কবি সমর সেন বাঙালি ভাবালু মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর

সমর সেন (ইংরেজি: Samar Sen, ১০ অক্টোবর, ১৯১৬ — ২৩ আগস্ট, ১৯৮৭) ছিলেন স্বাধীনতা-উত্তর স্নায়ুযুদ্ধকালীন যুগের একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি এবং সাংবাদিক। সমর সেন, তাঁর সমসাময়িক কবিদের মতো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশাল প্রভাব বলয়ে বেড়ে ওঠেন। তবুও সমর সেনই সম্ভবত প্রথম কবি যিনি রবীন্দ্রনাথের গীতিমূলক রোমান্টিকতার সাথে “বিচ্ছেদ” ঘটান এবং বাংলা কবিতায় “আধুনিক” উদ্বেগ (মোহমুক্তি, অবক্ষয়, অগ্রগামী নগর দৃষ্টিভঙ্গি) প্রবর্তন করেন। তাঁর কাজের মাধ্যমে, ফরাসি এবং ইংরেজি আধুনিকতার প্রভাব প্রথমে বাংলা কবিতায় অনুবাদ করা হয়েছিল; একই সময়ে, আধুনিকতাবাদ এবং মার্কসবাদের মিলন তার কাব্যিক চিন্তাভাবনা এবং শৈলীতে প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট ছিল।

সমর সেনের কবিতা কিছুটা তার মৌলিক সাংবাদিকতার দ্বারা আবৃত ছিল, যা তিনি কিংবদন্তি ফ্রন্টিয়ারের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তৈরি করেছিলেন। তিনি সোভিয়েত সাহিত্যের অনুবাদের জন্যও পরিচিত ছিলেন; তিনি প্রায় পাঁচ বছর মস্কোতে অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছিলেন, যদিও পরবর্তী জীবনে তিনি আমলাতান্ত্রিক কমিউনিজম সম্পর্কে সন্দেহবাদী হয়ে পড়েন।

সমর সেন “নাউ” (ইংরেজি: Now) নামক একটি র‍্যাডিকাল জার্নালও সম্পাদনা করতেন, যার মাধ্যমে জোয়ান রবিনসন এবং সত্যজিৎ রায়সহ বিশিষ্ট পণ্ডিত ও লেখকদের একটি দল আবির্ভূত হয়েছিল; তার উপ-সম্পাদক ছিলেন নাট্যকার এবং অভিনেতা উৎপল দত্ত। ব্যক্তিগত জীবনে সমর সেন ছিলেন একজন তিক্ত রসবোধসম্পন্ন মানুষ, কখনও কখনও তীব্র কিন্তু প্রায়শই মারাত্মকভাবে নির্ভুল।

মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনের রূপকার

বাংলা ভাষার এই মহান কবি বাঙালি মধ্যবিত্তের ছ্যাবলামো কামনা বাসনাকে তাঁর বাংলা কবিতায় তুলে এনেছিলেন। তাঁর ছোটো ছোটো কবিতাগুলো মধ্যবিত্তের সুশীল পশ্চাৎদেশে একাধিক লাথি মেরে গেছে। সেইসব লাথিতে তীব্র জোর না থাকায় বাঙালির বোধোদয় আজো ঘটেনি।

মেকলের রোপণ করা বিষবৃক্ষের বিষাক্ত ফল এই বাঙালি মধ্যবিত্ত; যাদের সামর্থ্য সীমাবদ্ধ হলেও অনিষ্ট করার ক্ষমতা অপরিসীম। এই শ্রেণিটি কেবল সামাজিক বিপ্লবের পথকেই রুদ্ধ করেনি, বরং শ্রমজীবী মানুষকে ঠেলে দিয়েছে চরম বিভ্রান্তির গহ্বরে। তাদের মজ্জায় মিশে আছে মীরজাফরী বিশ্বাসঘাতকতা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমর সেনের মধ্যবিত্ত চর্চা সম্বন্ধে লিখেছেন,

