অবশ্যই বলা যেতে পারে যে এখন ইতিহাস চর্চার সময় নয়। সত্যিই, একটা নির্দিষ্ট প্রশ্নের ক্ষেত্রে বর্তমানের সঙ্গে অতীতের একটা অবিচ্ছিন্ন, প্রত্যক্ষ ও ব্যবহারিক সংযোগ যদি না থাকে, তবে ও কথাটা খাটে। কিন্তু দুর্ভাগা শান্তির প্রশ্নটা, অতি দুঃসহ শান্তির প্রশ্নটা এমন জরুরি প্রশ্ন যে তার বিশদ আলোচনা দরকার। সেই জন্যই ১৯১৮ সালের ৮ জানুয়ারি আমাদের পার্টির প্রায় ৬০ জন বিশিষ্ট পেত্রগ্রাদ কর্মীর সভায় আমি এই প্রশ্নে যে থিসিসগুলি পড়েছিলাম তা ছাপতে দিচ্ছি।
থিসিসগুলি এই:
৭. ১. ১৯১৮
অবিলম্বে পৃথক ও রাজ্যগ্রাসী শান্তি চুক্তি সম্পাদনের প্রশ্নে থিসিস [১]
১. বর্তমান মুহূর্তে রুশ বিপ্লবের পরিস্থিতিটা এমন যে প্রায় সমস্ত শ্রমিক ও বিপুল অধিকাংশে কৃষক নিঃসন্দেহেই সোভিয়েত রাজ ও তৎকর্তৃক সূচিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে। সেই পরিমাণে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য সুনিশ্চিত।
২. সেই সঙ্গে সম্পত্তিবান যে শ্রেণিগুলি ভালোই জানে যে জমি ও উৎপাদন-উপায়ের ব্যক্তিমালিকানা রক্ষার শেষ ও চূড়ান্ত সংগ্রাম তাদের সামনে, তাদের ক্ষিপ্ত প্রতিরোধে যে গৃহযুদ্ধ বেধেছে, সে যুদ্ধটা কিন্তু এখনো তার চরমে ওঠে নি। এ যুদ্ধে সোভিয়েত রাজের বিজয় নিশ্চিত, কিন্তু বুর্জোয়ার প্রতিরোধ দমনের আগে এখনো কিছুটা সময় অনিবার্য’ই কাটবে, অনিবার্য’ই শক্তি নিয়োগের প্রয়োজন হবে কম নয়, এবং যে কোনো যুদ্ধেই, বিশেষ করে গৃহযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটা ব্যাপারে দারুণ ছারখার ও বিশৃঙ্খলার একটা নির্দিষ্ট পর্ব অনিবার্য।
৩. তাছাড়া, এ প্রতিরোধ তার অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয় ও অসামরিক রূপের ক্ষেত্রে — যথা, সাবোতাজ, ছন্নছাড়া ভবঘুরেদের হাত করা, সমাজতন্ত্রীদের কর্মনাশের জন্য তাদের মধ্যে সেঁধনো বুর্জোয়া দালালদের ঘুষ দেওয়া ইত্যাদি, ইত্যাদিতে — এতই একরোখা ও এত বিচিত্র রূপ ধারণের সামর্থ্য দেখিয়েছে যে তাদের সঙ্গে লড়াইটা এখনো কিছু কাল চলবে, তার প্রধান প্রধান ধরনের ক্ষেত্রে কয়েক মাসের আগে তা শেষ হবে কিনা সন্দেহ। বুর্জোয়া ও তার পক্ষপাতীদের এই সব নিষ্ক্রিয় ও গুপ্ত প্রতিরোধের ওপর দৃঢ় বিজয় ছাড়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য অসম্ভব।
৪. শেষত, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সাংগঠনিক কর্তব্য এতই বৃহৎ ও কঠিন যে তা সাধন করতে হলে — সমাজতান্ত্রিক প্রলেতারিয়েতের পেটি বুর্জোয়া সহযাত্রীদের প্রাচুর্য ও প্রলেতারিয়েতের অনুচ্চ সাংস্কৃতিক মানের ক্ষেত্রে — যথেষ্ট সুদীর্ঘ কালই দরকার।
৫. একত্রে এই সমস্ত ঘটনাচক্র এমনই যে তা থেকে একান্ত সুনিশ্চিত রূপেই এই সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে যে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সাফল্যের জন্য একটা নির্দিষ্ট, অন্যূন কয়েক মাসের অন্তর্বর্তীকাল আবশ্যক, যার মধ্যে প্রথমে নিজ দেশের অভ্যন্তরে বুর্জোয়াদের ওপর বিজয় এবং ব্যাপক ও প্রগাঢ় গণসাংগঠনিক কাজ চালুর জন্য সমাজতান্ত্রিক সরকারের হাত পুরোপুরি খোলা থাকা চাই।
৬. রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অবস্থাটাকেই ধরতে হবে আমাদের সোভিয়েত রাজের যে কোনো আন্তর্জাতিক কর্তব্য নির্ণয়ের ভিত্তিতে, কেননা যুদ্ধের চতুর্থ বৎসরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে গুণে বলা সম্ভব নয় ঠিক কোন মুহূর্তে বিপ্লব জ্বলে উঠবে এবং (জার্মানি সমেত) কোনো একটা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী সরকারের উচ্ছেদ হবে। কোনো সন্দেহ নেই যে ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুরু হতে বাধ্য এবং শুরু হবে। এই প্রত্যয় ও এই বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎ দৃষ্টির ভিত্তিতেই আমরা সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ে আশা করে আছি। সাধারণভাবে আমাদের