ব্যারন ডি’ হলবাক: ফরাসি আলোকায়ন ও আধুনিক বস্তুবাদী দর্শনের অগ্রপথিক

পল থিরি, ব্যারন ডি’হলবাক (১৭২৩–১৭৮৯) ছিলেন ফরাসি আলোকায়ন বা এনলাইটেনমেন্ট যুগের একজন অগ্রগণ্য ফরাসি-জার্মান দার্শনিক, বিশ্বকোষ প্রণেতা এবং প্রাবন্ধিক। ফরাসি বিপ্লব-পূর্ববর্তী সময়ের বস্তুবাদী (Materialist) দর্শনের বিকাশে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে ‘এনসাইক্লোপ্যাডিস্ট’ বা বিশ্বকোষকারক হিসেবে পরিচিত জ্ঞানালোকিত গোষ্ঠীটির অন্যতম প্রধান সংগঠক ও চালিকাশক্তি হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয়।

জন্মসূত্রে জার্মানির রাইন অঞ্চলের প্যালাটিনেটের অধিবাসী হলেও তাঁর কর্মজীবন ও গবেষণার প্রধান কেন্দ্র ছিল প্যারিস। সেখানে তাঁর পরিচালিত বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা বা ‘সেলুন’ তৎকালীন মুক্তচিন্তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। হলবাক বিশেষত জার্মান বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তাধারা ফ্রান্সে প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে দর্শনের ইতিহাসে তিনি তাঁর কট্টর নাস্তিক্যবাদ এবং ধর্মতাত্ত্বিক গোঁড়ামিবিরোধী লেখনীর জন্য সর্বাধিক স্মরণীয়। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘দ্য সিস্টেম অফ নেচার’ (১৭৭০) এবং ‘দ্য ইউনিভার্সাল মরালিটি’ (১৭৭৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা আধুনিক বস্তুবাদী চিন্তার বিকাশে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।[১]

জন্ম ও জীবনকাল সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র

ব্যারন ডি’ হলবাকের জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন মত লক্ষ্য করা যায়। তাঁর সুনির্দিষ্ট জন্মতারিখটি ইতিহাসের দলিলে সংরক্ষিত নেই; তবে সমকালীন গির্জার নথিপত্র অনুযায়ী জানা যায় যে, ১৭২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর তাঁর ‘বাপ্তিসম’ (Baptism) সম্পন্ন হয়েছিল। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই অধিকাংশ গবেষক ও জীবনীকার তাঁর জন্মকাল নির্ধারণ করে থাকেন। তথ্যের এই অস্পষ্টতা আলোকায়ন যুগের অনেক দার্শনিক ও মনীষীর ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়, যা মূলত তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে।

ডি’হলবাখের সেলুন

আনুমানিক ১৭৫০ থেকে ১৭৯০ কালপরিধিতে ব্যারন ডি’ হলবাক তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ও আভিজাত্যকে কাজে লাগিয়ে প্যারিসে ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ‘সেলুন’ পরিচালনা করেন। রু রয়্যালে অবস্থিত তাঁর এই আবাসটি দ্রুতই ‘এনসাইক্লোপিডি’ (Encyclopédie) প্রকল্পের লেখকদের প্রধান মিলনস্থলে পরিণত হয়। প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার নিয়মিতভাবে আয়োজিত এই সভায় সমকালীন ইউরোপের শ্রেষ্ঠ ধীমান ব্যক্তিরা একত্রিত হতেন। হলবাকের সেলুনটি তার আলোচনার গভীরতা ও ব্যাপ্তির জন্য সমধিক পরিচিত ছিল, যা সমসাময়িক অন্যান্য সেলুনের তুলনায় অনেক বেশি আমূল সংস্কারবাদী ও মুক্তচিন্তার পরিবাহক হিসেবে গণ্য হতো। উন্নত আতিথেয়তা এবং প্রায় তিন হাজার গ্রন্থের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এই জ্ঞানচর্চাকে আরও উৎসাহিত করত।

তৎকালীন সময়ে এই অবিচ্ছেদ্য গোষ্ঠীটি ‘কোটেরি হলবাকিক’ (Coterie Holbachique) নামে পরিচিতি পায়। এই সার্কেলের নিয়মিত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ডেনিস দিদেরো, জঁ লিঁদ রোঁ দ’আলামবেয়ার, কন্ডোরসে, হেলভেটিয়াস এবং বিশেষ কিছু সময়কাল পর্যন্ত জাঁ জ্যাক রুশো। এছাড়াও ব্রিটিশ বুদ্ধিজীবী অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড হিউম, এডওয়ার্ড গিবন এবং আমেরিকার বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দার্শনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই সেলুনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। মূলত এই সেলুনটিই ছিল আলোকায়ন যুগের (Age of Enlightenment) প্রধান প্রধান রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বসমূহের সূতিকাগার।

