আধুনিক সংশোধনবাদ মার্কসবাদী লেলিনবাদী তত্ত্বে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারণা

আধুনিক সংশোধনবাদ (ইংরেজি: Modern Revisionism) মার্কসবাদী-লেলিনবাদী তত্ত্বে একটি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী শব্দ। মূলত মার্কসবাদের মৌলিক ভিত্তি—শ্রেণি সংগ্রাম, প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব এবং বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা—থেকে বিচ্যুত হয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে আপস করার প্রবণতাকেই এই পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পর এই ধারার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তি

সংশোধনবাদের ধারণাটি নতুন নয়। ১৯শ শতাব্দীর শেষে এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন প্রথম যুক্তি দেন যে, পুঁজিবাদের পতন অনিবার্য নয় এবং বিপ্লবের চেয়ে সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র অর্জন সম্ভব। তবে “আধুনিক সংশোধনবাদ” বলতে মূলত ১৯৫৬ সালের পরবর্তী সময়কালকে বোঝানো হয়। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ স্তালিনের সমালোচনা করেন এবং একটি নতুন রাজনৈতিক লাইনের ঘোষণা দেন। ক্রুশ্চেভের এই নীতিগুলোকেই মাও সেতুং এবং আলবেনিয়ার এনভার হোক্সার মতো নেতারা “আধুনিক সংশোধনবাদ” হিসেবে চিহ্নিত করেন।

আধুনিক সংশোধনবাদের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

আধুনিক সংশোধনবাদ মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল:

১. শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান (Peaceful Coexistence): ক্রুশ্চেভ যুক্তি দেন যে সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী শিবিরের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য নয়। পারমাণবিক যুদ্ধের যুগে দুই ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক শান্তি বজায় রাখা জরুরি। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপস। এই প্রসঙ্গে আনোয়ার হোজ্জা একটি লেখায় বলেন,

আধুনিক সংশোধনবাদীরা বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সমাজ-গণতন্ত্রীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের সাথে ঐক্যের ন্যায্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করে এই অজুহাতে যে, সমাজ গণতন্ত্রের স্তরের মধ্যে “ইতিবাচক প্রবণতা” লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিক সংশোধনবাদীরা শান্তি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে নিজেদের প্রকাশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি তাদের মনোভাব ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আধুনিক সংশোধনবাদীরা কমিউনিস্টদের প্রতি এক ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে নিজেদের প্রকাশ করেছে, তারা শ্রমিক শ্রেণীর দাবি পূরণে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সংরক্ষণ এবং শক্তিশালী করার জন্য এক ধরণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তারা বলেছে যে তারা সমাজের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পক্ষে ইত্যাদি।[১]

২. শান্তিপূর্ণ উত্তরণ (Peaceful Transition): সংশোধনবাদীরা বিশ্বাস করতেন যে সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়াই সংসদীয় বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাজতন্ত্রে পৌঁছানো সম্ভব। এটি মার্ক্সীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের (যেখানে রাষ্ট্রকে বুর্জোয়াদের শোষণের হাতিয়ার বলা হয়েছে) বিরোধী।

৩. জনগণের রাষ্ট্র ও জনগণের পার্টি: লেলিনবাদ অনুযায়ী পার্টি ছিল প্রলেতারিয়েতের অগ্রবাহিনী। কিন্তু সংশোধনবাদীরা দাবি করেন যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আর শ্রেণির অস্তিত্ব নেই, তাই পার্টি ও রাষ্ট্র এখন “সমগ্র জনগণের”। মাওবাদীদের মতে, এটি শ্রেণির লড়াইকে অস্বীকার করার একটি কৌশল মাত্র।

৪. অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ও মুনাফার ধারণা (Economic Liberalization): আধুনিক সংশোধনবাদের একটি বড় লক্ষণ ছিল কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বাজারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘লিবেরম্যান পরিকল্পনা’ (Liberman Plan) নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এতে কেন্দ্রীয় নির্দেশের বদলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং ব্যক্তিগত মুনাফাকে (Profit Motive) উৎপাদনের মাপকাঠি হিসেবে ধরার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সমালোচকদের মতে, এটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি নষ্ট করে দেয় এবং পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়।

৫. আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ (Bureaucratic Capitalism): সংশোধনবাদের ফলে পার্টি ও প্রশাসনের উচ্চপদে থাকা ব্যক্তিরা এক নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত হয়। একে প্রায়ই ‘নতুন শ্রেণি’ (The New Class) বা ‘লাল বুর্জোয়া’ বলা হয়। তারা রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও ক্ষমতা ভোগ করতে শুরু করে। এই আমলাতান্ত্রিক বিচ্যুতি সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির সাথে পার্টির দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়, যা সমাজতন্ত্রের আদর্শের পরিপন্থী।

৬. সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপস ও বিশ্ব রাজনীতি: সংশোধনবাদীরা বিশ্ব শান্তিবাদ বা ‘Peaceful Transition’ এর দোহাই দিয়ে অনেক সময় তৃতীয় বিশ্বের বিপ্লবী আন্দোলনগুলোকে সমর্থন দেওয়া কমিয়ে দেয়। তারা মনে করত, সশস্ত্র বিপ্লবকে সমর্থন দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। মাওবাদীদের মতে, এটি ছিল বিশ্ববিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ।

