বীণা দাস ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের নারী বিপ্লবী। বীণা দাস ছিলেন কটকের নারী বিপ্লবী। তিনি লেখক ছিলেন ও মেয়েদের রাজনীতিতে উৎসাহিত করে তোলার জন্য সাংগঠনিক কাজ করেছেন।
তিনি যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। গভর্নর স্ট্যালি জ্যাকসনকে হত্যার বৃথা চেষ্টা করে ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সাত বছর কারাবন্দী ছিলেন। কারামুক্ত হওয়ার পড়ে সাহিত্যজীবনে প্রবেশ করেন ও রাজনৈতিক কাজ অংশগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন ভাবে।[১]
জন্ম ও পরিবার:
বীণা দাস ১৯১১ সালের ২৪শে আগস্ট কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা বেণীমাধব দাস ও মাতা সবলা দাস। পিতৃভূমি তার চট্টগ্রাম। তার দিদি ছিলেন কল্যাণী দাস। দুই বোন কল্যাণী ও বীণার জীবনে গভীর প্রভাব ছিল তাঁদের পিতামাতার এবং বড়মামা অধ্যাপক বিনয়েন্দ্রনাথ সেনেব।
পিতামাতার নিকট থেকেই শুনতেন তার বড়মামার মহৎ চরিত্রকথা। ১৯৪৭ সালে তার বিবাহ হয় স্বাধীনতা-সংগ্রামের একনিষ্ঠ সৈনিক যতীশ ভৌমিকের সঙ্গে।
পিতার কাছ থেকে কল্যাণী দাস ও বীণা ছোটবেলায় বসে বসে শুনতেন সমাজ বিপ্লবীদেব জীবনী। একটা আদর্শের জন্য মানুষ যে কত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারে সেসব কথা শুনে শুনে বিপ্লবী রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হন।
শৈশব থেকে বীণা সমগ্র পরিবারের নিবিড় স্নেহমমতা এবং অগাধ বিশ্বাস পেয়ে শান্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। বড় হবার সাথে সাথে বাইরের জগতেব সঙ্গে যতই পরিচিত হতে লাগলেন ততোই তিনি অনুভব করলেন ‘অসীম বেদনাভরা মানবজীবন’। তাঁর মানসিক সুখশান্তির জগতে আলোড়ন দেখা দিল। দেশের দুঃখ দুর্গতি ও পরাধীনতার গ্লানি তাঁর মনকে আকুল করে তোলে।
রাজনৈতিক কাজে আগ্রহ:
অসহযোগ ও জাতীয় আন্দোলনের একটা প্রবল তরঙ্গ তখন দেশের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। বীণাদের পরিবারেও এই তরঙ্গে ধাক্কা লাগে। তাঁর মেজদাদা আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ করেন।
পিতা নিজে চরকা ও খদ্দর এনে দিতেন। তিনি মনের দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অন্যদিকে পিতার জীবন থেকে বীণা শিক্ষা পেয়েছিলেন, একটা আদর্শের অন্য মানুষ কত ত্যাগস্বীকায় নিজের জীবনে করতে পারে।
মাতৃভূমির শৃঙ্খলমোচনের আকুল আহ্বান এবং আদর্শবাদী পিতার আদর্শনিষ্ঠা বীণার মনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে তুলেছিল স্বাধীনতা-সংগ্রামের পথকে নিজের জীবনে বেছে নিতে।
বীণা দাস-এর রাজনীতিতে যুক্ত:
১৯৯৮ সালে এসেছিল সাইমন কমিশন। বেথুন কলেজে ছাত্রী বীণা দাস অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে সাইমন কমিশন বয়কট ও বেথুন কলেজে পিকেটিং কবতে উঠে-পড়ে লাগলেন। ঐ সালেই কোলকাতা কংগ্রেসের অধিবেশনে বীণা ও কল্যাণী দুই বোন পরম উৎসাহে স্বেচ্ছাসেবিকা-বাহিনীতে যোগদান করেন।
ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক কাজ:
সেই সময়ে বীণা বেথুন কলেজে পড়তেন। তার সহপাঠী সুহাসিনী দত্ত ও শান্তি দাশগুপ্ত ছিলেন একটি ছোট বিপ্লবী দলের সভ্য। বীণার মতো আদর্শবাদী আধার পেয়ে তারা নিজেদের বিপ্লবী দলে টেনে নেন।
