আলকাপ হচ্ছে গঙ্গা-ভাগীরথী-মহানন্দা অববাহিকার এক অনন্য লোকজ ঐতিহ্য। এটি প্রধানত লোকগান ও লোকনাটকের একটি মিশ্র ধারা। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মুর্শিদাবাদ জেলাকে এই শিল্পের কেন্দ্রভূমি ধরা হলেও নদীয়া, বর্ধমান, বীরভূম, মালদহ, রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলেও এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। মূলত ‘গম্ভীরা’ ও ‘বোলান’ থেকে বিবর্তিত হয়ে এটি নিজস্ব স্বকীয়তায় ‘আলকাপ’ নামে একটি স্বতন্ত্র ধারায় পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের পালাগান হিসেবে এটি আজও বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।[১]
আলকাপের বিভিন্ন সংজ্ঞা
আলকাপ এমন একটি সর্বজনীন শিল্পকলা যেখানে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করেন। আলকাপের বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা পূজা-পার্বণ কেন্দ্রিক নয়; বরং বছরের যেকোনো সময় এর আসর বসতে পারে। তবে সাধারণত কার্তিক-অগ্রহায়ণ থেকে শুরু করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের শুষ্ক সময়েই এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। লোকনাট্যের প্রখ্যাত সমালোচক গৌরীশংকর ভট্টাচার্যের ভাষায়—“আলকাপের ‘কাপ’ অংশটি রঙ্গরসের কৌতুকের দ্যোতক।” গবেষক ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে আলকাপের স্বরূপ:
- রঙ্গরসের আধার: বিশিষ্ট লোকনাট্য সমালোচক গৌরীশংকর ভট্টাচার্যের মতে, আলকাপের ‘কাপ’ অংশটি মূলত হাস্যরস ও সামাজিক কৌতুকের বহিঃপ্রকাশ।
- পাঁচমিশালি আঙ্গিক: মুর্শিদাবাদের নবগ্রাম, কান্দি ও বীরভুমের মুরারই-নলহাটি অঞ্চলে একে ‘ছ্যাঁচড়া’ লোকনাট্য বলা হয়। স্থানীয় শিল্পীদের মতে, হরেক পদের সবজি দিয়ে রান্না করা ‘ছ্যাঁচড়া’র মতোই এই নাট্যে নাচ, গান, অভিনয় ও হাস্যরসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ থাকে।
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের ‘শিবের ভিক্ষা যাত্রা’ অংশেও ‘কাপ’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এর প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য দেয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গলে’ ‘শিবের ভিক্ষা যাত্রা’ অংশে আছে—
কেহ বলে ওই এল শিব বুড়া কাপ।
কেহ বলে বুড়া টি খেলাও দেখি সাপ।।”
এখানে রঙ্গ-ব্যঙ্গকারী অর্থে কাপ শব্দটি ব্যবহৃত। যার উৎপত্তি কাপট্য থেকে। এর অর্থ ছদ্মবেশ বা কৌতুক। প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতিবিদ আশুতোষ ভট্টাচার্য আলকাপের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন—
একপ্রকার গ্রামীণ নাট্যের নাম ‘আলকাপ’। মালদা এবং মুর্শিদাবাদ জেলাতেই তা সমধিক জনপ্রিয়। যদিও অনুষ্ঠানটি ধর্মনিরপেক্ষ তথাপি মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে তা বিশেষ সমাদর লাভ করেছে। আলকাপ পূর্ণাঙ্গ নাটক নয়, তাকে গ্রাম্য জীবন চিত্র ভিত্তিক নাটকীয় নকশা বলা যেতে পারে।
আবার আলকাপের প্রবাদপুরুষ ওস্তাদ ঝাঁকসুর অভিমত ‘কাপ’ ব্যঙ্গ-রসাত্মক নাটক। আর ‘আল’ মানে মৌমাছির হুল। এমন কাপ যার আল আছে। অর্থাৎ আলকাপে লোককে হাসানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি অসঙ্গতিগুলিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ প্রতিবাদের আকারেও তুলে ধরা হয়। সজাগ করে দেওয়া হয় জনসাধারণকে।
আলকাপের পাঁচ অঙ্গ
