এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন ছিলেন একজন জার্মান সংশোধনবাদী সমাজ-গণতন্ত্রী

এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন বা এডোয়ার্ড বার্নস্টাইন (ইংরেজি: Eduard Bernstein; ৬ জানুয়ারি, ১৮৫০-১৮ ডিসেম্বর, ১৯৩২) ছিলেন জার্মান সমাজগণতন্ত্রী। মার্কসবাদীগণ বার্নস্টাইনকে বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের বিরোধী ব্যক্তি এবং সংশোধনবাদের প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করেন। বের্নস্তাইন মার্কসবাদের মূল দর্শন, অর্থনীতি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে নিজস্ব ব্যাখ্যা দ্বারা সংশোধন করার চেষ্টা করেন।[১]

এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন জন্মেছিলেন বর্তমান জার্মানির বার্লিনের  সচনোবার্গে এক ইহুদি পরিবারে। স্কুল ত্যাগের পর ১৮৬৬-১৮৭৮ সালে তিনি একটি ব্যাংকে পিয়নের কাজ করেন। ১৮৭২ সালে তার রাজনৈতিক জীবনায়ন শুরু হয় যখন তিনি জার্মানির সমাজ-গণতান্ত্রিক শ্রমিক দলে যোগ দেন এবং শীঘ্রই একজন ভাল কর্মী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে সক্ষম হন। কার্ল মার্কসের সংস্পর্শে আসেন সেই সময়। পরে ইংল্যান্ডে গিয়ে এঙ্গেলসের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। দলের মুখপত্রের তিনিই সম্পাদক নিযুক্ত হন।

১৮৯৬ সালে এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন প্রথম মার্কসবাদের ‘অপ্রয়োজনীয় অংশ’ দেখিয়ে কিছু রচনা প্রকাশ করেন। তিনি মার্কস কথিত পুঁজির কেন্দ্রিভবন, শ্রমিকের ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ার কথা স্বীকার করতেন না। শ্রেণিসংগ্রাম ও বলপ্রয়োগের তত্ত্ব এবং তা থেকে সর্বহারার একনায়কত্ব অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করতেন। পুঁজিবাদ ভেঙে পড়বে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন না। তার মতে সমাজতন্ত্র আসবে উদারনীতির উত্তরোত্তর বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। তিনি দেখান যে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমাজের, দেশের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। গণতান্ত্রিক নানা সংস্কার এর ফলে ঘটেছে।[২] 

বের্নস্তাইনের মতে শ্রেণিসংগ্রাম ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে একটি সমন্বিত সমাজব্যবস্থা রূপ লাভ করবে। সমাজতন্ত্রের কোনো চরম লক্ষ্য থাকার প্রয়োজনকেও বের্নস্তাইন অস্বীকার করেন। শ্রমিকশ্রেণীর লক্ষ্য হবে সমাজের সংস্কারসাধন, বিপ্লব সংঘটিত করা নয়। “চরম লক্ষ্যের কোনো মূল্য নাই। সংস্কারের চেষ্টা বা আন্দোলনই আসল বিষয়”। রাশিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে মেনশেভিক এবং অর্থনীতিবাদী বা ইকনমিস্টদের বের্নস্তাইনের অনুসারী মনে করা হয়। প্লেখানভ এবং লেনিন তীব্রভাবে বের্নস্তাইনের সমালোচনা করেন।[৩]

আরো পড়ুন:  মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী

কাউতস্কির সাথে এই সমস্ত প্রশ্নে তার মতবিরোধ হয়। ১৯২৮ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মান সমাজ গণতন্ত্রী দলে থাকেন। পরে এই দল ভাগ হয়ে যায়। তিনি সংসদীয় পথে সমাজতন্ত্রের রাস্তায় চলবার জন্য অবিচল থাকেন। তাকে জার্মান সমাজ-গণতন্ত্রী ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের চরম সুবিধাবাদী অংশের নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯১৭ সালে মহান নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। 