১৯৩০ সালে শুরু হয়েছিল গান্ধীজীর লবণ আইন অমান্য আন্দোলন। পাশাপাশি চলেছিল বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়— চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। বীণা কান পেতে শুনে আর বিমুগ্ধ হৃদয়ে তাদের গৌরবগাঁথা নিয়ে মনে মনে ছবি আঁকেন।
ডালহউসি স্কোয়ারের হামলা:
১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে ডালহউসি স্কোযারে বাংলার অত্যাচারী পুলিস-কমিশনার স্যার চার্লস টেগার্টকে বোমা ও রিভলভার দিয়ে আক্রমণ করবার অপরাধে গ্রেপ্তার হন দীনেশ মজুমদাব এবং নিহত হন অনুজা সেন।
ঢাকায় বিনধ বসু লোম্যানকে গুলির আঘাতে পররাজ্য-শাসনেব চরম পুরষ্কার দিযে পালিয়ে যান। তাই কিছুদিন পরে আবার কলকাতা বাইটার্স বিল্ডিংসে বিনয় বসুর আবির্ভাব হয় দীনেশ গুপ্ত ও বদল গুপ্তের সঙ্গে।
তিনজনেই আক্রমণ করেন সিম্পসন ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ ইংরেজকে। বিনয বসু ও বাদল গুপ্ত নিজ মস্তকে গুলী ক’রে ও সাইনাইড খেয়ে আত্মহত্যা কবেন। দীনেশ গুপ্তেব ফাঁসি হয়।
দলের ভাঙন:
১৯৩১ সালেব ডিসেম্বর মাসে স্কুলের দুটি কিশোরী ছাত্রী শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী কুমিল্লার ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে নিহত করে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তবে দণ্ডিত হন। এইভাবে একটার পর একটা ঘটনা বাংলাদেশের সত্তাকে প্রবল ধাক্কায় আলোড়িত করে তুলেছিল।
ডালহউসি স্কোযারে বোমার আক্রমণের পর বীণাদের সেই ছোট দলের নেতা এবং তাঁদের আরো অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে যান। তা ছাড়া নানা আভ্যন্তরীণ কারণে তাদের ছোট দলটি ভেঙে যায়। এদিকে চলেছে তখন সমস্থ বাংলাদেশ জুড়ে স্বাধীনতা-সংগ্রামের মরণ-উৎসব। বীণা উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন ওই সংগ্রামসাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে।
যুগান্তর-দলের সাথে যোগাযোগ:
একদিন তিনি যুগান্তর-দলের কর্মী কমল দাশগুপ্তের কাছে নিজের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলেন এবং ‘ডিগ্রী’ নেবার সময় কনভোকেশান-হলে অথবা কলিকাতার রেসকোর্সে গভর্নরকে গুলী করার জন্য রিভলভার চাইলেন।
তখনকার দিনে গুপ্তদলগুলি একে অন্যের কাছে নিজেদের কর্মপ্রচেষ্টা সম্বন্ধে আলোচনা অথবা কথাবার্তা বলতে একেবারেই অভ্যস্ত ছিল না। তাই বীণাকে দিয়ে এ কাজ করাবাব এতবড় দাযিত্ব নেওয়া সম্বন্ধে কমলা প্রথমদিনই বীণাকে কথা দিলেন না।
বীণাকে তিনি চিনতেন। তার সহপাঠী ও বন্ধু কল্যাণী দাসের ছোটবোন হিসেবে। বীণার স্বভাব ছিল মধুর ও আদর্শ প্রবণ, আর ছিল তার আবেগপূর্ণ প্রাণ। বীণার সঙ্গে তিনি দিনের পর দিন এই কাজের বিপদের দিকটা আলোচনা করে বোঝাতে লাগলেন যেন মুহুর্তের আবেগে তিনি কিছু কষতে না যান। বীণা রইলো দৃঢ় আপন সংকল্পে।
কমল অন্যদিকে আলোচনা করতে থাকলেন নিজেদের দলে মধ্যে। তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন তার পরম বিশ্বাসের পাত্র সুধীর ঘোষকে। সুধীরের সঙ্গে তাঁর আলোচনার মূল কথাটা দাঁড়ালো এইরকম গভর্নর হচ্ছেন শাসন ও প্রভুত্বের পূর্ণ প্রতীক।
এই পূর্ণ প্রতীককে আঘাত করে বিপ্লবের বন্যাটাকে তীব্রতম স্রোতে, দুর্দম গতিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজেদের নিঃশেষে অবলুপ্ত করে দেওয়াই ছিল তখন তাঁদের একমাত্র সাধনা ও লক্ষ্য। অতএব পরামর্শে স্থির হ্য়, কনভোকেশান-হলে গভর্নরকে গুলী করা হবে এবং গুলী করার দায়িত্ব গ্রহণ করা হবে। এই কাজের জন্য চরম শাস্তির যে বিধান ছিল— সেই ফাঁসি, দ্বীপান্তর, বর্বর অত্যাচার সবই বরণ করে নেবার জন্য প্রস্তুত হলেন তারা।