প্রচারমূলক কাজ ও বিশেষ করে ভ্রাতৃত্ব-স্থাপন জোরালো করতে হবে ও বাড়াতে হবে। কিন্তু ইউরোপীয় এবং বিশেষ করে জার্মান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সামনের ছয় মাসের মধ্যে (অথবা অনুরূপ একটা স্বল্প সময়ে) শুরু হবে কি হবে না, সেইটে স্থির করতে যাওয়ার ভিত্তিতে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক সরকারের রণকৌশল গড়ে তোলা ভুল হবে। সেটা যেহেতু স্থির করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, তাই অনুরূপ সমস্ত চেষ্টাই কার্যত হয়ে দাঁড়াবে অন্ধ জুয়া খেলা।
৭. ব্রেস্ত-লিতোভস্কে যে শান্তি আলোচনা চলেছে তাতে বর্তমান মুহূর্তে ৭. ১. ১৯১৮ নাগাদ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে জার্মান সরকারে (যা চতুঃশক্তি জোটের [২] অন্য সরকারদের পুরোপুরি চালাচ্ছে) নিঃসন্দেহেই প্রাধান্য লাভ করেছে সমর পার্টি, যা আসলে বলতে গেলে রাশিয়াকে ইতিমধ্যেই চরমপত্র দিয়েছে (তার আনুষ্ঠানিক প্রেরণের আশা করা উচিত, আশা করা আবশ্যক যে কোনো দিন)। চরমপত্রটা এই রকম: হয় যুদ্ধের প্রলম্বন নয় রাজ্যগ্রাসী শান্তি অর্থাৎ এই সর্তে শান্তি যে আমরা আমাদের দখল করা সব জমি ছেড়ে দেব, জার্মানরা তাদের দখল করা সমস্ত জমিই রাখবে এবং আমাদের উপর ক্ষতিপূরণ চাপাবে (বন্দীদের ভরণপোষণ ব্যয়ের ছদ্মাবরণে) এবং সে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ মোটের ওপর ৩০০ কোটি রুবল, কয়েক বছরের কিস্তিতে তা পরিশোধনীয়।
৮. রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক সরকারের সামনে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই প্রশ্ন এসেছে: এখনি এই রাজ্যগ্রাসী শান্তি গ্রহণ করা হবে নাকি অবিলম্বে বিপ্লবী যুদ্ধ চালানো হবে। এ ব্যাপারে কোনো মাঝামাঝি সিদ্ধান্ত বস্তুতপক্ষে অসম্ভব। ব্যাপারটা আরো কিছু পেছিয়ে দেওয়া আর চলে না, কেননা কৃত্রিমভাবে আলাপ আলোচনা টেনে লম্বা করার জন্য সম্ভব অসম্ভব সবকিছুই আমরা ইতিমধ্যে করে সেরেছি।
৯. অবিলম্বে বিপ্লবী যুদ্ধের যুক্তি বিচার করতে গিয়ে প্রথমেই এই যুক্তিটা দেখি যে বর্তমানে পৃথক শান্তিটা হবে বাস্তবক্ষেত্রে জার্মান সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপোস, ‘সাম্রাজ্যবাদী যোগসাজশ’ ইত্যাদি, এবং সেই হেতু এরূপ শান্তি হবে প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকতার মূলনীতির সম্পূর্ণ বিরোধী।
কিন্তু এ যুক্তি স্পষ্টতই ভুল। ধর্মঘটে পরাজিত হয়ে শ্রমিকেরা যদি তাদের পক্ষে প্রতিকূল ও পুঁজিপতির পক্ষে অনুকূল সর্তে কাজ শুরুর জন্য সই দেয় তবে তাতে সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয় না। সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে শুধু তারাই যারা শ্রমিকদের একাংশের সুবিধা বিকিয়ে দেয় পুঁজিপতির অনুকূলে, শুধু এইরূপ মিটমাটই নীতিগতভাবে অমার্জনীয়।
জার্মান সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুদ্ধটাকে যারা আত্মরক্ষামূলক ও ন্যায় যুদ্ধ বলে আর আসলে সাহায্য পায় ইঙ্গ-ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে, এবং তাদের সঙ্গে গুপ্ত চুক্তিগুলো জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে, তারা সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে। জনগণের কাছ থেকে কিছুই লুকিয়ে না রেখে, সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে কোনোরকম গোপন চুক্তি না করে যারা নির্দিষ্ট মুহূর্তটিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার শক্তি না থাকায় দুর্বল জাতিটির পক্ষে প্রতিকূল এবং এক গোষ্ঠীর সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে অনুকূল সন্ধি সর্ত স্বাক্ষরে রাজী হয়, তারা সমাজতন্ত্রের প্রতি বিন্দুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতা করে না।
