ক্যু দেতা বা আকস্মিক বিদ্রোহ (ফরাসি: Coup d’Etat, আক্ষরিক অর্থ: ‘রাষ্ট্রের আঘাত’), বা কেবল ক্যু হচ্ছে সাধারণত একটি সামরিক সংস্থা বা অন্যান্য সরকারি অভিজাতদের দ্বারা একজন ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি অবৈধ এবং প্রকাশ্য প্রচেষ্টা। বলা হয়, স্ব-ক্যু (ইংরেজি: Self-coup) তখনই ঘটে যখন একজন নেতা আইনি উপায়ে ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেন।[১]
ক্যু দেতা ফরাসি শব্দ। সাধারণভাবে ক্যু দেতা বলতে বোঝায় সামরিক বা সরকারি শক্তিশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যাঁদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাঁদের উদ্যোগে হঠাৎ বলপ্রয়োগ করে সরকার গঠন করা। বিপ্লবের সঙ্গে তার পার্থক্য হলো যে ক্যু উপর থেকে আরোপিত হয়ে চেপে বসে আর বিপ্লবের পিছনে থাকে জনগণ।
অনুমিত সংখ্যা হিসেবে, ১৯৫০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৪৫৭টি ক্যু দেতার প্রচেষ্টা হয়েছিল, যার অর্ধেকই সফল হয়েছিল। বেশিরভাগ ক্যু প্রচেষ্টা ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হয়েছিল, তবে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি এবং ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকেও প্রচুর সংখ্যক ক্যু প্রচেষ্টা হয়েছিল। স্নায়ু যুদ্ধের ক্যু’র তুলনায় স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ক্যু’র ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যদিও ক্যু এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদকে (ইংরেজি: Authoritarianism) স্থায়ী করে।
অনেক কারণ ক্যু’র দিকে পরিচালিত করতে পারে, সেইসাথে ক্যু’র সাফল্য বা ব্যর্থতাও নির্ধারণ করতে পারে। একবার ক্যু শুরু হয়ে গেলে, ক্যু সফল হয় ক্যুকারীদের ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে যারা অন্যদের বিশ্বাস করায় যে ক্যু প্রচেষ্টা সফল হবে। সময়ের সাথে সাথে সফল ক্যু’র সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় ব্যর্থ ক্যু সম্ভবত কর্তৃত্ববাদী শাসকের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। ক্যু’র ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ভবিষ্যতের ক্যু’র একটি শক্তিশালী ভবিষ্যদ্বাণী, যা “ক্যু’র ফাঁদ” নামে পরিচিত।
“ক্যু-প্রতিরোধ” নামে যা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে, শাসকগোষ্ঠী এমন কাঠামো তৈরি করে যা যে কোনো ছোট গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখল করা কঠিন করে তোলে। এই ক্যু-প্রতিরোধী কৌশলগুলির মধ্যে থাকতে পারে সামরিক বাহিনীতে পরিবার, জাতিগত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর কৌশলগত অন্তর্ভুক্তি এবং সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে ছোট দলে বিভক্ত করা। তবে, ক্যু-প্রতিরোধ সামরিক কার্যকারিতা হ্রাস করে কারণ সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ পূরণের সময় অভিজ্ঞতার চেয়ে আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
ইতিহাসে ক্যুর নজির হলো ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম নেপোলিয়নের, ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে তৃতীয় নেপোলিয়নের কিংবা ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে মুসোলিনির অথবা ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে চেকোস্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্টদের, ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইরাকে সামরিক গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখল। ব্রিটিশ ইতিহাসে অলিভার ক্রমওয়েলের ক্ষমতা দখল একমাত্র নজির।
লাতিন আমেরিকায় প্রায়শই ক্যু ঘটে। ক্যু সংগঠকদের কর্মকৌশল হলো সরকারি বাড়ি, রেলপথ, রেডিও, টেলিভিশন কেন্দ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জলসরবরাহের কেন্দ্র দখল করে সমগ্র ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ জারি করা। ক্যু’র প্রয়াস বহু সময়ে ব্যর্থ হতে দেখা গেছে ।
আরো পড়ুন
- নিকারাগুয়ার বিপ্লব হচ্ছে এক সাম্যবাদী আন্দোলন যা সাময়িকভাবে পরাজিত হয়
- মেক্সিকোতে মাওবাদ এবং হাভিয়ের ফুয়েন্তেস গুতিয়েরেসের ভূমিকা
- একাধিপত্য হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য
- আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকার
- আগ্রাসন হচ্ছে কোনো সম্প্রদায়কে উৎখাতের উদ্দেশ্যে গােষ্ঠী বা দেশের আক্রমণ
- ক্যু দেতা হচ্ছে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি অবৈধ এবং প্রকাশ্য প্রচেষ্টা
- অবরোধ হচ্ছে সামরিক শক্তির মাধ্যমে দেশ বা অঞ্চলে প্রবেশ ও বহিরাগমন রোধ
- অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে এক রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উৎস ও চরিত্র
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- আফগান গৃহযুদ্ধ হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রীদের মধ্যকার সশস্ত্র সংগ্রাম
- রাজমহলের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাকে পরাধীন করার অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আকস্মিক বিদ্রোহ প্রসঙ্গে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/coup-detat/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।