অবাধ বাণিজ্য (ইংরেজি: Laissez-faire) হচ্ছে রাষ্ট্র বা সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ইচ্ছা দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর নীতি। আর্থনীতিক বিধিব্যবস্থায় অর্থাৎ উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মালিকানা বনাম সরকারি হস্তক্ষেপ সম্পর্কে বিতর্ক দীর্ঘকালের। ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছার ভেতরে বাণিজ্য করবার সাথে এই লেইসে-ফেয়ার নীতি প্রযুক্ত।
অন্য কথায় লেইসে-ফেয়ার হচ্ছে এক ধরণের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে নিজস্ব ব্যক্তিদের মধ্যে লেনদেন যেকোনো ধরণের অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ (যেমন ভর্তুকি বা প্রবিধান) থেকে মুক্ত থাকে। লেইসে-ফেয়ারের আরেকটি মৌলিক নীতি হচ্ছে যে, বাজারগুলি স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত। এটা এমন একটি নিয়ম যা লেইসে-ফেয়ারের প্রাথমিক সমর্থকরা সর্বদা জোর দিয়েছিলেন।
অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে চতুর্দশ লুইয়ের অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে ধ্বনিত অবাধ বাণিজ্যের নীতির আদর্শ ফিজিওক্র্যাট নামে পরিচিত অর্থনীতিবিদরা গ্রহণ করেন। ফিজিওক্র্যাটরা প্রাথমিকভাবে লেইসে-ফেয়ারের সমর্থক ছিলেন এবং “১৭ শতকের ফ্রান্সে গড়ে ওঠা ভয়াবহ এবং পঙ্গু করের নেটওয়ার্ক” বদলিয়ে জমির খাজনার উপর নতুন ধরনের কর আরোপের পক্ষে ছিলেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে শুধুমাত্র জমির উপর কর আরোপ করা উচিত কারণ জমি উৎপাদিত হয় না বরং এটি একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। এই কথার অর্থ হচ্ছে জমির উপর কর আদায় করা হবে, করদাতাদের শ্রম থেকে অন্যান্য করের মতো কর আদায় করা উচিত নয়।
লেইসে-ফেয়ারের সমর্থকরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকে সরকারকে প্রায় সম্পূর্ণ পৃথক করার পক্ষে যুক্তি দেন। যদিও পূর্ণ ধারাবাহিকতার সাথে কখনও অনুশীলন করা হয়নি, অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে অবাধ-বাণিজ্য পুঁজিবাদের আবির্ভাব ঘটে এবং অ্যাডাম স্মিথের “দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস” বইটি এই নীতিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
ইউরোপে, লেইসে-ফেয়ার আন্দোলন প্রথমে ফিজিওক্র্যাটদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল, এই আন্দোলনে ভিনসেন্ট ডি গৌর্নে (১৭১২-১৭৫৯), একজন সফল ব্যবসায়ী থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। ফ্রাঁসোয়া কুয়েসনে-এর (১৬৯৪-১৭৭৪) চীন সম্পর্কিত তাওবাদী ধারণা ‘উ ওয়েই’ থেকে গৌর্নে এই অবাধ বাণিজ্যের ধারনাকে রূপান্তরিত করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
আরো পড়ুন
- অবাধ বাণিজ্য ব্যক্তিগত ইচ্ছা দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর নীতি
- পুঁজিবাদ হচ্ছে মানবেতিহাসে পণ্য সম্পর্কের সামাজিক স্তর
- পুঁজি হচ্ছে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহের একটি
- উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব হচ্ছে মার্কসবাদের অর্থনৈতিক উপাদান
- উদ্বৃত্ত মূল্য কাকে বলে?
- অর্থনীতিবাদ বিরোধী সংগ্রাম হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য
- অর্থনীতিবাদ শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি বাদ দিয়ে আর্থিক দাবি আদায়ের প্রবণতা
আদর্শ ফিজিওক্র্যাটরা সমকালীন মার্ক্যান্টাইলিস্ট অর্থাৎ বাণিজ্যতন্ত্রী অর্থনীতিবিদদের রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনীতি তথা সরকারি ব্যবসাবাণিজ্যের নীতি মানতেন না। ফিজিওক্র্যাটরা মনে করতেন যে রাষ্ট্রের কাজ হলো স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান। অ্যাডাম স্মিথ প্রমুখ ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা সরকারি হস্তক্ষেপ প্রবণতার বিরােধীদের শিবিরকে সংখ্যায় পুষ্ট করেন এবং অদ্যাবধি সমাজতন্ত্রের বিপক্ষ মতাবলম্বীরা অবাধ বাণিজ্য নীতিতে দৃঢ়তার সঙ্গে আস্থাশীল।[১]
তথ্যসূত্র:
১. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২০।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।