রোমান্টিক কবিতা হচ্ছে রোমান্টিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন থেকে উদ্ভূত কবিতা

রোমান্টিক কবিতা (ইংরেজি: Romantic poetry) হচ্ছে রোমান্টিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন থেকে উদ্ভূত রোমান্টিক যুগের কবিতা। রোমান্টিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে ইউরোপে উদ্ভূত হয়েছিল। এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রচলিত আলোকায়ন যুগের ধারণার বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে চালু হয় এবং আনুমানিক ১৮০০ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। রোমান্টিক কবিরা অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিতার ধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, যা মহাকাব্য, উপাখ্যান, ব্যঙ্গ, শোকগাথা, পত্র এবং গানের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।

ইংরেজি রোমান্টিক কবিতা

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডে, কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর এবং স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের যুগ প্রচেষ্টায় ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কাব্য-সংকলন “লিরিক্যাল ব্যালাডস” সেই রোমান্টিক আন্দোলনের সূচক। এই গ্রন্থের পরবতী সংস্করণে সংযোজিত মুখবন্ধে ওয়ার্ডসওয়ার্থ নতুন প্রজন্মের কবিতার বিষয়বস্তু, ভাষা ও কাব্যশৈলী ইত্যাদি বিষয়ে মতামত তথা পরিকল্পনা উপস্থাপিত করেছিলেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজের উদ্ভাবনী কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিরিক্যাল ব্যালাডসের দ্বিতীয় সংস্করণের (১৮০০) নতুন ভূমিকায় লিখেছিলেন:

আমি আগেই বলেছি যে কবিতা হলো শক্তিশালী অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত উপচে পড়া প্রবাহ: প্রশান্তিতে স্মরণ করা আবেগ থেকে কবিতার উৎপত্তি: আবেগটি ধ্যান করা হয় যতক্ষণ না এক ধরণের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রশান্তিটি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়; এবং ধ্যানের বিষয়বস্তুর আগে যা ছিল তার সাথে সম্পর্কিত একটি আবেগ ধীরে ধীরে উৎপন্ন হয় এবং প্রকৃতপক্ষে মনের মধ্যে বিদ্যমান থাকে।

লিরিক্যাল ব্যালাডসের কবিতাগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে কবিতার শব্দের ধরণ পুনর্কল্পনা করেছিল এইভাবে যেন “মানুষের বাস্তব ভাষার একটি নির্বাচন যা ছন্দবদ্ধ বিন্যাসে মানানসই করে”। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও তাঁর ইংরেজ সমসাময়িক কবিগণ যেমন কোলরিজ, জন কিটস, পার্সি শেলি, লর্ড বায়রন এবং উইলিয়াম ব্লেক, এমন কবিতা লিখেছিলেন যা মানুষের পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়ার উপর গুরুতর, মননশীল প্রতিফলন থেকে ফুটে ওঠে।

যদিও অনেকে রোমান্টিক কবিতায় স্বতঃস্ফূর্ততার ধারণার উপর জোর দেন, তবুও আন্দোলনটি রচনার অসুবিধা এবং এই আবেগগুলিকে কাব্যিক আকারে রূপান্তরিত করার বিষয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিল। প্রকৃতপক্ষে, কোলরিজ তার “অন পোয়েসি অর আর্ট” প্রবন্ধে শিল্পকে “প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী এবং পুনর্মিলনকারী” হিসেবে দেখেন। এই ধরনের মনোভাব ইংরেজি রোমান্টিক কবিতার প্রধান বিষয়বস্তুকে প্রতিফলিত করে: অর্থ তৈরির জন্য মানুষের মনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক আবেগকে পরিস্রুত করা।

রোমান্টিক কবিতার বৈশিষ্ট্য

এক অপার বিস্ময়বোধ, সৌন্দর্যপিপাসা, প্রকৃতি প্রেম, মানব প্রীতি, কল্পলোকের প্রতি আসক্তি এবং সর্বোপরি কাব্যভাষা ও প্রকরণের ক্ষেত্রে অষ্টাদশ শতকের নিয়ম শৃঙ্খল থেকে মুক্তি—এই সবই ছিলো রোমান্টিক কাব্য তথা অন্যতর সাহিত্যের উল্লেখনীয় বৈশিষ্ট্য।

