ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী পরিচয় ও জীবনবোধকে তুলে ধরে পত্রসাহিত্য ছিন্নপত্র

ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক জীবনবোধ এবং দার্শনিক ও সাহিত্যিক চিন্তাধারার বহুমুখী পরিচয় (ইংরেজি: The identity of Rabindranath) তাঁর লেখা পত্রসাহিত্য ছিন্নপত্রে ফুটে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য একটি পত্রসাহিত্য হচ্ছে এই ছিন্নপত্র। এই গ্রন্থে আছে জীবন, আছে জীবনের প্রবাহ। সেই জীবনের সামাজিক-নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নাই থাকুক, নাই থাকুক সব শ্রেণির সব পেশার মানুষের জীবন ও তাদের কর্মচাঞ্চল্য; কিন্তু আছে রবীন্দ্রনাথের মনের প্রাণচাঞ্চল্য, আছে বাংলাদেশের প্রকৃতির সংগে তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।

আমরা বুঝতে পারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি শুধুমাত্র ঘটনার ঘনঘটার তথ্য ভারাক্রান্ত নয়, অন্য এক স্বাদু রস তার মধ্যে মিশে থাকে, ঠিক যেমন আত্মচরিত রচনা কালে প্রাত্যহিক ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা করে জীবনের সত্যরূপে ও অনুভবকে তিনি তুলে ধরেন। ছিন্নপত্রাবলী রবীন্দ্রমানসের গভীর জীবনবোধ ও জীবনরসে সমুজ্জ্বল যা বিভিন্ন স্বীকারোক্তির মধ্যে নিহিত আছে। অনন্য সেসব চিঠির একটি চিঠিতে ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন

“তোকে আমি যেসব চিঠি লিখেছি, তাতে আমার মনের সমস্ত বিচিত্র ভাব যে রকম ব্যক্ত হয়েছে এমন আমার আর কোন লেখায় হয়নি।”

ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী পরিচয়

ছিন্নপত্রের বিভিন্ন চিঠির মধ্যে কবি রবীন্দ্রনাথ, অধ্যাত্মবাদী রবীন্দ্রনাথ, দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ, সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথ, মর্ত্যপ্রেমী রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিরসিক রবীন্দ্রনাথ, আধ্যাত্মিক রবীন্দ্রনাথ ও জীবনরসিক রবীন্দ্রনাথের নানা পরিচয় বিচ্ছুরিত। জমিদার রবীন্দ্রনাথ, পাঠক রবীন্দ্রনাথকেও এখানে আবিষ্কার করা যায়। সেই সঙ্গে ঘরোয়া মানুষ রবীন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ ছবির সামগ্রিক সত্তায় প্রকাশিত। এই পত্রাবলী রচনাকালে কবি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বাংলার পল্লীতে পল্লীতে পদ্মার উপর বোটে করে। তাঁর নিজের ভাষায়—

“পথ চলা মানে সেই সকল গ্রাম দৃশ্যের নানা নতুন পরিচয় ক্ষণে ক্ষণে চমক লাগাচ্চিল, তখনই তখনই তাই প্রতিফলিত হচ্ছিল চিঠিতে।”

মানুষের সঙ্গে তার পরিচয়ের সেই মানচিত্র চিঠির ভাষায় রূপচিত্র হয়ে ধরা পড়েছে। এই চিঠিগুলির মধ্যে নানাভাবে অভিব্যক্ত রবীন্দ্রমানসের যে পূর্ণ মূর্তি প্রকাশিত তেমন আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই ছিন্নপত্রাবলীকে রবীন্দ্রভাবনার অনুবিশ্ব বলতে পারি।

আরো পড়ুন:  পূর্ববঙ্গের পদ্মা তীরবর্তী প্রকৃতির চিত্র ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রে

এর একেকটি চিঠিতে কবি মনের এক একটি দিক ধরা পড়েছে। ১৬০ সংখ্যক পত্রে চিঠি সম্পর্কে তার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। এখানেই তিনি লিখেছেন যে কোনও লেখকের সবচেয়ে ভালো লেখা যদি তার চিঠিতেই দেখা দেয় তাহলে বুঝতে হবে যাকে চিঠি লেখা হচ্ছে, তারও আছে চিঠি লেখার আশ্চর্য ক্ষমতা। এজন্যই তাঁর মনে হয় যে শোনে এবং যে বলে এই দু’জনের সহমর্মিতায় শ্রেষ্ঠ চিঠি রচিত হতে পারে।

