হুমায়ুন আজাদ ছিলেন নিরাশার কর্দমে ডুবে থাকা বাঙলার হাহাকারের কবি

হুমায়ুন আজাদ (২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ – ১২ আগস্ট ২০০৪) ছিলেন নিরাশার কর্দমে ডুবে থাকা বাঙলার হাহাকারের কবি। তার মতো নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গতাপূজারি মানুষ পাওয়া ভার। আধুনিকতাবাদী কবিদের ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়া তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি ঘোষণা করতে পারেন ‘এ আঁধারে উন্মাদ ও অন্ধরাই শুধু আশাবাদী’। তিনি নৈরাশ্যবাদী ছিলেন এ ব্যাপারে যেমন দ্বিমত নেই তেমনি তিনি আশাবাদদণ্ডিত সাধারণ কাপুরুষের মতোই জীবনধারণ করেননি। ১৯৭১ পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদ-তাড়িত নয়া-উপনিবেশিক আমলে তিনি বিদ্রোহী ছিলেন সমাজের কুসংস্কার-অজ্ঞতা-প্রথার বিরুদ্ধে, কিন্তু বিদ্রোহী ছিলেন না সামাজিক বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে। শূন্যতা আর ব্যর্থতার বিরামহীন কাহিনী লিখে গেছেন তিনি, অথচ আশপাশের লড়াকু বীরদের তিনি চোখে দেখেছেন খুবই কম। উনিশ শতকের মহান বাঙালিদের মতো তিনিও বীরদের উপরে আস্থাশীল ছিলেন, কিন্তু সংঘশক্তিকে দেখেছেন সবরকম অনাস্থার সঙ্গে। এই রকম অবস্থায় তার চিন্তায় ভিড় করেছে রাজনীতি সম্পর্কে ঘৃণা এবং ব্যক্তিবাদ সম্পর্কে উচ্চমূল্যায়ন। তিনি ব্যক্তিবাদের চর্চাকারি এক আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক যিনি সমাজবিপ্লবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীলতার কথা বলতে চেয়েছেন।

আশা আর নিরাশার দ্বন্দ্বে পড়ে নিরাশার দিকে ঝুঁকে হতাশার প্যানপেনে গান গাওয়া ‘হ্বিটগেনস্টাইনের বোতলে আটকে পড়া মাছি’র নাম হুমায়ুন আজাদ। জটিল গাঢ় ধূমায়মান অন্ধকারে আশাবাদী থাকেন লড়াকু শ্রমিক-কৃষকেরা। এই শ্রমিক-কৃষকের রাজনীতির উপরে সারাজীবন আস্থাহীন ছিলেন তিনি। প্রতিটি ন্যায়যুদ্ধে কেন জনগণ অংশ নেয়, বিজয় অবধি কেন তারা লড়াই চালিয়ে যায়, আশা না থাকলে তারা কীসের প্রেরণা নিয়ে বাঁচে ইত্যাদি জটিল প্রশ্নের জবাব ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিতে আমরা তাঁর কাছে পাই না।

হুমায়ুন আজাদের আশাবাদ কোনও ফাটকা ব্যাপার নয়। তাই তিনি বলেন “মানুষকে স্থূলভাবে বাস করতে হয় আশার মধ্যেই; নইলে জীবন নামক সংকট ও নিরর্থকতা মানুষের পক্ষে সহ্য করা হতো অসম্ভব”। শূন্যতার চারদিকে নিজেরই মুদ্রাদোষে বারবার ঘুরে ফেরেন তিনি এবং নিজেকে ভাবতে থাকেন একা একক এক মহীরুহ। শূন্যতার চারিদিকে তিনি শেষ সম্রাট যিনি আরো বলেন,

“শূন্যতাই সঙ্গ দেবে যতো দিন বেঁচে,
আছো, শূন্যতাই পূর্ণ করে রাখবে তোমাকে;
অরণ্যে সবুজ হয়ে বেড়ে উঠবে শূন্যতা, শূন্যতার
অরণ্যে তুমি ঘুরবে একাকী;”