১০. অবিলম্বে যুদ্ধের দ্বিতীয় যুক্তি হলো এই যে চুক্তি স্বাক্ষর করলে আমরা কার্যক্ষেত্রে জার্মান সাম্রাজ্যবাদের দালাল হয়ে দাঁড়াব, কেননা তাতে জার্মান সাম্রাজ্যবাদের এই লাভ হবে যে আমাদের ফ্রন্ট থেকে সৈন্য অপসারিত হবে ও লক্ষ লক্ষ যুদ্ধবন্দী তারা ফেরত পাবে। কিন্তু এ যুক্তিও স্পষ্টতই ঠিক নয়, কেননা বর্তমান মুহূর্তে বিপ্লবী যুদ্ধ চালালেও কার্যক্ষেত্রে আমরা হয়ে পড়ব ইঙ্গ-ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের দালাল, তাদের লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য সহায়ক বল জোগাব। ইংরেজরা আমাদের সর্বাধিনায়ক ক্রিলেঙ্কোকে খোলাখুলি প্রস্তাব দিয়েছিল যে যুদ্ধ চালালে আমাদের প্রতি সৈনিক পিছু তারা মাসে ১০০ রুবল করে দেবে। ইঙ্গ-ফরাসীদের কাছ থেকে যদি আমরা একটা কোপেকও না নিই, তাহলেও কার্যক্ষেত্রে জার্মান ফৌজের একাংশকে টেনে রাখায় তাদের সাহায্য করাই হবে।
এই দিক থেকে উভয় ক্ষেত্রেই আমরা কোনো না কোনো সাম্রাজ্যবাদী যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারছি না এবং স্পষ্টতই বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ না করে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসা অসম্ভব। এ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় এই যে, কোনো একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিজয়ের সময় থেকেই প্রশ্নটায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত কোন সাম্রাজ্যবাদ বেশি পছন্দসই সেই দিক থেকে নয়, যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে কেবলমাত্র তার বিকাশ ও সংহতির সর্বোত্তম সর্তের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই।
অন্য কথায়: বর্তমানে দুই সাম্রাজ্যবাদের কাকে সাহায্য করা বেশি লাভজনক এই নীতি নয়, একটি দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শক্তিবৃদ্ধি, অন্ততপক্ষে অন্যান্য দেশ সঙ্গে এসে যোগ না দেওয়া পর্যন্ত তার টিকে থাকার ব্যবস্থা সবচেয়ে নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য রূপে কীভাবে করা যায়, এই নীতিকেই বর্তমানে রাখতে হবে আমাদের রণকৌশলের মূলে।
১১. বলা হয় যে জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্রাটদের মধ্যস্থিত যুদ্ধবিরোধীরা বর্তমানে ‘পরাজয়কামী’ হয়ে উঠেছে এবং জার্মান সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতিস্বীকার না করার জন্য আমাদের অনুরোধ করছে। কিন্তু পরাজয়-কামনাটা আমরা স্বীকার করেছিলাম কেবল নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়ার ক্ষেত্রে, আর অন্য দেশের সাম্রাজ্যবাদের উপর বিজয়, যে বিজয় অর্জিত হবে ‘বন্ধুভাবাপন্ন’ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বা বাস্তবিক সহযোগে, সে বিজয়কে আমরা নীতিগতভাবে অমার্জনীয় ও সাধারণভাবে অকেজো পদ্ধতি হিসাবে সর্বদাই অস্বীকার করেছি।
সুতরাং এই যুক্তিটা হলো আগেকার যুক্তিরই রকমফের মাত্র। জার্মান বামপন্থী সোশ্যাল-ডেমোক্রাটরা যদি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথক চুক্তি মূলতুবী রাখার প্রস্তাব দিত এবং সেই সময়ের মধ্যে জার্মানিতে বিপ্লবী অভিযানের গ্যারান্টি দিত, তাহলে প্রশ্নটা আমাদের পক্ষে অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু জার্মান বামপন্থীরা সে কথা তো বলছেই না, বরং আনুষ্ঠানিকভাবেই ঘোষণা করছে: ‘যতদিন পারো টিকে থাকো, তবে সিদ্ধান্ত নাও রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরই অবস্থা বিচার করে, কেননা জার্মান বিপ্লব সম্পর্কে নিশ্চিত করে কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া অসম্ভব।’
১২. বলা হয় যে আমরা কিছু কিছু পার্টি বিবৃতিতে বিপ্লবী যুদ্ধের ‘প্রতিশ্রুতি দিয়েছি,’ পৃথক শান্তি চুক্তি করলে আমাদের কথার খেলাপ হবে।