কমল দাশগুপ্ত ২৮০ টাকা সংগ্রহ করে এনে দিলেন সুধীর ঘোষের হাতে রিভলভার কিনে আনতে। কয়েকদিন পরেই এল অতিকষ্টে স্মাগল-করা রিভলভার। সেদিনই বিকালে কমলা চলে গেলেন বীণার সঙ্গে দেখা করতে। আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিলেন তিনি বীণা হাতে, বুঝিয়ে দিলেন তার প্রতিটি অংশের ব্যবহার।
গভর্নর স্ট্যালি জ্যাকসনের উপর হামলা ও বীণার কারাবরণ:
১৯৩২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি সেনেট-হলে কনভোকেশান বসেছে। গভর্নর স্ট্যালি জ্যাকসন অভিভায়ণ পাঠ শুরু করেছেন। বীণা দাস নিজের আসন থেকে উঠে এসে গভর্নরের কয়েক হাত দূর থেকে গুলী চুড়তে লাগলেন। গভর্নরের কানের পাশ দিয়ে গুলী চলে গেল।
সৈনিকের জাত, অতি সতর্ক কান, তৎক্ষণাৎ গর্ভনর মাথাটা সরিয়ে নিয়েছিলেন। কর্নেল সুরাওয়ার্দি ডাস থেকে ছুটে এসে বীণার গলা টিপে ধরে বসিয়ে দিতে চেষ্টা করতে থাকেন। তবুও বীণার হাতের বাকী গুলি কয়েকটা ঐ অবস্থাতেও ছুটেছিল।*
বীণা দাসকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। অপমানকর ভাষায় পুলিস তাকে জেরা করে রিভোলভার পাবার রহস্য জানতে । বীণা রইলেন নিরুত্তর। কোটে বীণা একটি বিবৃতি দেন। একদিনেই বিচার শেষ করে তাকে ৯ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
জেলের জীবন:
পরাধীন ভারতে যেসব আত্মভোলা কর্মী স্বাধীন ভারতের সৌধমুল গেঁথে তুলবার জন্য আত্মবিলুপ্তির আকাঙ্ক্ষার অধীর হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন বীণা দাস তাঁদের অন্যতম। সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ, শক্তিধর গভর্নরের প্রতি গুলি-নিক্ষেপ সেদিন ভূমিকম্পের মতে ফাটল ধরিয়েছিল বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিভূমিতে।
যদিও এই ষড়যন্ত্রেণ মধ্যে যারা জড়িত ছিলেন তাদের পুলিশ জানেনি, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই কমল দাশগুপ্ত এবং সুধীর ঘোষকে পুলিস গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায় এবং রাজবন্দী করে রাখে তাঁদের ছয় বৎসরেরও বেশী।
বীণা দাসকে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্সি জেল থেকে মেদিনীপুর জেলে। সেখানে ছিলেন শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী। মেদিনীপুরে কিছুদিন তাদের আনন্দেই কেটেছিল । কিন্তু জেলখানা আনন্দের জায়গা নয়। ঐ জেলের জেলারের অনাচারের প্রতিবাদে এরা তিনজন অনশন আর উপবাসের করেন সপ্তম দিনে কতৃপক্ষ তাঁদের দাবী মেনে নিলেন। তারপর বীণা দাস ও শান্তি ঘোষকে নিয়ে যাওয়া হয় হিজলী জেলে। যেখানে রাজবন্দিনীরা ছিলেন। সুনীতি চৌধুরীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাজশাহী জেলে।
বাংলাদেশের নানা জেলে স্থানান্তবিত হয়ে থাকার পর গান্ধীজীর প্রচেষ্টায সকল রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে বীণাও মুক্তি পান। পুরো সাতবছর জেলে কাটিয়ে বীণা বেরিয়ে আসেন ১৯৩৯ সালে। গান্ধীজীর প্রচেষ্টায শুধু বাজনৈতিক বন্দী নন, বিনাবিচারে বন্দীরাও সকলেই মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৩৮ সালের মধ্যে। বেরিয়ে আসার পর সব দলই নতুন পরিস্থিতিতে আত্নচিন্তা করতে লাগলেন।
