জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেলের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রচিন্তার পূর্ণাঙ্গ অনুধাবনের জন্য তাঁর ‘আইনতত্ত্ব’ বা আইনের দর্শন (Hegel’s theory of Law বা Philosophy of Right) পাঠ করা অপরিহার্য। হেগেলীয় দর্শনে আইন কেবল কতগুলো বিধিনিষেধের সমষ্টি নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলে বিদ্যমান এক গভীর যৌক্তিক বিন্যাস। তাঁর মতে, আইনের মাধ্যমেই ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা একটি বস্তুনিষ্ঠ এবং সামাজিক রূপ পরিগ্রহ করে। হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের যে বিশাল ইমারত আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত স্থাপিত হয়েছে এই আইনি চিন্তার ওপর, যা নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক শৃঙ্খলাকে সুসংহত করে।
হেগেল তাঁর দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় পরম শক্তি বা বিশ্ব-আত্মার (Weltgeist) বিকাশের তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তরের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ‘ব্যক্তিবাচক শক্তি’ যা নৃতত্ত্ব ও মনোবিদ্যার স্তরে ক্রিয়াশীল; দ্বিতীয়ত, ‘বস্তুগত শক্তি’ যার সার্থক বহিঃপ্রকাশ ঘটে আইন (Law) ও নৈতিকতার (Sittlichkeit) মধ্য দিয়ে; এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘পরম শক্তি’ যা ধর্ম, শিল্প ও দর্শনে পূর্ণতা পায়। হেগেলের মতে, আইন হলো সেই বস্তুগত মাধ্যম যেখানে পরম ইচ্ছার যৌক্তিক বিবর্তন ঘটে, যা ব্যক্তিকে একটি সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলে।
রাজনীতি, রাষ্ট্র, আইন যা কিছু ফ্রিডরিখ হেগেলের আলোচনায় এসেছে তার মূলে কাজ করেছে তাঁর দার্শনিক বিচার। আইনকেও তিনি বিচার করেছেন দর্শনেরই আলোকে। হেগেলের কাছে আইন একটা ভাব বা আদর্শ হিসাবেই উপস্থিত। আইনকে তিনি স্বাধীন ইচ্ছার বিদ্যমান অস্তিত্ব হিসাবেই দেখেছেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার সঙ্গে আইনের কোনো পার্থক্য নেই। স্বাধীনতার একটি বিশেষ রূপ হিসাবে তিনি যেমন আইনকে দেখেছেন আবার প্রচলিত ধারণাকে সামনে রেখেও আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন।
হেগেল বিশ্বাস করেন আইনব্যবস্থা হলো কার্যক্ষেত্রে স্বাধীনতার রাজত্বেরই রূপায়ন। বিশেষ আইন হলো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে যে আইন কার্যকর হয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই বিশেষ আইনের প্রকাশ আছে। এগুলি কখনও সীমাবদ্ধ, কখনও পরস্পর বিরোধী, আবার কখনও পরস্পর নির্ভরশীল, সাধারণভাবে আইন বলতে হেগেল যা বোঝেন তা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে রাষ্ট্রে। সুশীল সমাজের আইনের যে অসঙ্গতি আছে, রাষ্ট্রিক আইনে তা নেই।
পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ আইন জনসাধারণের কাছে আনুগত্য পায়, কারণ এই আইন তার কাছে কোনো বাইরের ব্যাপার নয় বা এ আইন তার উপর চাপানো কোনো নিয়ম নয়। এই আইনের প্রতি সে অনুবর্তী। সম্পূর্ণ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় ব্যক্তি চায় সেই শক্তি বা প্রেরণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে। এটা সম্ভব যখন ব্যক্তি কোনো স্বার্থ বা কামনা বাসনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে ওঠে। পরম ইচ্ছা তথা রাষ্ট্রের নির্দেশ অনুসারে চললেই এই স্বাধীন ইচ্ছাকে কার্যকর করা সম্ভব। আইন এই পরম ইচ্ছার অর্থাৎ রাষ্ট্রের ইচ্ছারই বাস্তব প্রকাশ। কোনোরকম ভয় ভীতি নিয়ে রাষ্ট্রের ইচ্ছার অধীন হলে ব্যক্তি স্বাধীন বলে গণ্য হবে না। রাষ্ট্রের ইচ্ছা তথা আইনকে ব্যক্তি সচেতনভাবেই মেনে নেবে এবং ব্যক্তিকে এই বিশ্বাস জাগ্রত করতে হবে যে রাষ্ট্র যা চায় সেও তাই কামনা করে।
আইন বিষয়ে হেগেলের চিন্তার অন্যান্য কতগুলি দিক লক্ষণীয় :
১. আইন মূর্ত হয়ে ওঠে আইনের বিধানগুলির মাধ্যমে। এগুলিই আইনকে একটা সার্বিক, সর্বজনগ্রাহ্য, সুনির্দিষ্ট রূপ দেয়। আইনের সংকলন বা লিপিবদ্ধকরণ, সুবিন্যস্ত প্রকাশ একান্ত বাঞ্ছনীয়।
২. মানবিক সম্পর্কের বাইরের বিষয়গুলিই আইনের দ্বারা প্রভাবিত, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রটি নয়।
৩. আইনের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জাতীয় চরিত্র ও তার ঐতিহাসিক বিকাশের পর্যায়গুলি প্রতিফলিত হয় ।