আলকাপ একটি পূর্ণাঙ্গ লোকনাট্য ধারা, যা পাঁচটি নির্দিষ্ট পর্যায় বা অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। নিচে এর পাঁচটি প্রধান অঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. বন্দনা (আসর বন্দনা):
এটি অনুষ্ঠানের সূচনা পর্ব। এখানে শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে ইষ্টদেবতা, আল্লা-রাসুল বা পীর-পয়গম্বর এবং আসরে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদন করেন। একে ‘আসর বন্দনা’ বা ‘ধূয়া’ গানও বলা হয়।
২. ছড়া:
বন্দনার পরেই একজন মূল গায়ক বা ‘সরকার’ ছড়া পরিবেশন করেন। এই ছড়াগুলো সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে রচিত হয় এবং এতে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি বা উপস্থিত দর্শকদের নিয়ে হাস্যরসাত্মক মন্তব্য থাকে। ছড়াগুলো অনেকটা ছন্দোবদ্ধ পদ্যের মতো।
৩. কাপ (রঙ্গ-কৌতুক):
এটি আলকাপের প্রাণ। ‘কাপ’ মানেই হলো কৌতুক বা প্রহসন। এখানে অভিনেতারা সমাজের নানা অসঙ্গতি, ভণ্ডামি বা পারিবারিক জীবনের মজার ঘটনাগুলোকে নাটকের আকারে ফুটিয়ে তোলেন। গ্রামীণ দর্শকদের নির্মল বিনোদন দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।
৪. বৈঠক (বৈঠকি গান):
কাপের মাঝে বিরতি হিসেবে বা নাটকের মোড় ঘোরানোর সময় বৈঠকি গান গাওয়া হয়। এখানে মূলত প্রেম-বিরহ বা আধ্যাত্মিক গান পরিবেশিত হয়। এটি আসরের গম্ভীরতা ও মিষ্টতা বজায় রাখে।
৫. গান (ছোকরা নাচ ও গান):
আলকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ‘ছোকরা’দের নাচ ও গান। শাড়ি পরে মেয়ে সেজে কিশোর বা যুবকরা জনপ্রিয় লোকগান বা সিনেমার গানের তালে নাচ পরিবেশন করে। এটি আসরকে জমজমাট রাখে এবং সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
আলকাপের উৎস
আলকাপ লোকনাট্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন। এই গানের শুরুতে পরিবেশিত ‘আসর বন্দনায়’ শিব, দুর্গা, সরস্বতী ও শ্যামাসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর স্তুতি করা হয়, যেখানে উভয় ধর্মের শিল্পীরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। আলকাপের আদি স্রষ্টা হিসেবে রাজশাহী শিবগঞ্জের মোনাকয়সার বনমালী সরকার (যিনি ‘বোনাকানা’ নামেও পরিচিত) সর্বজনবিদিত।
আলকাপের উৎপত্তি নিয়ে মূলত দুটি প্রধান অভিমত প্রচলিত আছে:
- বোলবাহি থেকে উৎপত্তি: মালদহ জেলার অনেক শিল্পী মনে করেন, খোট্টা ভাষায় রচিত ‘বোলবাহি’ গানের দ্বৈত সংগীতের সাথে আলকাপের গানের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। তাদের মতে, বোলবাহি থেকেই আলকাপের বিবর্তন ঘটেছে।
- ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন: অন্য একটি জোরালো মতানুসারে, আলকাপের জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কৌশল হিসেবে। ইংরেজ সরকার যখন সভা-সমিতি ও গান-বাজনা নিষিদ্ধ করে, তখন গ্রামের মুক্তিকামী শিল্পীরা বনের ভেতরে গোপনে রাজা-প্রজা সেজে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্রিটিশদের অত্যাচার ও কুকীর্তি তুলে ধরতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলে তারা কৌশলে বলতেন ‘আলকাপ’ করছেন। মালদহের মানিকচকের আলফাজ, রাজশাহীর ভবতারণ সরকার ও বোনাকানা প্রমুখ শিল্পী এই আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এভাবেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে শুরু হওয়া এই নাট্যাঙ্গন কালক্রমে ‘আলকাপ’ নামে লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
