মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী (২২ অক্টোবর ১৯০১ – ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৯) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত লোকসাহিত্য সংগ্রাহক, গবেষক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক বিদগ্ধ পণ্ডিত। বাংলার লোকজ সংস্কৃতির ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ—উভয় রাষ্ট্র থেকেই সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।
জন্ম ও শৈশবকাল:
১৯০১ সালের ২২ অক্টোবর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কাসিমপুর গ্রামে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ নবী বকস পণ্ডিত। মাত্র ৯-১০ বছর বয়সে পিতৃহারা হলে সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়েন এবং নেত্রকোনার নরেন্দ্রনগর গ্রামে মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন।
শিক্ষাজীবন ও সংগ্রামী পথচলা:
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নরেন্দ্রনগর মিডল ইংলিশ স্কুলে। সেখান থেকে মাইনর পাস করার পর তিনি আশুজিয়ার জগন্নাথ চক্রবর্তী ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তবে চরম আর্থিক সংকটের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মাঝপথেই থেমে যায়। দমে না গিয়ে তিনি রঘুনাথপুর পাঠশালার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজের মেধা ও চেষ্টায় নেত্রকোনা গুরু ট্রেনিং স্কুল থেকে ‘জিটি’ এবং ঢাকা নর্মাল স্কুল থেকে ‘টিচারশিপ সার্টিফিকেট’ লাভ করেন।
পেশাগত জীবন:
শিক্ষকতা ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। ১৯২৯ সালে তিনি নেত্রকোনার বালি জুনিয়র মাদ্রাসায় প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৩১ সালে মোহনগঞ্জ হাই স্কুলে ভার্নাকুলার টিচার হিসেবে নিযুক্তি পান। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জামালপুর ট্রেনিং স্কুল, ঢাকা ও ময়মনসিংহ প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট সংলগ্ন বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘ চার দশকের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবন শেষে ১৯৬৫ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণায় অনন্য অবদান
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ লোকবিজ্ঞানী। তিনি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে লোকসংগীত, ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন এবং ধাঁধা-হেঁয়ালির মতো লোক-ঐতিহ্যের অমূল্য রত্নরাজি সংগ্রহ করেছেন। সংগৃহীত এসব উপাদানের চমৎকার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য এবং তীক্ষ্ণ মেধার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কেবল গবেষণাই নয়, তিনি প্রচুর কবিতাও রচনা করেছেন, যা বর্তমান বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিশাল কর্মযজ্ঞ:
একটি সময় যখন বাংলা একাডেমি বা বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসাহিত্য সংরক্ষণের কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেয়নি, সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী তারও অনেক আগে থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যের যে বিশাল ভাণ্ডার সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছেন, তা বিশ্ব দরবারে এক বিস্ময়। তাঁর এই অর্জন কেবল একনিষ্ঠ সাধনা এবং গভীর মায়ার কারণেই সম্ভব হয়েছিল।
অন্যান্য লোকবিজ্ঞানীদের সঙ্গে পার্থক্য ও মৌলিকত্ব
সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর কাজের ধরন ছিল সমসাময়িক অনেক লোকবিজ্ঞানীর চেয়ে একেবারেই আলাদা। তৎকালীন অনেক পণ্ডিত যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার গণ্ডিতে থেকে কিংবা লাইব্রেরিতে বসে অন্যের সংগ্রহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষণা করতেন, কাসিমপুরী তখন মাঠ পর্যায়ে কাজ করতেন। তিনি অন্যের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি লোকজীবনের গভীরে অবগাহন করেছেন। তাই তাঁর প্রতিটি রচনা ছিল নিজস্ব মেধা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। তথ্যবহুল আলোচনা এবং সমাজ-মানসের গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি লোকসাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
আশুতোষ ভট্টাচার্যের স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি:
