চন্দ্রকুমার দে: মৈমনসিংহ গীতিকার নেপথ্য কারিগর ও লোকসাহিত্যের অমর সংগ্রাহক

বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্ন ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র প্রখ্যাত সংগ্রাহক ও লেখক চন্দ্রকুমার দে ছিলেন নেত্রকোণার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৮৮৯ সালে কেন্দুয়ার আইথর গ্রামে এক অতিদরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন; অতি অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে স্বাস্থ্যহীন এই অনাথ কিশোর গ্রাম্য পাঠশালায় সামান্য পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ পান।

প্রাণের তাগিদে তিনি প্রথমে গ্রামের একটি মুদির দোকানে মাত্র এক টাকা মাসিক বেতনে কাজ শুরু করেন। তবে কাজের চেয়ে মনের ঝোঁক অন্যখানে থাকায় বেশিদিন সেই কাজ টেকেনি। পরবর্তীতে মাসিক দুই টাকা বেতনে এক তালুকদারের তহশিলদার হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। খাজনা আদায়ের প্রয়োজনে তাঁকে গ্রামের পথে-প্রান্তরের মানুষের কাছে যেতে হতো। এই সুবাদেই পূর্ব ময়মনসিংহের সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। কৃষকদের আয়োজিত রাতভর পালাগান শুনে তন্ময় হয়ে যেতেন তিনি—আর এভাবেই তাঁর হৃদয়ে রোপিত হয় লোকসাহিত্য সংগ্রহের বীজ।

সংগ্রাম থেকে স্বীকৃতি: লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে উত্থান

ময়মনসিংহের বিশিষ্ট গবেষক ও পণ্ডিত কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘সৌরভ’ (১৯১২) পত্রিকায় লোকসাহিত্য নিয়ে চন্দ্রকুমার দে-র কয়েকটি চমৎকার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমেই সুধী সমাজে তিনি প্রথম পরিচিতি পান। কেদারনাথের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাসিক আট টাকা বেতনে গৌরীপুরের জমিদারের গোমস্তা হিসেবে তাঁর নতুন কর্মজীবন শুরু হয়। মূলত এই চাকরির সুবাদেই তিনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান এবং মৌমাছির মধু সংগ্রহের মতো করে পরম মমতায় সংগ্রহ করতে থাকেন পল্লীগীতিকার অমূল্য রত্নসমূহ।

তবে সাহিত্যের মোহে আচ্ছন্ন চন্দ্রকুমারের মন খাজনা আদায়ের মতো নিরস কাজে টেকেনি। ফলে দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে তিনি চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য বড় কিছু জমা রেখেছিল। ১৩২০ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে ‘সৌরভ’ পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ প্রকাশিত হলে তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেনের নজরে আসে।

দীনেশচন্দ্র সেন প্রথমে জানতেন যে, চন্দ্রকুমার একজন দরিদ্র ও স্বশিক্ষিত যুবক। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয়ের পর চন্দ্রকুমারের অসামান্য প্রতিভা ও লোকসাহিত্যের প্রতি তাঁর টান দেখে ড. সেন মুগ্ধ হন। ফলশ্রুতিতে, ১৯২০ সালে তিনি চন্দ্রকুমার দে-কে মাসিক ৭০ টাকা বেতনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পালাগান সংগ্রাহক’ পদে নিযুক্ত করেন। এটিই ছিল তাঁর জীবনের এক বৈপ্লবিক মোড়।

মৈমনসিংহ গীতিকা’ প্রকাশ ও লোকসাহিত্যের বিশ্বজয়

চন্দ্রকুমার দে-র কর্মতৎপরতা ছিল বিস্ময়কর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের মাত্র এক বছরের মাথায়, অর্থাৎ ১৯২১ সালের মধ্যেই তিনি ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র প্রথম চারটি পালা সংগ্রহ করে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের হাতে তুলে দেন। এর পরের বছরই সংগৃহীত হয় বাকি ছয়টি পালা। তাঁর এই কঠোর পরিশ্রম ও অসামান্য দক্ষতার ফসল হিসেবেই ১৯২৩ সালে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কালজয়ী গ্রন্থ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’

