বাংলাদেশের সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে তসলিমা নাসরিন কেবল একজন নির্বাসিত সাহিত্যিক নন, বরং তিনি এদেশীয় তথাকথিত প্রগতিশীলতা ও মুক্তচিন্তার এক মীমাংসিত কষ্টিপাথর। আশির দশকের শেষার্ধ থেকে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী যখন সমাজকাঠামোর মূলে আঘাত হেনেছে, তখনই উন্মোচিত হয়েছে প্রগতিশীল শিবিরের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য। মূলত তসলিমা নাসরিন ও অন্যান্য সংকীর্ণতাবাদী বাংলাদেশের মুক্তমনারা রাজনৈতিকভাবে চরম প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করেছেন; যাঁরা কার্যত জনগণ, গণতন্ত্র ও সার্বভৌম স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে অবতীর্ণ। এই গোষ্ঠী জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের সেবাদাস হিসেবে কাজ করে এসেছে। বর্তমান নিবন্ধের মূল লক্ষ্য হলো—তসলিমা নাসরিনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে যে সংকীর্ণতাবাদ ও গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তার একটি নির্মোহ রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করা। আমরা দেখব, কীভাবে প্রগতিশীলতার বোরখা পরা এই বুদ্ধিজীবী মহল শেষ পর্যন্ত শোষক শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় লিপ্ত হয়ে এক প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের করুণ আখ্যান রচনা করেছে।১
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: বুর্জোয়া সংকীর্ণতাবাদ ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের অনুপস্থিতি
বাংলাদেশের মুক্তমনারা জনগণের পশ্চাৎপদ চিন্তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক অবস্থান না বুঝে এবং তাঁদের শ্রেণিসংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত না করেই স্রেফ ‘বুলিবাগীশ’ হিসেবে নিজেদের হাজির করেছেন। ফলে তাঁরা অনিবার্যভাবে বুর্জোয়া সংকীর্ণতাবাদ এবং হঠকারী সত্য প্রকাশের খপ্পরে পড়েছেন। একজন লেখক যদি অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বুর্জোয়া সংকীর্ণতাবাদী নাস্তিক্যবাদের প্রচারকারীতে পরিণত হন, তবে তাঁর কর্মসমূহ শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধেই চালিত হতে বাধ্য। কারণ, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া এবং আধার ও আধেয়-এর দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক বুঝে অগ্রসর হওয়ার নামই বিজ্ঞান। এর সঙ্গে আরও যুক্ত করা প্রয়োজন যে—বিশ্লেষণ, প্রতি-বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ এবং তার বিকশিত রূপ হিসেবে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে আত্মস্থ করে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো প্রকৃত মার্কসবাদ।
বস্তুনিষ্ঠ বাস্তববোধ বনাম হঠকারী মুক্তচিন্তা: এক ঐতিহাসিক পাঠ
সত্য জ্ঞান হলো সেই প্রজ্ঞা, যা বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বাস্তবতাবর্জিত যেকোনো কর্মকাণ্ড শেষ পর্যন্ত জনগণের কোনো মৌলিক উপকারে আসে না। বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন বাংলাদেশের হঠকারী মুক্তমনারা কি ভেবে দেখেছেন—কেন নিকোলাস কোপারনিকাস (১৪৭৩–১৫৪৩) তাঁর নভোবস্তুর আবর্তন বিষয়ক প্রসিদ্ধ মহাগ্রন্থ ‘On the Revolutions of Heavenly Spheres’ মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে প্রকাশ করেছিলেন? সত্য প্রকাশের জন্য প্রথমত প্রয়োজন বস্তু ও বাস্তবতার নিবিড় বিশ্লেষণ। সেই দুরূহ ও দায়বদ্ধ কাজটি সম্পন্ন না করে, জনগণের