বাল গঙ্গাধর তিলক (ইংরেজি: Bal Gangadhar Tilak; ২৩ জুলাই ১৮৫৬ – ১ আগস্ট ১৯২০), লোকমান্য হিসাবে প্রিয় ছিলেন, একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং একজন স্বাধীনতা কর্মী ছিলেন। তিনি ছিলেন “লাল বাল পাল” সমশব্দত্রয়ের এক তৃতীয়াংশ। তিলক ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম নেতা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ তাকে “ভারতীয় অস্থিরতার জনক” বলে অভিহিত করেছিল। তিনি “লোকমান্য” উপাধিতেও ভূষিত হন, যার অর্থ “জনগণ কর্তৃক তাদের নেতা হিসাবে গৃহীত”। গণশত্রু মোহনদাস গান্ধী তাকে “আধুনিক ভারতের নির্মাতা” বলে অভিহিত করেছিলেন।
ভারতের সুবিখ্যাত রাজনীতিক ও পন্ডিত বাল গঙ্গাধর তিলকের জন্ম ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই দাক্ষিণাত্যের অন্তর্গত রত্নগিরি নামক স্থানে ঐতিহ্যসম্পন্ন মহারাষ্ট্রীয় চিতপাবন ব্রাহ্মণ পরিবারে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই বংশের অবদান ইতিহাসের পাতায়, স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তিলকের পিতার নাম ছিল গঙ্গাধর রামচন্দ্র।
১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাল গঙ্গাধর তিলক ডেকান কলেজ থেকে স্নাতক এবং ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শ্রেণীতে আইনশাস্ত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সংস্কৃত সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও তার পান্ডিত্য ছিল অসাধারণ বেদ-বেদান্ত ও বৈদিক সংহিতার বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যায় তিনি সুগভীর জ্ঞানের পরিচয় দেন।
স্বদেশীয় সাহিত্য সংস্কৃতির পাশাপাশি পশ্চিমী রাজনীতি ও চিন্তাধারার সঙ্গেও তার একাত্মতার অভাব ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন ইউরোপীয় প্রথার অন্ধ অনুকরণ নয়, ভারতীয় সনাতনী প্রথাতেই ভারতীয় জনজীবনে আধুনিকতার রূপান্তর সম্ভব।
রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় তিলক বিদেশী শাসকের কাছে আবেদন নিবেদনে বিশ্বাসী ছিলেন না। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেই তিনি তার রাজনৈতিক ভূমিকাকে অব্যাহত রাখেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস যখন স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভে ব্যস্ত হয়েছে, সেই সময় তিলকের ‘স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার’ এই দাবি ভারতীয় রাজনীতিকে সচকিত করে তুলে।
একমাত্র রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমেই জাতীয় স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভাব—এই প্রশ্নে তিনি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়তাবাদী দল এবং ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে উভয় দলের মিলন ঘটিয়ে জঙ্গী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রচনার মধ্যে তিনি তার মত ও কর্মধারায় অনেকাংশে সফল হন।
আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে তাঁর জাতীয়তাবাদ নরমপন্থী কংগ্রেসীদের আবেদন নিবেদন মূলক জাতীয়তাবাদ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তিলকের মতে জাতীয়তাবাদ মূলতঃ ভাবগত হলেও বস্তুর মাধ্যমেই তা মূর্ত হয়ে ওঠে। তাই হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের পুনর্জাগরণের ভাবধারার সাথে রাজনৈতিক চিন্তাধারার ঐক্য ঘটিয়ে জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি সূচনা করলেন গণপতি পূজা ও শিবাজী উৎসবের।
স্বদেশপ্রেম এবং ধর্মীয় ভাব ও ভাবনায় বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন বহুল পরিমাণে স্বামী বিবেকানন্দ ও স্বামী দয়ানন্দ দ্বারা প্রভাবিত। মূলত, জঙ্গী জাতীয়তাবাদের প্রচারক হলেও মোহনদাস গান্ধী-পূর্ব ভারতে জাতীয়তাবাদ প্রকাশ ও বিকাশে তার সার্থক ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
লোকমান্য তিলকের বিরাট ব্যক্তিত্ব, গভীর পান্ডিত্য, অসামান্য রাজনৈতিক প্রতিভা, সর্বভারতীয় নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা ইংরাজ শাসকের ভয়ের কারণ ছিল। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ বলেছিলেন, “I fear only one man in India he is Mr. Tailk.”