এই সংকলনটি কেবল কিছু গল্পের সমষ্টি নয়, বরং এটি বাংলার গণমানুষের জীবন ও সংস্কৃতির এক শাশ্বত দলিল। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ—পীর-ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে মুদি, দেওয়ান, জমিদার, নফর, পণ্ডিত, রাখাল, ডাকাত, এমনকি সাধারণ কিষাণ-কিষাণী ও বেদে-বেদেনীরাও এই গীতিকার প্রাণবন্ত চরিত্র হিসেবে ফুটে উঠেছেন। পূর্ব ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য যে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীর ঐশ্বর্য, ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ বিশ্বদরবারে তা পুনরায় প্রমাণ করেছে।

চন্দ্রকুমারের অমর সৃষ্টি: মৈমনসিংহ ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার পালাসমূহ

চন্দ্রকুমার দে কেবল একজন সংগ্রাহকই ছিলেন না, বরং তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পালাগানগুলোর মধ্যে যেখানেই কোনো শূন্যতা বা অসংগতি খুঁজে পেয়েছেন, সেখানেই তিনি নিজের কবিত্ব শক্তি দিয়ে তা পূরণ করেছেন। তাঁর এই সৃজনশীল স্পর্শ পালাগানগুলোকে পূর্ণতা দান করেছে।

ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় চন্দ্রকুমারের সংগৃহীত এই অমূল্য পালাগানগুলো ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ (১৯২৩) এবং ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ (১৯২৬) নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থগুলো প্রকাশের পরপরই বিলুপ্তপ্রায় লোকসাহিত্য উদ্ধারের কারিগর হিসেবে চন্দ্রকুমার দে দেশে-বিদেশে ব্যাপক খ্যাতি ও প্রশংসা অর্জন করেন।

তাঁর সংগৃহীত উল্লেখযোগ্য পালাগানসমূহ:

  • মৈমনসিংহ গীতিকার অন্তর্ভুক্ত পালা: মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, রূপবতী, কঙ্ক ও লীলা, দেওয়ানা মদিনা এবং ধোপার পাট।
  • পূর্ববঙ্গ গীতিকার অন্তর্ভুক্ত পালা: মইষাল বন্ধু, ভেলুয়া, কমলারাণী, দেওয়ান ঈসা খাঁ, ফিরোজ খাঁ দেওয়ান, আয়না বিবি, শ্যামরায়, শিলাদেবী, আন্ধা বন্ধু, বন্ডুলার বারমাসী, রতন ঠাকুর, পীর বাতাসী, জিবালনি, সোনারামের জন্ম এবং ভারাইয়া রাজা।

অসংগৃহীত সাহিত্যসম্ভার ও চন্দ্রকুমারের সীমাবদ্ধতা

মৈমনসিংহ ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার বাইরেও চন্দ্রকুমার দে ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ জনপদ থেকে প্রচুর ধর্মীয় ও পৌরাণিক কাহিনীমূলক কবিগানের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাঁর সংগৃহীত সেই তালিকায় ছিল মুক্তারামের ‘দুর্গা পুরাণ’, রামকান্তের ‘মনসার ভাসান’, ‘উমার বিবাহ’, ‘শিব-দুর্গার কোন্দল’, ‘দুর্বাসার পাবণ’, ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’ এবং ‘নরমেধ যজ্ঞ’-এর মতো কালজয়ী সব লোকগাথা।

তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব পৌরাণিক কাহিনী সংগ্রহের প্রতি ড. দীনেশচন্দ্র সেনের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এবং দীনেশ সেনের অনীহায় চন্দ্রকুমারের এই উৎসাহ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে। তা না হলে বাংলার সাহিত্যভাণ্ডার হয়তো আরও অনেক বিরল কবিগান ও প্রতিভাবান কবিয়ালের সন্ধান পেত। পাশাপাশি, চন্দ্রকুমার নিজেও তথাকথিত ‘অর্বাচীন’ বা অসংলগ্ন ভাষায় রচিত কাহিনীগুলো গ্রহণে কিছুটা অনাগ্রহী ছিলেন। রুচি ও গুণগত মানের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন বলে অনেক পালাগানই তাঁর সংগ্রহ তালিকায় ঠাঁই পায়নি।