পশ্চাৎপদ অংশের ধর্মীয় আবেগকে অবমাননা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল মুক্তমনা, মুক্তচিন্তক ও নাস্তিকেরা গত চার দশক ধরে কেবল নাস্তিক্যবাদ প্রচারে লিপ্ত রয়েছেন। স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে পশ্চাৎপদ জনপদকে উসকে দিয়ে ধর্মের রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি করার পেছনে সাম্রাজ্যবাদ এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। মূলত সেই সাম্রাজ্যবাদী কূটচালেরই ফসল হলেন সালমান রুশদি; আর সেই একই ধারার বাংলাদেশি উৎপাদন হলেন দাউদ হায়দার২ ও তসলিমা নাসরিন।
👉 বাংলা কাব্য-ঐতিহ্যের সহস্র বছরের পরিক্রমায় তসলিমা নাসরিন ও সমকালীন অন্যান্য কালজয়ী কবিদের জীবন ও শিল্পদর্শন সম্পর্কে আরও জানতে আমাদের এই আকর নিবন্ধটি পড়ুন: বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার: প্রধান কবিদের জীবন ও শিল্পদর্শনের আলোকে একটি আকর নিবন্ধ।
অর্থনৈতিক শোষণের নেপথ্য ও নাস্তিক্যবাদের শ্রেণি-চরিত্র
বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের নাস্তিকেরা পুঁজিপতি, কারখানামালিক, কর্পোরেট পুঁজি, লগ্নি পুঁজি, সাম্রাজ্যবাদী ব্যাংক ও বহুজাতিক ব্যাংকসমূহের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শোষণপ্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করে না। তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে কেবল শোষিত জনগণের সাময়িক অজ্ঞতার দিকে। অথচ শোষিতদের কারা সহস্রাব্দ ধরে এই তিমিরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তাও এই নাস্তিকতান্ধরা অনুধাবন করে না। তারা বিস্মৃত হয় যে—‘শ্রমিক জনগণের অন্তহীন শোষণ ও কার্কশ্য যে-সমাজের ভিত্তি, সেখানে বিশুদ্ধ প্রচার মাধ্যমে ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণের প্রত্যাশা বুদ্ধিহীনতার নামান্তর। মানুষের উপর চেপে থাকা ধর্মের জোয়াল যে সমাজমধ্যস্থ অর্থনৈতিক জোয়ালেরই প্রতিফলন ও ফল’৩ এই অমোঘ সত্যটি অস্বীকার করে তারা অতি সহজেই গণবিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়।

‘শ্রমিক জনগণের অন্তহীন শোষণ ও কার্কশ্য যে-সমাজের ভিত্তি, সেখানে বিশুদ্ধ প্রচার মাধ্যমে ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণের প্রত্যাশা বুদ্ধিহীনতার নামান্তর। মানুষের উপর চেপে থাকা ধর্মের জোয়াল যে সমাজমধ্যস্থ অর্থনৈতিক জোয়ালেরই প্রতিফলন ও ফল’— ভি. আই. লেনিন।
গণবিরোধী নাস্তিক্যবাদ: ফ্যাসিবাদের নব্য-সাংস্কৃতিক হাতিয়ার
ফলে এই তথাকথিত নাস্তিকদের গণবিরোধী অবস্থানকে দ্বান্দ্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এই সত্যটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হবে যে—রুশদি বা তসলিমা নাসরিনরা আদতে বুদ্ধিবৃত্তিক ‘টাউট’, যাঁরা বিজ্ঞানবিরোধী, যুক্তিবিরোধী এবং সত্যবিরোধী এক প্রপঞ্চ। এঁরা প্রত্যেকেই পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ভোগবাদ এবং শোষক শ্রেণির লুটতরাজ ও শোষণের বিশ্বস্ত সমর্থক। একইসাথে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের ঘোর বিরোধিতা করতে গিয়ে তাঁরা প্রকারান্তরে ফ্যাসিবাদের একনিষ্ঠ সহযোগী ও দোসর হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। গণমানুষের মুক্তির লড়াইকে পথভ্রষ্ট করাই এই সাম্রাজ্যবাদী এজেন্টদের মূল অভিসন্ধি।