এটা ঠিক নয়। আমরা সাম্রাজ্যবাদের যুগে সমাজতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে বিপ্লবী যুদ্ধের ‘প্রস্তুতি ও চালনার’ আবশ্যিকতার কথা বলেছিলাম, একথা আমরা বলেছিলাম বিমূর্ত শান্তিসর্বস্বতার বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের যুগে ‘পিতৃভূমি রক্ষা’ পুরোপুরি অস্বীকার করবার মতো তত্ত্বের বিরুদ্ধে এবং শেষত, সৈন্যদের একাংশের নির্ভেজাল স্বার্থপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়বার জন্য; কিন্তু কোনো মুহূর্তে বিপ্লবী যুদ্ধ চালানো কতটা সম্ভবপর, সেটা হিসেব না করেই আমরা বিপ্লবী যুদ্ধ শুরুর প্রতিশ্রুতি দিতে যাই নি।
বর্তমানেও নিঃসন্দেহেই আমাদের বিপ্লবী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চালাতে হবে। আমাদের এ প্রতিশ্রুতি আমরা পুরণ করছি, যেমন পূরণ করেছি তৎক্ষণাৎ পুরণযোগ্য সবকিছু প্রতিশ্রুতি: গুপ্তচুক্তি নাকচ করেছি, সমস্ত জাতির কাছে ন্যায়সঙ্গত শান্তির প্রস্তাব দিয়েছি, সবরকমে বেশ কয়েকবার শান্তি আলাপ আলোচনা বিলম্বিত করেছি যাতে অন্য জাতিরা আমাদের সঙ্গে যোগ দেবার সময় পায়।
কিন্তু এক্ষুণি, অবিলম্বে বিপ্লবী যুদ্ধ চালানো যায় কি না, এই প্রশ্নেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে যুদ্ধ কার্যকরী করার একান্ত বৈষয়িক সর্ত কী এবং ইতিমধ্যেই সূচিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বার্থ কী তা ভেবেই।
১৩. অবিলম্বে বিপ্লবী যুদ্ধের যুক্তিগুলির খতিয়ান করলে এই সিদ্ধান্তেই আসতে হয় যে এরূপ পলিসিতে হয়ত লোকের সুন্দর, চাঞ্চল্যকর ও জমকালোর পিপাসা মিটবে, কিন্তু সূচিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বর্তমান মুহূর্তে শ্রেণী-শক্তির বাস্তব অনুপাত এবং বৈষয়িক ব্যাপারগুলোর বিবেচনা তাতে একেবারেই করা হবে না।
১৪. কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের ফৌজ বর্তমান মুহূর্তে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের (এবং খুবই সম্ভব আগামী কয়েক মাসের) মধ্যে সাফল্যের সঙ্গে জার্মান আক্রমণ প্রতিহত করতে অক্ষম, কারণ প্রথমত, খাদ্যের ব্যাপারে, অবসন্নদের বদলি ইত্যাদিতে অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ সৈন্য চূড়ান্ত ক্লান্ত ও অবসন্ন; দ্বিতীয়ত, ঘোড়াগুলো একেবারে অনুপযুক্ত, যাতে জার্মানদের হাতে আমাদের গোলন্দাজ বাহিনীর ধ্বংস অনিবার্য; তৃতীয়ত, রিগা থেকে রেভেল পর্যন্ত উপকূল রক্ষা একান্ত অসম্ভব, যাতে লিফল্যান্ডের বাকি অংশ, তারপর এস্টল্যান্ড জয় করার, এবং আমাদের সৈন্যবাহিনীর বৃহৎ অংশের পেছনে গিয়ে আক্রমণ করার ও শেষত পেত্রগ্রাদ দখলের নিশ্চিত সুযোগ পাবে শত্রু।
১৫. এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে বর্তমান মুহূর্তে আমাদের সৈন্যবাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক অংশটা রাজ্যগ্রাসী শান্তির পক্ষেই নিঃসন্দেহে মত দেবে, অবিলম্বে বিপ্লবী যুদ্ধের পক্ষ নেবে না, কেননা সৈন্যবাহিনীর সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন, তার মধ্যে লাল রক্ষী বাহিনী মিলিয়ে দেবার কাজ ইত্যাদি সবেমাত্র শুরু হয়েছে।
সৈন্যদলের মধ্যে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র বজায় থাকার অবস্থায় অধিকাংশ সৈন্যের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে হবে হঠকারিতা অথচ সত্যিকারের মজবুত ও ভাবাদর্শে’র দিক থেকে দৃঢ়, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক-কৃষক ফৌজ গড়তে হলে দরকার অন্তত মাসের পর মাস সময়।
১৬. শ্রমিক শ্রেণী কর্তৃক পরিচালিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমর্থন করতে রাশিয়ার গরিব চাষীরা সক্ষম, কিন্তু অবিলম্বে বর্তমান মুহূতেই গুরুতর বিপ্লবী যুদ্ধে নামতে তারা অক্ষম। উল্লিখিত প্রশ্নে এই বাস্তব শ্রেণী-শক্তির অনুপাত উপেক্ষা করা মারাত্মক ভুল।
১৭. সুতরাং বর্তমান সময়ে বিপ্লবী যুদ্ধের ব্যাপারটা এই রকম:
আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে যদি জার্মান বিপ্লব জ্বলে ওঠে ও জয়লাভকরে, তাহলে অবিলম্বে বিপ্লবী যুদ্ধের রণকৌশলে হয়ত বা আমাদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ধ্বংস পাবে না।