সাহিত্যজীবিন ও রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন:
যুগান্তর দলের নেতারা নিজেদের কর্মপদ্ধতি ও গুপ্তদল সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করে স্থির করেন যে, তাদের আর গুপ্তদল এবং পৃথক কর্মপদ্ধতি রাখবার প্রয়োজনীয়তা নেই। তাঁর নিজেদের দল ভেঙে দিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যোগ দেন। ‘ফরওয়ার্ড’ সাপ্তাহিক কাগজ তখন তারাই পরিচালনা কবেন ।
‘মন্দিরা’ নামে একটি রাজনৈতিক মাসিক পত্রিকাও তারা পরিচালনা করেন। মুক্তির পর বীণা দাস এসে এদের সঙ্গে কাজে যুক্ত হলেন। মন্দিরার সম্পাদিকা তখন কমল দাশগুপ্ত। কঠিন পরিশ্রম ছিল এই কাগজ পরিচালনা করা।
মনের মধ্যে অদ্ভুত আশা নিয়ে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা অচ্ছেদ্য অঙ্গ মনে করে কমল দাশগুপ্ত, বীণা দাস, মায়া ঘোষ, রেবা ঘোষ, কমলা সেন, সুপ্রীতি মজুমদাব, প্রভাবতী বস্ত্র, পাস্তা বসু, স্নেহলতা সেন, দুলু দত্ত ও অন্যান্য সহকর্মিগণ মন্দিরার জন্য খাটতেন।
লেখা সংগ্রহ করা, ডালহাউসি স্কোয়ারের বিরাট দালানগুলি ঘুরে ঘুরে বিজ্ঞাপন যোগাড় করা প্রভৃতি কোনো কাজকেই তাঁদের নীরস বা একঘেযে মনে হত না। স্বাধীনতা সংগ্রামে অঙ্গনে বীণা দাস ছিলেন সাহিত্যিক। তাঁর লেখাগুলি আজও পুরাতন ‘মন্দিরা’ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেয়।
‘মন্দিরা’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন ।
কমলা চ্যাটার্জী- বৈশাখ ১৩৪৫ থেকে কার্তিক ১৩৪৫ পর্যন্ত।
কমলা দাশগুপ্ত- অগ্রহায়ণ ১৩৪৫ থেকে শ্রাবণ ১৩৪৯ ,
পৌষ ১৩৫২ থেকে চৈত্র ১৩৫৪ পর্যন্ত।
স্নেহলতা সেন- ভাদ্র ১৩৪৯ থেকে অগ্রহায়ণ ১৩৫২ পর্যন্ত। (এইসময় কমল দাশগুপ্ত জেলে ছিলেন।)
কংগ্রেসের কাজে যুক্ত:
বীণা দাস ওদিকে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের মধ্যে গণসংযোগের কাজও করতে থাকেন। কংগ্রেসের এক প্রধান কর্মসূচী ছিল গণসংযোগ করা। তিনি টালিগঞ্জের চালের কলের বস্তি গিয়ে বস্তিবাসী দরিদ্র শ্রমিকদের সঙ্গে দিনের পর দিন মিশে তাদের চরম দুর্গতি নিজের হৃদয়ে অনুভব করতেন। দারিদ্রের লাঞ্ছনা তাকে ব্যাকুল করে তুলত।
১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে আরম্ভ হয় শেষ স্বাধীনতা-সংগ্রাম। বীণ দাস ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল অবধি ছিলেন দক্ষিণ কলিকাতা কংগ্রেসের সম্পাদিকা। তিনি দক্ষিণ কলিকাতা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সভা ডাকলেন হাজরা পার্কে। বে-আইনী সভা।
একটি সহকর্মীকে ব্যাটন দিয়ে প্রহাররত সার্জেন্টের হাত শক্ত করে চেপে ধরতেই পুলিস বীণা দাসকে গ্রেপ্তার করে। এবারে তিনি নিরাপত্তা বন্দী হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে রইলেন প্রায় তিন বছর। জেল থেকে মুক্তি পান তিনি ১৯৪৫ সালে ।
১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন। ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকার কর্মচারীদের ইউনিয়নের তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ঐ ইউনিয়নের কর্মীদের অভিযোগ ও বিক্ষোভ জমা হয়ে ছিল বহুদিনের।
অভিযোগের প্রতিকারের জন্য এক দারুণ প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি ধর্মঘট পরিচালনা করেছিলেন। তার প্রধান দুই সহকর্মী ও সহায়ক ছিলেন তারাদাস ভট্টাচার্য এবং বীরেশ্বর ঘোষ। এছাড়া আরো কতকগুলি ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বীণা।
