রাজনৈতিক অর্থনীতি অধ্যয়নের পরিধি (Scope of the study of political economy) মূলত পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের ঐতিহাসিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শ্রমজীবী মানুষের নির্মম শোষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ইতিহাসের মঞ্চ থেকে কখনো স্বেচ্ছায় বিদায় নেবে না। শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন উপনিবেশসমূহের কৃষক ও শ্রমজীবী মৌলিক জনগণের সাথে মৈত্রীর ওপর নির্ভর করে শ্রমিক শ্রেণি এক বীরত্বপূর্ণ বিপ্লবী সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে। এই সংগ্রামের মাধ্যমেই কেবল পুঁজিবাদের উচ্ছেদ এবং বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করা সম্ভব।
পুঁজিবাদী যন্ত্রের গঠন ও শোষণ প্রক্রিয়া
বর্তমান বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে যে আদর্শিক সংগ্রাম চলছে, তাতে সক্রিয় ও সচেতনভাবে অংশ নিতে হলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ রূপ বোঝা জরুরি। এই পুঁজিবাদী যন্ত্রটি কীভাবে গঠিত এবং কীভাবে এটি পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি কোটি কোটি শ্রমজীবীকে আধুনিক দাসত্বে অবদ্ধ করে রাখে— তা জানা প্রত্যেক সচেতন মানুষের দায়িত্ব।
বহু বছর পূর্বেই কার্ল মার্কস বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে গেছেন যে, পুঁজিবাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিয়মই একে অনিবার্যভাবে সর্বহারা বিপ্লবের দিকে এবং একটি নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিজয়ের দিকে চালিত করে। মার্কস এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন পুঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির এক সামগ্রিক অধ্যয়নের মাধ্যমে এবং পুঁজিবাদের বিকাশ ও অবক্ষয়ের অমোঘ নিয়মাবলী আবিষ্কার করার মধ্য দিয়ে।
রাজনৈতিক অর্থনীতি কী এবং এর গুরুত্ব
এ থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, রাজনৈতিক অর্থনীতি মানব সমাজে কী বিপুল গুরুত্ব বহন করে। ভ্লাদিমির লেনিনের ভাষায়, রাজনৈতিক অর্থনীতি হলো:
“সামাজিক উৎপাদনের বিকাশমান ঐতিহাসিক পদ্ধতিসমূহের বিজ্ঞান।”
মার্কস ও লেনিনের সমস্ত শিক্ষাবলীতে এই বিজ্ঞান এক অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কার্ল মার্কস তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘পুঁজি’ (Das Kapital) গ্রন্থের ভূমিকায় এই বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বলেছেন,
“এই রচনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আধুনিক সমাজের[১] গতির অর্থনৈতিক নিয়ম উঘাটন করা।”
সর্বহারা শ্রেণির মুক্তি ও বুর্জোয়াদের মিথ্যা অপপ্রচার
সর্বহারা শ্রেণিকে তার মুক্তির সংগ্রামে সঠিক দিশা দেখানোর উদ্দেশ্যে মার্কস নিজেকে পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশের নিয়মাবলী আবিষ্কারের কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। লেনিনের মতে:
“একটি নির্দিষ্ট, ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত সমাজের উৎপাদন-সম্পর্কসমূহকে তাদের উৎপত্তি, বিকাশ এবং তাদের অবক্ষয়ের দিক থেকে অধ্যয়ন করাই হচ্ছে মার্কসীয় অর্থনৈতিক শিক্ষাবলীর মর্মবস্তু।”
অন্যদিকে, বুর্জোয়া শ্রেণির সেবাদাস ও বেতনভোগী বুদ্ধিজীবীরা সবসময় প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী সম্পর্কগুলো চিরন্তন আর অপরিবর্তনীয়। তাদের এই অপপ্রচারের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা শ্রমিকদের মগজধোলাই করে বোঝাতে চায় যে, পুঁজিবাদের উচ্ছেদের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। তারা প্রচার করে— পুঁজিবাদের পতন মানেই মানব সভ্যতার পতন এবং কেবল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তিতেই মানব জাতি টিকে থাকতে পারে। তারা পুঁজিবাদের শোষণের নিয়মগুলোকে শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় হিসেবে তুলে ধরে বলতে চায়— চিরকাল এরূপই ছিল এবং চিরকাল এরূপই থাকবে।
মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব ও পুঁজিবাদের অনিবার্য পতন
মার্কস ও লেনিনের সৃষ্ট মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের এই কাল্পনিক স্বপ্নসৌধকে কোনোভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় না। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব নিখুঁতভাবে দেখিয়ে দেয়:
- কীভাবে পূর্বতন সামন্ততান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ থেকে পুঁজিবাদী সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল।
- কীভাবে সময়ের সাথে সাথে এই সম্পর্কগুলো বিকশিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
- কীভাবে পুঁজিবাদের নিজস্ব তীব্র অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো অবশ্যম্ভাবী রূপে তার নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।
এই তত্ত্ব স্পষ্ট করে দেয় যে, পুঁজিবাদ চিরস্থায়ী নয়, বরং এটি বুর্জোয়া শ্রেণির কবর রচনাকারী সর্বহারা শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ঐতিহাসিক সত্য: পুঁজিবাদ চিরন্তন নয়
