লোকায়ত সাময়িকপত্রের চার্লস ডারউইন সংখ্যা বিবর্তন বিশ্লেষণ করেছে

লোকায়ত সাময়িকপত্রের চার্লস ডারউইন সংখ্যা (বর্ষ ২৬, সংখ্যা ৩, সেপ্টেম্বর ২০০৯) মানুষের চোখের উপরে বিরাজিত মিথ্যার ছানিকে সরিয়ে দেয়। ডারউইনের জীবন সত্যের বেদিতে সমর্পিত সেই জীবন যা কোটি কোটি মানুষকে দেখায় সত্যের স্বরূপ। হাজার বছরের সৃষ্টিবাদকে ভুল প্রমাণিত করে ডারউইন যে জগত আমাদের সামনে মেলে ধরেন তা পুরোনো জগত ভেঙেচুরে গড়ে দেয় নতুন পৃথিবী, যে পৃথিবীতে পুরোনো সবকিছুকেই টিকে আকতে হয় বিবর্তনের চিরাচরিত নিয়মানুসারে।

১৮৫৯ সালে প্রকাশিত ‘প্রজাতির উৎপত্তি’র পরের বছরগুলোর পৃথিবী যেন এক নতুন পৃথিবী। ১৮৫৯ সালের পরের মানুষ দেখেছে নতুন জীববিজ্ঞান, নীতিবিদ্যা, অর্থনীতি, ইতিহাস। পাল্টে গেছে ধর্মের রূপ। বস্তুজগতের ব্যাখ্যা পাল্টে যাওয়ায় বদলে গেছে মানবমন ও তার পরিবেশ। আমিনুল ইসলামের লেখা প্রবন্ধ ‘চার্লস ডারউইন ও বিবর্তনবাদ’ সেই ইতিহাসের পরিচায়ক।

লোকায়ত সাময়িকপত্রের চার্লস ডারউইন সংখ্যায় মুসা আনসারী লিখেছেন ‘ডারউইনবাদের ঐতিহাসিক পটভূমি’। লেখক আলোচনা করেছেন যে প্রেক্ষাপটে বিবর্তনবাদের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছিল তার কার্য-কারণ ও প্রকৃতি। যে রেনেসাঁস মানুষকে বিপুলভাবে আলোড়িত করে তারই ধারাবাহিকতায় পুনর্জাগরণ ও আলোকায়নের কালে গড়ে ওঠে যুক্তি-বিজ্ঞান-দর্শনের শক্ত ভিত্তি। সেই ভিত্তির ভূমিতে বিবর্তনবাদের বিজয় ছিল ইউরোপীয় জীবনব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক চিন্তাপদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার বিজয়। সেই সময়ের বুর্জোয়া ভাববাদবিরোধী লেখকগণ মনে করতেন ডারউইনবাদ, মূলত সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের পদার্থ ও রসায়নবিদ্যার বিকাশক্রমের একটি পরিণতি। অর্থাৎ রেনেসাঁ পরবর্তী সংগ্রামী বস্তুবাদের তীব্র ভাববাদবিরোধিতা জীববিজ্ঞানের প্রভূত অগ্রগতি ঘটায় বিবর্তনবাদ।

ভুতত্ত্ব সম্পর্কিত গবেষণা আঠারো শতকের আগেই শুরু হয় এবং পুরো অষ্টাদশ শতক জুড়ে বুর্জোয়া বিকাশের হাতিয়ার রূপে বিরাজ করে যা আমরা উনিশ ও বিশ শতকে খনিজসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে দেখি । কিন্তু শুরুর দিনগুলোতে পৃথিবী সম্পর্কিত ভুল ধারণাগুলো দৃঢ় করতে পৃথিবীর গঠনের সাথে জড়িয়ে জৈববির্তনবাদ এগিয়ে আসে।

আরো পড়ুন:  অভিবাসন-এর মাধ্যমে মানিক সমাজের অর্থনীতিকে তুলে ধরেছেন

ডারউইনযুগে ইংল্যান্ডে ছিল পুঁজিবাদ বিকাশের যুগ। ১৮৩২ সালে সেখানে বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতাসীন হয় যা ১৯০০ সালের ভেতরেই একচেটিয়া পুঁজি ও লগ্নি পুঁজিতে রূপান্তর ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পথে এগোতে থাকে। প্রকাশ হয়ে পড়ে বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থপরতা, লোভ ও সম্পদগ্রাস। ১৮৯৩ সালেই যোগ্যতমের টিকে থাকা ও প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে টমাস হাক্সসলি অকপটে স্বীকার করেন ‘মনুষ্যজীবনে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রয়োগ করা চলে না;… অস্তিত্বের সংগ্রামে যা কিছু টিকে থাকবে তাই উপযুক্ত এবং উত্তম এমন নাও হতে পারে। তিনি জীবন সায়াহ্নে এসে ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদবিরোধি হয়ে পড়েন।