এই শূন্যতার উৎপত্তি শূন্যতা থেকে নয়। আধুনিকতাবাদী কবিদের বৈশিষ্ট্যেই এই শূন্যতা আর হাহাকারের প্রতি মনোবেদনা দেখা যায়। শূন্যতাকে ভালোবাসার জন্য তারা শূন্যতার জয়গান গেয়ে যান। হুমায়ুন আজাদ কী এক্ষেত্রে অনেক পশ্চাৎপদ আধুনিকতাবাদী কবি ছিলেন। যে আন্দোলনের জন্ম ১৮৯০-এর দশকে তার ধারাবাহিকতা বাংলা কবিতায় আজো থামলও না। জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় শূন্যতাকে এতোকাল প্রলম্বিত করে রেখেছেন। এই শূন্যতা এসেছে জনবিচ্ছিন্নতা থেকে, যেমন ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া’ কবিতায় তিনি লিখছেন,

“মানুষ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না; শুধু ভাবি
এতো কুৎসিত কী করে হলও এই জন্তুগুলো প্রত্যেকের মুখে
কী ক’রে জমলো এতো আবর্জনা?… … 
মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভালো; অতিশয় দূরে বেঁচে আছি,
পথের কুকুর দেখে মুগ্ধ হই, দেখি দূরে আজো ওড়ে মুখর মৌমাছি।”

উপরের এই বোধ এক মানববিদ্বেষী কবির, যিনি আসলে মানুষের জন্যই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেছেন। এই বৈপরীত্য নিয়েই তিনি ঘৃণা আর ভালোবাসার ভুল চশমায় মানুষ দেখেছেন। দেখেছেন বিমূর্ত মানুষ যারা আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর জগদ্দল পাথরের ন্যায় চেপে বসে আছে। 

আরো পড়ুন:  বাংলা ছোটগল্প হচ্ছে বিশ শতকে বাংলা ভাষায় রচিত ও চর্চিত গল্পের ধারা

জাতীয়তাবাদ দ্বারা আলোড়িত হুমায়ুন আজাদ লিখে গেছেন বাঙালির জন্য। তার কবিতায় এই বাঙালি ধরা পড়েছে নানা রূপে নানা চেহারায়। কখনো তারা তার ছাত্র, কখনো তারা তার ছাত্রের প্রেমিকা, কখনো এই বাঙালি সানগ্লাস পরা খোকন, কখনো নবম শ্রেণির সালোয়ার-পরা স্বপ্ন। হুমায়ুন আজাদের সমগ্র কবিতাজুড়ে এই বাঙালিরা আছে সদ্য গ্রাম থেকে আসা ঝলমলে সবুজ তরুণ ‘নাসিরুল ইসলাম বাচ্চু’, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, আশির দশকের মোনাফেক মানুষ, বড়োই গরিব আর একান্ত ভিখারি, সামরিক আইনের রক্ষাকর্তা, প্রতিপত্তিশালী গরু আর অতি খ্যাতিমান গাধা, সমকালীন অশুভ দেবতা, সাত কোটি বিপন্ন কোকিলের সুরে গান গাওয়া মুক্তিবাহিনী, বড় বেশি প্রতিক্রিয়াশীল বৃদ্ধরা, দলীয় কবি, জ্ঞানী চাষি আর প্রাজ্ঞ শ্রমিকরূপে অথবা তারা আছে খুব সাধারণ শূন্য শক্তিহীন মানুষসহ আরো বিচিত্ররূপে।

কিন্তু হুমায়ুন আজাদ বাঙালির শ্রেণিগুলোকে নিয়ে মনোযোগ সহকারে মাথা ঘামাননি। তার বাঙালি চরিত্রগুলো যেন শ্রেণিহীন বিমূর্ত বাঙালি। তিনি কী খেপেছিলেন বিত্তশালীদের শঠতায়? কার উপরে এতো ক্ষোভ জমা রাখেন তিনি? যে দেশকে তিনি অভিযুক্ত করছেন এই বলে যে,

“যে তুমি ফোটাও ফুল বনে বনে গন্ধ ভরপুর,
সে তুমি কেমন ক’রে, বাঙলা, সে তুমি কেমন ক’রে
দিকে দিকে জন্ম দিচ্ছ পালে পালে শুয়োরকুকুর।”