‘এনসাইক্লোপেডি’-তে অবদান ও বুদ্ধিবৃত্তিক মধ্যস্থতা

ফরাসি বিশ্বকোষ বা ‘এনসাইক্লোপেডি’ (Encyclopédie) প্রকল্পে ব্যারন ডি’ হলবাকের অবদান ছিল বহুমুখী এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী। ১৭৫১ থেকে ১৭৬৫ সালের মধ্যে তিনি রাজনীতি, ধর্ম, রসায়ন এবং খনিজবিদ্যার মতো বৈচিত্র্যময় বিষয়ে প্রায় চার শতাধিক প্রবন্ধ রচনা করেন। জন্মসূত্রে জার্মান এবং পরবর্তীতে ফরাসি নাগরিকত্ব গ্রহণকারী হলবাক সমকালীন জার্মান ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ (Natural Philosophy) সংক্রান্ত আকর গ্রন্থগুলো ফরাসি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে দুই সংস্কৃতির বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেন। তাঁর অবদানের একটি বড় অংশ ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক, যেখানে তিনি প্রাকৃতিক দর্শনের ওপর বেশ কিছু খণ্ডের সম্পাদনাও করেন। তবে বিজ্ঞানের সমান্তরালে তাঁর লেখায় একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমালোচনার সুর বিদ্যমান ছিল। ধারণা করা হয়, তিনি অ-খ্রিস্টান ধর্মগুলোর ওপর বেশ কিছু বিদ্রূপাত্মক ও নেতিবাচক নিবন্ধ রচনা করেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল পরোক্ষভাবে তৎকালীন খ্রিস্টধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও গোঁড়ামিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

ধর্মীয় সমালোচনা ও কট্টর নাস্তিক্যবাদ

‘এনসাইক্লোপেডি’-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও, সমকালীন দর্শনের ইতিহাসে ব্যারন ডি’ হলবাক তাঁর আমূল সংস্কারবাদী ও ধর্মবিরোধী রচনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তৎকালীন ফ্রান্সের কঠোর সেন্সরশিপ এড়াতে তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই বেনামে বা ছদ্মনামে আমস্টারডাম থেকে মার্ক-মিশেল রে-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হতো। তাঁর এই চিন্তাধারাকে আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে ‘ফরাসি বস্তুবাদ’ (French Materialism) আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৭৬১ সালে প্রকাশিত তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ক্রিশ্চিয়ানিজম দেভোইলে’ (খ্রিস্টধর্মের উন্মোচন)-এ তিনি দাবি করেন যে, খ্রিস্টধর্মসহ সকল সংগঠিত ধর্মই মানবজাতির নৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়।

মজার বিষয় হলো, প্রখ্যাত ঈশ্বরবাদী (Deist) দার্শনিক ভলতেয়ারও হলবাকের এই চরমপন্থী নাস্তিক্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। ভলতেয়ার স্পষ্টভাবেই এই রচনার সাথে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন এবং জানান যে, এমন নাস্তিক্যবাদী দর্শন তাঁর নিজস্ব আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই ধারাবাহিকতায় হলবাক আরও কিছু প্রভাবশালী গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে ‘লা কন্তাজিওঁ সাক্রে’‘থিওলজি পোর্তাতিভ’ এবং ‘এসাই সুর লে প্রেজুজে’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে তাঁর প্রধান সহযোগী ছিলেন জ্যাক-আন্দ্রে নাইজোঁ, যাকে পরবর্তীতে হলবাকের সাহিত্যিক উত্তরসূরি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

