আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে কেবল সমতলের মানুষ নয়, পাহাড়ি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানও ছিল অনস্বীকার্য। এমনই এক অকুতোভয় যোদ্ধার নাম অনাথ নকরেক। নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ভরতপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের এই সন্তান কীভাবে যুদ্ধের ময়দান থেকে আবার জীবন সংগ্রামের লড়াইয়ে ফিরে এলেন, সেই সত্য ইতিহাস আজও আমাদের নাড়া দেয়।
শৈশব ও জীবন সংগ্রামের শুরু
অনাথ নকরেকের জন্ম নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ভরতপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম দেওনা মানখিন। ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল সময়ে অনাথ ছিলেন মাত্র ২২ বছরের এক টগবগে তরুণ। অভাবের সংসারে জীবন অতিবাহিত হতো হাড়ভাঙা খাটুনিতে; জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবিকা। পঁচিশে মার্চের কালো রাতের পর যখন দেশজুড়ে হাহাকার, তখন অনাথ তাঁর পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন ধাম্বুক শরণার্থী শিবিরে।
রণক্ষেত্রে বীরত্ব: ১১ নম্বর সেক্টরের সেই দিনগুলো
শান্তিকামী এই তরুণ মেঠো পথ ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে নামেন ১৯৭১ সালের ২২ আগস্ট। ভারতের তুরাতে তিনি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মাত্র ২১ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণে তিনি এসএমজি (SMG), এলএমজি (LMG) ও রাইফেল চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকে পাঠানো হয় মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ১১ নম্বর সেক্টরে, যার দায়িত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খান।
অনাথ নকরেক ‘ইলিয়াস কোম্পানি’র অধীনে কলমাকান্দা, বিজয়পুর, ধাবরাম ও টাঙ্গাটিসহ নেত্রকোণার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। তিনি সরাসরি ৬টি সম্মুখ সমরে অংশ নেন, যার মধ্যে ৩টিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে কলমাকান্দার অপারেশনটি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা, যেখানে তাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর বড় একটি দলকে পরাস্ত করেছিলেন।
যুদ্ধোত্তর জীবন: আবার হাতে কুড়াল
দেশ স্বাধীন হলো, লাল-সবুজ পতাকা উড়ল বাংলার আকাশে। কিন্তু অনাথ নকরেকের ভাগ্যের চাকা খুব একটা ঘুরল না। স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দিয়ে তিনি আবার ফিরে গেলেন পুরনো পেশায়। যে হাতে রাইফেল গর্জে উঠেছিল, সেই হাতেই আবার তুলে নিলেন কুড়াল। কাঠ কাটা আর কৃষিকাজ করেই শুরু হলো তাঁর নতুন জীবন যুদ্ধ।
একটি ট্র্যাজেডি: ট্রেন ডাকাতি ও হারিয়ে যাওয়া সনদ
অনাথ নকরেকের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে যখন তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে যোগ দিতে ঢাকা যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি ট্রেন ডাকাতির কবলে পড়েন। ডাকাতরা তাঁর সর্বস্ব লুটে নেওয়ার পাশাপাশি ছিনিয়ে নেয় তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় ‘মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট’টি। এই একটি কাগজের অভাবে পরবর্তী জীবনে রাষ্ট্রীয় অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে তিনি বঞ্চিত হন।
আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্ষেপ ও বর্তমান বাস্তবতা
অনাথ নকরেকের মতো অনেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা আজ অবহেলিত। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানিয়েছিলেন যে, বিভিন্ন সময়ে সরকার থেকে ঘর, টিন বা অন্যান্য সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তাঁরা কিছুই পাননি। এই বঞ্চনা ও অবহেলা অনাথ নকরেকের মতো বীরদের মনে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে।
উপসংহার
অনাথ নকরেক কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি আমাদের জাতীয় বীরত্বের এক জীবন্ত সাক্ষী। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর মতো হাজারো মানুষের রক্ত ও ঘাম মিশে আছে। তাঁদের এই ত্যাগকে সম্মান জানানো এবং প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। অনাথ নকরেকের হতাশা দূর করতে এবং আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়নে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
আরো পড়ুন
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ৩২১।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