সমর সেন তাঁর সাহিত্যে ও সাংবাদিকতায় এই বিষবৃক্ষের ক্ষতিকর তৎপরতাকে ক্ষমাহীনভাবে উন্মোচিত করেছেন। তিনি বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের ভূমিকা বিষয়ে। উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের যে চাঞ্চল্যকর বিকাশ তা যে সাম্প্রদায়িকতাকে পুষ্ট করে মারাত্মক ক্ষতি করে রেখে গেছে বাঙালীর জন্য, এ বিষয়ে তাঁর তুলনায় সচেতন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক তাঁর সময়ে আর কেউ ছিলেন কিনা সন্দেহ, পরেও খুব বেশি পাওয়া গেছে মনে হয় না।[১]

মধ্যবিত্ত বাঙালির পেছনে লাত্থি দেবার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (জুন ২৩, ১৯৪৮ — জুলাই ৩১, ২০১৪) পর্যন্ত যার শব্দের ধার টাকা আর ক্ষমতালোভি মধ্যবিত্তকে তীব্রভাবে আঘাত করতে পেরেছিলো। সমর সেনের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,

“কবি সমর সেনের প্রধান অবলম্বন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের দুঃখলাঞ্ছনা, আশাহীন আনন্দহীন ধূসর অপরাহ্ণ। তিনি জনতার প্রাণের কথা শুনতে অভিলাষী। প্রায়শই মিথ্যা আদর্শবাদের ফাঁকা বুলিকে ব্যাঙ্গের কশাঘাতে জর্জরিত করতে চেয়েছেন।”[২]

সমর সেন সেই মধ্যবিত্তের আশপাশে টিকে ছিলেন যারা কলকাতা এবং পরবর্তীতে ঢাকায় বসে গোটা বাংলার জনগণের ওপরে মস্তানি ফলাত। সেই মস্তানি শুধু সাম্প্রদায়িক রক্তের হোলিখেলায় মত্তই হয়নি, আরো দৃঢ়ভাবে বাঙালি শ্রমিক কৃষক ও প্রলেতারিয়েতকে বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত করে শোষণের কলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেই নরপিশাচ বিত্তলোভি মস্তানদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে গিয়ে তিনি যে মহান মানুষটিকে সমর্থন করেছিলেন তাঁর নাম চারু মজুমদার এবং যে মহান সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তার নাম নকশাল আন্দোলন। ‘যে মধ্যবিত্ত গণ্ডিটাকে তিনি সারা জীবন উপলব্ধি করেছিলেন কিন্তু ভাঙতে পারেননি— নকশালপন্থিরা খানিকটা জোর করে সে’ গণ্ডিতে নাড়া দিতে পারায় তিনি নকশাল আন্দোলনের পক্ষপাতী হয়েছিলেন।

নিপীড়িতের পক্ষের এক সৈনিক

বুর্জোয়া সাফল্যের প্রচলিত পরিমাপ দ্বারা সমর্থিত আরামদায়ক বস্তুগত জীবন ত্যাগের জন্য তিনি কখনও অনুশোচনা করেননি। তাঁর আনুগত্য সর্বদা নিপীড়িতদের প্রতি ছিল। কিছু সমালোচক তাঁর কবিতা পরিত্যাগকে ভারতীয় সাহিত্যের ক্ষতি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন, যুক্তি দেন যে তাঁর তীক্ষ্ণ উপলব্ধি এবং ভাষার উপর অসাধারণ দখল স্থায়ী তাৎপর্যপূর্ণ স্মরণীয় কবিতা তৈরি করতে পারত। তবে, সমর সেন সিদ্ধান্ত নেন যে চরম বঞ্চনা এবং অবিচারের জগতে কবিতা একটি বিলাসিতা এবং আরো সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নিজের জন্য যে মূল্যই হোক না কেন, দরিদ্রদের পক্ষে আন্দোলন করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবেন। তিনি তাঁর বাকি জীবন এই উদ্দেশ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, যদিও তিনি নিজেই উল্লেখযোগ্য দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়েছিলেন।