মুক্তবুদ্ধির অপপ্রয়োগ ও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই বাগাড়ম্বরকারী নাস্তিক, মুক্তমনা ও মুক্তচিন্তকেরা নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক’ বলে পরিচয় দেন এবং নিয়মিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বুলি আওড়ান। কিন্তু এই বুলিবাগিশরা কি ভেবে দেখেছেন—কেন বাংলাদেশে প্রতি বছর হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কেন দুর্নীতির সূচক ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী? আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে, গত সাড়ে পাঁচ দশকে এদেশের নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে; তাদের যাবতীয় ‘শুভচিন্তা’ বিলীন হয়ে গেছে লুটতরাজের পদতলে। বাংলাদেশের মুক্তচিন্তক ও মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীরা যেন আজ প্রকৃত শুভচিন্তা ও শুভবুদ্ধির বিপ্রতীপে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
নিঃসন্দেহে মুক্তবুদ্ধি আমাদের বদ্ধচিন্তা ও রক্ষণশীলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে, কিন্তু এর প্রয়োগে পর্যাপ্ত সতর্কতা ও বস্তুনিষ্ঠতা না থাকলে তা অনিবার্যভাবে আত্মঘাতী হতে বাধ্য।৪ বাংলাদেশের এই তথাকথিত মুক্তচিন্তকদের হঠকারী কর্মকাণ্ডের ফলে সমাজে পশ্চাৎপদ বিষয়গুলোতে তীব্র অসহিষ্ণুতা জন্ম নিয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো—মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার এই বাংলাদেশি চর্চাকারীরা প্রকৃত অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যর্থতার মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত না করে, কেবল ‘উপরিকাঠামোর’ (Superstructure) দিকেই তাঁদের অন্ধ অস্ত্র তাক করেছেন। আমাদের তথাকথিত নাস্তিক, মুক্তমনারা কী নিজেদের প্রশ্ন করেছেন,
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে কেন? স্বাধীনতা ব্যর্থ হচ্ছে কেন? এর জন্য কী ধর্মপন্থিরা দায়ী?৫
বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও প্রকৃত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে এদেশের সুবিধাবাদী আমলাতন্ত্র-নির্ভর, সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক রাজনীতি এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজই প্রধানত দায়ী। তাঁদের এই চারিত্রিক নিকৃষ্টতা ও গণবিচ্ছিন্নতা সাধারণ জনগণকে কখনোই তাঁদের অভিমুখে টেনে নিতে পারেনি। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততার বিষয়ে প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক অত্যন্ত নিপুণভাবে লিখেছেন—
মানববাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি মানবীয় আদর্শের ধারক-বাহকেরা যদি নিকৃষ্ট চরিত্রের হয় এবং এ ধারায় নেতৃত্ব যদি নিকৃষ্টতর চরিত্রের হয় তাহলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। সে অবস্থায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলনের চেয়ে মানবীয় আদর্শভিত্তিক রাজনীতির মান উন্নত করার চেষ্টা করাই কল্যাণকর।৬
তসলিমা নাসরিন ও আদর্শিক বৈপরীত্য: লৈঙ্গিক রাজনীতি থেকে সাম্প্রদায়িক শক্তির সখ্য
বাংলাদেশের তথাকথিত মুক্তমনা, মুক্তচিন্তক ও নাস্তিকেরা মূলত নীতিবিবর্জিত ও ভোগবাদী এক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো—এই ভোগবাদী চরিত্রের তসলিমা নাসরিনকে দীর্ঘকাল ধরে সমর্থন জুগিয়ে আসছেন এদেশীয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতাপন্থীরা। ১৯৯২ সালে তাঁর ‘লজ্জা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর যখন ধর্মান্ধগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে, তখন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) তাদের মুখপত্র ‘ভ্যানগার্ড’-এর প্রায় পুরো ২৪ পৃষ্ঠা জুড়ে তসলিমার সমর্থনে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল। সেই সূচনা থেকে আজ অবধি কতিপয় লেনিনবাদ-বিরোধী সংশোধনবাদী গোষ্ঠী তসলিমার পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছে।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস ও তসলিমার রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গুজরাটে দুই সহস্রাধিক মুসলিম নিধনের দায়ে অভিযুক্ত এবং দাঙ্গায় সরাসরি উস্কানিদাতা হিসেবে পরিচিত উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি, তৎকালীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন এবং ভারতের আবাসিক ভিসা লাভ করেছেন।৭ এই হলো তসলিমা নাসরিনের প্রকৃত রাজনৈতিক চারিত্র্য! ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এটাই যে—১৯৯২ সালে বাংলাদেশে যেসব সাম্প্রদায়িক অপশক্তি হিন্দুদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল (যার প্রতিবাদে তিনি ‘লজ্জা’ লিখেছিলেন), আজ সেই একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত অন্য এক উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির (বিজেপি) দরবারেই এই স্বঘোষিত নাস্তিক তসলিমাকে আশ্রয় ও করুণা ভিক্ষা করতে হচ্ছে।
সার্বিক বিচারে বাংলাদেশে তথাকথিত মুক্তচিন্তক, মুক্তমনা ও নাস্তিকদের যাবতীয় তৎপরতার চূড়ান্ত ফল হলো—দ্বিদলীয় বুর্জোয়া ধারার (আওয়ামী লীগ-বিএনপি) ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষা করা। তসলিমা নাসরিন যেমন উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির (নরেন্দ্র মোদি সরকার) কাছে আজ অনুগত, বাংলাদেশের এই নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠীও ঠিক তেমনি ইউরোপীয় চাকচিক্য ও পশ্চিমা নন্দনতত্ত্বের কাছে তল্পিবাহক হিসেবে দাসত্ব করছে। এরা কার্যত সমাজের আমূল পরিবর্তনের বিরোধী এবং সমাজ বিপ্লবের পরম শত্রু। জনগণকে অজ্ঞতার সাগরে নিমজ্জিত রেখে গণমানুষের লড়াইকে ভুল পথে চালিত করতেই এই গোষ্ঠী সর্বাধিক পারঙ্গম।
প্রচলিত দুর্নীতিনির্ভর ও নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রকাঠামোর সেবক হিসেবে বাংলাদেশের এই মুক্তমনারা তাই নিরেট প্রতিক্রিয়াশীল এক শক্তি। মার্কসীয় দর্শনে বুর্জোয়া চিন্তাধারা বলতে তাকেই বোঝায়—যা প্রচলিত শোষক সমাজকে টিকিয়ে রাখার অনবরত অপচেষ্টা চালায়। এই নিরিখে তসলিমা-রুশদি ও তাঁদের অনুসারীদের কর্মকাণ্ড প্রতিক্রিয়াশীলতা হিসেবেই গণ্য। মূলত বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তচিন্তা আজ গণমুক্তির পরিবর্তে কেবল ‘অধর্ম’ ও নাস্তিক্যবাদের এক সংকীর্ণ ও বিভ্রান্তিকর আলাপেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
যারা নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ও সোনিয়ার কংগ্রেস এবং এদেশের ‘লিগেনপি’-কে (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) সম্পূর্ণ পৃথক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখেন, তাঁরা মূলত সমাজের নীতিনির্ধারক শোষকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ যে ঐক্য, তাকেই এক প্রকার বাগাড়ম্বর দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেন। শোষণের কারখানা হিসেবে এই রাজনৈতিক ব্লকগুলোর রূপ যে একই—তা তাদের কর্মকাণ্ডেই স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, বিগত ‘লিগ’ সরকারের তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী ১৪ জুলাই ২০১৪ তারিখে মন্তব্য করেছিল—’দুর্নীতি বন্ধ করতে ইসলাম কায়েম করতে হবে’। সে আরও দাবি করেছিল যে, ‘ইসলাম কায়েম করতে পারলে সহিংস রাজনীতি থাকবে না’।৮