মানব জাতির প্রকৃত ইতিহাস আমাদের বলে যে, পুঁজিবাদ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না রেখেই মানুষ এই পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে অত্যন্ত সফলভাবে বসবাস করে এসেছে। এর অর্থ হলো, রাজনৈতিক অর্থনীতি পুঁজিবাদী উৎপাদনের যে নিয়মাবলীকে উন্মোচন করেছে, তা কোনো চিরন্তন বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। বিপরীত পক্ষে, এই নিয়মগুলো পুঁজিবাদের আবির্ভাবের সাথে সাথেই উৎপন্ন হয়েছে এবং যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এগুলোর জন্ম দিয়েছিল, সেই ব্যবস্থার ধ্বংসের সাথে সাথে এই নিয়মগুলোও পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
তদসঙ্গে, এর আরও একটি গভীর অর্থ রয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনীতি কেবলমাত্র পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা অধ্যয়নের মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। সমাজের সামগ্রিক বিকাশকে বুঝতে হলে একে অবশ্যই পুঁজিবাদের পূর্ববর্তী যুগগুলো নিয়েও বিস্তারিত অধ্যয়ন করতে হবে।
উৎপাদন-সম্পর্কের দ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রাম
মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি দমনমূলক ও শোষণমূলক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার নিভৃততম কন্দরে গভীরভাবে প্রবেশ করে। এটি পুঁজিবাদী সমাজের শ্রেণি-সম্পর্কের সত্যিকার ও নিষ্ঠুর প্রকৃতিকে উন্মোচন করে দেয়, যা বুর্জোয়া শ্রেণির বেতনভোগী বিজ্ঞ ভৃত্যরা সবসময় কুয়াশাচ্ছন্ন বা আড়াল করে রাখতে চায়।
এই বিজ্ঞান পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের উৎপাদন-সম্পর্কসমূহকে তাদের বিকাশ ও গতির দিক থেকেই অধ্যয়ন করে। মানব সমাজের উৎপাদিকা-শক্তিসমূহ সবসময় একটি সুনির্দিষ্ট উৎপাদন-সম্পর্কের রূপরেখার মধ্যেই বিকাশ লাভ করে। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশ একসময়ে এমন একটা বিন্দুতে পৌঁছায়, যেখানে উৎপাদিকা-শক্তিসমূহ আর পুরনো উৎপাদন-সম্পর্কের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না এবং সেই সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়।
তখন পুঁজিবাদী সমাজের উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্কের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব তীব্র ও গভীর হয়ে ওঠে। এই অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বই সমাজে দৃশ্যমান রূপ নেয় শোষক বুর্জোয়া শ্রেণি এবং শোষণের অবসানের লক্ষ্যে লড়াইরত সর্বহারা শ্রেণির মধ্যকার আপসহীন শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে।
চূড়ান্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অভিমুখ
পরিশেষে বলা যায়, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি মূলত পুঁজিবাদের সেই বিকাশমান দ্বন্দ্বগুলোর ওপর আলোকপাত করে, যা তাকে অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এবং সর্বহারা শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের দিকে চালিত করে।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্কসমূহের মধ্যকার এই অমীমাংসিত বিরোধই সামাজিক বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে। পুঁজিবাদী সমাজ যতই সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং বিকশিত হয়, ততই এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো অনিবার্যরূপে আরও তীব্র ও প্রখর হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত একটি নতুন বৈষম্যহীন সমাজতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে।[২][৩]
আরো পড়ুন
- রাজনৈতিক অর্থনীতি অধ্যয়নের পরিধি ও পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ
- পুঁজিবাদী সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য ও দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার এক গভীর বিশ্লেষণ
- মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির ভূমিকা এক যুদ্ধরত পার্টি বৈশিষ্ট্যধারী শ্রেণি-বিজ্ঞান
- অবাধ বাণিজ্য ব্যক্তিগত ইচ্ছা দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর নীতি
- পুঁজিবাদ হচ্ছে মানবেতিহাসে পণ্য সম্পর্কের সামাজিক স্তর
- পুঁজি কী? সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও সাধারণ অর্থনীতি থেকে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা
- উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব হচ্ছে মার্কসবাদের অর্থনৈতিক উপাদান
- উদ্বৃত্ত মূল্য কাকে বলে?
- অর্থনীতিবাদ বিরোধী সংগ্রাম হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য
- অর্থনীতিবাদ শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি বাদ দিয়ে আর্থিক দাবি আদায়ের প্রবণতা
তথ্যসূত্র ও টিকা (References & Notes)
১. আধুনিক সমাজ বলতে কার্ল মার্কস এখানে মূলত পুঁজিবাদী সমাজকে বুঝিয়েছেন।
২. এ. লিয়নতিয়েভ; মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র, সিরাজুল আনোয়ার অনূদিত, গণপ্রকাশন, ঢাকা; দ্বিতীয় সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃষ্ঠা: ৭-৯।
৩. প্রকাশনার নোট: এই অর্থনৈতিক প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ৮ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে ফুলকিবাজ.কম-এর সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধের মূল ভাব ও তাত্ত্বিক গভীরতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে, লেখাটি নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত এবং আধুনিক এসইও-বান্ধব (SEO-friendly) আকারে আজ ২৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পুনর্মূল্যায়ন করে হালনাগাদ (Updated) করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