এই শুয়োরকুকুর তো ৭১ পরবর্তী লুটপাটকারী উচ্চবিত্ত ও আমলাতান্ত্রিক মুৎসুদ্দি মধ্যবিত্ত। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোথাও তিনি এই লোভী পিশাচ সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত এবং অলস, নিষ্কর্মা রক্তলোলুপ উচ্চবিত্তদের বিরুদ্ধে খেপে উঠেন না। বরং হাহুতাশ করেন কিভাবে তার ‘চোখের সামনে নষ্ট হলো কতো শব্দ, কিংবদন্তি, আদর্শ, বিশ্বাস।’ হুমায়ুন আজাদ দেখলেন ‘বিপ্লব’, ‘সংঘ’, সবচেয়ে রূপসী মেয়েটি, কিংবা ‘আকাশে মাথা ছোঁয়া মুক্তিযোদ্ধারা’ এক দশক যেতে না যেতেই পচে গেল, কিন্তু তিনি দেখলেন না তার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক কারণটি।

এর প্রধান কারণটি আমরা জানি, কারণ মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদীদের পক্ষের লোক হয়ে কবিতা লিখলে পতাকা বা মানচিত্র দেখে বিভ্রান্ত হওয়া সহজ, কিন্তু শ্রমিকের হাতুড়ি ও কৃষকের কাস্তের কাছে ফিরে যাওয়া কঠিন। জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে থাকলে পুঁজির নিয়ম, ব্যবসার শক্তি, মুনাফার কৌশল, দরিদ্রের দর্শন ও দর্শনের দারিদ্র ইত্যাদি নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে। মাথা না ঘামালেও চলে ইতিহাসে জনগণের ভূমিকার শক্তি ও তাদের শ্রেণিযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নিয়ে। বরং তার চেয়ে অনেকগুণে সহজ হয়ে যায় জাতীয়তাবাদী যুদ্ধটির পক্ষে অনবরত লিখে যাওয়ার চেষ্টায়; কিন্তু তাতে শ্রমিক-কৃষক বিরোধী জায়গায় ভূমিকায় নিজের কাজকর্ম পড়লেও মধ্যবিত্তরা বাকবাকুম করবেই। আর মধ্যবিত্তরাই তো কবিতার পাঠক।

হুমায়ুন আজাদের কবিতায় রাজনীতি বিষয়টি প্রথম কবিতাগ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমার (১৯৭৩) থেকেই ভিড় করেছে। ঐ কবিতাগ্রন্থের ‘ব্লাডব্যাংক’ নামক কবিতায় তিনি বাঙলার সব রক্তই যে তীব্রভাবে মাটি অভিমুখী তা জানাচ্ছেন। বাঙলার এই ব্লাডব্যাংক বাঙলার বিদ্রোহকে চিত্রিত করলেও কবিতাটিতে বিদ্রোহের মহত্ত্বকে ফুটানো হয়নি। প্রথম কাব্যগ্রন্থে যে রাজনীতির উল্লেখ শুরু হয়েছিল তা আমরা পাবো তার পরের জ্বলো চিতাবাঘ (১৯৮০), সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে (১৯৮৫), যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল (১৯৮৭) এবং আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে (১৯৯০) কবিতাগ্রন্থে। কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু (১৯৯৮) গ্রন্থে রাজনীতির উপর গুরুত্ব তেমন নেই, বরং গুরুত্ব পাচ্ছে প্রেম, প্রকৃতি, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি যদিও এ-গ্রন্থের প্রায় ৫টি কবিতাতে রাজনীতি আছে। আর সবশেষ কবিতাগ্রন্থ পেরোনোর কিছু নেই (২০০৪) পড়লে আমরা পাবো মাত্র একটি রাজনৈতিক কবিতা কিন্তু এ-গ্রন্থে পাবো থরোথরো প্রেম আর হাজারো অনুভূতির এক মোহগ্রস্ত জগত। প্রথম দুটি কবিতার বইয়ের মতো তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থটিতে রয়েছে প্রেম-প্রকৃতি আর অনুভূতির চিত্রকল্পময় এক বর্ণিল জগত এবং হুমায়ুন আজাদের জগতটি ইন্দ্রিয়ভারাতুর এক জগত যা বারবার রাজনীতির ডামাডোলে পড়ে বিষণ্ণ হয়েছে বলে মনে হবে।