ছিন্নপত্রের চিঠিগুলি রবীন্দ্রনাথের নির্যাস বলতে পারি। এর অনন্যতা আমাদের কাছে তখনই ধরা পড়ে যায় যখন তিনি জানান যে তাঁর ইচ্ছা করে ইন্দিরা দেবীকে লেখা এই চিঠিগুলি নিরালায় পড়ে জীবনের বহু বিগত মুহূর্তের স্মৃতির মধ্যে ডুব দিত। এ বিষয়েই ২০ সংখ্যক চিঠিতে জানিয়েছেন

“আমার গদ্যে পদ্যে কোথাও আমার সুখদুঃখের দিনরাত্রিগুলি এরকম করে গাঁথা নেই।”

স্বয়ং লেখকের কাছ থেকে এমন অভিজ্ঞানপত্র নিঃসন্দেহে ছিন্নপত্রাবলীর মর্যাদাকে কালাতীত গৌরব দান করেছে। এর বিভিন্ন চিঠিতে নানা রবীন্দ্রনাথকে আমরা খুঁজে পাই। কখনো ঘরোয়া টুকরো ছবি, কখনোবা হৃদয়ের একান্ত অনুভব, আবার কখনো সৌন্দর্য তত্ত্বের অনন্ত রসরূপ, কখনো বা ধর্মের মূল ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একটি চিঠিতে তিনি বলেছেন প্রেম হচ্ছে সমস্ত ধর্মের মূল ভিত্তি। এই বোধ রবীন্দ্রনাথের নানা কাব্যে, প্রবন্ধে বহুবার ধরা পড়েছে। আবার সৌন্দর্যের গভীর তত্ত্ব স্বরূপ নিয়ে আরেকটি চিঠিতে তার ব্যখ্যা করেছেন। সৌন্দর্যের ভিতরকার অনন্য গভীর আধ্যাত্মিক কথা প্রসঙ্গে এসেছে বিহারীলালের ‘সারদামঙ্গল’, শেলীর কবিতার অংশ এবং কীটসের কবিতার উল্লেখ। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : ‘সৌন্দর্য আমার কাছে প্রত্যক্ষ দেবতা’। সৌন্দর্যতত্ত্ব। নিয়ে এমন কথা সাহিত্যতত্ত্বে তিনি আলোচনা করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত চিঠির মধ্যে সৌন্দর্যতত্ত্বের এমন আলোচনা সম্ববত আর কেউ করেন নি।

১২০ নং চিঠিতে দুঃখের স্বরূপ নিয়ে গভীর কথা বলেছেন, বলেছেন গভীরতম দুঃখে হৃদয়ে বিদীর্ণ, ব্যথার ভিতর থেকে একটা সান্তনার উৎস জন্মায়। ছোট দুঃখের কাছে আমরা কাপুরুষ, কিন্তু বড় দুঃখ আমাদের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করে দেয়। এই গভীর জীবন অনুভবের পাশাপাশি অন্তরঙ্গ রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক পরিচয়ের যে ছবি ছিন্নপত্রে আঁকা আছে তার মূল্যও কম নয়।

আরো পড়ুন:  বাংলা ছোটগল্প হচ্ছে বিশ শতকে বাংলা ভাষায় রচিত ও চর্চিত গল্পের ধারা

৪৬ সংখ্যক চিঠিতে তার তিন পুত্রকন্যা খোকা, বেলি ও রানু-র (রথীন্দ্রনাথ, মাধুরীলতা ও রেণুকা) শিশুসুলভ চাপল্যের যে আনন্দ ছবি আঁকা আছে তা পিতা রবীন্দ্রনাথের স্নেহবৎসল হৃদয়ের সূপর্ব প্রকাশ। তার কনিষ্ঠা কন্যা মীরার একেবারে শিশুবেলার যে মধুর ছবি ছিন্নপত্রে আঁকা আছে, অন্য কোথাও তেমন নিবিড়ভাবে তা ধরে পড়েনি।

সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন রচনা যে অঙ্কুরিত অবস্থায় ছিন্নপত্রাবলীতে প্রচ্ছন্ন তা পাঠক মাত্রেই জানেন। ছিন্নপত্রের যুগে লেখা অসামান্য ছোটগল্প, ‘সোনারতরী’র অনবদ্য কবিতা চিঠিগুলির পাতায় আভাসে ধরা আছে। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—

“আমার এ সাজাদপুরের দুপুরবেলা গল্পের দুপুরবেলা।”