আর যদি সামনের কয়েক মাসের মধ্যে জার্মান বিপ্লব না শুরু হয়, তাহলে যুদ্ধ চলতে থাকলে ঘটনাচক্র অনিবার্য’ই এমন দাঁড়াবে যে প্রচণ্ডতম পরাজয়ে রাশিয়া অনেক বেশি প্রতিকূল পৃথক শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হবে এবং তদুপরি সে চুক্তিটা সম্পাদন করবে সমাজতান্ত্রিক সরকার নয়, অন্য কোনো সরকার (যেমন, বুর্জোয়া রাদা [৩] ও চের্নোভপন্থীদের [৪] একটা জোট, বা অনুরূপ কিছু)। কেননা যুদ্ধে অসহ্য রকমের অবসন্ন কৃষক ফৌজ প্রথম কয়েকটা পরাজয়ের পর — খুবই সম্ভব কয়েক মাস নয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই — সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক সরকারের উচ্ছেদ ঘটাবে।
১৮. এইরূপ অবস্থায় জার্মান বিপ্লব সপ্তাহের মাপকাঠিতে মাপার মতো স্বল্পতম একটা সময়ের মধ্যেই শুরু হতে পারে শুধু এই কথা ভেবে রাশিয়ায় ইতিমধ্যেই সূচিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভাগ্য বাজী রাখার রণকৌশল একেবারেই অমার্জনীয়। সে কৌশল হবে হঠকারিতা। এরকম ঝুঁকি নেবার অধিকার আমাদের নেই।
১৯. আর আমরা যদি পৃথক শান্তি চুক্তি করি, তাতে জার্মান বিপ্লব তার অবজেকটিভ ভিত্তির দিক থেকেই মোটেই বাধাগ্রস্ত হবে না। সম্ভবত শভিনিজমের মত্ততায় সাময়িকভাবে তা দুর্বল হয়ে পড়বে, কিন্তু জার্মানির হাল চূড়ান্ত রকমের কঠিন হয়েই থাকবে, ইংলণ্ড ও আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ চলতেই থাকবে, উভয় পক্ষেরই আক্রমণাত্মক সাম্রাজ্যবাদের মুখোস পুরোপুরি ফাঁস হবে। সমস্ত দেশের জনগণের সামনে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে জীবন্ত আদর্শ, আর সে আদর্শের প্রচারমূলক বিপ্লব-ঘটানো প্রভাব হয়ে উঠবে বিপুল। একদিকে বুর্জোয়া ব্যবস্থা এবং দুই দল হিংস্রকের মধ্যে নিঃশেষে উদ্ঘাটিত রাজ্যগ্রাসী যুদ্ধ, অন্যদিকে শান্তি এবং সোভিয়েতগুলির সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র।
২০. পৃথক শান্তি চুক্তি করে সাম্রাজ্যবাদী দুই শত্রুগোষ্ঠীর শত্রুতা ও যুদ্ধ — আমাদের বিরুদ্ধে তাদের যোগসাজশ যাতে দুরূহ হয়ে উঠছে, তা কাজে লাগিয়ে আমরা বর্তমান মুহূর্তে সম্ভবপর সর্বাধিক মাত্রায় উভয় গোষ্ঠীর কাছ থেকেই মুক্তি লাভ করব এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হাত খোলা পেয়ে তা কাজে লাগাব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব চালিয়ে যাওয়া ও সংহত করে তোলার জন্য। যদি কয়েকমাসের শান্তিপূর্ণ কাজের গ্যারান্টি থাকে তাহলে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের ভিত্তিতে, ব্যাঙ্ক ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণের ভিত্তিতে, এবং খুদে কৃষকদের গ্রাম্য খরিদ্দার সমিতির সঙ্গে শহরের স্বাভাবিক উৎপন্ন বিনিময়ের ব্যবস্থা করে রাশিয়ার পুনর্গঠন অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি সম্ভব। আর সেরূপ পুনর্গঠনে সমাজতন্ত্র রাশিয়ায় এবং সারা বিশ্বে অপরাজেয় হয়ে উঠবে, এবং সেই সঙ্গে পরাক্রান্ত শ্রমিক-কৃষক লাল ফৌজের একটা পাকা অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলবে।
২১. বর্তমান মূহূর্তে সত্যিকারের বিপ্লবী যুদ্ধ হবে সেই যুদ্ধ যাতে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র লড়বে বুর্জোয়া দেশসমূহের বিরুদ্ধে, অন্যান্য দেশের বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করার সুস্পষ্ট-উত্থাপিত এবং সমাজতান্ত্রিক ফৌজ কর্তৃক সম্পূর্ণ অনুমোদিত লক্ষ্য নিয়ে। অথচ এই লক্ষ্য বর্তমান মুহূর্তে আমরা যে এখনো গ্রহণ করতে অক্ষম তা জানা কথা। বর্তমান মুহূর্তে আমরা বাস্তবত পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও কুল্যান্ডের মুক্তির জন্য লড়তে পারি। কিন্তু মার্কসবাদ ও সাধারণভাবে সমাজতন্ত্রের মূল কথাগুলো বিসর্জন না দিয়ে কোনো মার্কসবাদীই এ কথা অস্বীকার করতে