আলকাপের নিয়ম কানুন
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর ‘আলকাপ নাট্যরীতি এবং থার্ড থিয়েটার’ প্রবন্ধে আলকাপের এক বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত চিত্র তুলে ধরেছেন। পঞ্চাশের দশকে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং বিহারের পূর্ণিয়া, দুমকা ও সাঁওতাল পরগনার বাংলাভাষী অঞ্চলগুলোতে আলকাপের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল।
আলকাপ দলের গঠন ও পরিবেশনা
একটি পূর্ণাঙ্গ আলকাপ দল গড়তে অন্তত দশজন সদস্যের প্রয়োজন হতো। দলের মূল নেতৃত্বে থাকতেন একজন ‘ওস্তাদ’ বা ‘মাস্টার’। কৌতুক অভিনয়ের দায়িত্বে থাকতেন ‘সঙাল’, ‘সপ্তদার’ বা ‘কপে’। এছাড়া নারী চরিত্রে অভিনয় ও নাচ-গানের জন্য থাকতেন দুজন ‘ছোকরা’। বাদ্যযন্ত্রে হারমোনিয়াম ও তবলাবাদকের পাশাপাশি থাকতেন চারজন ‘দোয়ারকি’ বা দোহার। বিশেষ প্রয়োজনে বাদ্যকর ও দোহারদেরও অভিনয়ে অংশ নিতে হতো।
আসর ও অভিনয়ের ধরন
আলকাপের আসর বসত খোলা জায়গার ঠিক মাঝখানে, যেখানে দর্শকরা চারপাশ ঘিরে বসতেন। প্রথাগত নাটকের মতো এখানে নির্দিষ্ট প্রবেশ বা প্রস্থানের পথ ছিল না। কখনো কখনো দুটি দল প্রতিযোগিতামূলক ‘পাল্লার আসরে’ নামত। দর্শকদের সন্তুষ্ট করতে এই অনুষ্ঠান টানা বারো ঘণ্টা পর্যন্ত চলত। আসরে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়াম, ডুগি-তবলা এবং কয়েক জোড়া খঞ্জনী বা করতাল ব্যবহৃত হতো।
ছোকরা: আলকাপের প্রাণ
দলের প্রধান আকর্ষণ ছিল নাচিয়ে ‘ছোকরা’ এবং কৌতুকাভিনেতারা। ছোকরাদের বয়স সাধারণত বারো থেকে কুড়ির মধ্যে হতো। সুন্দর মুখশ্রী এবং সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী কিশোরদের বারো বছর বয়স থেকেই মেয়েলি চলন-বলন ও নাচের কঠোর তালিম দেওয়া হতো। নারী শিল্পী না থাকায় তাদের সারাক্ষণ ফ্রক, চুড়ি ও লম্বা চুলে মেয়ে সেজে থাকতে হতো। বয়স বেড়ে গেলে এই ছোকরাই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ওস্তাদ বা কমেডিয়ানে রূপান্তরিত হতো।
আলকাপ পালার পরিবেশনা
আলকাপের পরিবেশনা শুরু হয় এক জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। প্রথমেই হারমোনিয়ামের মধ্য সপ্তক বা মুদারা পর্দায় সুর বেঁধে পুরো দল সমস্বরে জয়ধ্বনি দেয়। এই জয়ঘোষণা শুরু হয় দেবী সরস্বতীসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও স্থানীয় পীর-দরবেশের স্মরণের মাধ্যমে। এরপর পর্যায়ক্রমে সংগীত সম্রাট তানসেন, দলের দীক্ষাগুরু, আলকাপের প্রথিতযশা ওস্তাদগণ এবং সবশেষে বর্তমান ওস্তাদের নামে জয়ধ্বনি দেওয়া হয়।
আলকাপ পরিবেশনার প্রধানত দুটি বিশেষ অংশ থাকে: গান ও ছড়া। গানের অংশে সাধারণত রাধাকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক প্রণয়-লীলা বা প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনী অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। অন্যদিকে, ছড়ার অংশে উঠে আসে সমকালীন নানা লঘু ও সামাজিক ঘটনা। এই ছড়া কাটার মাঝপথে গায়ক যখন হাস্যরসাত্মক গান বা ব্যঙ্গকৌতুক পরিবেশন করেন, তখন তাকে বলা হয় আলকাপের ‘রঙ’।
এই বন্দনা পর্বের পর শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান, যার ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- সমবেত বন্দনা: ‘ছোকরা’ হয় এই বন্দনার মূল গায়ক, আর দলের বাকি সদস্যরা দ্রুততালে ‘ধুয়া’ গেয়ে তাকে সঙ্গ দেয়।
