খোন্দকার আশরাফ হোসেন: উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য রূপকার

বিষয়তথ্য
পুরো নামখোন্দকার আশরাফ হোসেন
জন্ম৪ জানুয়ারি ১৯৫০; সরিষাবাড়ী, জামালপুর
মৃত্যু১৬ জুন ২০১৩; ঢাকা
পেশাঅধ্যাপক (ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), কবি ও গবেষক
সাহিত্যিক ধারাউত্তরাধুনিকতা ও আধুনিকোত্তর বাংলা কবিতা
উল্লেখযোগ্য কাব্যতিন রমনীর কাসিদা, সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর, পার্থ তোমার তীব্র তীর
পুরস্কারআলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র পুরস্কার

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মেধাবী ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন (Khondakar Ashraf Hossain; ৪ জানুয়ারি ১৯৫০ – ১৬ জুন ২০১৩)। তিনি ছিলেন আধুনিকোত্তর বা উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতার এক বিশিষ্ট কারিগর। যে সময়ে বাংলা কবিতায় আধুনিকতাবাদের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান ছিল, সেই প্রথাগত বলয় ভেঙে কবিতার নতুন ভাষা ও শৈলী নির্মাণে যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

খোন্দকার আশরাফ হোসেন আমাকে আধুনিক বাংলা কবিতা ভালবাসতে শিখিয়েছিলেন। পরে আমি নিজেই কবিতা লিখতে শুরু করি। কিন্তু কোনোদিনই আমার কবিতা স্যারকে দেখানো হয়নি। এমনকি কত শত তরুণ কবি ‘একবিংশ’-তে কবিতা দিয়েছে; শুধু আমিই দেইনি। তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়নি আমার কমিউনিজম প্রীতির কারণে। তিনি সমাজতন্ত্র থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলেন হয়তো; আর আমরা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম সেই সমাজতন্ত্রকেই।

কাব্য বিষয়ে খোন্দকার আশরাফ হোসেন

খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতায় রাজনীতির উপস্থিতি নেই—এমনটা বলা যায় না; বরং তিনি খুব পরিমিত ও সুচারুভাবে রাজনীতি ও সমাজকে তাঁর কাব্যকাঠামোয় স্থান দিয়েছেন। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পার্থ তোমার তীব্র তীর’-এ এই সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে রচিত কবিতাটি তাঁর দেশপ্রেম ও ভাষাসংগ্রামের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য দলিল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কবিতাটির তিনটি লাইন এখানে দেয়া হচ্ছে, পাঠ বিবেচনা পাঠকের।

“কবি ও কুকুরদের এইখানে আসতে দিও না।
ওদের নখরে শুধু উঠে আসে স্মৃতির কবর থেকে মৃত
ভায়ের বোনের লাশ, আমাদের সমাহিত স্মৃতির কাফন।”

ফেব্রুয়ারিতে জনৈক বাগান মালিক, নির্বাচিত কবিতা, ১৯৯৭, প. ১০৪

খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’ কাব্যগ্রন্থটি কেবল ব্যক্তিগত অনুভবের নয়, বরং এর বেশ কিছু কবিতায় প্রখর রাজনৈতিক চেতনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ‘বেহুলা বাংলাদেশ’ কবিতায় তিনি আশি ও নব্বইয়ের দশকের এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। কবি বাংলার সাহসী তরুণদের ‘নবীন লখিন্দর’ হিসেবে কল্পনা করেছেন, যারা রাজপথে আঙুল উঁচিয়ে দেশের ওপর হওয়া দীর্ঘদিনের অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে সংকল্পবদ্ধ।[২] বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে রাজপথে আত্মাহুতি দেওয়া শহীদ নূর হোসেনের সেই বিপ্লবী তেজই যেন এই কাব্যের ছত্রে ছত্রে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কবিতাটির এক জায়গায় তিনি লিখেছেন,

