রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি (ইংরেজি: Politics) হচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণির সম্পর্ক। অর্থাৎ রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রে বিরাজমান যে-কোনো সমস্যা সমাধানের কর্মপ্রক্রিয়া। যদিও বাংলা ভাষায় ‘রাজনীতি’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ মূলত রাষ্ট্র পরিচালনাসংক্রান্ত নীতি।[১]
প্রচলিত অর্থে আমরা রাজনীতি বলতে রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণ কিংবা সেই পরিচালন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলনকে বুঝি। এই প্রেক্ষাপট থেকেই আমরা ‘স্বাধীনতার আন্দোলন’ কিংবা ‘স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন’-এর মতো পরিভাষাগুলো ব্যবহার করে থাকি।
প্রকৃতপক্ষে, রাজনীতির ধারণা আরও ব্যাপক। এটি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের যে কোনো সমস্যা সমাধান এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো আন্দোলনই রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত।
ব্যাপক অর্থে, শ্রমিক, কৃষক বা সমাজের অপরাপর শ্রমজীবী শ্রেণির আর্থিক সংকট দূরীকরণের আন্দোলনও রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতি কোনো বিমূর্ত বা নির্দিষ্ট নীতি নয়; বরং একটি শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে নিজ নিজ শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় পরিচালিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাই হলো রাজনীতি।
এই প্রচেষ্টাকে সফল করার প্রধান বাহন হলো সংগঠিত রাজনৈতিক দল। শ্রেণিগত স্বার্থ সংরক্ষণে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়া বর্তমান সময়ের একটি সাধারণ সত্য হতে পারে, তবে এটি কেবল আধুনিককালেরই কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়—বরং ইতিহাসের পরিক্রমায় এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
রাজনীতির ইতিহাস
রাজনীতির ইতিহাস মানব ইতিহাসের সমগ্রতাকে ধারণ করে এবং আধুনিক সরকারী প্রতিষ্ঠানের বিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না। সামাজিক সংগঠনের প্রাথমিক মানবিক রূপগুলোতে—ব্যান্ড এবং গোষ্ঠী—কেন্দ্রিকৃত রাজনৈতিক কাঠামোর অভাব ছিল। এগুলিকে কখনও কখনও রাষ্ট্রহীন সমাজ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
উৎপাদনের উপকরণসমূহকে উৎপাদনে নিযুক্ত করতে কাজে লাগাতে হয়। ফলে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা নিয়ে সমাজে দ্বন্দ্ব বাঁধে এবং সমাজ দ্বন্দ্বমান শ্রেণিতে বিভক্ত হওয়ার সময় থেকেই দ্বন্দ্বমান শ্রেণির সচেতন অংশ নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ প্রয়াস চালিয়ে এসেছে। ফলশ্রুতিতে সমাজ বিভিন্ন গোষ্ঠীতে (ইংরেজি: Tribe) বিভক্ত হয়ে পড়ে।
অনেক সময়ে একটা রাষ্ট্রের মধ্যে বহু রাজনীতিক দলের সৃষ্টি এবং কার্যক্রম দেখা যায়। কিন্তু রাজনীতিক দলের সংখ্যার আধিক্য একথা বুঝায় না যে এই রাষ্ট্র এতো অধিক শ্রেণিতে বিভক্ত। দলের সংখ্যা যতই হোক না কেন মূলত তাদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রধান দ্বন্দ্বমান আর্থনীতিক শ্রেণির স্বার্থই প্রতিফলিত হয়। সেই কারণে মার্কসবাদীগণ বলেছেন যে শ্রেণির সাথে শ্রেণির সম্পর্ক প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে।[২]
মাও সেতুং যখন উল্লেখ করেন যে, “রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ আর যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি” তখন পরস্পর বৈরি শ্রেণিসমূহের সম্পর্কই একথা দ্বারা ফুটে ওঠে। বাইরে থেকে এই বৈশিষ্ট্য অনেক সময়ে আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু সমাজ কাঠামোর বিশ্লেষণে দেখা যাবে যে, জীবিকার ভিত্তিতে আর্থনীতিক বিন্যাস নিয়ে তৈরি হয় সমাজের অন্তঃকাঠামো। আর এই অন্তঃকাঠামোর উপর গঠিত হয় শাসনগত এবং রাজনীতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহিঃকাঠামো।
শোষিত শ্রেণির রাজনীতিক লক্ষ্য থাকে উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা দখলের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করা কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র দখলের মাধ্যমে পরিণামে উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা থেকে শোষক শ্রেণিকে উচ্ছেদ করা। যে-কোনো পর্যায়ের শাসক ও শোষক শ্রেণির রাজনীতির লক্ষ্যও থাকে নিজেদের দখলকৃত অবস্থানকে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখা। শ্রেণিহীন সমাজ হলে শ্রেণিভিত্তিক রাষ্ট্রের রাজনীতির অবসান ঘটে এবং রাজনীতি সেখানে রাষ্ট্রীয় এবং অর্থনৈতিক শক্তি দখলের সংঘবদ্ধ আন্দোলনের পরিবর্তে সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থিক সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য দিকের ক্রমিক উন্নতির জন্য মানুষের সমষ্টিগত কর্মকাণ্ডকে বুঝায়। এমন অবস্থায় রাজনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রের সংগঠিত কর্মকাণ্ডের আর প্রভেদ থাকে না।
আরো পড়ুন
- রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণির সম্পর্ক
- আধুনিক সংশোধনবাদ মার্কসবাদী লেলিনবাদী তত্ত্বে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারণা
- স্বৈরতন্ত্র এমন সরকার যেখানে একটি একক সত্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাথে শাসন করে
- আমূল পরিবর্তনবাদ ছিল ১৮ থেকে ২০ শতকের উদারনীতির বামপন্থী আন্দোলন
- অভিজাততন্ত্র মুষ্টিমেয় সংখ্যক ব্যক্তিদের দ্বারা চালিত গণবিরোধী শাসন
- অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের নীতি
- বিজয়ী ফ্যাসিবাদ জনগণের জন্য কী বহন করে আনে?