- যন্ত্রসংগীত ও নাচ: বন্দনা শেষে কয়েক মিনিট যন্ত্রসংগীতের সুর লহরী চলে। এই সময়ের মধ্যে ছোকরা তৈরি হয়ে আসরে নামে এবং আলকাপের নিজস্ব গায়নরীতিতে খেমটা, টপ্পা বা ঝুমুর গানের তালে নাচ শুরু করে।
- ওস্তাদের ছড়া: ছোকরার নাচের পর ওস্তাদ আসরে নামেন। তিনি আসর, গ্রাম কিংবা সমকালীন দেশীয় পরিস্থিতি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মুখে মুখে ছড়া বেঁধে প্রায় ২০ মিনিট ধরে কবিয়ালদের ঢঙে পরিবেশনা চালিয়ে যান।
- মূল অনুষ্ঠান: ওস্তাদের এই চমৎকার ভূমিকার পরেই শুরু হয় আলকাপের প্রধান আকর্ষণ—’কাপ’ বা নাট্য পালা।
আলকাপ প্রধানত মুসলিম কৃষক সমাজের হাত ধরে বিকশিত হওয়ায় এর নামকরণের সঙ্গেও মুসলিম সংস্কৃতির যোগসূত্র পাওয়া যায়। এটি একটি পুরুষ-প্রধান লোকনাট্য ধারা, যেখানে নারী চরিত্রের কোনো স্থান নেই। দলের মূল আকর্ষণ হলো কিছু সুশ্রী কিশোর বা যুবক, যাদের বিশেষ তালিমের মাধ্যমে নাচ ও গানে পারদর্শী করে তোলা হয়। এরাই নারীসুলভ সাজসজ্জা ও পোশাক পরিধান করে আসরে চিত্তাকর্ষক নৃত্য-গীত পরিবেশন করে, যা আলকাপের আসরকে পূর্ণতা দেয়।
এই শিল্পধারায় অভিনয়ের খাতিরে মুখরোজক মাস্ক বা মুখোশ এবং বৈচিত্র্যময় নাটকীয় পোশাকের ব্যবহার দেখা যায়। মূলত গান, নাচ ও অভিনয়ের এক চমৎকার সমন্বয়ে গঠিত এই আলকাপ বাংলার লোকসাহিত্যের এক অমূল্য উপাদান এবং পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক সঙ্গীতের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আলকাপের বৈশিষ্ট্য
আলকাপের নাটক মূলত ব্যঙ্গ-রসাত্মক হওয়ায় একে ‘সঙ’ও বলা হয়। এর প্রধান উপজীব্য হলো প্রচুর হাস্যকৌতুক এবং সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতি সূক্ষ্ম বিদ্রুপ। এই নাট্যরীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি বা নির্দিষ্ট নাট্যকার নেই। ফলে অভিনেতাদের প্রথাগত সংলাপ মুখস্থ করারও কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।
সাধারণত একটি নির্দিষ্ট গল্পের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে অভিনয় এগিয়ে চলে। আসরের গতিপ্রকৃতি এবং দর্শকদের মেজাজ বুঝে শিল্পীরা তাৎক্ষণিকভাবে সংলাপে পরিবর্তন আনেন। গল্পের খাতিরে বা প্রয়োজন অনুযায়ী অনেক সময় দেশভাগ, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের মতো সমসাময়িক ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও এই লোকনাট্যে অত্যন্ত সহজভাবে উঠে আসে। মূলত তাৎক্ষণিক বুদ্ধি ও সৃজনশীলতাই আলকাপের অভিনয়ের প্রাণ।
মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতে আলকাপের ব্যাপক প্রচলনের কারণে অনেক সময় লোকসংস্কৃতিবিদ বা সাহিত্যিকরা একে ভুলবশত কেবল ‘মুসলিম চাষিদের গান’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটি সত্য যে, এই শিল্পের শিল্পী এবং দর্শক—উভয় ক্ষেত্রেই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রাধান্য বেশি ছিল। তবে এই লৌকিক শিল্পটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। হিন্দু দেব-দেবীর জয়ধ্বনি বা বন্দনাগীতি গাইতে মুসলিম শিল্পীদের যেমন কোনো দ্বিধা ছিল না, তেমনি এই বন্দনাগানগুলোর অনেকগুলোর রচয়িতাও ছিলেন মুসলিম কবিরা।
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘মায়ামৃদঙ্গ’ উপন্যাসটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আলকাপ কীভাবে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে একই মঞ্চে নিয়ে এসেছিল। জাত-পাতের বিভেদ মুছে দিয়ে এটি গ্রাম ও শহরের এক সর্বজনীন শিল্পে পরিণত হয়েছিল, যেখানে মানবিকতা ও শিল্পই ছিল প্রধান পরিচয়।[২]