“আমি ডুবে যাচ্ছি, ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠছি
মৃত্যুর শয্যা ছেড়ে নবীন লখিন্দর, আমার বুকের ছাতি
ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে, কঙ্কালের চিহ্নগুলো ঢেকে যাচ্ছে
পেশির কবরে –
রাজপথে দাঁড়ালাম বুকে পিঠে সেঁটে নিয়ে ক্রোধ
সহস্র মৃত্যু আর অবমাননার নেবো প্রতিশোধ
নেবো প্রতিশোধ
নেবো প্রতিশোধ

বেহুলা বাংলাদেশ, নির্বাচিত কবিতা, ১৯৯৭, প. ১০৪

একই কবিতা গ্রন্থের ‘পোশাক শিল্পের শ্রীরাধা’ কবিতাটি বন্দি নারীদের জীবনযন্ত্রণা আর কাল্পনিক স্বপ্নকে ফুটিয়ে তোলে। ‘পথরোধ চাই’ হচ্ছে ক্রোধে জ্বলে উঠবার আশায় লেখা এক প্রেম আর সৌন্দর্যের কবিতা। কবিতা কোলাজে যে বারটি ছোট কবিতা আছে তার অনেকগুলোতে আছে রাজনৈতিক চেতনার ছোঁয়া।

বারবার হৃদয়ে কড়া নাড়ে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সেই আর্তস্বর: ‘ভালোবাসিয়াছি, ভালোবাসিয়াছি, ভালোবাসে নাই ভালো’। তাঁর সৃষ্টি এমন এক নির্জীব অথচ প্রাণবন্ত শিল্প, যা থেকে বিচ্ছুরিত হয় পাথুরে কাঠিন্যের এক মৃদু সুবাস। পাউল সেলানের দুর্বোধ্য কাব্যবিশ্বের অনুবাদক হয়ে ওঠা সম্ভবত তাঁর সেই গূঢ় রহস্যপ্রিয়তারই ফল। বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত ক্যানভাসে খোন্দকার আশরাফ আজও অনন্য—তাঁর বিষয়বৈচিত্র্য, জটিল বুনন আর স্পর্ধিত অগ্রহণযোগ্যতার কারণে।

সাহিত্য সাধনায় খোন্দকার আশরাফ হোসেন

তিনি ১৯৫০ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি লেখালেখির সংগে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর এ যাবত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’, ‘পার্থ তোমার তীব্র তীর’, ‘জীবনের সমান চুমুক’, ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’, ‘জন্মবাউল’, ‘যমুনাপর্ব’ এবং ‘আয়না দেখে অন্ধ মানুষ’ । ‘বাংলাদেশের কবিতা: অন্তরঙ্গ অবলোকন’ তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ। অনুবাদ করেছেন সফোক্লিসের ইডিপাস, ইউরিপিডিসের মিডিয়া, আলসেস্টিস, পাউল সেলানের কবিতা, এডিথ হ্যামিল্টনের মিথলজিসহ অনেক গ্রন্থ। তাঁর গবেষণার পরিমাণ বিপুল।

তিনি ১৯৮৫ সাল থেকে সৃষ্টিশীল কবিতার কাগজ ‘একবিংশ’ সম্পাদনা করেছেন। পেশাগত দিক দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৪২ দিনের মাথায় প্রায় আকস্মিকভাবেই ২০১৩ সালের ১৬ জুন ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে রোববার সকালে মৃত্যু বরণ করেন। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৬৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একজন প্রতিভাবান লেখক ও বহু বিষয়ে বিদ্বান ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছিল। ভালো থাকুক এই পৃথিবীর শ্রমিকেরা, যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন খোন্দকার আশরাফ হোসেন।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, “খোন্দকার আশরাফ হোসেন আধুনিক বাংলা কবিতা পরবর্তী যুগের উত্তরাধুনিক কবি”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/ashraf-hossain/
২. অনুপ সাদি গৃহীত খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সাক্ষাৎকার, “আমাদের সমাজটা আসলে বন্দি“, ২৭ নভেম্বর, ২০০০, দৈনিক বানলাবাজার পত্রিকা, উপসম্পাদকীয় পাতা।

Leave a Comment