মুকুন্দ দাস ছিলেন বাংলার চারণ কবি, লেখক, পালাগায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী

মুকুন্দ দাস (ইংরেজি: Mukunda Das; ২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৮ – ১৮ মে ১৯৩৪) ছিলেন বাংলা ভাষার চারণ কবি, লেখক, যাত্রাপালা রচয়িতা এক স্বাধীনতা সংগ্রামী। বাংলার চারণ কবি মুকুন্দদাসের জন্ম ঢাকার বানরী গ্রামে। পিতার নাম গুরুদয়াল দে। তার পিতৃদত্ত নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর। গুরুদয়াল কাজ করতেন বরিশালে এক ডেপুটির আদালতে। কর্মসূত্রে তাকে বরিশালে থাকতে হতো। পরে সপরিবারে এখানেই এসে বসবাস করেন। এখানেই বাল্যের স্কুলের পড়া আরম্ভ হয় মুকুন্দ দাসের।

সংসারে স্বচ্ছলতার অভাব ছিল। তাই স্কুলের পড়া বেশিদূর এগোয়নি। ফলে কিশোর বয়স থেকেই পিতার মুদি দোকানে বসতে আরম্ভ করেন। ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন স্বাধীন চেতা আর অত্যন্ত দুরন্ত। গানের গলা ছিল মিষ্টি। শুনে শুনেই গান তুলতে পারতেন।

বরিশালের তৎকালীন নায়েব বীরেশ্বর গুপ্ত একটি কীর্তনের দল করেছিলেন। মুকুন্দ সেই কীর্তন দলে যোগ দেন ১৯ বছর বয়সে। পরে নিজেই একটি দল গড়েন। নানা পূজাপার্বণে কীর্তনের দল নিয়ে বরিশালের বিভিন্ন স্থানে যেতে হতো। এইভাবে অনেক কীর্তনীয়া দলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি পছন্দমত গান অন্য কীর্তনীয়াদের কাছ থেকে টুকে রাখতেন। পরে এইসব উপাদান তাঁর কীর্তনসঙ্গীত নামক সংকলন গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়।

মুকুন্দ দাস ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষা নেন রামানন্দ বা হরিবোলানন্দ নামের এক সর্বত্যাগী সাধুর কাছে। দীক্ষাগ্রহণের পর তার নাম হয় মুকুন্দ দাস। পরবর্তীকালে এই নামেই তিনি দেশবিখ্যাত হন। বরিশালের মনস্বী অশ্বিনীকুমার দত্তের সংস্পর্শে এসে মুকুন্দ দাস স্বদেশ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন। তারই প্রেরণায় মুকুন্দ দাস হয়ে ওঠেন বাংলার চারণ কবি।

সম্প্রদায়গত কোনো প্রকার গোঁড়ামি তার মধ্যে ছিল না। বৈষ্ণব ও শাক্তর ভেদাভেদ যেমন তিনি মানছেন না তেমনি মন্দির মসজিদের পার্থক্যও কখনো করেন নি। তার সাধন সঙ্গীতগুলিতে এই ভাবসমন্বয়ের প্রকাশ ঘটেছিল।

আরো পড়ুন:  মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন উনিশ শতকের নবজাগরণের যুগের মহাকবি

মুকুন্দ দাস নিজেই যাত্রাপালা ও গান রচনা করতেন। গানে সুর সংযোজন নিজেই করতেন। মনোমোহন চক্রবর্তী, হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং অশ্বিনীকুমার দত্তের গানও করতেন তিনি। একসময় বরিশাল হিতৈষী পত্রিকায় লিখতে আরম্ভ করেন।

মুকুন্দ দাসের দলের যাত্রাগান এমনই জনাপ্রয়তা লাভ করেছিল যে সারা বরিশাল তাকে গানের দল নিয়ে ঘুরতে হত। সেই সময়ে বিভিন্ন দেশ বরেণ্য নেতা এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন। তার মাতৃপূজা যাত্রা পালাটি যুবকদের স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ করত।

স্বদেশী আন্দোলনে, বিশেষ করে বিদেশী দ্রব্য বর্জন আন্দোলনে মুকুন্দ দাস বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। “পরো না রেশমি চুড়ি বঙ্গনারী কভু হাতে আর পরো না” এই গানটি এক সময়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে তীব্র উন্মাদনা জাগিয়েছিল।

অশ্বিনীকুমারের নিকট স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষিত হবার পরে মুকুন্দ দাস গ্রামে গ্রামে দেশাত্মবোধক গান ও স্বদেশী যাত্রাভিনয় করে বেড়াতেন। ফলে তিনি বরিশালে ইংরাজ সরকারের কোপদৃষ্টিতে পড়েন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিনে মুক্ত হন।

মাতৃপূজা গীত সংকলনের ‘ছিল ধান গোলা ভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা’ গানটির জন্য তার জরিমানা হয়। তিন বছর কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুকুন্দ দাস অংশ গ্রহণ করেছিলেন তার সংগীত ও যাত্রাপালা নিয়ে। তার গানের মাধ্যমে তিনি জনসাধারণকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রে তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এবং সুভাষচন্দ্রেরও সংস্পর্শে এসেছিলেন। বাংলার জনগণই তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে চারণ কবি আখ্যা দিয়েছিল। গান করে তিনি সারাজীবনে ৭শত মেডেল ও বহু পুরস্কার পেয়েছিলেন।

মুকুন্দ দাসের উল্লেখযোগ্য রচনা সাধন সঙ্গীত, পল্লীসেবা, ব্রহ্মচারিণী, পথ, সাথী, সমাজ, কর্মক্ষেত্র প্রভৃতি। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল বাংলা মায়ের চারণ সন্তান মুকুন্দ দাস পরলোক গমন করেন।

তথ্যসূত্র

১. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৭৭-৭৯।

Leave a Comment

error: Content is protected !!