উনবিংশ শতাব্দীতে মালদহ জেলায় উদ্ভূত আলকাপ সঙ্গীতধারা বিংশ শতাব্দীতে এক বিশাল বিস্তৃতি লাভ করে। এই সময়ে এটি উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর দিনাজপুর এবং বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের গ্রামগঞ্জে এক জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কয়েকজন আলকাপ শিল্পী
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে আলকাপের প্রসারে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের অনেক কিংবদন্তি শিল্পী অবদান রেখেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম ও সংক্ষিপ্ত জীবনী নিচে দেওয়া হলো:
এই ধারার প্রসারে যে সকল শিল্পীদের অবদান অনস্বীকার্য:
- সাবের আলী: বিংশ শতাব্দীতে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর (উত্তর, দক্ষিণ ও অবিভক্ত) এবং মালদহ অঞ্চলে আলকাপ পরিবেশন করে তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর মাধ্যমেই এই গান উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
- জয়চাঁদ সরকার: একুশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে আলকাপ গানকে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি ও তাঁর দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
- বনমালী সরকার (বোনাকানা): তাঁকে আলকাপ গানের আদি প্রবর্তক বা জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি অবিভক্ত বাংলার মালদহ জেলার শিবগঞ্জ থানার (বর্তমানে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ) মোনাকয়সা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গবেষকদের মতে, তিনিই প্রথম এই শিল্পধারাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে তৎকালীন শিল্পী সমাজ তাঁকে আলকাপের স্রষ্টা হিসেবে সম্মান জানাত।
- ভবতারণ সরকার: তিনি আলকাপের ইতিহাসের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী শিল্পী ও ওস্তাদ। তিনিও মোনাকয়সা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় আলকাপকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইংরেজদের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়তে তিনি বিভিন্ন পালা পরিবেশন করতেন।
- আলফাজ সরকার: আলকাপের প্রসারে মালদহ অঞ্চলের একজন অন্যতম প্রধান মুসলিম শিল্পী। তিনি মালদহ জেলার মানিকচক থানার রহিমপুর গ্রামের নিবাসী ছিলেন। ভবতারণ সরকার ও বোনাকানার সমসাময়িক এই শিল্পী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি লৌকিক অভিনয়ের মাধ্যমে ইংরেজদের অন্যায় কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করতেন।
- করুণাকান্ত হাজরা: আধুনিক যুগের একজন বিশিষ্ট আলকাপ শিল্পী। তার আবাস পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা। বর্তমান সময়ে আলকাপ যখন বিলুপ্তির পথে, তখন তিনি এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের আলকাপ শিল্পীদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব।
আলকাপ বর্তমানে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বীরভূম এবং বাংলাদেশের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় একটি সচল লোকনাট্য শৈলী হিসেবে টিকে আছে। এটি নাচ, গান ও হাস্যরসের মাধ্যমে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।