‘দ্য সিস্টেম অফ নেচার’: বস্তুবাদী দর্শনের ইশতেহার

১৭৭০ সালে ব্যারন ডি’ হলবাক তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ এবং আধুনিক নাস্তিক্যবাদের অন্যতম প্রধান আকর গ্রন্থ ‘দ্য সিস্টেম অফ নেচার’ (Le Système de la nature) প্রকাশ করেন। ফরাসি রাজকীয় অ্যাকাডেমির প্রয়াত সচিব জঁ-বাপতিস্ত দ্য মিরাবোর ছদ্মনামে প্রকাশিত এই গ্রন্থে তিনি প্রচলিত সকল অধিবিদ্যক (Metaphysical) ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। হলবাক এতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং সকল প্রকার অতিপ্রাকৃত পূর্বানুমানকে তথ্যপ্রমাণের অভাবে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, মহাবিশ্ব মূলত এক অখণ্ড গতিশীল বস্তু (Matter in motion), যা কার্যকারণ সম্পর্কের (Causality) অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত। তিনি যুক্তি দেন যে, বস্তুর গঠন ও জগতের বিবর্তন ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রয়োজন নেই; বরং প্রকৃতি নিজেই নিজের ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট। এই গ্রন্থটি তৎকালীন ইউরোপীয় চিন্তাধারায় এতটাই বৈপ্লবিক ছিল যে, একে অনেক সময় ‘নাস্তিকদের বাইবেল’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

ব্যারন ডি হলবাকের এই যুগান্তকারী গ্রন্থটির বৈপ্লবিক চিন্তাধারার কারণে ১৭৭০ সালে প্যারিস পার্লামেন্টের নির্দেশে তা ভস্মীভূত করা হয়। হলবাকের দার্শনিক অবস্থান ছিল আপসহীনভাবে বস্তুবাদী; তিনি প্রচলিত ধর্মতত্ত্ব ও ভাববাদী দর্শনের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ধর্মের মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, অজানার প্রতি ভয় এবং একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সুচতুর প্রতারণা।

বস্তুবাদী দর্শন: ভাববাদ বিরোধিতা ও যান্ত্রিক নিয়তিবাদ

হলবাক বিশেষত বিশপ বার্কলের ভাববাদী তত্ত্বকে মানুষের কাণ্ডজ্ঞানবিরোধী এবং বাস্তববিবর্জিত এক কল্পনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি হলো—বস্তুর বাইরে কোনো অস্তিত্ব নেই। বস্তু যখন আমাদের ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করে, তখনই অনুভূতির সৃষ্টি হয়। তিনি বস্তুর মূল উপাদান হিসেবে ‘অবিভাজ্য অণু’র ধারণা প্রদান করেন এবং মনে করেন বস্তুর গতি সম্পূর্ণ যান্ত্রিক। হলবাকের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ প্রকৃতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং প্রাকৃতিক নিয়মের কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ। মানুষের ওপর এই প্রাকৃতিক বিধানের প্রভাবকে তিনি এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে, তাঁর তত্ত্বে মানুষকে অনেক সময় পরম ‘নিয়তিবাদ’ বা মেকানিক্যাল ডিটারমিনিজমের (Mechanical Determinism) এক অসহায় অনুগামী হিসেবে প্রতীয়মান হয়।[২]

‘দ্য সিস্টেম অফ নেচার’: একটি সামগ্রিক প্রকৃতিবাদী ভাষ্য

‘দ্য সিস্টেম অফ নেচার’ কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং এটি জগতের এক পূর্ণাঙ্গ ও সুসংগত প্রকৃতিবাদী (Naturalistic) দৃষ্টিভঙ্গির তাত্ত্বিক রূপরেখা। তবে এই মহৎ কর্মে ব্যারন ডি’ হলবাকের একক কৃতিত্ব নিয়ে গবেষকদের মধ্যে কৌতূহলোদ্দীপক বিতর্ক রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ডেনিস দিদেরোর প্রভাব এই গ্রন্থে কতটা গভীর ছিল, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট সংশয় বিদ্যমান। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, দিদেরো কেবল একজন পরামর্শক ছিলেন না, বরং গ্রন্থের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের সরাসরি রচয়িতাও ছিলেন তিনি। তবে রচনার নেপথ্যে দিদেরোর অবদান যাই হোক না কেন, এই গ্রন্থটিকেই আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে ‘ফরাসি বস্তুবাদ ও নাস্তিক্যবাদের চূড়ান্ত পরিণতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি সমকালীন ইউরোপীয় চিন্তাধারার সকল প্রথাগত আধ্যাত্মিকতাকে বর্জন করে বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্ববীক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

নৈতিক দর্শন ও আলোকিত আত্মস্বার্থ (Enlightened Self-interest):