নোয়াখালির দাঙ্গার পর তিনি সেখানে দাঙ্গাপীডিতদের মধ্যে রিলিফের কাজ করতে চলে যান। গান্ধীজীর নির্দেশ ছিল গ্রামে গ্রামে গিয়ে দু-একটি কর্মী মিলে এক-একটি কেন্দ্র করে বসবেন।
কর্মীদের কর্তব্য ছিল গ্রামের ভয়ার্ত লোকদের মধ্যে সাহস সঞ্চার করা, পুনর্বসতি স্থাপন করা, সাম্প্রদায়িক সদ্ভাব ফিরিয়ে আনা প্রভৃতি। বীণা দাসের উপর ভার ছিল রামগঞ্জ থানার নোয়াখোলা গ্রামে কেন্দ্র করে বসার।[২]
আরো পড়ুন
- শহীদ কমরেড রাবেয়া আখতার বেলী: নকশালবাড়ি আন্দোলনের এক নির্ভীক নারী বিপ্লবী
- শান্তিসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- শোভারানী দত্ত ছিলেন বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা
- সাবিত্রী দেবী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- মায়া ঘোষ ছিলেন বিপ্লবী দলের নেত্রী
- বিমলপ্রতিভা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী
- বনলতা সেন (চক্রবর্তী) ছিলেন অনুশীলন সমিতির নেত্রী
- বনলতা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তরুণ বিপ্লবী
- নির্মলা রায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন বিপ্লবী
- সুষমা রায় ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মী
- ছায়া গুহ ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের বিপ্লবী নেত্রী
- কমলা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বিপ্লবী নেতৃত্ব
- কমলা চট্টোপাধ্যায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী
- ঊষা মুখার্জী ছিলেন অনুশীলন দলের বিপ্লবী
- পারুল মুখার্জী ছিলেন অনুশীলন দলের বিপ্লবী
- উমা সেন ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী নারী বিপ্লবী
- উজ্জ্বলা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবী নারী ও সমাজসেবী
- ইলা সেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শহীদ লুৎফুন নাহার হেলেন: এক অকুতোভয় মাওবাদী বিপ্লবীর জীবন ও মহান আত্মত্যাগ
- সুনীতি চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক
- লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা
- বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা
- ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি
- দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী
- চারুশীলা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী
- ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক
- ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের নারী বিপ্লবী
- ইন্দুমতী সিংহ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের একজন বিপ্লবী নেত্রী
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. দোলন প্রভা, ১২ আগস্ট , ২০১৯, “বীণা দাস ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শবাদী নারী বিপ্লবী”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/bina-das/
২.কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা ১১৯-১২৪ আইএসবিএন 978-81-85459-82-0।
টিকা: এই ঘটনার বিশদ বিবরণ লেখিকার রক্তের অক্ষরে পুঙ্ককে আছে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ফুলকিবাজ এবং রোদ্দুরে ডটকমের সম্পাদক।