নকশাল আন্দোলনের কমিউনিস্টরা মধবিত্ত ক্ষুদে বুর্জোয়াদের জগত থেকে ‘রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রাঙ্গণকে বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন’ এবং সমর সেন সেই বিস্তৃত জগতে নির্ভয়ে পা রেখেছিলেন; অন্যান্য সব ক্ষেত্রেই তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রতিবাদের কাজটি দৃঢ়ভাবে পালন করেছিলো যার প্রমাণ পাওয়া যাবে জনগণ, গণতন্ত্র ও শ্রমিক-কৃষকের স্বাধীনতার শত্রু, ভারতীয় পুঁজির খুনে প্রতিনিধি প্রতিক্রিয়াশীল ইন্দিরা গান্ধীর (১৯১৭ — ১৯৮৪) জারীকৃত ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে।[৩]  

সমর সেন ছিলেন অগ্নিগর্ভে লড়াকু এক সৈনিক যার ব্যক্তিগত সমস্যায় প্রতিবাদ ছিলো না। তিনি প্রতিবাদ করেছেন শ্রমিক-কৃষকের হয়ে। ১৯৭৩ সালের শেষকালে একবার পুলিস তাঁর বাসায় হানা দিয়ে যথেষ্ট হয়রানি করে। কয়েকজন বন্ধু বললেন, একজন সম্পাদকের বাসায় পুলিসি হানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো উচিত। তিনি লিখেছেন, ‘যখন জেলে, পুলিস ভ্যানে, রাস্তাঘাটে কিশোর ও যুবক হত্যা রেওয়াজ তখন সম্পাদকের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য প্রতিবাদ’[৪] হবে কীভাবে। এই হচ্ছেন সমর সেন।

ন্যায় যুদ্ধের ঘোষক

সমর সেন কবি ছিলেন, ন্যায় যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, প্রলেতারিয়েতের মুক্তি নিয়ে ভাবিত ছিলেন। একুশ শতকের শুরুতে বাঙালির অজস্র কবিদের ভেতরে সমর সেন যেন সেসব লড়াকু দুর্বল শ্রেণিযোদ্ধাদের মতোই বাংলার বিপন্ন আকাশে হারিয়ে গেছেন। তাঁকে আজ তরুণ কবিদের খুব সামান্য অংশই চেনে। আজ যত কবি দেখি, তাদের মেরুদণ্ডের খোঁজ নিতে গেলে দেখতে পাই, কাকও প্রতিবাদ করে; কিন্তু কবিরা মুনাফাপূজারি।

যেই সময়ের কবি তিনি তখনই ‘সমুদ্র শেষ’ হয়ে যেত, ‘চাঁদের আলোয়’ ‘সময়ের শূন্য মরুভূমি জ্বলে’[৫] উঠত। সেই শূন্য মরুভূমিতে বণিকেরা সভ্যতা গড়ে আর ‘একটি বেকার প্রেমিকের’ সকাল বেলায় ঘুম ভাঙে ‘কলতলার ক্লান্ত কোলাহলে’। বেকার প্রেমিকের ‘রক্তে জ্বলে’ ‘মৃত্যুহীন প্রেম থেকে মুক্তি’র আকাঙ্খা। এই যে প্রেম, তার চেয়ে মৃত্যুও বড় রমণীয়, সেখানে অন্তত বেকারত্বের গ্লানি নেই।

সমর সেন যেই সমাজের আশা নিয়ে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শুনেছিলেন সেই বসন্ত আজো সুদূরপরাহত। চিংকাং পাহাড়ের অগ্নিশিখা জ্বলতে আজো অনেক দেরি, তবে তা পুনরায় শূন্য দশকে ভারতের আকাশে জ্বলার পূর্ব পর্যন্ত চোখ ক্লান্ত হয়ে গেছে তাকে খুঁজতে। আমাদের দিনগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে ছিলো। তবুও সমর সেন-এর কবিতা কানে বাজে,

“বসন্তের বজ্রধ্বনি অদৃশ্য পাহাড়ে।
আজ বর্ষশেষে
পিঙ্গল মরুভূমি প্রান্ত হতে
ক্লান্ত চোখে ধানের সবুজ অগ্নিরেখা দেখি
সুদূর প্রান্তরে।”[৬]