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার নেপথ্যে ডি’ হলবাকের মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত নৈতিক ও সামাজিক সংস্কার। তিনি খ্রিস্টীয় চার্চের প্রচলিত অনুশাসনগুলোকে মানবজাতির নৈতিক ও বৌদ্ধিক অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর দর্শনে নৈতিকতার উৎস কোনো অলৌকিক ধর্মগ্রন্থ বা প্রাতিষ্ঠানিক যাজকতন্ত্র নয়, বরং মানুষের জাগতিক ‘সুখ’ (Happiness)। তিনি যুক্তি দেন যে, নৈতিকতা ও সুখ অবিচ্ছেদ্য; যদি কোনো ব্যক্তি সৎ হয়ে সুখী হতে না পারে, তবে তাকে জোরপূর্বক নীতিবান করার চেষ্টা নিরর্থক ও অন্যায্য। হলবাকের মতে, যতক্ষণ পাপ বা অনৈতিক কাজ মানুষের সুখের কারণ হয়, ততক্ষণ তাকে বর্জন করা অসম্ভব। তবে তিনি স্বার্থপরতাকে সমর্থন করেননি; বরং ‘আলোকিত আত্মস্বার্থ’ (Enlightened Self-interest)-এর ধারণা প্রবর্তন করেন। তাঁর মতে, মানুষের প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে সমাজ ও ব্যষ্টির সম্মিলিত কল্যাণের মধ্যে। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ ‘সিস্টেম অফ নেচার’-এর প্রথম খণ্ডের ১৫তম অধ্যায়ে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সদ্গুণ বা নৈতিকতা ব্যতীত মানুষের পক্ষে প্রকৃত সুখী হওয়া সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজতত্ত্ব: ধর্মের ঊর্ধ্বে সামাজিক সংস্কার

ব্যারন ডি’ হলবাকের পরবর্তী কর্মজীবনে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ ‘ধর্মীয় অধিবিদ্যা’ (Religious Metaphysics) থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের দিকে ধাবিত হয়। তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী গ্রন্থ—‘সিস্টেম সোশ্যাল’ (১৭৭৩), ‘পলিটিক ন্যাচারেল’ (১৭৭৩-১৭৭৪) এবং ‘মোরাল ইউনিভার্সেল’ (১৭৭৬)—প্রথাগত খ্রিস্টীয় নৈতিকতার বিকল্প হিসেবে একটি বৈজ্ঞানিক ও সেক্যুলার নৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। যদিও এই রচনাগুলো তাঁর পূর্ববর্তী কাজগুলোর মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা বা প্রভাব অর্জন করতে পারেনি, তবে এগুলো তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে।

হলবাক ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বৈরাচারের কঠোর সমালোচক ছিলেন; তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল তুলনামূলক রক্ষণশীল ও সংস্কারবাদী। তৎকালীন ক্রমবর্ধমান বৈপ্লবিক চেতনার বিপরীতে, তিনি আমূল বিপ্লব, সরাসরি গণতন্ত্র বা গণ-অভ্যুত্থানের (Mob Rule) পরিবর্তে শিক্ষিত ও আলোকিত অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক ও নৈতিক বিশ্ববীক্ষায় ব্রিটিশ বস্তুবাদী দার্শনিক টমাস হবসের (Thomas Hobbes) গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য যে, হলবাক নিজেই হবসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডি হোমিন’ (De Homine) ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, যা তাঁর দর্শনে হবসীয় বস্তুবাদ ও সামাজিক শৃঙ্খলার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।

জীবনাবসান ও অন্তিম শয়ান

ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে, ১৭৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি ব্যারন ডি’ হলবাক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে প্যারিসের ঐতিহাসিক সাঁ-রোক (Saint-Roch) প্যারিশ গির্জার মূল বেদীর নিচে অবস্থিত পারিবারিক সমাধিকক্ষে (Crypt) সমাহিত করা হয়। তবে ইতিহাসের পরিহাস এই যে, গির্জার এই সংরক্ষিত সমাধিস্থলটি দুইবার চরম অস্থিতিশীলতার শিকার হয়। প্রথমবার ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল সময়ে এবং দ্বিতীয়বার ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের অভ্যুত্থানের সময় এটি লুণ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক লুণ্ঠনগুলো কেবল এক ব্যক্তি বা পরিবারের সম্পদের বিনাশ ছিল না, বরং তা ছিল ফরাসি ইতিহাসের বিভিন্ন মোড় পরিবর্তনের এক বিধ্বংসী প্রতিফলন।[৩]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৬ মে ২০১৯, “হলবাক ফরাসি বিপ্লব-পূর্বকালের বস্তুবাদী দার্শনিক”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/holbach/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২০০।
৩. এই নিবন্ধের অধিকাংশ তথ্যসমূহ ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া হয়েছে। সংগ্রহের তারিখ ৯ এপ্রিল ২০২৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!