আরো পড়ুন:  বাংলা কবিতা হচ্ছে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতার সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যবাহী ধারা

রাষ্ট্রনীতি যদি হয় শ্রেণির সাথে শ্রেণির সম্পর্ক তবে রাষ্ট্রনীতিকে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই দেখতে হবে। অন্য কোনোভাবে দেখলেই রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতি বিষয়ক বিমূর্ত কথাবার্তা চিন্তায় ভর করবে। একুশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের পোলাপানেরা যে রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতিকে ঘৃণা করে সবকিছু ফাটিয়ে ফেলল, সেই চিন্তার মূলেও কাজ করেছে জনগণকে নিরাজনীতিক করার চক্রান্ত। হুমায়ুন আজাদও নিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁর ‘রাজনীতিবিদগণ’ নামের কবিতাটির প্রধান বিষয় হচ্ছে রাজনীতিবিদগণের প্রতি তীব্র ঘৃণা। মনে হতে পারে রাজনীতিবিদেরা যেন এ-সমাজ বিচ্ছিন্ন কোনো এক পৈশাচিক জীব যাদের কারণে,

“… সমস্ত শহর জুড়ে শুরু হয় খুন, লুঠ, সম্মিলিত অবাধ ধর্ষণ,
ভেঙে পড়ে শিল্পকলা, গদ্যপদ্য; দাউদাউ পোড়ে পৃষ্ঠা সমস্ত গ্রন্থের;
ডাল থেকে গোঙিয়ে লুটিয়ে পড়ে ডানা ভাঙা নিঃসঙ্গ দোয়েল,
আর্তনাদ করে বাঁশি যখন ওঠেন মঞ্চে রাজনীতিবিদগণ।”

এই কয়েকটি লাইনের সহজ অর্থ হচ্ছে রাজনীতিবিদগণ যুদ্ধ বাঁধান, ধ্বংস সাধন করেন। কবিতায় হয়ত অতি সহজেই কারো ঘাড়ে দোষ চাপানো যায়, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা কি বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখবেন না। ‘যুদ্ধ কেন’ নামে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি প্রবন্ধ আছে। রাষ্ট্র যদি হয় শ্রেণিশোষণের হাতিয়ার তবে সেই রাষ্ট্র যখন ভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, কিংবা নিজ জনগণের সাথে যুদ্ধ করে তখন কী শুধু রাজনীতিবিদগণই দায়ি থাকে? যুদ্ধ ও রাজনীতির সমস্যার ক্রমাগত সমাধান না করে ঢালাওভাবে রাজনীতিবিদগণকে দায়ি করা একটি একদেশদর্শীতা। হুমায়ুন আজাদ তাঁর চিন্তায় এই একদেশদর্শীতা ও একতরফাবাদ দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন রাজনীতিকরাই যত নষ্টের মূল। তাঁর একটি কবিতার বইয়েরই নাম হয়ে গেছে সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। এই নষ্টরা মূলত সেই রাজনীতিক যারা গোটা দুনিয়াকে নরকে পরিণত করছে। কিন্তু তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন না সাম্যাকাঙ্ক্ষী কোনো মহান রাজনীতিকের কর্মের বিষয়ে।

হুমায়ুন আজাদ সমাজের অগ্রগতিকে ব্যক্তিগত চেষ্টার দ্বারা ঘটে বলেই বিবেচনা করতেন। কিন্তু ব্যক্তির একক চেষ্টায় খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়, যদিও মহান ব্যক্তিদের প্রভাব ইতিহাসের গতিকে একটু বাড়িয়ে দিতে পারে বৈকি। তাঁর চিন্তার ভেতরে ব্যক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ইত্যাদি ক্রিয়াশীল ছিলো। তাঁর একটি কবিতার নাম ‘হ্যামিলনের বাঁশিঅলার প্রতি আবেদন’ যে কবিতায় তিনি পৌরাণিক গল্পের হ্যামিলনকে আহ্বান করছেন শিশুদেরকে সে যেন নিয়ে যায় ‘উপত্যকা বা পাহাড়ের পবিত্র গুহায়- পৌরপিতাদের পাপ যেন’ তাদের আত্মায় না লাগে, তারা যেন নষ্ট না হয়।

