শুক-শারী সংবাদ হচ্ছে গোবিন্দ অধিকারী রচিত লোকসংগীত ও বৈষ্ণব পদাবলির গান

শুক-শারী সংবাদ গোবিন্দ অধিকারী রচিত বাংলা লোকসংগীত এবং বৈষ্ণব পদাবলির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ গান। এই গানটি মূলত শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকার প্রেমলীলার এক চমৎকার রূপক বিতর্ক।[১]

গানের মূল বিষয়বস্তু হলো দুই পাখি—শুক (পুরুষ পাখি) এবং শারী (স্ত্রী পাখি)-র মধ্যকার কথোপকথন। শুক পাখি যখন শ্রীকৃষ্ণের মহিমা ও রূপের গুণগান গায়, শারী পাখি তখন রাধিকার শ্রেষ্ঠত্ব এবং ত্যাগের কথা তুলে ধরে পাল্টা যুক্তি দেয়। এই বাদানুবাদের মধ্য দিয়ে মূলত রাধা-কৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য প্রেম এবং একে অপরের পরিপূরক হওয়ার বিষয়টি ফুটে ওঠে।

শুক-শারী সংবাদ গানটির বৈশিষ্ট্য

গানটির একটি বিশেষ দিক হচ্ছে এটির রূপক ও আধ্যাত্মিকতা। এখানে শুক ও শারী কেবল দুটি পাখি নয়, বরং তারা ভক্ত হৃদয়ের দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক। গানটি খুব জনপ্রিয়তা। চলচ্চিত্র, যাত্রা এবং লোকসংগীতের আসরে এই গানটি যুগ যুগ ধরে সমাদৃত। বিশেষ করে গ্রামবাংলার বাউল ও কীর্তনীয়াদের কণ্ঠে এর আবেদন চিরন্তন। সহজ কথায়, শুক-শারী সংবাদ কেবল একটি গান নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অমূল্য আধ্যাত্মিক সম্পদ যা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমতত্ত্বকে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে প্রকাশ করে।

গোবিন্দ অধিকারী রচিত শুক-শারী সংবাদ গানের কথা

বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের।
রাই আমাদের রাই আমাদের
আমরা রাইয়ের রাই আমাদের।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণ মদনমোহন।
শারী বলে আমার রাধা বামে যতক্ষণ;
নৈলে শুধুই মদন।
শুক বলে আমার কৃষ্ণ গিরি ধরেছিল।
শারী বলে আমার রাধা শক্তি সঞ্চারিল;
নৈলে পারিবে কেন?
শুক বলে আমার কৃষ্ণের মাথায় ময়ুর পাখা।
শারী বলে আমার রাধার নামটি তাতে লিখা;
ঐ যে যায় গো দেখা।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণের চুড়া বামে হেলে।
শারী বলে আমার রাধার চরণ পাবে বলে;
চূড়া তাইতে হেলে।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণের বাঁশী করে গান।
শারী বলে সত্য বটে, বলে রাধার নাম;
নৈলে মিছে সে গান।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণ জগতের গুরু।
শারি বলে আমার রাঁধা বাঞ্ছাকল্পতরু;
নৈলে কে কার গুরু।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণ জগতের কালো।
শারী বলে আমার রাধার রূপে জগত আলো;
নৈলে আঁধার কালো।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণের শ্রীরাধিকা দাসী।
শারী বলে সত্য বটে সাক্ষী আছে বাঁশী;
নৈলে হ’ত কাশীবাসী।।
শুক বলে আমার কৃষ্ণ জগতের প্রাণ।
শারী বলে আমার রাধা জীবন করে দান;
থাকে কি আপন প্রাণ?
শুক শারী দুজনার দ্বন্দ্ব ঘুচে গেল
রাধা কৃষ্ণের প্রীতে একবার হরি হরি বল।
(বলে বৃন্দাবনে চলো)।।[২]

লোপামুদ্রা মিত্রের গাওয়া গানের কথা

বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। (২)
রাই আমাদের রাই আমাদের, আমরা রাইয়ের
শ্যাম তোমাদের, রাই আমাদের। (২)
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। (২)
শুক বলে আমার কৃষ্ণ মদনমোহন।
আহা শুক বলে আমার কৃষ্ণ মদনমোহন।
আর শারী বলে, (২)
আমার রাধা বামে যতক্ষণ নইলে শুধুই মদন।
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। (২)
শুক বলে আমার কৃষ্ণের চূড়া বামে হেলে।
আহা শুক বলে আমার কৃষ্ণের চূড়া বামে হেলে।
আর শারী বলে,
আমার রাধার চরণ পাবে বলে, চূড়া তাইতে হেলে।
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। (২)
শুক বলে আমার কৃষ্ণের মাথায় শিখির পাখা।
আহা শুক বলে আমার কৃষ্ণের মাথায় শিখির পাখা।
আর শারী বলে, (২)
আমার রাধার নামটি তাতে লেখা, সে যে যায় না দেখা।
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। (২)
শুক শারী দুজনার দ্বন্দ্ব ঘুচে গেল।
আহা শুক সারী দুজনার দ্বন্দ্ব ঘুচে গেল।
রাধা কৃষ্ণের নামে এবার হরি হরি বলো,
বৃন্দাবনে চলো।
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। (২)
রাই আমাদের রাই আমাদের, আমরা রাইয়ের
শ্যাম তোমাদের, রাই আমাদের। (২)
বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের (৪)[৩]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

১৯৬৭ সালের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘অনন্ত প্রেম’-এ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের কাছে একে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

আরো পড়ুন

গানটি ইউটিউবে শুনুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. অনুপ সাদি, ১৫ নভেম্বর ২০১৭; রোদ্দুরে.কম, “শুক-শারী সংবাদ — গোবিন্দ অধিকারী”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/art/music/shuk-sari-sanbad/
২. কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, বাঙ্গালীর গান, আবদুল হক সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রকাশকাল ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৭১-৭২। উল্লেখ্য কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর ‘বাঙ্গালীর গান’ প্রবন্ধে যে কথাগুলো দিয়েছেন তা এখানে দেয়া হলো। অবশ্য সেখানে গানটির অংশবিশেষ কাজী মোতাহার হোসেন উল্লেখ করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে গানটি অনেক বড় ছিলো। কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এই কীর্তনটি ১৯৫২ সালে রেকর্ড করেন।
৩. লোপামুদ্রা মিত্রের গাওয়া এই গানটির কথাগুলো কিছুটা আলাদা। এখানে নিচে লোপামুদ্রা মিত্রের গাওয়া কথাগুলো দেয়া হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!