শোন ওরে ও শহরবাসী গানটি বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত এই গানটি মূলত ১৯৪৩ সালের (বাংলা ১৩৫০ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ পঞ্চাশের মন্বন্তরের (ইংরেজি: Bengal Famine) পটভূমিতে তৈরি হয়েছিল।
গানটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের ভুল নীতি এবং মজুদদারদের কারসাজিতে বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, ইতিহাসে তা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। সেই সময় গ্রাম থেকে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষ একটু খাবারের আশায় শহরে ছুটে আসত। পথে-ঘাটে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছিল। সেই চরম দুর্দিনের করুণ ছবিই বিনয় রায় এই গানে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গানটির বিষয়বস্তু
গানটিতে দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে থাকা গ্রামবাংলার মানুষের হাহাকার এবং চরম দারিদ্র্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। শহর ও দেশের মানুষরা শুনুন, অভাবী মানুষের আর্তনাদ আজ আকাশছোঁয়া। দেশের মানুষ যদি আজ এক হয়ে এগিয়ে না আসে, তবে দেশকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মা তার সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছে, এমনকি নিজের সম্মানটুকু হারিয়েও অনেকে দুবেলা খাবারের জোগাড় করতে পারছে না—এমন মর্মস্পর্শী বর্ণনা গানটিতে রয়েছে।
আজ লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আমাদের এখন একটাই কাজ হওয়া উচিত—দেশকে বাঁচানো। আপনারা সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার, পোশাক ও অর্থ দিয়ে এই ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। মনে রাখবেন, আজ অন্যের প্রাণ রক্ষা করা মানেই নিজেকে রক্ষা করা। তাই গানটির মাধ্যমে শিল্পী শহরের বিত্তবান এবং সাধারণ দেশবাসীকে ভেদাভেদ ভুলে মানুষের সেবায় এগিয়ে আসার এবং দেশ বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
শোন ওরে ও শহরবাসী গানটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
বিনয় রায় ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) একজন প্রথম সারির সংগঠক ও শিল্পী ছিলেন। তাঁর এই গানটি সেই সময়ে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য অর্থ ও খাদ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রাজপথে গাওয়া হতো, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
গানের কথা
শোন ওরে ও শহরবাসী, শোন ক্ষুধিতের হাহাকার
দেশবাসী না এগিয়ে এলে দেশ বাঁচানো বিষম ভার।
ক্ষুধার জ্বালায় পাগল হ’য়ে, মা বেচে দেয় ছেলে মেয়ে
শেষ সম্বল ইজ্জৎ বেচেও জোটে না ক্ষুধার আহার।
হাজার হাজার লক্ষ কোটি, মরণ পথে চলছে ছুটি
ভেদাভেদ আজ দূর করে নাও, দেশ বাঁচানোর সকল ভার।
অন্ন, বস্ত্র, অর্থ দাও, ক্ষুধিতের সেবার ভার নাও
জনরক্ষা, আত্মরক্ষা, সাহায্য চায় সবাকার।
আরো পড়ুন
- বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি: গীতিকার প্রণব রায়ের জীবন ও সৃষ্টি
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছিলেন সুরের এক চিরভাস্বর নক্ষত্র
- আধুনিক বাংলা গান সমকালের রুচি ও মনন থেকে জন্ম নেওয়া এক অনন্য সুরশৈলী
- এইটুকু এই জীবনটাতে হাসতে মানা, নিষেধের বেড়াজালে বিষণ্ণ হাসির গান
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- এই ঝির ঝির ঝির বাতাসে এই গান ভেসে ভেসে আসে, সেই সুরে সুরে মন নাচে উল্লাসে
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত
- থামো বন্ধু, দাঁড়াও ক্ষণেক থামি হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচিত গান
- হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি, নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী
- নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর
- আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে
- এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি, ডালে ডালে ফোটায় কে আজ বুলিয়ে রঙিন অঙ্গুলি
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই ঘনায় নয়নে অন্ধকার
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- গণসংগীত বা বাংলার প্রতিবাদী গান হচ্ছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জনগণের বিপ্লবী গান
- হোই হোই হোই, জাপান ঐ গানটি বিনয় রায় রচিত একটি বিখ্যাত গণসংগীত
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি বঙ্গদেশ বীর-প্রসবিনী
- নবজীবন তরঙ্গাঘাতে হ’ল বঙ্গভূমি সিঞ্চিতা
- ফিরাইয়া দে, মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে
- আর কতকাল, বলো কতকাল, সইব এ মৃত্যু অপমান
- নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার
- ওগো সুন্দর, মনের গহনে তোমার মূরতিখানি
- বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি উচ্চে তুলেছি মাথা
- তেলের শিশি ভাঙল বলে, খুকুর পরে রাগ করো
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- বাংলা সংগীত হচ্ছে হাজার বছর ধরে চলমান এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের অধিকারী
- ভয় নেই, ভয় নেই, মরণের পাল তুলে জীবন তো আসবেই
- মুক্তিরণের সাথী ওরে মুক্তিরণের সাথী
- এসো মুক্ত করো, মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
- নজরুল গীতি হচ্ছে দেশপ্রেম, প্রেম, ধর্মসংগীতসহ রাগ ধারার গান
তথ্যসূত্র
১. সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত গণসংগীত সংগ্রহ, নাথ ব্রাদার্স, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ নভেম্বর ১৯৯০, পৃষ্ঠা, ১৫২।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।