অনিমা সিংহ: টংক আন্দোলন ও কৃষক সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নাম

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই—বাংলার ইতিহাসে নারী বিপ্লবীদের অবদান অনস্বীকার্য। এমনই একজন তেজস্বী বিপ্লবী ও কৃষক আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন অনিমা সিংহ (অন্য বানানে: অণিমা সিংহ)। প্রতিকূল সমাজব্যবস্থা এবং পারিবারিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি যেভাবে নিজেকে দেশ ও মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন, তা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।

জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

অনিমা সিংহ ১৯২৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অন্নদা প্রসন্ন দাস ছিলেন একজন পেশাদার চিকিৎসক এবং মা আশালতা দাস ছিলেন একজন শিক্ষিত ও সচেতন গৃহিনী। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে বেড়ে উঠলেও অনিমা সিংহের চিন্তাধারা ছিল অনেক বেশি প্রগতিশীল। এর পেছনে সবথেকে বড় ভূমিকা ছিল তার মায়ের। তার মা আশালতা দাস নিজে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন এবং কন্যার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবসময় ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। পারিবারিক ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে অনিমা সিংহ যখন রাজনীতির মাঠে পা রাখেন, তখন মায়ের অকুণ্ঠ সমর্থনই ছিল তার প্রধান শক্তি।

ছাত্র রাজনীতি থেকে মার্কসবাদের পথে

অনিমা সিংহের রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি হয় তার ছাত্রাবস্থায়। সিলেট মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত থাকার সময়ই তিনি মার্কসবাদী দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। শ্রমজীবী ও মেহনতী মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে তিনি সাম্যবাদকে বেছে নেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। তার দৃঢ় মনোবল, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং অদম্য সংকল্প দেখে পার্টি তাকে সদস্যপদ প্রদান করে। এভাবেই একজন সাধারণ ছাত্রীর বিপ্লবী নেত্রী হিসেবে উত্তরণ ঘটে।

টংক আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রাম

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিদ্রোহী হাজং কৃষকরা ‘টংক প্রথার’ বিরুদ্ধে তাদের লড়াই তীব্রতর করে তোলে। এটি ছিল মূলত জমিতে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। অনিমা সিংহ এই সময় নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে সরাসরি মাঠে নেমে পড়েন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ঘুরে ঘুরে তিনি কৃষকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। ১৯৫০ সালে সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় কৃষকনেতা রবি দাসের সাথে তার বিবাহ হয়। বিয়ের পরপরই তারা পাহাড়ে চলে যান এবং সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৫০ সালের মে মাসে পুলিশের গুলিতে রবি দাস শহিদ হন। বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় স্বামীকে হারিয়েও অনিমা সিংহ দমে যাননি। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি আবারো হাজংদের সাথে নিয়ে পাহাড় থেকে পাহাড়ে লড়াই চালিয়ে যান।

দমন-পীড়ন ও আত্মগোপন জীবন

১৯৫০ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার টংক প্রথা বাতিল করতে বাধ্য হয়। তবে কৃষকদের এই বিজয় সত্ত্বেও আন্দোলনের সংগঠক ও কর্মীদের ওপর নেমে আসে চরম দমন-পীড়ন। এমতাবস্থায় পার্টির নির্দেশে অনিমা সিংহ প্রথমে সিলেট এবং পরবর্তীতে ঢাকায় চলে আসেন। আত্মগোপন থাকা অবস্থাতেই ১৯৫৫ সালে তিনি প্রখ্যাত বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০ শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের দীর্ঘ সময় এই বিপ্লবী দম্পতি আত্মগোপনে থেকেই তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।

প্রতিকূলতার মাঝে উচ্চশিক্ষা লাভ

অনিমা সিংহ ছিলেন জ্ঞানপিপাসু ও অদম্য সাহসী নারী। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় চরম অভাব ও অনিশ্চয়তার মাঝেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই কঠিন সময়ের মধ্যেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বি.এ এবং ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। যা তার বুদ্ধিবৃত্তিক দৃঢ়তা ও একাগ্রতার প্রমাণ দেয়। তাদের একমাত্র সন্তান দিবালোক সিংহ বড় হতে থাকলে আত্মগোপন জীবন পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে, যার ফলে এক পর্যায়ে তিনি ত্রিপুরায় চলে যান।

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অনিমা সিংহ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি শরণার্থী শিবিরের সংগঠক হিসেবে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কৃষক সমিতির সম্পাদিকা নির্বাচিত হন এবং কৃষকদের অধিকার আদায়ে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে মস্কোতে আয়োজিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তিনি যোগ দেন। মানবিক কাজের প্রতিও তার ছিল বিশেষ ঝোঁক। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষের সময় তিনি নিজ হাতে রুটি বানিয়ে ক্ষুধার্তদের মাঝে বিতরণ করতেন।

মহীয়সী এই বিপ্লবীর প্রয়াণ

১৯৮০ সালের জুন মাসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২রা জুলাই এই মহান বিপ্লবী নেত্রী চিরবিদায় নেন। অনিমা সিংহ কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।

আরো পড়ুন

    তথ্যসূত্র

    ১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ২৩।

    Leave a Comment