এই ধরনের বক্তব্য আসলে জনগণের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে শোষণের রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, লিগ-বিএনপি কিংবা বিজেপি-কংগ্রেস—উভয়ই হলো জনশোষণের সেই বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র, যার আমূল মূলোৎপাটন ব্যতিরেকে স্বদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রকৃত মুক্তি অর্জন করা কদাপি সম্ভব নয়।
প্রগতিশীলতার ছদ্মাবরণে ধর্মব্যবসা ও মুক্তচিন্তার দেউলিয়াগ্রস্ততা
বিগত চার দশকে বাংলাদেশের তথাকথিত মুক্তমনা, মুক্তচিন্তক ও নাস্তিক্যবাদী গোষ্ঠী সুকৌশলে আওয়ামী লীগকে একটি ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাহির করার নিরন্তর অপপ্রয়াস চালিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এরাই দলটির অঘোষিত রাজনৈতিক প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে এসেছে। একদা দলীয় প্রধানকে প্রকাশ্য ধর্মীয় অনুষঙ্গ—তসবিহ ও মাথায় পট্টি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে এক প্রকার ইসলামি ভাবাদর্শের রাজনৈতিক মেরুকরণ করতে দেখা গেছে। যে দলের ঐতিহাসিক উৎস মূলে রয়েছে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ এবং যাদের রাজনীতির অন্যতম প্রধান কৌশল হলো ‘ধর্মব্যবসা’, সেই দলের পক্ষেই এদেশের প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ‘ফ্যাশনবাজ’ মুক্তচিন্তকরা ক্রমাগত লেখনী উদগিরণ করে ইতিহাসের চাকাকে উল্টোদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছেন।
বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন তাঁদেরই সমর্থিত সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী দাবি করেন—’ইসলাম কায়েম করতে পারলে সহিংস রাজনীতি থাকবে না’, তখন সারা বিশ্বের তথাকথিত ইসলামবাদী শান্তিবাদী রাষ্ট্রগুলোর ‘শান্তির’ স্বরূপ নিয়ে উপহাস করা ছাড়া আর পথ থাকে না। পরিকল্পনামন্ত্রীর এই বাণীর পরে তো প্রতিছাগু৯ মহান মুক্তমনাদের আত্মহত্যা করা লাগবে। আর সেটি তারা করতে না পারলে তাদেরকে শরিয়ার দরিয়ায় সাঁতার দিতে হবে।
বাংলাদেশের এই তথাকথিত ‘মহান’ মুক্তমনাদের একটি ধ্রুব সত্য স্মরণে রাখা প্রয়োজন যে—মাঝে মাঝে দু-একটি লোকদেখানো কথায় সামন্তবাদের বিরোধিতা করলেই প্রগতিশীল হওয়া যায় না। তসলিমা নাসরিনের বিগত কয়েক বছরের রাজনৈতিক গতিবিধি ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় যে, তিনি বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক দল বিজেপির এক উৎকৃষ্ট ‘পণ্যে’ রূপান্তরিত হয়েছেন। এদেশীয় মুক্তমনাদের মনে রাখা জরুরি যে—আওয়ামী লীগকে ‘চুষে’ শেষ পর্যন্ত যেমন মৌলবাদী ইসলামেরই দেখা পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি তসলিমা মার্কা নাস্তিকতাকে ‘চুষে’ পরিশেষে কেবল শিবসেনা, বজরং দল আর বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদেরই সাক্ষাৎ মেলে। এই সুবিধাবাদী ও পশ্চাৎপদ নাস্তিক্যবাদ মূলত গণমুক্তির বদলে এক নতুন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পথই প্রশস্ত করে চলেছে।১০
আরো পড়ুন
- তসলিমা নাসরিন ও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর: মুক্তমনাদের সংকীর্ণতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার ব্যবচ্ছেদ
- বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ ধারার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কালানুক্রমিক পরিবর্তন
- ‘সত্যপীরের পাঁচালি’-র আদি রূপকার: মধ্যযুগের বিস্ময় কবি কঙ্ক
