগুলো তিনলক্ষ সাপের ফনা তুলে তালে তালে নৃত্য আরম্ভ করে দিলে। … ঝড়ের সে শব্দ আর থামে না_ আকাশের কোনখানে যে একটা আস্ত জগত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।”[১৩]

ছিন্নপত্রে রয়েছে অনেক নাম না জানা ছোট ছোট শাখানদী, উপনদী, খাল, বিল, ঝিলের বর্ণনা; রয়েছে ছোট খাট পাখির নাম যেমন পানকৌড়ি, হাঁস, মোরগ, কোকিল, চিল, মাছরাঙা; অনেক পশু যেমন গরু, বাছুর, ছাগল, শুয়োর, ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁপোকা আর এসবের সাথেই আছে কৃষক, মাঝি, গ্রামের বধূ, ছোট ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা, খেয়া নৌকায় চাষিদের পার হওয়া ও কচু পাতা মাথার উপর ধরে বৃষ্টির মধ্যে চাষিদের নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার মুহূর্ত। এইরকম ছবিময় বর্ণনার মধ্যেই রয়েছে ছোটখাট নিজস্ব মন্তব্য।

আরো পড়ুন:  সাহিত্যের শৈলি হচ্ছে কোনো লেখকের দ্বারা কোনো গল্প লেখা অথবা বলার উপায়

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখায় ব্যবহৃত পদ্মা নদীর আলোকচিত্রটি Tarik Adnan Moon তুলেছেন লালন শাহ ব্রিজ থেকে ২২ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে।

তথ্যসূত্র

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২১ জুন ১৮৯২, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৫৮ নং পত্র, রবীন্দ্রসমগ্র খণ্ড ২২, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা, ২০১৩, পৃষ্ঠা ৬৫৯।
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ৭ জুলাই, ১৮৯৩, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ১০৫ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭০৯
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯ জানুয়ারি, ১৮৯১, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ১১ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬০৯-৬১০;
৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ৩ জুলাই, ১৮৯৩, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ১০২ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭০৬;
৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ৫ আগস্ট, ১৮৯৪, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ১৩৯ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭৪৯;
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৫ জুন, ১৮৯২, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৫৫ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৫৫;
৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২ মে, ১৮৯৩, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৯৩ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৯৭-৯৮;
৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২১ জুলাই, ১৮৯২, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৬৮ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৬৯;
৯. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ৯ আগস্ট, ১৮৯৪, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ১৪১ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭৫১;
১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২ মে, ১৮৯৩, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৯৩ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৯৭;
১১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০ জুলাই, ১৮৯২, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৬৭ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৬৮;
১২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২১ মে ১৮৯২, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ৪৮ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬৪৮;
১৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯ জুন ১৮৯১, ছিন্নপত্র, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা ২০ নং পত্র, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৬২০;

Leave a Comment

error: Content is protected !!