আইন যখন আইনের রূপ পরিগ্রহণ করেনি, যখন আইন ব্যক্তির সামর্থেই, তার চেতনাতেই রূপ নিচ্ছে তখন আইন হলো বিমূর্ত আইন। এই পর্যায়ে ব্যক্তি নিজেই এক অনুশাসন তৈরি করে নিচ্ছে এবং নিজের ও অপরের ক্ষেত্রে তা মান্য করে চলবে। হেগেল মনে করেন আইন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, সম্পত্তি, চুক্তির স্বাধীনতাকে রূপ দেয়। ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছাকে কার্যকর করাই আইন। জীবন্ত কোনো প্রাণী তখনই ব্যক্তি বলে গণ্য হবে যখন এর মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছার প্রকাশ ঘটবে। কোন বস্তু সম্পদ কারণ তা নির্ধারিত ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা। এই স্বাধীন ইচ্ছার অভাব আছে বলেই– অর্থাৎ স্বাধীন মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার সামর্থ্যরে অভাব আছে বলে কোনো কোনো মানুষ দাস বলে পরিচিত।
হেগেলের মতে, ব্যক্তিকে স্বাধীনতা থেকে, তার নৈতিকতা থেকে সরিয়ে আনা অন্যায়। তিনি ক্রীতদাসদের নিজস্ব স্বাধীনতা, হেগেলের যুগের ভূমিদাসত্ব থেকে স্বাধীনতা, দেবার পক্ষে ছিলেন। হেগেলের চিন্তায় আইন ও আইনতত্ত্ব প্রাধান্য পেলেও নৈতিকতাও যথেষ্ট মূল্য পেয়েছে। হেগেল Social Ethics ধারণাটিকে প্রচার করেছেন এবং বলেছেন সামাজিক নৈতিকতার মধ্যেই আছে স্বাধীন ইচ্ছার প্রকৃত উপলব্ধি। হেগেল সামাজিক নৈতিকতা বলতে প্রথাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বলেছেন আইন যা নয়, প্রথা তাই। প্রথার মধ্যেই আছে প্রেরণা বা মহাশক্তি।
হেগেল আইন প্রসঙ্গে শুধু নৈতিকতার আলোচনা করেছেন তা নয়, ন্যায়-অন্যায় প্রশ্নও বিচার করেছেন। অন্যায় প্রসঙ্গে হেগেল সাধারণ অন্যায়, প্রতারণা, অপরাধ প্রভৃতির কথা বলেছেন। না বুঝে সরলভাবে যে অন্যায় করা হয় সে অন্যায় এতট শাস্তিযোগ্য নয়, যতটা শাস্তিযোগ্য প্রতারণা বা অপরাধের মত ঘটনা। সজ্ঞানে যে অপরাধ করা হয় তার জন্য শাস্তি একান্ত প্রয়োজন, কারণ তা শুধু আইনের কর্তৃত্বকেই প্রকাশ করবে না, সাহায্য করবে অপরাধীকে অপরাধ থেকে নির্বৃত্ত করতে।
আরো পড়ুন
- প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন: আধুনিক ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় দর্শনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: রাষ্ট্রদর্শন, প্রগতি এবং নৈতিক সংহতির নবদিগন্ত
- হেগেলীয় রাজনৈতিক চিন্তা: জার্মান ভাববাদের বিস্তার এবং ফরাসি বিপ্লবোত্তর দোদুল্যমানতা
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ ও এর বৌদ্ধিক উত্তরধিকার: মার্কস থেকে গ্রামসি পর্যন্ত বিবর্তন
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ (Civil Society): চাহিদার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সংহতির মধ্যবর্তী স্তর
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির অবস্থান: পরম সত্তার বিবর্তনে ব্যষ্টি ও সমষ্টির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
- হেগেলীয় রাজনৈতিক কাঠামো: সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের জৈব ঐক্য
- হেগেলীয় স্বাধীনতা তত্ত্ব: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংহতির নৈতিক রূপায়ণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন: জীবনতত্ত্বের আঙ্গিক একত্ব ও উচ্চতর সত্তার সংশ্লেষণ
- হেগেলের আইনতত্ত্ব: পরম সত্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সমাজ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের স্বরূপ: সার্বভৌম নৈতিক সত্তা, বিশ্ব-আত্মার মূর্তায়ন ও পরম লক্ষ্য
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শন: পরম ইচ্ছার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং আইন ও নৈতিকতার সংশ্লেষণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তা: জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক নিয়তি এবং বিশ্ব-আত্মার মূর্ত প্রকাশ
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিবর্তন: সক্রেটিস, হেগেল এবং মার্কসীয় বস্তুবাদী রূপান্তরের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
তথ্যসূত্র
১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৮৬-৩৮৭।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।