৭. সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিচ্যুতি: সংশোধনবাদ কেবল রাজনীতিতে নয়, সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলে। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতি, ব্যক্তিবাদ এবং উদারনৈতিক মূল্যবোধকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এতে সমষ্টিগত স্বার্থের বদলে ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পেতে শুরু করে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৈপ্লবিক উদ্দীপনা কমিয়ে দেয়।

চীন-সোভিয়েত বিরোধ ও তাত্ত্বিক বিভাজন

আধুনিক সংশোধনবাদকে কেন্দ্র করেই বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (CPC) অভিযোগ করে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্র ত্যাগ করে “রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ” (State Capitalism) এবং “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে” পরিণত হয়েছে। চীন বিপ্লবের নেতা মাও সে তুং মনে করতেন, পার্টির ভেতরে ঢুকে পড়া বুর্জোয়া উপাদানরাই সংশোধনবাদের মূল কারিগর। তিনি এই সংশোধনবাদ ঠেকানোর জন্যই “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শুরু করেছিলেন।

সংশোধনবাদ কেবল তাত্ত্বিক বিচ্যুতি ছিল না, বরং এটি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনে। বাজার অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া, মুনাফার ধারণা ফিরিয়ে আনা এবং কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা শিথিল করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদী উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটে।

ঐতিহাসিক প্রভাব ও সমালোচনা

আধুনিক সংশোধনবাদের প্রবক্তারা একে সময়ের প্রয়োজনে মার্কসবাদের “সৃজনশীল বিকাশ” বলে দাবি করেন। তাদের মতে, কট্টরপন্থা সমাজতন্ত্রকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল। অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে, এই সংশোধনবাদই শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের প্রধান কারণ। যখন শ্রেণির লড়াইকে তুচ্ছ করা হয় এবং আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পার্টি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে আধুনিক সংশোধনবাদ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে “বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি” (সিপিবি)-এর অবস্থানটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিতর্কিত। তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ময়দানে এই ধারাটি মূলত রুশপন্থী আধুনিক সংশোধনবাদী ধারার প্রধান ধারক হিসেবে চিহ্নিত। নিখাদ রাজনৈতিক পরিভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ‘সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের’ প্রধান প্রবক্তা বা প্রতিনিধি হিসেবে সাইফউদ্দিন মানিকের ভূমিকা ছিল অনন্য।

সাইফউদ্দিন মানিকের হাত ধরে যে রাজনৈতিক ধারার বিকাশ ঘটেছিল, পরবর্তীতে মঞ্জুরুল আহসান খান এবং বর্তমান সময়ে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে তা আরও সংহত রূপ লাভ করে। এই দলটির শেকড় প্রোথিত রয়েছে মনি সিংহ ও প্রয়াত মোহাম্মদ ফরহাদের মতো তাত্ত্বিক নেতাদের আদর্শের ওপর। বিশেষ করে মোহাম্মদ ফরহাদের প্রয়াণের পর দলটির নেতৃত্বে বিভিন্ন পরিবর্তন এলেও তাদের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তিটি অপরিবর্তিতই থেকে গেছে।[২]

সাংগঠনিক সক্ষমতার বিচারে সিপিবি একটি ‘বনেদি’ সংশোধনবাদী গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসে এরাই সবচেয়ে পুরনো ও ঐতিহাসিকভাবে প্রভাবশালী সংগঠন। এদের অধীনে রয়েছে শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল বেশ কিছু গণসংগঠন, যা দেশের মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অস্তিত্বকে বলিষ্ঠভাবে টিকিয়ে রেখেছে। বামপন্থার আবরণে সংশোধনবাদের চর্চা এবং সোভিয়েত বলয়ের রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণে এই সংগঠনের ঐতিহাসিক ভূমিকা বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনার বিষয়।

উপসংহার

আধুনিক সংশোধনবাদ সাম্যবাদী ইতিহাসে একটি জলবিভাজিকা। এটি একদিকে যেমন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে নমনীয় করতে চেয়েছিল, অন্যদিকে মার্কসীয় দর্শনের বৈপ্লবিক চেতনাকে স্তিমিত করার জন্য দায়ী ছিল। বর্তমান বিশ্বে চীন বা ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোকেও অনেকে সংশোধনবাদের আধুনিক রূপ হিসেবে দেখেন, আবার অনেকে একে বিশ্বায়নের যুগে সমাজতন্ত্রের টিকে থাকার কৌশল মনে করেন। তবে তত্ত্বগতভাবে, সংশোধনবাদ আজও মার্কসবাদী বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. আনোয়ার হোজ্জা, ৭ এপ্রিল, ১৯৬৪, “The Modern Revisionists on the Way to Degenerating Into Social-Democrats and to Fusing with Social-Democracy”, মার্কিস্টস.অর্গ।
২. মনজুরুল হক, পূর্ব বাংলার সাত দশকের কমিউনিস্ট রাজনীতি, ঐতিহ্য, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃষ্ঠা ১১৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!