স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে বাল গঙ্গাধর তিলক কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মিলিতভাবে মারাঠী ও কেশরী নামে দুখানি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। একটি ইংরাজি সংবাদপত্রের সম্পাদক রূপেও তিনি কাজ করেন।
লোকমান্য তিলকের জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপ এত তীব্র ছিল যে, ভীত সন্ত্রস্ত ইংরাজ সরকার তাকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে একাধিকবার অভিযুক্ত করে। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে কোলাপুর মানহানি এবং ১৮৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে কারাদন্ড ভোগ করতে হয়।
১৯০৮-’১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজদ্রোহাত্মক অপরাধের অভিযোগে মান্দালয় জেলে অন্তরীণ থাকতে হয়। এইভাবে ক্রমাগত বন্দি থাকার ফলে বন্দিজীবনই তার কাছে হয়ে উঠেছিল পরিচিত গার্হস্থ্য জীবন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে কারামুক্তির পর তিলক ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে বিলাত যান।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে লখনৌ চুক্তির মাধ্যমে তিলক কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের আন্দোলনগত ঐক্যস্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। জাতীয়তাবাদী তিলকের সঙ্গে শ্যামজী কৃষ্ণবর্মা, প্রতিক্রিয়াশীল বিনায়ক দামোদর সাভারকর প্রমুখের সঙ্গেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। সাভারকর প্রতিষ্ঠিত মিত্রমেলা ও অভিনব ভারত নামে গুপ্তসংগঠনের সদস্যদের সঙ্গেও তাব সম্পর্ক ছিল। লোকমান্য তিলকের প্রেরণাতেই ১৯৩৩ খ্রিঃস্টাব্দে নেপালে বোমার কারখানা তৈরি হয়েছিল।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিলক ছিলেন একাধারে অভিজ্ঞ রাজনীতিক, সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত, বিখ্যাত গণিতজ্ঞ, আইনজ্ঞ। মারাঠি গদ্যের অন্যতম স্রষ্টা ও অনন্যসাধারণ নেতা। উগ্র জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক বলে স্বীকৃতি লাভ করলেও তিনি বিপ্লবের কোনো প্রকার বৈজ্ঞানিক মতবাদ; পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন নি। তাছাড়া স্বয়ং বিপ্লবী নায়ক বলেও পরিচিত হতে পারেন নি। কিন্তু তার স্বদেশপ্রেম ও অসাধারণ বাগ্মিতা বহু দেশপ্রেমিক নেতা ও কর্মীকে অনুপ্রাণিত করেছে।
বাল গঙ্গাধর তিলক ছিলেন সর্বক্ষেত্রেই বাস্তববাদী। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চলার বাস্তবতা তিনি বারবার স্বীকার করেছেন। রাজনীতিক চিন্তা ও চেতনায় মহাত্মার সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও অসহযোগ আন্দোলনের পরিকল্পনাকে তিনি সমর্থন জানান।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে হোমরুল লিগ স্থাপন এবং ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ব্রিটিশ শ্রমিক দলের পরিচিতি ঘটানো তিলকের অবিনশ্বর কীর্তি।
মারাঠি ও কেশরী পত্রিকায় তিলকের বহু সুচিন্তিত প্রবন্ধ ও সময়ানুসারী সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এই সকল রচনা তাঁর বিচক্ষণতা স্বদেশপ্রেম ও বাগ্মিতাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
The orion তিলকের আর্য সভ্যতার উৎপত্তি ও তাৎপর্য সম্পর্কিত একটি পান্ডিত্যপূর্ণ মূল্যবান রচনা। তার লেখা গীতা রহস্য ও The Arctic Home in the Vedas গ্রন্থ দুখানি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১লা আগস্ট লোকমান্য তিলকের জীবনাবসান ঘটে।
আরো পড়ুন
- অনিল রায় ছিলেন একাধারে বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী: এক অকুতোভয় নকশালবাদী বিপ্লবীর জীবনগাথা
- কমরেড আব্দুর রউফ মুকুল ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা
- কমলা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বিপ্লবী নেতৃত্ব
- উজ্জ্বলা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবী নারী ও সমাজসেবী
- ইলা সেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- উল্লাসকর দত্ত ছিলেন অগ্নিযুগের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- ভূপেশ গুপ্ত ছিলেন বাংলা ও ভারতের সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী নেতা
- ক্ষুদিরাম বসু বিশ শতকের বাঙলার অগ্নিযুগের মহান সশস্ত্র বিপ্লবী
- হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত
- রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী
- যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী
- সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ শতকের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী
- কমরেড মুজিবর রহমান: নকশালবাড়ি আন্দোলনের এক কিংবদন্তি বিপ্লবীর জীবনগাথা
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- বাল গঙ্গাধর তিলক একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং স্বাধীনতা কর্মী
- বিপিনচন্দ্র পাল একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, লেখক, ও সমাজ সংস্কারক
- রাসবিহারী বসু ছিলেন আধুনিক বর্বর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় বিপ্লবী
- শহীদ লুৎফুন নাহার হেলেন: এক অকুতোভয় মাওবাদী বিপ্লবীর জীবন ও মহান আত্মত্যাগ
- বিপ্লবী চেতনার অগ্নিপুরুষ: কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম
- সুনীতি চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক
- লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা
- বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা
- ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি
- দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী
- ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাম্যবাদী শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের নারী বিপ্লবী
- ইন্দুমতী সিংহ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের একজন বিপ্লবী নেত্রী
- আজীবন বিপ্লবী নগেন সরকার: ৩২ বছরের কারাজীবন ও সাম্যবাদী সংগ্রামের ইতিহাস
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুম জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধি নেতা
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
তথ্যসূত্র
১. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৯৭৬-৯৮০।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।