নিকারাগুয়ার বিপ্লব (স্প্যানিশ: Revolución nicaragüense), বা সান্দিনিস্তা বিপ্লব (স্প্যানিশ: Revolución popular sandinista) ছিল একটি সশস্ত্র সংঘাত যা ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ায় সংঘটিত হয়েছিল। এই বিপ্লব বিংশ শতাব্দীর লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যা সেদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসকে বিকশিত করে।[১]
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে সোমোজা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা, ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে স্বৈরতন্ত্রের উৎখাত, এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সরকার এবং কন্ট্রাদের মধ্যে লড়াইয়ের মাধ্যমে এটি শুরু হয়েছিল। এই বিপ্লব দেশটিকে স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম প্রধান ছায়া যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে প্রকাশ করেছিল।
১৯৭৮-৭৯ সালে সোমোজা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রাথমিক উৎখাতের ফলে উভয় পক্ষে অনেক প্রাণহানি ঘটে। এরপর ১৯৮০-এর দশকের কন্ট্রাবিরোধী যুদ্ধে আরও কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয় এবং তীব্র আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যর্থ অর্থনীতি এবং সীমিত সরকারি প্রভাবের কারণে বিপ্লবী ও স্বৈরতন্ত্রী— উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৮০-এর দশকে নিকারাগুয়ার এই বিপ্লবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির একটি ‘সান্দিনিস্তা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট’কে (ইংরেজি: Sandinista National Liberation Front বা FSLN) আর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্যবাদ-বিরোধী প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রা’কে সমর্থন করলে নিকারাগুয়া ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হয়।
১৯৮৮ সালে, সাপোয়া চুক্তির মাধ্যমে একটি শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পরের বছর টেলা চুক্তি স্বাক্ষর এবং স্যান্ডিনিস্তা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট এবং কন্ট্রা সেনাবাহিনীর অসমাবেশিতকরণের (ইংরেজি: Demobilization) পর বিপ্লবী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলে তৎকালীন নিকারাগুয়ার বিস্তৃত পরিসরের জোট ‘জাতীয় বিরোধী ইউনিয়ন’ জয়ী হয় এবং সান্দিনিস্তারা হেরে যায়। সান্দিনিস্তারা ২০০৬ সাল পর্যন্ত নিকারাগুয়ায় ক্ষমতার বাইরে ছিল।[২]
নিকারাগুয়ার ইতিহাস ও বিপ্লব
নিকারাগুয়া মধ্য আমেরিকার একটি ক্ষুদ্র দেশ। এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মত নিকারাগুয়াও স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা নিপীড়িত দেশ ছিল এবং ১৮২১ সালে নিকারাগুয়া জাতীয় স্বাধীনতা লাভ করে। জাতীয় স্বাধীনতা লাভ করলেও নিকারাগুয়ার অর্থনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয় এবং দেশের রেলওয়ে, ব্যাংক, খনিজ সম্পদ সব কিছুই মার্কিন পুঁজি ও মার্কিন কোম্পানী দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।
নিকারাগুয়ার তথাকথিত স্বাধীন সরকার ও সেনাবাহিনীও মার্কিন সরকারের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে এবং মার্কিন সৈন্যও নিকারাগুয়াতে অবস্থান করতে থাকে। এই অবস্থার বিরদ্ধে ১৯২৬ সালে নিকারাগুয়াতে এক বিদ্রোহ আরম্ভ হয়। এই বিদ্রোহের নেতা ছিলেন নিকারাগুয়া দেশেরই এক সেনানায়ক—জেনারেল সিজার অগাস্টো সান্দিনো (General Cesar Augusto Sandino)। দেশে মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে তিনি ৬ বৎসর ধরে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে চলেন এবং সমস্ত ল্যাতিন আমেরিকাতেই তার প্রভাব বিস্তার লাভ করে।
পরবর্তীকালে রুজভেল্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হলে মার্কিন সৈন্য নিকারাগুয়া থেকে চলে যায় এবং সান্দিনো তাঁর গেরিলা যুদ্ধ বন্ধ করেন। কিন্তু মার্কিন সৈন্য চলে গেলেও নিকারাগুয়া সরকার ও তার সেনাবাহিনীর অনেকেই ছিলেন মার্কিন সরকারের প্রভাবাধীন এবং নিকারাগুয়ার ন্যাশনাল গার্ডের সেনাধ্যক্ষ এনাস্টাসিও সোমোজা (Anastasio Somaza) ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। এই ন্যাশনাল গার্ডের চক্রান্তে ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্যাণ্ডিনো নিহত হন। ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাসে সোমোজো দেশের প্রেসিডেন্ট পদ লাভ করেন এবং পরে তাঁর দুই পুত্র পর পর নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সোমোজাদের শাসনকালে সান্দিনোর দলভুক্ত লোকজনের উপর অকথ্য অত্যাচার চলে এবং তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নিকারাগুয়াতে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব স্থাপিত হয়।
সান্দিনিস্তা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট
এই অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে বামপন্থী গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী মতাদর্শে আস্থাশীল স্যান্ডিনিস্তা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গড়ে উঠে। স্বভাবতই এই ফ্রণ্ট ছিল নিকারাগুয়াতে মার্কিন প্রভুত্বের চরম বিরোধী এবং এই ফ্রন্টের অনেকেই সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে আকৃষ্ট হয়। সাম্যবাদীদের প্রভাবও ফ্রন্টে যথেষ্ট ছিল। কিউবার বিপ্লব এবং ভিয়েতনামের যুদ্ধ দ্বারাও এই ফ্রন্টের নেতৃবন্দ বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়।
১৯৭৪ সালে নিকারাগুয়ায় গণতন্ত্র ভাবাপন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্বারা গণতান্ত্রিক মুক্তি ইউনিয়ন (ইংরেজি: Democratic Liberation Union) নামে আর একটি সংগঠন স্থাপিত হয়। এই সংগঠনের মধ্যে কমিউনিস্টদের কোনো প্রভাব ছিল না, কিন্তু নিকারাগুয়ার শাসকগোষ্ঠী এই সংগঠনের সাথেও কোনোরকম বোঝাপড়ায় আসতে রাজী হয় না। গেরিলা যুদ্ধ, ছাত্র আন্দোলন এবং দেশব্যাপী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে সোমোজা সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নিজের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং ১৯৭৫ সালে নিকারাগুয়াতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
জরুরি অবস্থা ষত্বেও আন্দোলন সমান ভাবেই চলতে থাকে এবং সশস্ত্র সংগ্রাম ও সাবিক ধর্মঘটে দেশে অচলাবস্থা দেখা দেয়। ১৯৭৯ সালে সোমোজা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন এবং এফএসএলএন পাল্টা এক অস্থায়ী সরকার গঠন করে তোলে। প্রথমে কোস্টারিকা-তে এই সরকার স্থাপন করা হয় এবং ১৯৭৯ সালের ১৯ জুলাই এই সরকারের সদস্যগণ নিকারাগুয়ার রাজধানী মানাগুয়াতে এসে দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। কিউবা প্রথম এই নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেয় এবং অল্প পরেই এই সরকার সোভিয়েতের স্বীকৃতি লাভ করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বভাবতই এই সরকার সম্বন্ধে বিরূপ মনোভাব গ্রহণ করে এবং অর্থনৈতিক সমস্ত সাহায্য বন্ধ করে দিয়ে এবং এই নতুন সরকারের বিরোধী পক্ষকে নানাভাবে সাহায্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিকারাগুয়ায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবকে বিনষ্ট করতে তখন বদ্ধপরিকর।[৩]
এফএসএলএন-এর নেতৃত্বে গঠিত নিকারাগুয়ার এই নতুন সরকার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার প্রস্তুতিপর্ব সেখানে আরম্ভ করেছিল। ১৯৮৪ সালের নিকারাগুয়ার প্রথম সাধারণ নির্বাচনে, যা মুক্ত এবং ন্যায্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল, সান্ডানিস্তারা সংসদীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং তার নেতা ড্যানিয়েল অরতেগা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন। ১৯৯০ সালে সান্দানিস্তারা মার্কিন ষড়যন্ত্রে পরাজিত হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান প্রশাসন কন্ট্রা বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে নিকারাগুয়ার বিপ্লবকে ধুলিস্মাত করে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় এবং লক্ষ লক্ষ নিকারাগুয়াবাসীকে হত্যা করে।
আরো পড়ুন
- একটি সর্বহারা মিলিশিয়া বাহিনী
- নিকারাগুয়ার বিপ্লব হচ্ছে এক সাম্যবাদী আন্দোলন যা সাময়িকভাবে পরাজিত হয়
- মেক্সিকোতে মাওবাদ এবং হাভিয়ের ফুয়েন্তেস গুতিয়েরেসের ভূমিকা
- একাধিপত্য হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য
- আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকার
- আগ্রাসন হচ্ছে কোনো সম্প্রদায়কে উৎখাতের উদ্দেশ্যে গােষ্ঠী বা দেশের আক্রমণ
- ক্যু দেতা হচ্ছে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি অবৈধ এবং প্রকাশ্য প্রচেষ্টা
- অবরোধ হচ্ছে সামরিক শক্তির মাধ্যমে দেশ বা অঞ্চলে প্রবেশ ও বহিরাগমন রোধ
- অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে এক রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উৎস ও চরিত্র
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- আফগান গৃহযুদ্ধ হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রীদের মধ্যকার সশস্ত্র সংগ্রাম
- রাজমহলের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাকে পরাধীন করার অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২৯ জুন ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “নিকারাগুয়ায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস এবং বিপ্লবের পরাজয়”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/socialist-movement-in-nicaragua/
২. ইংরেজি উইকিপিডিয়া, সংগ্রহের তারিখ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
৩. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ৩৬২-৩৬৪।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।