ভাষাসৈনিক অছিম উদ্দিন আহম্মদ: নেত্রকোণার এক নির্লোভ জননেতার জীবনগাথা

বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি লড়াইয়ে নেত্রকোণা জেলা যেমন অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, তেমনি এই জেলা জন্ম দিয়েছে অগণিত কৃতি সন্তান। তাঁদেরই একজন অছিম উদ্দিন আহম্মদ। একাধারে দক্ষ সংগঠক, তুখোড় রাজনীতিক এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সেনানী অছিম উদ্দিন আহম্মদ তাঁর সারাজীবন ব্যয় করেছেন জনকল্যাণে।

জন্ম ও শৈশব পরিচয়

অছিম উদ্দিন আহম্মদ ১৩২২ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ (ইংরেজি ১৯১৫ সাল) নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলার কামতলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল ছমির উদ্দিন আহম্মদ এবং মাতা করিমুন্নেছা বিবি। পারিবারিক জীবনে তিনি নুরুন্নাহার বেগমের সাথে দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। স্বচ্ছল ও সম্ভাবনাময় পরিবেশে তাঁর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়।

শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের শুরু

মেধাবী ছাত্র হিসেবে অছিম উদ্দিন আহম্মদের শিক্ষাজীবন ছিল বেশ উজ্জ্বল। তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি ঐতিহাসিক স্যার সলিমউল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি নেত্রকোণার পুরাতন হাসপাতাল রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সমাজ বিনির্মাণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

ভাষা আন্দোলনে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় অছিম উদ্দিন আহম্মদ নেত্রকোণায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে যখন পুরো দেশ উত্তাল, তখন নেত্রকোণা কলেজের অধ্যাপক আমীরুল্লাহ বাহার চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং অছিম উদ্দিন আহম্মদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক চৌধুরী দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে অছিম উদ্দিন আহম্মদের কাঁধে আহ্বায়কের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নেত্রকোণায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ব্যাপক গণভিত্তি লাভ করে।

রাজনৈতিক জীবন ও সমাজ উন্নয়ন

অছিম উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন একজন দূরদর্শী সংগঠক। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত নেত্রকোণা টাউন মুসলিম লীগের সেক্রেটারি এবং পরবর্তীতে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত মহকুমা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জনপ্রতিনিধি হিসেবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ১৯৫৬ সালে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে তিনি ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ময়মনসিংহ জেলা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে আসীন ছিলেন। তাঁর মেয়াদে নেত্রকোণা প্যাভিলিয়ন, পুলিশ ক্লাব এবং পাবলিক হলের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন সম্পন্ন হয়।

মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী জীবন

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অছিম উদ্দিন আহম্মদ সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে যান এবং কামতলা গ্রামে অবস্থান করেন। যুদ্ধের অস্থির সময়ে তিনি গ্রামের সাধারণ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাহস জুগিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি শহরে ফিরে এলেও আর কখনও সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেননি। অবসর সময়ে তিনি বই পড়া, চিঠি লেখা এবং সামাজিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।

মহাপ্রয়াণ

সততা ও নৈতিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ২০০১ সালের ২২ জানুয়ারি (সোমবার) এই মহান ভাষাসৈনিক বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে নেত্রকোণা হারায় এক নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবককে।

আরো পড়ুন

    তথ্যসূত্র

    ১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ২১।

    Leave a Comment

    error: Content is protected !!