ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রাণী গানের লিরিক্স ও পেছনের গল্প 

বাংলা সংগীত জগতের এক কালজয়ী ও অবিস্মরণীয় সৃষ্টি হলো— ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে, তোমারে করেছে রাণী’। বিরহ এবং প্রেমের এক অনন্য সংমিশ্রণে তৈরি এই গানটি দশকের পর দশক ধরে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে আবেগের এক গভীর জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে। এই অমর সৃষ্টির নেপথ্যে ছিলেন কালজয়ী সব মানুষ। গানটির হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো লিখেছিলেন প্রখ্যাত গীতিকার মোহিনী চৌধুরী এবং এর চিরসবুজ সুরারোপ করেছিলেন কিংবদন্তি সুরকার কমল দাশগুপ্ত। গানটি মূলত প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ জগন্ময় মিত্রের দরাজ কণ্ঠে প্রাণ পেয়ে অমর হয়ে আছে।

গানের বিষয়বস্তু ও পর্যালোচনা:

এই গানটি বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন বিরহী চেতনার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গীতিকার মোহিনী চৌধুরী অত্যন্ত সুনিপুণভাবে একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রেমিকের হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে শব্দে রূপ দিয়েছেন। গানের প্রতিটি চরণে ফুটে উঠেছে না পাওয়ার তীব্র হাহাকার, যেখানে ভালোবাসা একজনকে করেছে ‘ভিখারী’ আর অন্যজনকে আসীন করেছে ‘রাণী’র উচ্চাসনে।

তবে এই সৃষ্টি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এর পেছনের গভীর আবেগ, অনবদ্য গীতিকাব্য এবং সুরের মূর্ছনা গানটিকে সাধারণ গানের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এটি যেন বিরহী হৃদয়ের এক জীবন্ত দলিল বা একটি যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়ের সার্থক মহাকাব্য। শ্রোতারা যখন গানটি শোনেন, তখন মোহিনী চৌধুরীর শব্দ আর কমল দাশগুপ্তের সুরের জাদুতে নিজের অজান্তেই সেই ব্যথার সাগরে ডুব দেন।

১. বৈপরীত্যের নিপুণ চিত্রায়ন: গানের শুরুতেই ‘ভিখারী’ ও ‘রাণী’ শব্দ দুটির ব্যবহারের মাধ্যমে প্রেমিক-প্রেমিকার সামাজিক বা মানসিক অবস্থানের এক বিস্তর ব্যবধান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভালোবাসা এখানে কাউকে সর্বস্ব হারিয়ে রিক্ত করে, আবার কাউকে সম্মানের উচ্চাসনে মহিমান্বিত করে—এই অমোঘ বাস্তবতাই গানটির মূল উপজীব্য।

২. নিভৃত বেদনার হাহাকার: “নয়নের জলে যে কথা জানাই, সে ব্যথা আমার কেহ বোঝে নাই”—এই কালজয়ী পঙক্তিটির মাধ্যমে প্রিয়জনের অবহেলা এবং গভীর একাকীত্বের করুণ সুর ফুটে উঠেছে। জগন্ময় মিত্রের দরদী ও মায়াবী কণ্ঠ এই বিষণ্ণতাকে শ্রোতার হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিয়েছে, যা আজও বিরহী মনকে সমানভাবে আন্দোলিত করে।

৩. প্রকৃতির উপমা ও রূপক: গানে মানুষের অব্যক্ত যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলতে ‘মেঘের মরম’ বা ‘চাঁদ’-এর মতো চমৎকার প্রাকৃতিক উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন আকাশের চাঁদ মেঘের অন্তরের কান্না বুঝতে পারে না, ঠিক তেমনি সমাজ কিংবা প্রিয়জনও প্রেমিকের এই নীরব অশ্রু ও দীর্ঘশ্বাস অনুভব করতে ব্যর্থ হয়। এই রূপকগুলো গানটিকে এক উচ্চমার্গীয় কাব্যিক সার্থকতা দান করেছে।

গানটি ইউটিউবে শুনুন জগন্ময় মিত্রের কণ্ঠে

গানের কথা

ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রাণী
তোমারই দুয়ারে কুড়াতে এসেছি ফেলে দেওয়া মালাখানি
নয়নের জলে যে কথা জানাই, সে ব্যথা আমার কেহ বোঝে নাই
মেঘের মরমে যে মিনতি কাঁদে চাঁদ বুঝিবে না জানি
ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রাণী।

মাধবীলতা গো আজ তুমি আছ ফুলের স্বপন সুখে
একদিন যবে ফুল ঝরে যাবে লুটাবে ধূলির বুকে
খেয়ালী প্রেমের খেলা বোঝা দায়, কখনো হাসায় কখনো কাঁদায়
মুক হয়ে যায় কারও মুখরতা, কারও মুখে জাগে বাণী
ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে তোমারে করেছে রাণী।

উপসংহার: চিরকালীন ঐতিহ্য

এই গানটি আজও বাংলা সংগীতের ‘গোল্ডেন এরা’ বা স্বর্ণযুগের এক অনন্য ও অমলিন দলিল হয়ে টিকে আছে। যদিও পরবর্তী সময়ে বাপ্পী লাহিড়ী কিংবা লতা মঙ্গেশকরের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা বাংলা গানে অসামান্য অবদান রেখেছেন, কিন্তু এই নির্দিষ্ট গানটির ক্ষেত্রে জগন্ময় মিত্রের সেই দরদী গায়কীই এর প্রধান প্রাণশক্তি। তাঁর কণ্ঠের সেই বিশেষ বিষণ্ণতা গানটিকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা আজও অতুলনীয়।

পরবর্তীকালে অনেক জনপ্রিয় শিল্পী (যেমন— কুমার শানু) গানটি নতুনভাবে গেয়েছেন বা ‘কাভার’ করেছেন, যার ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছেও গানটি নতুন করে পরিচিতি পেয়েছে। তবে ১৯৪৬ সালের সেই আদি সংস্করণটিই এর প্রকৃত ঐতিহ্য, আভিজাত্য এবং শুদ্ধ আবেগের ধারক হিসেবে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন দখল করে আছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ৩১ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ১২০ পৃষ্ঠা থেকে।

Leave a Comment