তিনি একসময় বলেছিলেন, “প্রাচীন রোমের কথা স্মরণ করুন, এমন একটা শাসকশ্রেণি ছিল যারা কাজ করতো না, কিন্তু থাকত আরামে; আর এর ফলশ্রুতিতে, এই শ্রেণিটির পতন ঘটে। এ ধরনের একটি শ্রেণিকে অবশ্যই ক্রমান্বয়ে তার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।” দাস মালিকদের পতন হচ্ছে এমন একটি সত্য যা বের্নস্তাইন গোপন করতে পারেননি; কিন্তু তিনি গোপন করেছেন একথা যে দাসমালিকেরা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। আমরা ইতিহাসের সবগুলো যুগেই দেখি প্রভু ও মালিক শ্রেণি স্বেচ্ছায় কখনোই ক্ষমতা ত্যাগ করে না। দাসমালিক, সামন্তপ্রভু ও কারখানামালিকদের শাসন উচ্ছেদ হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী পৌনপুনিক ও বিরামহীন বিপ্লবের দ্বারাই।[৪]  

বের্নস্তাইনের ভাবনাকেই মার্কসবাদীরা সংশোধনবাদ বলে চিহ্নিত করেন। সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ১৯০০-১৯০৩ সালেই প্লেখানভ দল থেকে বের্নস্তাইনকে বহিষ্কারের দাবি করেছিলেন।[৫] তার সম্পর্কে ভি. আই. লেনিন লিখেছেন,

‘আন্দোলনটাই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়’_ বের্নস্তাইনের এই বাঁধা বুলিটিতে অনেক দীর্ঘ প্রবন্ধের চেয়েও ভাল ভাবেই শোধনবাদের মর্ম প্রকাশিত হয়েছে।[৬] বর্তমান বিশ্বেও যারাই সশস্ত্র পথে বিপ্লবের রাস্তায় থাকেনি তারা কার্যত বের্নস্তাইনের দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনুসরণ করেছে।

বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের বদলে এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন বিবর্তনবাদী সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব উপস্থিত করেন। তাঁর ‘ইভোল্যুশনারী সোস্যালিজম’ বা ‘বিবর্তনবাদী সমাজতন্ত্র’ নামক গ্রন্থে বার্নস্টাইন এরূপ অভিমত প্রকাশ করেন যে ১. মার্কস পুঁজিবাদের আসন্ন পতনের যে কথা বলেছিলেন তা বাস্তবে সত্য বলে প্রমাণিত হয় নি; ২. মার্কস শ্রেণিবিরোধকে যেভাবে আপসহীন বিবেচনা করেছেন এবং পুঁজিপতি এবং সর্বহারার দুই প্রান্তে সমাজকে বিভক্ত করেছেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অব্যাহত অস্তিত্ব তাকে ভুল প্রমাণিত করেছে; ৩. পুঁজিবাদের চরিত্রে পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে। সমাজসংস্কারের আন্দোলনের ফলে পুঁজিবাদের শোষণমূলক চরিত্রের অনেক পরির্তন সংঘটিত হচ্ছে; ৪. চরম সংঘর্ষের বদলে ধীরে এবং ক্রমান্বয়ে সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্য দ্বারা শ্রমিকশ্রেণী অধিকতর স্থায়ী ফল লাভ করতে পারে।[৭]

আরো পড়ুন:  জাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের সাম্প্রতিক রাষ্ট্রচিন্তার ২০১৮ সালের ফাইনাল প্রশ্নপত্র

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ

১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৮৮-৮৯।
২. সমীরণ মজুমদার; মার্কসবাদ, বাস্তবে ও মননে; স্বপ্রকাশ, কলকাতা; ১ বৈশাখ, ১৪০২।
৩. সরদার ফজলুল করিম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৮।
৪. লেনিনবাদ দীর্ঘজীবী হোক; ১৬ এপ্রিল, ১৯৬০; সিপিসির রেড ফ্ল্যাগ-এর প্রবন্ধ। 
৫. ভি. আই লেনিন; কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ; লেনিন রচনাবলী, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪; চতুর্থ ভাগ; পৃষ্ঠা ২৬। 
৬. ভি. আই লেনিন; মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ; ১৯০৮। ১৭শ খণ্ড, পৃ. ১৫-২৬।
৭. সরদার ফজলুল করিম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৮৮।

রচনাকাল ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!