অবরোধ (ইংরেজি: Blockade) হলো সামরিক শক্তির মাধ্যমে কোনো দেশ বা অঞ্চলকে খাদ্য, সরবরাহ, অস্ত্র, যোগাযোগ, এবং কখনও কখনও জনগণকে গ্রহণ বা প্রেরণ থেকে সক্রিয়ভাবে বিরত রাখার কাজ। অবরোধ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (ইংরেজি: Economic sanctions) বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা (ইংরেজি: International sanctions) থেকে আলাদা; সাধারণত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় প্রাকৃতিক বাধার চেয়ে বাণিজ্যের জন্য আইনি বাধাকে বোঝানো হয়। এটি নিরোধ (ইংরেজি: siege) থেকেও আলাদা, নিরোধে সাধারণত একটি দুর্গ বা শহরের উপর অবরোধ করা হয়। অন্যদিকে অবরোধ সমগ্র দেশ বা অঞ্চলের দিকে পরিচালিত হয় এবং উদ্দেশ্য সর্বদা অঞ্চলটি জয় করা নাও হতে পারে।
অবরোধ হচ্ছে শত্রুতাপূর্ণ অবস্থায় শত্রুদেশের বন্দরে প্রবেশ ও বহিরাগমন রোধ করার উদ্দেশ্যে বন্দরের বাইরে যুদ্ধ জাহাজ দিয়ে অবরোধ, যাতে সে দেশে সরবরাহ ও অর্থনৈতিক বিঘ্ন সৃষ্টি করা যায়। নৌবাহিনীকে সমুদ্রে প্রবেশ থেকে বিরত রাখার জন্য শত্রু বন্দরের নিকটবর্তী টহলকেও অবরোধ বলা হয়। যখন উপকূলীয় শহর বা দুর্গগুলি স্থলভাগ থেকে অবরোধ করা হতো, তখন অবরোধকারীরা প্রায়শই সমুদ্রপথও অবরোধ করে রাখত।
আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নিরপেক্ষ কোনো দেশের বাণিজ্য-জাহাজ সে-অবরোধ অমান্য করলে জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার অধিকার থাকে। উক্ত আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ সমস্ত দেশসহ যাবতীয় ক্ষেত্রেই ওই অধিকার প্রযুক্ত হতে হবে।
লন্ডনে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে একটি ঘোষণায় অবরোধের অধিকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সেটা ফলপ্রসূ হয়নি। শান্তিবাদী অবরোধ (pacific blockade) ন্যূনতম হিংসার আশ্রয় নেবার রীতি অনুসৃত হয়; উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ এড়ানো এবং অন্যদেশের জাহাজের যাতে অবরোধে ক্ষতি না হয়। ইতিহাসে বিভিন্ন দেশের অনেক অবরোধের নজির আছে। অনেক সময়ে শান্তি রক্ষার্থে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলি অবরোধের পদ্ধতি প্রয়োগ করে। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে হেগ চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব হতে সালিশির প্রয়াস ব্যতীত ঋণ উশুলের উপায় হিসেবে অবরোধ আইনবিরুদ্ধ। অবরোধ ভূখণ্ডেও হয়ে থাকে।
অতি সম্প্রতি, অবরোধের মধ্যে মাঝে মাঝে বেতার সিগন্যাল জ্যাম করে এবং সমুদ্রের তলদেশের তারগুলি বিচ্ছিন্ন করে ইলেকট্রনিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অবরোধের ফলে প্রায়শই বেসামরিক জনগণের অনাহার দেখা দেয়, বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির অবরোধ এবং নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বিয়াফ্রা অবরোধের সময় অনাহারের ঘটনা ঘটেছিল।
আরো পড়ুন
- নিকারাগুয়ার বিপ্লব হচ্ছে এক সাম্যবাদী আন্দোলন যা সাময়িকভাবে পরাজিত হয়
- মেক্সিকোতে মাওবাদ এবং হাভিয়ের ফুয়েন্তেস গুতিয়েরেসের ভূমিকা
- একাধিপত্য হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য
- আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকার
- আগ্রাসন হচ্ছে কোনো সম্প্রদায়কে উৎখাতের উদ্দেশ্যে গােষ্ঠী বা দেশের আক্রমণ
- ক্যু দেতা হচ্ছে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি অবৈধ এবং প্রকাশ্য প্রচেষ্টা
- অবরোধ হচ্ছে সামরিক শক্তির মাধ্যমে দেশ বা অঞ্চলে প্রবেশ ও বহিরাগমন রোধ
- অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে এক রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উৎস ও চরিত্র
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- আফগান গৃহযুদ্ধ হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রীদের মধ্যকার সশস্ত্র সংগ্রাম
- রাজমহলের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাকে পরাধীন করার অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
চিত্রের ইতিহাস: ভারতের নেপাল অবরোধের প্রতিবাদ, ওয়াশিংটন ডিসিতে ২২ নভেম্বর ২০১৫, আলোকচিত্র: S Pakhrin
তথ্যসূত্র:
১. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১৯-২০।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।