পারেন না যে সমাজতন্ত্রের স্বার্থ জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের চেয়ে উর্ধ্বে। ফিনল্যান্ড, ইউক্রেন ও অন্যান্য অঞ্চলের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার কার্যকরী করার জন্য আমাদের সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র তার যথাসাধ্য করেছে এবং করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ পরিস্থিতি যদি এমন রূপ নেয় যাতে কতিপয় জাতির (পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, কুল্যান্ড ইত্যাদি) আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার হয় লঙ্ঘিত নয় সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বই বর্তমান মুহূর্তে বিপন্ন হয়ে উঠছে, তাহলে সেক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রক্ষার স্বার্থই যে উর্ধ্বে, তা বলাই বাহুল্য।
সেইজন্য যে বলে ‘আমরা লজ্জাকর জঘন্য ইত্যাদি শান্তি চুক্তি সই করতে পারি না, পোল্যান্ডের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না, ইত্যাদি’, সে এইটে লক্ষ্য করে না যে পোল্যান্ড মুক্তির সর্তে শান্তি চুক্তি করলে সে কেবল ইংলন্ডের বিরুদ্ধে, বেলজিয়ম, সার্বিয়া ও অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে জার্মান সাম্রাজ্যবাদকেই আরো বেশি শক্তিশালী করবে। পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, কুল্যান্ড মুক্তির সর্তে শান্তি হলে সেটা হত রাশিয়ার দিক থেকে ‘দেশপ্রেমাত্মক’ শান্তি, কিন্তু সেটা যে রাজ্যগ্রাসীদের সঙ্গেই, জার্মান সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গেই চুক্তি তার এতটুকু বদল হত না।
২১শে জানুয়ারি, ১৯১৮ সালে বর্তমান থিসিসের সঙ্গে যোগ করা উচিত:
২২. অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে গণ ধর্মঘট, তারপর বার্লিন ও ভিয়েনায় শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েত গঠন, পরিশেষে ১৮ই — ২০শে জানুয়ারি থেকে বার্লিনে সশস্ত্র সংঘাত ও রাজপথের সংঘর্ষ, এসব থেকে বাস্তব তথ্য হিসাবে স্বীকার করতে হচ্ছে যে জার্মানিতে বিপ্লব শুরু হয়েছে।
এই তথ্য থেকে আরো কিছুটা সময় পর্যন্ত শান্তির আলাপ আলোচনা দীর্ঘায়ত করার সুযোগ আমরা পাচ্ছি।[৫]
আরো পড়ুন
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ১ (১) — রাষ্ট্র হলো শ্রেণি-বিরোধের অমীমাংসেয়তার ফল
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৫) — পরগাছা রাষ্ট্রের উচ্ছেদ
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৪) — জাতীয় ঐক্যের সংগঠন
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৩) — পার্লামেন্ট প্রথার বিলোপ
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (২) — ভেঙে-ফেলা রাষ্ট্রযন্ত্রের বদল হবে কী দিয়ে?
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (১) — কমিউনারদের প্রচেষ্টায় বীরত্ব কোনখানে?
- ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের রচনাবলী: কালানুক্রমিক তালিকা (১৮৯৩-১৯২৩)
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইয়ের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
- ভ্লাদিমির লেনিন-এর ঐতিহাসিক রেকর্ডকৃত ভাষণসমূহ: একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন
- ইহুদি নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে
- অবিলম্বে পৃথক ও রাজ্যগ্রাসী শান্তি চুক্তি সম্পাদনের প্রশ্নে থিসিসের পরিশেষ
- দুর্ভাগা শান্তি-সমস্যার ইতিহাস প্রসঙ্গে
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টির ভূমিকা
- অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের নীতি
- বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব প্রসঙ্গে লেনিনবাদ
- অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে
- সিপিএসইউ (বি)-তে দক্ষিণ বিচ্যুতি
- এক লাইন, না দুই লাইন?