রোমান্টিক যুগের সাহিত্য তথা রোমান্টিকতার বৈশিষ্ট্যসমূহ, যুগ প্রভাব ও প্রেক্ষিত বিষয়ে স্বতন্ত্র অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে। বর্তমান অধ্যায়ে তাই এই যুগ পর্বের একটি সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা উপস্থিত করা হলো। অগ্রজ কবিদের মধ্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজের কথা বলা হয়েছে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতি চেতনা ও কোলরিজের অতিপ্রাকৃতের রহস্য রোমান্টিক কাব্য সাহিত্যের দুই স্থায়ী আকর্ষণ। 

তাঁদের অগ্রজ কবি ছিলেন উইলিয়াম ব্লেক, যিনি কবিতায় সাধারণ মানুষকে এনেছিলেন। তাঁদের অনুজ কবিদের মধ্যে ছিলেন লর্ড বায়রন (Byron ), পার্সি বিসি শেলি, ও জন কিটস (John Keats)। গাথাকাব্য ও ব্যঙ্গকাব্য রচনায় বায়রনের সাফল্য ছিলো প্রশ্নাতীত। শেলীর কাব্যের মূল সুর মানবিক দুঃখ-যন্ত্রণাকে অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা-পালিত এক অবিচল আদর্শবাদের সুর। মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য, প্রেম ও পুনরুজ্জীবনের জন্য তাঁর আকুতি শেলীর কাব্যকে এক স্বতন্ত্র মহিমা দিয়েছে। 

ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সৌন্দর্য ও মনোরমতাকে কীটসের কবিমন যেভাবে উপভোগ ও প্রকাশ করেছে তেমনটি রোমান্টিক কাব্যের ইতিহাসে অদ্বিতীয়। গ্রীক পুরাণ ও বর্ণগন্ধস্পর্শগ্রাহ্য প্রকৃতি জগত, এ দুয়ের প্রতি কীটসের ছিলো দুর্বার আকর্ষণ। চিত্রকল্পের কারুকাজে, গীতি মাধুর্যে, সৌন্দর্য ও নিত্যতার দ্বন্দ্ব দর্শনে কীটসের কবিতা এক বিস্ময় ভাণ্ডার। এই যুগের অপরাপর কবিদের মধ্যে নাম করা যেতে পারে রবাট সাউদি (Southey), টমাস ক্যাম্পবেল (Campbell), টমাস মুর (Moore), জন ক্লেয়ার (Clare) প্রমুখের।

উপসংহার

ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবিরা আঠারো শতকের শেষভাগে এবং ঊনবিংশ শতকের শুরুতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন, যা মূলত তৎকালীন যান্ত্রিক শিল্পবিপ্লব এবং কঠোর যুক্তিনির্ভর আলোকায়নের যুগের বিরুদ্ধে এক ধরনের কাব্যিক বিদ্রোহ ছিল। ১৭৯৮ সালে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের যৌথ কাব্যগ্রন্থ লিরিক্যাল ব্যালাডস প্রকাশের মাধ্যমে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

রোমান্টিক কবিরা মূলত প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, সাধারণ মানুষের জীবনবোধ এবং মানুষের অবদমিত আবেগকে কবিতার প্রধান উপজীব্য করে তোলেন। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ যেখানে প্রকৃতিকে তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষক ও বন্ধু হিসেবে দেখেছেন, সেখানে কোলরিজ তাঁর কবিতায় অতিপ্রাকৃত উপাদানের রহস্যময় ব্যবহার করেছেন। আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রজন্মের কবিদের মধ্যে লর্ড বায়রন তাঁর বিদ্রোহী চরিত্রের জন্য, পার্সি বিশি শেলি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শ ও স্বাধীনতার বার্তার জন্য এবং জন কিটস তাঁর কবিতার অতুলনীয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৌন্দর্য ও চিরন্তন সত্যের সন্ধানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। রোমান্টিক কাব্যতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপনে এবং ব্যক্তি-অনুভূতির গুরুত্ব তুলে ধরতে এই কবিদের অবদান ইংরেজি সাহিত্যে আজও অপরিসীম।

আরো পড়ুন

    আলোকচিত্রের ইতিহাস: ফরাসি চিত্রকর লুই জ্যাঁমটের ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে অংকিত পাহাড়চূড়ায় আত্মার কবিতা

    তথ্যসূত্র

    ১. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১৭-১৮।  

    Leave a Comment

    error: Content is protected !!