আরো পড়ুন:  On First Looking into Chapman’s Homer কবিতার মূলভাব ও সারমর্ম

হুমায়ুন আজাদের কবিতায় মৃদু শ্রেণিসংগ্রামের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে প্রায় সব কবিদের মতোই তিনিও গরিব মানুষের পক্ষে কিছু বাক্য ব্যয় করেছেন। ‘আমাদের মা’ কবিতায় তিনি পিতৃতন্ত্রের বিপক্ষে লিখছেন। আবার কিছু কবিতায় বিদ্রোহের-বিপ্লবের কথাও এনেছেন। যেমন তৃতীয় বিশ্বের একজন গরিব চাষি প্রশ্ন করছেন ‘দিনরাত লেফ-রাইট লেফ-রাইট করলে ক’মন শস্য ফলে এক গণ্ডা জমিতে?’ তেমনি তাঁর আরেকটি কবিতার নাম ‘রঙিন দারিদ্র’, কবিতাটির পুরোটাই এখানে দেয়া হলও,

আমি ঠিক জানি না
কোন স্বাপ্নিকের কালে বাঙলাদেশে
টেলিভিশন রঙিন হয়েছে।
যার কালেই হোক, তাকে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন
ব’লে মানতেই হবে। টেলিভিশনে
এখন আমাদের দারিদ্রকে
কী সুন্দর, রঙিন, মনোরম দেখায়।

তাঁর কবিতা ‘গরিবদের সৌন্দর্য’ পড়লে দেখবো এই কবিতায় তিনি ঘোষণা করছেন যখন গরিবরা ‘রুখে ওঠে কেবল তখনি তাদের সুন্দর দেখায়’১০। এছাড়াও শ্রমিকদের উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘বন্ধুরা, আপনারা কি জানেন আপনারা শোষণ উৎপাদন করছেন’ শিরোনামের কবিতা, যে কবিতায় তিনি ধর্মঘট, হরতাল, চাকা-বন্ধ করার মাধ্যমে শোষণ মুক্তির ডাক দিয়েছেন। কিন্তু এই কবিতায়ও আমরা দেখবো উৎপাদনের উপকরণগুলোর দখল নেবার এবং সম্পদের সামাজিক মালিকানার পক্ষে তিনি কথা বলছেন না, যেমন অন্য অনেক কবিরাও বলেননি। এইভাবেই অনেক কবিই তাদের মেধাকে শোষণমুক্তির সংগ্রামে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। হুমায়ুন আজাদ আমাদের কাছে সেইটুকুই মনোযোগের দাবিদার যেখানে তিনি গণমানুষের পক্ষে এবং সেটুকুই তাঁর ব্যর্থতা যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন শ্রমিক-কৃষকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্পের অযাচিত চূড়ায়।

তথ্যসূত্র:

১. হুমায়ুন আজাদ, উন্মাদ ও অন্ধরা, জ্বলো চিতাবাঘ, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-৯৭
২. হুমায়ুন আজাদ, আততায়ীদের সঙ্গে কথোপকথন, আগামি প্রকাশনী, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৫; পৃষ্ঠা-৩২
৩. হুমায়ুন আজাদ, শূন্যতা, কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু; কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-২১৫-২১৬
৪. হুমায়ুন আজাদ, মানুষের সঙ্গ ছাড়া, পেরোনোর কিছু নেই, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-২৩৪-২৩৫।
৫. হুমায়ুন আজাদ, যে তুমি ফোটাও ফুল, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-১৬৮।
৬. হুমায়ুন আজাদ, রাজনীতিবিদগণ, কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-২০৪।
৭. হুমায়ুন আজাদ, হ্যামিলনের বাঁশিঅলার প্রতি আবেদন, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-১৮০।
৮. হুমায়ুন আজাদ, তৃতীয় বিশ্বের একজন গরিব চাষির প্রশ্ন, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-১৬৮।
৯. হুমায়ূন আজাদ, রঙিন দারিদ্র, আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে, কাব্যসমগ্র; আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-১৬৮।
১০. হুমায়ূন আজাদ, গরিবদের সৌন্দর্য, যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল, আগামি প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি, ২০০৫; পৃষ্ঠা-১৩৩।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page