উপনিবেশবাদ ও উপন্যাস: সাহিত্যের আড়ালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নৈতিক বর্ম

সাহিত্য পাঠে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও রাজনীতির গভীর বোঝাপড়া কেন অপরিহার্য, তার অনন্য দিশা মেলে এডওয়ার্ড সাঈদের কালজয়ী গ্রন্থ ‘কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম’-এ। সাঈদ এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যে, ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দী থেকে শুরু করে পশ্চিমা কথাসাহিত্যের বিবর্তনে উপনিবেশবাদ ও উপন্যাস একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর মতে, সে সময়ের উপন্যাসের বিকাশে উপনিবেশবাদী আদর্শ কেবল একটি অনুষঙ্গ ছিল না, বরং তা ছিল সাহিত্যের এক প্রধান চালিকাশক্তি।

অন্যদিকে, এই উপনিবেশবাদী আদর্শ নিজেও পশ্চিমা প্রভাবশালী সংস্কৃতির কাছ থেকে একটি ‘স্বাভাবিক মূল্যবোধ’ (normative value) লাভের মাধ্যমে টিকে ছিল এবং পুষ্ট হয়েছিল। সাঈদের মতে, সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিস্তৃতি ছাড়া যেমন পশ্চিমে উপন্যাসের বিকাশ সম্ভব হতো না, তেমনি উপন্যাসের জোরালো নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমর্থন ছাড়া সাম্রাজ্যবাদের এই দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য বজায় রাখাও সম্ভব ছিল না।

‘রবিনসন ক্রুসো’ (১৭১৯) থেকে ‘ম্যানসফিল্ড পার্ক’ (১৮১৪), ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’ (১৮৯৯), ‘কিম’ (১৯০১) কিংবা ‘এ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’ (১৯২৪)—এই প্রতিটি ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম সৃষ্টির পেছনে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সাঈদ জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেবল সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হওয়ার পরেই যে নতুন উদ্যোক্তারা ইংরেজি বা পশ্চিমা সাহিত্যের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে কাজে লাগিয়েছে তা নয়; বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এই সাহিত্যকে তাদের ঔপনিবেশিক প্রকল্পের একটি নিয়ন্ত্রক অস্ত্র হিসেবে সচেতনভাবে ব্যবহার করেছিল।

১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীর প্রায় প্রতিটি প্রধান উপন্যাসে লেখকদের কল্পনায় থাকা দূরবর্তী অঞ্চলগুলোই কাহিনীর প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ‘উপনিবেশবাদ’-এর ধারণার সাথে যুক্ত, যা মূলত সাম্রাজ্যবাদেরই একটি পরিণতি এবং দূরবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলো কেবল সাধারণ ইংরেজদের মনেই সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেনি, বরং এই বাস্তব ভূখণ্ডগুলো সমকালীন লেখকদের কল্পনাশক্তিকেও এক বিশাল ব্যাপ্তি দিয়েছিল।

সাঈদের এই পর্যবেক্ষণ অকাট্য যে, ‘রবিনসন ক্রুসো’ উপন্যাসটি সেই ঔপনিবেশিক লক্ষ্য ছাড়া কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব, যা লেখক ড্যানিয়েল ডিফোকে আফ্রিকা, প্রশান্ত মহাসাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরের দূরবর্তী জনহীন প্রান্তরে নিজের মতো করে এক নতুন পৃথিবী গড়ার সুযোগ দিয়েছিল। একইভাবে, সাঈদের মতে, জেন অস্টেনের ‘ম্যানসফিল্ড পার্ক’ (১৮১৪) উপন্যাসটি বোঝা সম্ভব নয় যদি না এর চরিত্র থমাস বার্ট্রাম এবং বাস্তব জগতের ম্যানসফিল্ড পার্কের অধিপতি হিসেবে ক্যারিবীয় দ্বীপ অ্যান্টিগুয়ার একজন অনুপস্থিত বাগান মালিকের (absentee plantation owner) ভূমিকার কথা বিবেচনা করা হয়। এই উপন্যাসটি মূলত বিদেশের মাটিতে ব্রিটিশ শক্তির বাস্তবতা এবং বার্ট্রাম এস্টেটের অভ্যন্তরীণ জটিলতার মধ্যে এক যোগসূত্র স্থাপন করে।

সাঈদের নিজস্ব উদ্ভাবিত পদ্ধতি ‘কনট্রাপাণ্টাল রিডিং’ (contrapuntal reading) বা প্রতিসারি পাঠের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কনরাডের ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’ উপন্যাসে আফ্রিকান কঙ্গোতে বেলজিয়ামের সাম্রাজ্যবাদী রূপ তুলে ধরা হয়েছে এবং কৌশলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাকে তুলনামূলকভাবে ‘উন্নত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, সমগ্র আধুনিক ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদকে ইংল্যান্ডের প্রাচীন রোমান উপনিবেশের তুলনায় আদর্শগতভাবে অধিকতর শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী হিসেবে ইতিবাচক আলোয় দেখানো হয়েছে। এভাবেই ইংরেজি উপন্যাসের ইতিহাস এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেছে, যা সাঈদের সেই মূল বক্তব্যকে অমোঘভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে—”সাম্রাজ্যবাদ এবং উপন্যাস পরস্পরকে এমন মাত্রায় শক্তিশালী করেছে যে, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে পাঠ করা কার্যত অসম্ভব।”

এই ধরনের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়গুলো আমাদের কেবল উপন্যাস পাঠের ক্ষেত্রেই নয়, বরং ইংরেজি সাহিত্যের অন্যান্য শাখা যেমন নাটক ও কবিতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে আধুনিক সময়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিক মাধ্যম হিসেবে উপন্যাসই সবার আগে আসে এবং এটি একটি বিশাল পাঠকগোষ্ঠীর মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া, উপন্যাসের গঠনগত কাঠামোর কারণেই এটি সমাজের প্রাণবন্ত ও বিস্তারিত চিত্র ধারণ করতে অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় অধিকতর সক্ষম। তাই এডওয়ার্ড সাঈদের দেখানো পথে সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে ক্ষমতার এই সূক্ষ্ম রাজনীতিকে চিনে নেওয়া আমাদের সময়ের অন্যতম প্রধান বৌদ্ধিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।[১]

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লাইব্রেরি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মানচিত্র সম্বলিত থিমেটিক ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরিকৃত।

তথ্যসূত্র

১. Edward W Said, Culture and Imperialism. New York: Vintage Books, 1994. Print,

Leave a Comment