মুর্শিদাবাদ থেকে সংগৃহীত একটি আলকাপ গানের কথা
নারী – আরে ও বন্ধু শোনো মুখের বাণী
চার প্রশ্নের উত্তর দিলে তোমায় আজকে মানি, বন্ধু হে।
পুরুষ – চার প্রশ্ন কেমন কন্যা হে, তুমি বল আমার কাছে,
এ প্রশ্নের উত্তর দেব আজ দশ সমাজের মাঝে কন্যা হে।
নারী – চারিটি কালোর প্রশ্ন দিলাম হে বন্ধু, বল আমার কাছে,
এই চার কালোর উত্তর দিলে যাবো তোমার পাশে বন্ধু হে।
পুরুষ – কাক কালো, কোকিল কালো হে কন্যা, কালো মাথার বেণী,
তার চেয়ে অধিক কালো তোমার চোখের মণি কন্যা হে।
নারী – কালো প্রশ্নের উত্তর পেলাম হে বন্ধু, তাহা কানে শুনি,
চারিটি সাদার উত্তর পেলে তোমায় আমি মানি, বন্ধু হে।
পুরুষ – বক সাদা, বস্তু সাদা, হে কন্যা, আরও সাদা টাকা,
তার চেয়ে অধিক সাদা তোমার হাতের শাঁখা কন্যা হে।
নারী – বেশ উত্তর দিলে বন্ধু হে, আমার শুনে প্রাণটি জুড়ায়,
তিতোর মধ্যে চারিটি তিতোর উত্তর দেওয়া চায়, বন্ধু হে।
পুরুষ – নিম তিতো, নিসিন্ধা তিতো, হে কন্যা, আরও তিতো মহাকাল,
তার চেয়ে অধিক তিতো, দুই সতিনের ঘর কন্যা হে।
নারী – আরও প্রশ্ন আছে বন্ধু হে, বন্ধু বলি তোমার কাছে,
চার মিষ্টির নাম কর এখন আমার পাশে, বন্ধু হে।
পুরুষ – গুড় মিষ্টি, মধু মিষ্টি, হে কন্যা, আরও মিষ্টি চিনি,
তার চেয়ে অধিক মিষ্টি তোমার মুখের বাণী, কন্যা হে।
আরো পড়ুন
- গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর কবি নরোত্তম দাস ঠাকুর রচিত বৈষ্ণব পদাবলী
- আলকাপ হচ্ছে গঙ্গা-ভাগীরথী-মহানন্দা অববাহিকার এক অনন্য লোকজ ঐতিহ্য
- সঙ্গীত হলো নিনাদের বিন্যাস যা রূপ, ঐকতান, সুর, ছন্দের মাধ্যমে সমন্বিত হয়
- তোরসা নদীর ধারে ধারে ওই, দিদিগো মানসাই নদীর ধারে
- শুক-শারী সংবাদ হচ্ছে গোবিন্দ অধিকারী রচিত লোকসংগীত ও বৈষ্ণব পদাবলির গান
- শাহেরা খাতুনের গাওয়া তিনটি মেয়েলী গীত বা সহেলা গীত
- একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি — পীতাম্বর দাসের রচিত বাংলা দেশপ্রেমের গান
- আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও: হীরেন বসুর গানের লিরিক্স ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ
- প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডে ছিলেন আসামের গোয়ালপাড়িয়া লোকগানের রাজকন্যা
- প্রতিমা বড়ুয়ার গান হচ্ছে উত্তরবঙ্গের এমন ধরন যার মূল বিষয় শ্রম, বেদনা, প্রেম
- গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জীবনী ও জনপ্রিয় গানের তালিকা
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের রচিত বাংলা গান হচ্ছে প্রেম, স্বদেশী ও হাসির গান
- অতুলপ্রসাদ সেনের রচিত বাংলা গান হচ্ছে দেশপ্রেম, ভক্তিমূলক ও প্রেমের সংগীত
- গীতিকা বা গাথা হচ্ছে লোকসাহিত্যের সর্বশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবর্গ
- ভাদু মূলত কৃষি বা ফসল তোলার উৎসবকে কেন্দ্র করে আচার অনুষ্ঠানের গান
একটি পালাগানের রূপে পূর্ণ আলকাপ গান ইউটিউবে শুনুন
জয়চাঁদ সরকার ও তার দলের রাজশাহী অঞ্চলের আলকাপ গান
১. অনুপ সাদি, ১৫ জুলাই, ২০২০; রোদ্দুরে.কম, ঢাকা; “আলকাপ গান হচ্ছে উত্তরবঙ্গের বাংলা ভাষার জনপ্রিয় বাংলা লোকসংগীত”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/art/music/alkap-song/
২. শম্পা সাহা, “লোকনাট্য ‘আলকাপ’: হিন্দু-মুসলমান মিলন সেতুর সেকাল-একাল”, সৃষ্টিসন্ধান.কম থেকে pdf ফাইল হতে সংগৃহীত; সংগ্রহের তারিখ, ৯ মার্চ ২০২৬।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