আবার ছিন্নপত্রের একটি চিঠির মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে বহুখ্যাত কবিতা ‘যেতে নাহি দিব’ এবং ‘বসুন্ধরা’র বীজ, ‘চিত্রা’ কাব্যের সৌন্দর্য চেতনা বিকশিত। ‘পূর্ণিমা’ কবিতাটির উৎস মনে হয় ছিন্নপত্রাবলীর ২৫০ সংখ্যক চিঠি। অনেক রাত্রিতে পাঠশ্রান্ত কবি শুতে যাবার আগে বাতি নিভিয়ে দেওয়া মাত্র দেখলেন চারিদিকে খোলা জানালা দিয়ে বোটের মধ্যে জ্যোৎস্না বিচ্ছুরিত হয়ে উঠলো। গ্রন্থের মধ্যে সে সুধা তিনি খুঁজেছিলেন বাইরের সমস্ত আকাশ পরিপূর্ণ করে সেই সুয়ার প্লাবন পরিপূর্ণ হচ্ছিল জ্যোৎস্নালোকে। অন্ধকারের অন্তর থেকে উৎসারিত এই সৌন্দর্য তার অনুভবকে আচ্ছন্ন করেছে, প্রেরণা দিয়েছে সৌন্দর্যতত্ত্ব বিষয়ক অনন্য কবিতা রচনায়। ছিন্নপত্রের চিঠির মধ্যে যেন সেই জ্যোস্নালোকের অনুভূতি ও মহিমা ধরা পড়েছে। কবি মনের সমস্ত বিচিত্রভাব এই চিঠিগুলিতে যেমনভাবে ব্যক্ত হয়েছে আর কোথাও সামগ্রিকভাবে তা হয়নি।

এই পত্রাবলীতে পাঠক রবীন্দ্রনাথ এক অন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। এখানেই কালিদাসের প্রতি তার অসামান্য অনুরাগ প্রকাশিত। বিভিন্ন চিঠিপত্রে বিভিন্ন সময়ে মেঘদূতের প্রসঙ্গ ফিরে এসেছে। তার সমগ্র জীবনব্যাপী কালিদাস মুগ্ধতা ছিন্নপত্রে সূত্রাকারে প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া নানা বিদেশী গ্রন্থের উল্লেখ রবীন্দ্র-অধ্যয়নের বিশাল ক্ষেত্রকে ছিন্নপত্রে তুলে ধরেছে। তার মনের কাছাকাছি একটি বই-এর একাধিকবার উল্লেখ আমরা লক্ষ্য করেছি। বইটির নাম—“অ্যামিয়েলস জার্নাল’। পরবর্তীকালে দেখা গেছে এই বইটি নানাভাবে রবীন্দ্রমননে প্রভাব রেখে গেছে।

আরো পড়ুন:  ছড়া হচ্ছে বিশেষ ধরনের ছন্দের ক্ষুদ্রাকার কবিতা বা পদ্য

অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের ঈষৎ অনালোকিত আরেকটি পরিচয় বা সত্তা ছিন্নপত্রাবলীতে বারবার ছায়া ফেলেছে। সেই পরিচয় জমিদার রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিপরিচয়, যার সূত্রে শিলাইদহে তার আগমন ঘটেছিল। পরিচিত জমিদারের প্রথাগত মূর্তি’র পরিবর্তে প্রজারঞ্জক দরদী রবীন্দ্রনাথ বারবার আমাদের চোখে ধরা দিয়েছেন। এরই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা বা সমবায় নীতির প্রচার সম্ভব হয়েছিল। তার দরদী মনের স্পষ্ট ছবি ধরা পড়েছে। কয়েকটি চিঠিতে যেখানে দরিদ্র চাষী প্রজাদের দেখে তাঁর নিষ্ঠুর বিধানের কথা মনে হয়েছে। তাদের প্রতি তার মমতার প্রকাশ নানাভাবেই দেখা গেছে। দরিদ্র খানসামার শিশুকন্যার মৃত্যুতে রবীন্দ্রমানসে বেদনার্ত প্রকাশ ছিন্নপত্রের চিঠিতে ধরা পড়েছে।

রবীন্দ্রনাথের বহু কৌণিক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য তার নানা রচনায় ধরা পড়েছে। কিন্তু ছিন্নপত্রাবলীতে তা যেন পূর্ণ স্বরূপে এবং অখণ্ডভাবে ধরা রয়েছে। সমগ্র রবীন্দ্র জীবন ও মননের নির্যাস রূপে এই ছিন্নপত্রাবলীকে গ্রহণ করা হয়। আর তখনই চিঠি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব বক্তব্যের আলোতে ছিন্নপত্রাবলীর মূল্য অমূল্য হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

“পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, কিন্তু সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়।” 

বাংলা সাহিত্যের বিগত, সমাগত ও অনাগত সমস্ত পাঠকের কাছে ছিন্নপত্রাবলী সেই মহামূল্য উপহার যার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের সেইসব পরিচয় যা আমাদেরকে একজন দার্শনিকের জগতকে তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র

১. মীনাক্ষী সিংহ, বাংলা, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রয়োদশতম পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি ২০২০, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৮-১০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!