- ফ্যাসিবাদের শ্রেণি চরিত্র
- উদারতাবাদের ইতিহাস চার শতক মানুষের দাসত্বের ইতিহাস
- বর্ণবাদ কাকে বলে
- হার্বার্ট মারকুস মার্কসবাদবিরোধী আবর্জনা সৃষ্টিকারী জার্মান-মার্কিন দার্শনিক
- দ্বন্দ্ববাদের উদাহরণ
- মার্কসীয় তত্ত্বের মূলনীতি হচ্ছে মার্কসের রচনায় অনুসৃত কতিপয় মৌলিক নীতি
- বিপ্লবের মার্কসবাদী তত্ত্ব হচ্ছে আজ পর্যন্ত উঠে আসা সব থেকে স্পষ্ট বৈপ্লবিক চিন্তা
- বিপ্লব সম্পর্কে তত্ত্ব কয়েক ধরনের তত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন
- সংশোধনবাদ প্রসঙ্গে লেনিনবাদী মত এবং তা কেন প্রতিরোধ করতে হবে
- লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ হচ্ছে লেনিন কর্তৃক রচিত সংগ্রামের বিভিন্ন সূত্রাবলি
- লেনিনবাদী বলশেভিকবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হচ্ছে সাম্যবাদ অভিমুখী সংগঠন
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- সাম্যবাদী প্রচারণা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া
- পার্টি শৃঙ্খলা সম্পর্কে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও সে সম্পর্কিত ধারণা
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত নীতি
- উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী জান্তব মতবাদ
- সাম্যের বিভিন্ন রকমের প্রকারভেদ হচ্ছে স্বাভাবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি
- সামাজিক সাম্য হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সমস্ত লোকের সমান অধিকার
- স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মিলের ধারণা হচ্ছে কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা সমস্যার সমাধান
- সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ
- বামপন্থা পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা সংগঠন কেন মার্কসবাদী লেনিনবাদী নয়?
- স্বাধীনতা সম্পর্কে মন্টেস্কুর ধারণা দ্য স্পিরিট অফ ল গ্রন্থের স্বাধীনতার আলোচনা
- ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি হচ্ছে মন্টেস্কুর আইন, শাসন ও বিচার ক্ষমতার পৃথকীকরণ
- মন্টেস্কুর আইনতত্ত্ব হচ্ছে দ্য স্পিরিট অব লজ গ্রন্থে প্রদত্ত আইনের ব্যাখা
- মন্টেস্কুর রাষ্ট্রচিন্তা যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের সংমিশ্রণে গড়া সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
- মেকিয়াভেলিবাদ ভীতি সঞ্চার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নীতি
- মেকিয়াভেলি রচনাবলী হচ্ছে তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ
- মেকিয়াভেলি ইতালীয় রেনেসাঁর কূটনীতিক, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী লেখক
- জাঁ জ্যাক রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব হচ্ছে সামাজিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়
- জাঁ জ্যাক রুশো ফরাসি বিপ্লবের তাত্ত্বিক এক পুঁজিবাদী দার্শনিক, লেখক ও সুরকার
- জন লক ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ বস্তুবাদী দার্শনিক ও রাজনৈতিক লেখক
- রাষ্ট্রদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রকৃতি ও বিকাশের আলোচনা
- সর্বহারা একনায়কত্ব থেকেই নির্মিত হয়েছে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পথ
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ৩১ মার্চ ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “রাজনীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কিত যে-কোনো সমস্যা সমাধানের কর্মপ্রক্রিয়া”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/politics/politics-is-principles-of-states/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩১৩-৩১৪।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।