তিনি সাংবাদিক হয়েছিলেন, শ্রমিক কৃষকের মুক্তির জন্য সম্পাদনা করেছেন ‘ফ্রন্টিয়ার’ নামের ইংরেজি পত্রিকা, এ যুগে যেকথা শুনে হয়ত কৌতুক মনে হতে পারে। কিন্তু গণশত্রু ইন্দিরার জরুরি অবস্থার সময়ে সেন্সরধারী মূর্খ মধ্যবিত্তকে ধাপ্পা দিতে সেটি কাজে লেগেছিল। সমর সেন আলাপের কণ্ঠে আমাদেরকে শুনিয়ে দেন রক্তের আগুনের কথা যা একুশ শতকের রক এন রোল শোনা তরুণদের কাছে মশকরা বৈকি। তিনি ৩০ বছরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই কবিতা ছেড়েছিলেন, কবিতায় আর ফিরে যাননি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত না হলে যিনি গেরিলা হতে পারতেন, তিনি হয়ত কোনো গ্রামে কবিতার কাছে পরাজিত হন, কিন্তু কৃষক তাঁকে মনে রাখে। আমাদের এটিই বড় ট্রাজেডি যে সমর সেন আমাদের স্মৃতিভারাতুর মনে নাড়া দেয় না।

লাল লগ্নের পথপ্রদর্শক

কবি সরোজ দত্তরা অভিযোগ করলে ১৯৪০ পরবর্তীকালের কবিতায় ‘সমান জীবনের চকিত স্বপ্ন’ নাড়া দেবে তাঁর কবিতায়। ‘মৃত্যু’ কবিতায় ‘কলের বাঁশির হাহাকারে’ ধরা পড়বে শ্রমজীবীর উপরে পুঁজিবাদী সমাজের শোষণের নির্মমতা, ‘নাগরিক’ কবিতায় ‘পাটের কলের উপরে আকাশ তখন / পাথরের মতো কঠিন’। পাটকল শ্রমিকদের প্রতি কবির সহানুভূতি ছড়িয়ে পড়বে। সামাজিক বৈষম্য অবসানের প্রত্যাশা দেখা যাবে ‘নাগরিক’ শিরোনামের কবিতায়,

“কিছুক্ষণ পরে হাওয়ায় জোয়ার আসবে
দুর সমুদ্রের দ্বীপ থেকে—
সেখানে নীল জল, ফেনায় ধূসর-সবুজ জল,
সেখানে সমস্ত দিন সবুজ সমুদ্রের পরে
লাল সূর্যাস্ত
আর বলিষ্ঠ মানুষ, স্পন্দমান স্বপ্ন_”[৭]

লাল সূর্যাস্ত আর বলিষ্ঠ মানুষ নিঃসন্দেহে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের দ্যোতক। সেই বিপ্লবী স্বপ্ন তাঁর কবিতার এক অমূল্য দিক। তিনি বলছেন জোয়ার আসছে, প্লাবন আসছে, কৃষক জাগছে, শ্রমিক জাগছে। তিনি, খাপ ছাড়া ঘুমে দূরে শুনছেন জোয়ারের জল, কীসের কল্লোল! বাঁধ ভেঙে বন্যার জল আসছে; এ পৃথিবীকে মুক্ত করবে অসাম্যের অভিশাপ থেকে। বাংলায় বন্যা এক সাধারণ নিত্য বাৎসরিক অভিশাপ, সেই বন্যাকে বিপ্লবে রূপান্তরের জন্য হিম্মত লাগে, সেই হিম্মত সমর সেন এবং নবারুণ ছাড়া আর কজন কবির ছিলো। সমর সেনের হিম্মত ছিলো, কিন্তু তিনি নিজেকে বাস্তবে কী মনে করতেন? তিনি নিজেকে বিপ্লবী মনে করতেন না, একজন ছাপোষা মধ্যবিত্তই মনে করতেন যার আরেক নাম বাঙালি বাবু। তাঁর সংক্ষিপ্ত আত্মজীবনী বাবু বৃত্তান্তে তিনি লিখেছেন, বাবু বৃত্তান্ত