ব্যক্তিগত সাহিত্যচর্চা ও ড. দীনেশচন্দ্র সেনের পরামর্শ

চন্দ্রকুমার দে কেবল একজন দক্ষ সংগ্রাহকই ছিলেন না, বরং তাঁর কলমে ছিল সৃজনশীল সাহিত্যের বিশেষ ধার। গীতিকা সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি বিপুল সংখ্যক কবিতা, গল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত অন্যতম কাব্যগ্রন্থ ‘লোহার মাঞ্জস’-এর সপ্তম সর্গ পর্যন্ত তৎকালীন বিখ্যাত ‘সৌরভ’ পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল।

তবে লোকসাহিত্যের অমূল্য রত্ন সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁর নিজস্ব কবিপ্রতিভা বিকাশের সুযোগ অনেকাংশেই সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালাগান সংগ্রাহক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর, ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁকে একটি বিশেষ পরামর্শ দেন। তিনি চন্দ্রকুমারকে সাময়িকভাবে কাব্যচর্চা থেকে বিরত থেকে সম্পূর্ণ মনোযোগ পালাগান সংগ্রহে নিবদ্ধ করার উপদেশ দেন। সাহিত্যের বৃহত্তর স্বার্থে এবং বিলুপ্তপ্রায় লোকগাথা রক্ষায় ড. সেনের এই উপদেশ মেনে নিয়ে চন্দ্রকুমার নিজের ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতাকে কিছুটা আড়ালে রেখে উৎসর্গ করেন জাতির স্থায়ী সাহিত্য সম্পদ আহরণে।

সংগ্রাহকের আড়ালে এক দরদী লেখক ও ড. সেনের স্মৃতিচারণ

যদিও বিশ্বজুড়ে চন্দ্রকুমার দে-র মূল পরিচিতি ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক হিসেবে, তবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল একজন মননশীল কবি, পরিশ্রমী গবেষক এবং তীক্ষ্ণধী প্রাবন্ধিক হিসেবে। অর্থাৎ সংগ্রহের নেশায় মত্ত হওয়ার আগেই তিনি তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন।

চন্দ্রকুমারের লেখনীর জাদুকরী শক্তির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. দীনেশচন্দ্র সেন এক আবেগঘন বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯১৩ (মতান্তরে ১৯২৩) সালে ‘সৌরভ’ পত্রিকায় চন্দ্রকুমারের লেখা ‘প্রাচীন মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শীর্ষক প্রবন্ধটি প্রথম তাঁর নজরে আসে। ড. সেনের ভাষ্যমতে:

“গ্রন্থকার চন্দ্রাবতীর গল্পের কেবল মূল অংশটুকু দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সামান্য লেখাই ছিল চৈত্র-বৈশাখী বাগানের ফুলের গন্ধে ভরপুর। সেদিন কেনারামের উপাখ্যানের সেই সারাংশ পড়ে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।”

চন্দ্রকুমারের লেখার এই অসামান্য আবেদনই ড. দীনেশচন্দ্র সেনকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তাঁকে লোকসাহিত্য সংগ্রহের বিশাল দায়িত্বে নিয়োজিত করতে।

উপসংহার: লোকসাহিত্যের চিরঞ্জীব সাধক

চন্দ্রকুমার দে ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি গ্রামের ধূলিমলিন পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতেন, কৃষকের সহজ-সরল জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়ে স্থাপন করতেন আত্মিক যোগসূত্র। গ্রামীণ জনপদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী লোক-সংস্কৃতির সাথে তিনি একাত্ম হয়েছিলেন প্রাণের টানে। অভাবের তীব্র কষাঘাত, শারীরিক অসুস্থতা আর জীবনের চরম দুঃসময়েও তিনি তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। নিরলস সাধনায় লোকসাহিত্যের যে অমূল্য রত্নভাণ্ডার তিনি উদ্ধার করেছেন এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে এর চিরন্তন সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন, তা আজও অমলিন। বাংলা লোকসাহিত্য সংগ্রহের ইতিহাসে চন্দ্রকুমার দে চিরকাল এক অবিস্মরণীয় অগ্রপথিক এবং প্রাতঃস্মরণীয় শিরোমণি হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরিত হবেন।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ১১৭-১১৯।

Leave a Comment