- সংশোধনবাদ প্রসঙ্গে লেনিনবাদী মত এবং তা কেন প্রতিরোধ করতে হবে
- লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ হচ্ছে লেনিন কর্তৃক রচিত সংগ্রামের বিভিন্ন সূত্রাবলি
- লেনিনবাদী বলশেভিকবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হচ্ছে সাম্যবাদ অভিমুখী সংগঠন
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- সাম্যবাদী প্রচারণা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া
- পার্টি শৃঙ্খলা সম্পর্কে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও সে সম্পর্কিত ধারণা
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত নীতি
- অর্থনীতিবাদ বিরোধী সংগ্রাম হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য
- অর্থনীতিবাদ শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি বাদ দিয়ে আর্থিক দাবি আদায়ের প্রবণতা
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব হচ্ছে ১৯১৭ সালে লেনিন লিখিত বই যাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচিত
- রাষ্ট্র সম্পর্কে লেনিনবাদী ধারণা হচ্ছে রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশের দ্বন্দ্ববাদী বিশ্লেষণ
- এপ্রিল থিসিস কী? রুশ বিপ্লবে লেনিনের ঐতিহাসিক ১০ দফার গুরুত্ব
- বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ বা বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা বই সম্পর্কে
- নারীমুক্তির প্রশ্নে লেনিনবাদ শোষণ ও অধীনতা থেকে মুক্তির কথা বলে
- লেনিনবাদ হচ্ছে ভ্লাদিমির লেনিন বিকশিত একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ
- মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দর্শনের বিষয়বস্তু প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিষয়
- পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে
- সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় লেনিন রচিত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ
- কী করতে হবে হচ্ছে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন রচিত সাম্যবাদী রাজনৈতিক গ্রন্থ
- লেনিনের বই রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা
- বলশেভিকবাদ রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাষ্ট্রশাসন প্রণালীর বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারা
- লেনিন ছিলেন বিশ শতকের ইউরোপের মহত্তম মানব এবং মার্কসবাদের উত্তরসূরি
- শ্রেণিহীন সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যেখানে কেউ সামাজিক শ্রেণিতে থাকে না
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. ‘অবিলম্বে পৃথক ও রাজ্যগ্রাসী শান্তি চুক্তির প্রশ্নে থিসিস’ লেনিন পাঠ করেন ১৯১৮ সালের ৮ই (২১শে) জানুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য ও পার্টি কর্মীদের সভায়। সভায় উপস্থিত থাকেন মোট ৬৩ জন। সভার মিনিটুট্স পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেছে শুধু লেনিনের লেখা অসিস্কি (অবলেননিষ্ক), ত্রতস্কি, লমোভ (অপকভ), কামেনেভ প্রভৃতির বক্তৃতার সংক্ষিপ্ত নোট।
১১ই (২৪শে) জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় কমিটির অধিবেশনে লেনিনের বক্তৃতা থেকে জানা যায় যে লেনিনের থিসিসের পক্ষে ভোট দেন ১৫ জন, ৩২ জন সমর্থন করেন ‘বামপন্থী কমিউনিস্টদের’ মত এবং ১৬ জন ত্রৎস্কির দৃষ্টিভঙ্গি।
থিসিসগুলি প্রকাশিত হয় কেবল ২৪শে ফেব্রুয়ারি যখন কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রশ্নে লেনিনের সমর্থনে দাঁড়ান।
২. চতুঃশক্তি জোটে যোগ দেয় জার্মানি, অস্ট্রো-হাঙ্গারি, বুলগেরিয়া, তুরস্ক।
৩. ইউক্রেনীয় কেন্দ্রীয় রাদা — ১৯১৭ সালের এপ্রিলে কিয়েভে অনুষ্ঠিত সারা ইউক্রেন জাতীয় কংগ্রেসে ইউক্রেনীয় বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী গ্রুপ ও পার্টির ব্লক থেকে গঠিত প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী সংগঠন। রাদার সভাপতি হন ইউক্রেনীয় বুর্জোয়াদের মতপ্রবক্তা ম. স. গ্রুশেভস্কি, সহসভাপতি ড. ক. ভিন্নিচেঙ্কো। রাদার সামাজিক ভিত্তি ছিল শহর ও গ্রামের বুর্জোয়া ও পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী। ইউক্রেনীয় বুর্জোয়া ও জমিদারদের ক্ষমতা শক্তিশালী করার চেষ্টা করে রাদা, ইউক্রেনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে ইউক্রেনীয় বুর্জোয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। জাতীয় স্বাধীনতার নিশানের আড়ালে তা ইউক্রেনের জনগণকে স্বপক্ষে টানতে চায়, সারা রুশ বিপ্লবী আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের ইউক্রেনীয় বুর্জোয়ার আধিপত্যাধীনে আনতে ও ইউক্রেনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয় নিবারণ করতে চায়। ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে মতভেদ থাকলেও রাদা রাশিয়ার সাময়িক সরকারকে সমর্থন করে।
মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের পর রাদা নিজেকে ‘ইউক্রেনীয় জন প্রজাতন্ত্রের’ সর্বোচ্চ সংস্থা বলে ঘোষণা করে, সোভিয়েত রাজের সঙ্গে প্রকাশ্য সংগ্রামে নামে ও সারা রুশ প্রতিবিপ্লবের একটি অন্যতম কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়।
১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে খার্ক’ভে অনুষ্ঠিত প্রথম সারা ইউক্রেনীয় সোভিয়েত কংগ্রেস থেকে ইউক্রেনে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ঘোষিত নয়। কেন্দ্রীয় রাদার ক্ষমতা উচ্ছেদ হল বলে ঘোষণা করা হয় কংগ্রেসে। রুশ সোভিয়েত ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জনকমিশার পরিষদ ইউক্রেনের সোভিয়েত সরকারকেই ইউক্রেনের একমাত্র বৈধ সরকার বলে স্বীকার করে এবং প্রতিবিপ্লবী রাদার সঙ্গে সংগ্রামে তাকে অবিলম্বে সাহায্যদানের নির্দেশ দেয়। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর ও ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে সারা ইউক্রেনে কেন্দ্রীয় রাদার বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু হয় সোভিয়েত রাজ পুনঃস্থাপনের জন্য। ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে সোভিয়েত সৈন্য ইউক্রেনে আক্রমণ অভিযান চালায় ও বুর্জোয়া রাদার ক্ষমতা উচ্ছেদ করে ২৬শে জানুয়ারি (৮ই ফেব্রুয়ারি) কিয়েভ দখল করে।
পরাস্ত ও সোভিয়েত ইউক্রেন থেকে বিতাড়িত হয়ে এবং মেহনতী জনগণের মধ্যে কোনো ভিত্তি না পেয়ে কেন্দ্রীয় রাদা সোভিয়েত রাজ উচ্ছেদ ও ইউক্রেনে বুর্জোয়া ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য জার্মান সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জোট বাঁধে। জার্মানির সঙ্গে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের শান্তি আলাপের সময় রাদা রেস্ত-লিতোস্কে নিজের প্রতিনিধিদল পাঠায় ও গোপনে জার্মানির সঙ্গে পৃথক চুক্তি করে যাতে ইউক্রেনের শস্য কয়লা ও কাঁচামাল দেবার বদলে সোভিয়েত রাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জার্মানির কাছ থেকে সামরিক সাহায্য পাবার সর্ত থাকে। ১৯১৮ সালের মার্চে’ অস্ট্রো-জার্মান দখলকারীদের সঙ্গে একত্রে রাদা কিয়েভে ফেরে ও জার্মানদের ক্রীড়নক হয়ে বসে। ইউক্রেনে বিপ্লবী আন্দোলন দমন ও খাদ্য প্রেরণে রাদার একান্ত অসামর্থ্য দেখে জার্মানরা এপ্রিলের শেষে রাদাকে বিতাড়িত করে।
৪. ভ. ম. চের্নোভ (১৮৭৬-১৯৫২) সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারি পার্টির একজন নেতা ও তাত্ত্বিক, বুর্জোয়া সাময়িক সরকারে কৃষিমন্ত্রী, অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সোভিয়েতবিরোধী বিদ্রোহের একজন সংগঠক।
৫. ভি আই লেনিন থিসিসটি লেখেন ৭ (২০) জানুয়ারি, ২২শ থিসিস- ২১ জানুয়ারি (৩ ফেব্রুয়ারি); মুখবন্ধ- ১১ (২৪) ফেব্রুয়ারির আগে, ১৯১৮। প্রথম প্রকাশিত হয় (২২শ থিসিস বাদে) ২৪ (১১) ফেব্রুয়ারি, ১৯১৮ ৩৪ নং প্রাভদা পত্রিকায়। ২২ নং থিসিস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে লেনিনের রচনাবলীর ৪র্থ রুশ সংস্করণের ২৬শ খণ্ডে। প্রকাশের সময় লেনিন স্বাক্ষর দেন ‘ন. লেনিন’। লেখা ও তথ্য ভ. ই. লেনিন, রচনাবলী; পঞ্চম রুশ সংস্করণ; ৩৫ খন্ড, পৃষ্ঠা ২৪৩-২৫২ পৃষ্ঠা হতে। ফুলকিবাজ.কমে প্রবন্ধটি সংকলিত এবং এটি নেয়া হয়েছে প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭০ থেকে প্রকাশিত বিপ্লবী বুলি ব্রেস্ত শান্তি চুক্তির প্রশ্নে ‘বামপন্থী কমিউনিস্টদের’ ভুল নিয়ে প্রবন্ধ ও বক্তৃতা গ্রন্থের ৫-১৪ পৃষ্ঠা থেকে।

ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (২২ এপ্রিল, ১৮৭০ – ২১ জানুয়ারি, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।