দীর্ঘ সত্তর বছরের নিরলস সাধনায় এই মিষ্টভাষী পণ্ডিত বাংলা সাহিত্যের গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্যের পাঁচ খণ্ডে সমাপ্ত বিখ্যাত আকরগ্রন্থ ‘বাংলার লোকসাহিত্য’-এর অন্যতম প্রধান সংগ্রাহক ছিলেন সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী। ডক্টর ভট্টাচার্য নিজেও তাঁর এই অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধি:
সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর খ্যাতি কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তৎকালীন আমেরিকার লোকবিজ্ঞানীসহ বিশ্বজুড়ে এই বিষয়ের গবেষকদের কাছে তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত পরিচিত ও সম্মানীয় নাম। লোকসাহিত্যের বিশ্বদরবারে তিনি বাংলাদেশকে সগৌরবে তুলে ধরেছিলেন।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:
মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরীর গবেষণালব্ধ কাজগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- লোকসাহিত্যে ছড়া (১৩৬৯ বঙ্গাব্দ; বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত)
- লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও প্রবাদ (১৩৭৫ বঙ্গাব্দ)
- বাংলাদেশের লোকসংগীত পরিচিতি (১৩৮০ বঙ্গাব্দ)
- লোকসাহিত্যে মেয়েলী গীতি
পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা:
সাহিত্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য কিছু সম্মাননা হলো:
- তমঘা-ই-খিদমত: শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে এই রাষ্ট্রীয় উপাধিতে ভূষিত করে।
- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৬): প্রবন্ধ ও গবেষণায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেন।
- ময়মনসিংহ সাহিত্য সম্মেলন সংবর্ধনা (১৯৭৮): আঞ্চলিকভাবেও তাঁকে তাঁর কাজের জন্য শ্রদ্ধা ও সংবর্ধনা জানানো হয়।
মৃত্যু:
বাংলার লোকসাহিত্যের এই মহান সাধক ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর নিজ গ্রাম কাসিমপুরীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শারীরিক প্রস্থান ঘটলেও বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের মাঝে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আরো পড়ুন
- মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী: লোকসাহিত্য গবেষণা ও সংগ্রহের অগ্রপথিক
- চন্দ্রকুমার দে: মৈমনসিংহ গীতিকার নেপথ্য কারিগর ও লোকসাহিত্যের অমর সংগ্রাহক
- মণি সিংহ: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক জীবন
- কাহ্নপা বা কাহ্নপাদ হাজার বছর আগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদকর্তা
- অনিল চন্দ্র তালুকদার: নেত্রকোনার এক নিভৃতচারী সংগীত সাধক
- বীর মুক্তিযোদ্ধা অরবিন্দ সাংমা দিও: নেত্রকোনার এক অকুতোভয় গেরিলার সমরগাথা
- অনিন্দ্য জসীম: নেত্রকোনার এক নিভৃতচারী কবি ও দক্ষ সম্পাদক
- অনার্য শান্ত: নেত্রকোনার এক আধুনিক কবি ও সমাজ সংস্কারক
- অনাথ নকরেক: এক লড়াকু আদিবাসী বীর এবং হারিয়ে যাওয়া সার্টিফিকেটের গল্প
- সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অঞ্জনা রায়: সমাজ পরিবর্তন ও শিল্পের এক অনন্য নাম
- অনিমা সিংহ: টংক আন্দোলন ও কৃষক সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নাম
- ভাষাসৈনিক অছিম উদ্দিন আহম্মদ: নেত্রকোণার এক নির্লোভ জননেতার জীবনগাথা
- স্বামী অখিলানন্দ: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শনের সেতুবন্ধনকারী এক অমর সাধক
- ভাস্কর অখিল পাল: যার ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির ইতিহাস
- শহীদ অখিল চন্দ্র সেন: নেত্রকোনার এক প্রদীপ্ত আইনজীবীর আত্মত্যাগের ইতিহাস
- অক্ষয় কুমার সরকার: এক কালজয়ী কবিয়াল ও আয়ুর্বেদ পণ্ডিতের জীবনগাথা
- দোলন প্রভার যৌথ খামার: সাহিত্য, সাম্যবাদ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়
- বাদল মজুমদার: বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও নেত্রকোণার এক গর্বিত সন্তান
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- দোলন প্রভা: নতুন সমাজ বিনির্মাণে এক প্রগতিশীল ও মানবিক সত্তার প্রতিকৃতি
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- ‘সত্যপীরের পাঁচালি’-র আদি রূপকার: মধ্যযুগের বিস্ময় কবি কঙ্ক
- এনামূল হক পলাশ: সহজিয়া ধারার কবি, লেখক ও বিপ্লবী সংগঠক
- বিপ্লবী চেতনার অগ্নিপুরুষ: কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ১১৭-১১৯।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