“পড়ে পাঠকেরা বুঝবেন যে জনগণের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ছিলো না, পরিধি ও পরিবেশ ছিল মধ্যবিত্ত। আমার ছাত্রাবস্থায় বাবা বলতেন আমার বন্ধু বান্ধব সবাই সচ্ছল। কথাটা ঠিক । আমাকে কেউ বিপ্লবী বললে মনে হতো — এবং এখনো হয় — যে বিপ্লবকে হেয় করা হচ্ছে। চিন্তায় ও কর্মে সমন্বয় আনতে না পারলে বড় জোর ‘বিপ্লবী” সাপ্তাহিক চালানো যায়, কিন্তু বিপ্লবী হওয়া যায় না। এমন কি স্তালিনোত্তর ‘মহান বিপ্লবী’ দেশে কয়েক বছর কাটালেও নয়।”[৮]  

এই হচ্ছেন সমর সেন, যিনি নিজেকে বিপ্লবী মনে করেন না, অথচ বিপ্লবের জন্য লিখেন, বিপ্লবীদের জন্য লিখেন। ফলে একুশ শতকে যখন মানুষের চেয়ে মুনাফার শক্তি কয়েক লক্ষ গুণ বেশি হয়ে যায়, তখন সমর সেনকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করে মালিক-পুঁজিপতি শ্রেণি। সাপের মতো মসৃণ, ধূসর অন্ধকারের ভিতরে যখন একটি জাতি সাময়িক বন্দি হয় তখন সমর সেন বিস্মৃত হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

সমর সেন অনেক কিছুর সংগে নগরজীবনকে বাংলা কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। নাগরিক তির্যক ভঙ্গি, কথা বলবার দৈনন্দিন ধরন, অবক্ষয়ে জর্জরিত নগর জীবনের শ্বাস প্রশ্বাস তাঁর কবিতায় একটি বড় আকর্ষণ তৈরি করেছিল।[৯] তাই গণমানুষের জীবন সংশ্লিষ্ট জনগণের কবি সমর সেন বেঁচে থাকবেন জনগণের হৃদয়ে। ‘মধ্যবিত্তের সাহসের দৌড়’ সম্পর্কে সুবিদিত এই মহান মানুষটি তাঁর লড়াইয়ের জন্যই আমাদের কাছে স্মরণীয়। কবিতার এই শিল্পী তাঁর জীবনের লড়াইয়েও এগিয়ে ছিলেন কৃষক-শ্রমিকের সংগ্রামের সাথে। মুক্তির সকল লড়াইয়ে সমর সেনরা অমর রহে।[১০]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মেকলের বিষবৃক্ষের ভিন্ন ফল,
২. ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত, মডার্ন বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, পুনর্মুদ্রিত নতুন সংস্করণ ২০০৭, পৃষ্ঠা ৫৯১
৩. আরো দেখুন, খালেদ হোসাইন ও সাজ্জাদ আরেফিন সম্পাদিত, সমর সেন; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা; সেপ্টেম্বর, ২০০২, পৃষ্ঠা- ২৮৬।
৪. সমর সেন, বাবু বৃত্তান্ত, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৩৪
৫. সমর সেন-এর কবিতা ‘স্বর্গ হ’তে বিদায়’ থেকে
৬. সমর সেন-এর কবিতা ‘বসন্ত’
৭. ‘নাগরিক’, কয়েকটি কবিতা কাব্যগ্রন্থ থেকে
৮. সমর সেন, বাবু বৃত্তান্ত, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা, পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল, ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৪৭।
৯. শঙ্খ ঘোষ, লেখা যখন হয় না, পত্রভারতী, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ২০১৯, পৃষ্ঠা ৫১।
১০. অনুপ সাদি, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, “কবি সমর সেন বাঙালি মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর”, রোদ্দুরে ডট কম, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/samar-sen/

রচনাকাল আগস্ট, ২০১৪, চৌরঙ্গী মোড়, ময়মনসিংহ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!