- এনামূল হক পলাশ: সহজিয়া ধারার কবি, লেখক ও বিপ্লবী সংগঠক
- হাসান ফকরী বাংলাদেশের একজন কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
- কবি শামসুল ফয়েজ: সাম্যবাদী জীবনাকাঙ্ক্ষা ও দ্রোহের এক তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর
- অনুপ সাদির কবিতা তুলে এনেছে শ্রমঘনিষ্ঠ রাজনীতির স্বপ্নকাহন
- দোলন প্রভা বাংলাদেশের কবি, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পর্যটক
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- খোন্দকার আশরাফ হোসেন: উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য রূপকার
- কমরেড এম. এ. মতিন — এক আজীবন বিপ্লবী ও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী বুদ্ধিজীবীর জীবনদর্শন
- হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নিরাশার কর্দমে ডুবে থাকা বাঙলার হাহাকারের কবি
- জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- হাজার বছরের বাংলা কবিতা: প্রধান কবিদের জীবন ও শিল্পদর্শনের আলোকে আকর নিবন্ধ
তথ্যসূত্র:
১. লেখাটি ২৪ আগস্ট ২০১৭ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে কিছুটা বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
২. দাউদ হায়দার (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ – ২৬ এপ্রিল ২০২৫) একজন বাংলাদেশি বাঙালি প্রতিক্রিয়াশীল কবি, সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রবিরোধী লেখক ও ও সাংবাদিক।
৩. ভি. আই. লেনিন, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম, ডিসেম্বর ১৯০৫, ধর্ম প্রসঙ্গে, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি., সেপ্টেম্বর ২০০৬, পৃ. ১১। ৪. মুক্তবুদ্ধি ও শুভবুদ্ধি বিষয়ে পড়তে পারেন মুহম্মদ সাইফুল ইসলামের প্রবন্ধ মুক্তবুদ্ধি ও শুভবুদ্ধি, আবুল কাসেম ফজলুল হক, সম্পাদিত লোকায়ত, একবিংশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, মে ২০০৩, পৃষ্ঠা ৭-১৮।
৫. আবুল কাসেম ফজলুল হক, রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ; কথাপ্রকাশ, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৮; পৃষ্ঠা ৯০। আপনারা এই গ্রন্থের ‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার’ নামের প্রবন্ধটি আরো বোঝার জন্য পড়তে পারেন।
৬. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৯৩।
৭. ভারতের আবাসিক ভিসা পেলেন তসলিমা, দৈনিক সমকাল, ৩ আগস্ট ২০১৪, শেষ পাতা, খবরের লিংক: http://www.samakal.net/2014/08/03/76341
৮. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৪ জুলাই, ২০১৪, পরিকল্পনামন্ত্রীর উদ্ধৃতির লিংক এইখানে, http://www.kalerkantho.com/online/national/2014/07/14/106916।
৯. প্রতিছাগু (Counter-goat) হচ্ছে ছাগুদের বিপরীত ছাগু। বাংলাদেশের অন্তর্জাল দুনিয়ায় ধর্মপন্থিদের ছাগু বলা হয়। এই ছাগু নামকরণটি করেছেন কথিত মুক্তমনারা যাদেরকে প্রতিছাগু হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
১০. প্রবন্ধটি সরকার আজিজ সম্পাদিত মে ২০১৫ তে ময়মনসিংহ জং, ষষ্ঠ সংখ্যা, ছোটকাগজের ২১-২৫ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত। উল্লেখ্য প্রবন্ধটির রচনাকাল রচনাকাল: ৬ আগস্ট, ২০১৪। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে লেখাটিকে পরিমার্জন করা হয়েছে। মূল ছবিটি ২২ মার্চ ২০১৮ তারিখে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে টুইটারে করা তসলিমা নাসরিনের পোস্টের স্ক্রিনশট।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