ডারউইনের চিন্তাধারা সমসাময়িক সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তনের উপর যে প্রভাব বিস্তার কবে তা থেকেই গড়ে ওঠে সামাজিক ডারউইনবাদ নামের নতুন তত্ত্ব যা পুঁজিবাদের বিকাশকালে হয়ে দাঁড়ায় বুর্জোয়াদের জীবনদর্শন। টমাস হবসের জবানিতে মানুষকে সর্বনিকৃষ্ট জীব বলে বুর্জোয়ারা একদা ঘোষণা করেছিল এবং যোগ্যতমের টিকে থাকার তত্ত্ব সেই পালে আরো বাতাস দিয়েছিল কিন্তু পঞ্চাশ বছর যেতে না যেতেই মানুষের চোখে ধরা পড়ল প্রাণীজগত ও মানবসমাজের মধ্যে পার্থক্যও আছে। মানুষ শুধু তার অস্তিত্বের জন্যই সংগ্রাম করে না, সে সৃজন করে এবং বদলে দেয় মানবের উৎপাদন পদ্ধতি ও উৎপাদন সম্পর্ক। তাই বস্তুবাদী ডারউইন প্রকৃতি বিজ্ঞানকে এগিয়ে দেন অনেকখানি এবং মুসা আনসারীর প্রবন্ধটি পাঠককে পথ বাতলে দেয় কোন পথে যেতে হবে; জানান দেয় ডারউইন কেন আমাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

নীতি সম্বন্ধে ডারউইনের যুক্তি এমন একটি নিবন্ধ যেখানে লেখক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বোঝানোর চেষ্টা করেছেন ডারউইনের নীতি সম্পর্কে টনটনে জ্ঞান ছিল। ডারউইন বিশ্বাস করতেন নৈতিক শক্তি সর্বাপেক্ষা কল্যাণকর। গান্ধি সেই প্রবন্ধে বলেছেন স্বার্থপর মানুষ পশুর সমান আর নীতিবান মানুষ সমস্ত মানবজাতির পরমাত্মীয়। শেষ পর্যন্ত নীতির উপরই মানুষের অস্তিত্ব নির্ভর করে। এই প্রবন্ধটিতে যত না আছে ডারউইনের যুক্তি তার চেয়ে বরং অনেক বেশি আছে নীতি স্বম্বন্ধে গান্ধির নিজস্ব চিন্তা।

আরো পড়ুন:  নয়া ঐতিহাসিকতাবাদ সাহিত্যের ইতিহাসমনস্ক বিচারের একটি ধারা

চার্লস ডারউইনের The Descent of Man গ্রন্থটি মানুষের উৎপত্তি নিয়ে লিখিত। এই বইয়ের একটি অংশ ‘স্ত্রী ও পুরুষ: যৌথ নির্বাচন’ এখানে অসীম চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রবন্ধে নারী-পুরুষের মিল-অমিল যেমন তুলে ধরা হয়েছে তেমনি অন্যান্য বানরসদৃশ প্রাইমেটদের নারী-পুরুষের সাথে মানবের সম্পর্ক আলোচনা করা হয়েছে। স্ত্রী-পুরুষের মানসিক শক্তির পার্থক্য, কণ্টস্বরের পার্থক্য আলোচনা করা হয়েছে। প্রবন্ধের মূল অংশটি রয়েছে ‘বিবাহের ক্ষেত্রে সৌন্দর্যের ভূমিকা’ অংশ যেখানে সারা পৃথিবীর নর-নারীরা বিবাহ ও যৌনসম্পর্কে সৌন্দর্যের তাৎপর্যকে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া লোকায়ত সাময়িকপত্রের এসংখ্যাটিতে চালর্স ডারউইনের একটি সংক্ষিপ্ত রচনাপঞ্জি লিখে সংখ্যাটিকে সমৃদ্ধ করেছেন আখতারুজ্জামান। এরকম একটি ডারউইন বিষয়ক সংখ্যা প্রকাশ করে প্রধান সম্পাদক আবুল কাসেম ফজলুল হক আমাদেরকে কৃতজ্ঞপাশে আবদ্ধ করেছেন এবং আমরা আশা করব এখানে নৈতিকতা ও সামাজিক বিবর্তনের আলোচনায় যে অপূর্ণাঙ্গতা থেকেছে তা ভবিষ্যতে পূর্ণ করার জন্য নৈতিকতা ও সামাজিক বিবর্তন বিষয়ক লোকায়ত পত্রিকার আলাদা দুটি সংখ্যা প্রকাশ করলে পাঠকসহ সকলেই উপকৃত হবেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: গবেষক অনুপ সাদির এই পত্রিকা আলোচনাটি প্রধান সম্পাদক আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং সম্পাদক মিজান রহমান কর্তৃক ছোটকাগজ লোকায়ত-এর বর্ষ ২৯ সংখ্যা ১, সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃষ্ঠা ১১৫-১১৭ হতে সংগৃহীত এবং ফুলকিবাজ ডট কম ঈষৎ পরিবর্তিত আকারে পুনঃপ্রকাশিত।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page