গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর, হরি হরি বলিতে নয়নে ব’বে নীর—এই অমর পঙক্তিটি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের অত্যন্ত আবেগঘন ও জনপ্রিয় একটি পদাবলি কীর্তন বা লোকগান। ১৬শ শতাব্দীতে (আনুমানিক ১৫৫০ সাল নাগাদ) প্রখ্যাত বৈষ্ণব সাধক ও কবি নরোত্তম দাস ঠাকুর এটি রচনা করেন। পদটি মূলত ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি ভক্তের একনিষ্ঠ প্রেম, আকুতি এবং শ্রীহরি নাম সংকীর্তনের অপার মাহাত্ম্য তুলে ধরে। বৈষ্ণব ভক্তিমার্গের সাধনায় এই পদটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং যুগের পর যুগ ধরে বিভিন্ন সংকলনে এটি নানা ভাষ্যে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।[১]
গানটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য
গানটির রচয়িতা পদাবলি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নরোত্তম দাস ঠাকুর ১৬শ শতকের একজন বিখ্যাত বৈষ্ণব সাধক এবং মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের ভাবধারার প্রচারক ছিলেন। এই পদে ভক্তের হৃদয়ের গভীর আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। কবি বলছেন— কখন ‘গৌরাঙ্গ’ নাম উচ্চারণ করলে শরীরে রোমাঞ্চ (পুলক) হবে? কখন শ্রীহরির নাম নিতে নিতে চোখে অশ্রু ঝরবে? কবে মন থেকে সমস্ত জাগতিক বিষয়-বাসনা দূর হবে এবং বৃন্দাবনের শ্রীরাধা-কৃষ্ণের রূপ দর্শনের যোগ্যতা তৈরি হবে?
গানটির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হচ্ছে গানটি বৈষ্ণব দর্শনের ‘রাগমার্গ’ ভক্তির কথা বলে। এখানে কেবল বাহ্যিক পূজা নয়, বরং অন্তরের শুদ্ধি এবং গুরু-কৃপা লাভের মাধ্যমে দিব্য প্রেম অর্জনের পথ দেখানো হয়েছে।
কীর্তনটি আজও যে কোনো বৈষ্ণব সমাবেশ, নামসংকীর্তন বা মন্দিরে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গাওয়া হয়। বিশেষ করে নরোত্তম দাস ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম সেরা পদ হিসেবে এটি পরিচিত।
কয়েকটি চরণের ব্যাখ্যা
নরোত্তম দাস ঠাকুরের এই বিখ্যাত পদটি অত্যন্ত গভীর এবং ভক্তিপূর্ণ। নিচে প্রতিটি চরণের (লাইনের) সহজ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
- গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর, হরি হরি বলিতে নয়নে ববে নীর: কবে এমন দিন আসবে যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর (গৌরাঙ্গ) নাম মুখে নিলেই ভক্তিভরে শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠবে এবং ‘হরি হরি’ বলতে বলতে চোখের জল (অশ্রু) ঝরবে? অর্থাৎ, নাম জপ করার সময় হৃদয়ে সত্যিকারের প্রেমের উদয় হবে।
- আর কবে নিতাইচাঁদ করুণা করিবে, সংসার বাসনা মোর কবে তুচ্ছ হবে: নিত্যানন্দ প্রভু (নিতাইচাঁদ) কবে আমার ওপর কৃপা করবেন? তাঁর করুণা লাভ করলে এই মায়াভরা পৃথিবীর জাগতিক লোভ-লালসা ও বিষয়-সম্পত্তির মোহ আমার কাছে অর্থহীন বা তুচ্ছ মনে হবে।
- বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন, কবে মুই হেরব শ্রী বৃন্দাবন: জাগতিক কাম-ক্রোধ ও বিষয়-আসক্তি ত্যাগ করে আমার মন কবে পবিত্র হবে? মন যখন সম্পূর্ণ শুদ্ধ হবে, তখনই আমি প্রকৃত অপ্রাকৃত ‘বৃন্দাবন’ দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করব।
- রূপ-রঘুনাথ পদে হইবে আকুতি, কবে মুই বুঝব সে যুগল পীরিতি: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পার্ষদ রূপ গোস্বামী এবং রঘুনাথ দাস গোস্বামীর চরণে কবে আমার গভীর অনুরাগ জন্মাবে? তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করলেই শ্রীরাধা-কৃষ্ণের সেই স্বর্গীয় ও দিব্য প্রেমের (যুগল পীরিতি) গভীরতা আমি বুঝতে পারব।
- রূপ-রঘুনাথ পদে রহু মোর আশ, প্রার্থনা করয়ে সদা নরোত্তম দাস: নরোত্তম দাস ঠাকুর বিনীতভাবে প্রার্থনা করছেন যে, তাঁর শেষ আশ্রয় বা আশা যেন সবসময় রূপ ও রঘুনাথ গোস্বামীর চরণে থাকে। তাঁদের পথ অনুসরণ করেই যেন তিনি পরমাত্মার দেখা পান।
গৌরাঙ্গ বলিতে হবে ভজনটির কথা
গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর।
হরি হরি বলিতে নয়নে ব’বে নীর।।
কবে নয়ন জলে বুক ভাসিবে
হকৃষ্ণ হকৃষ্ণ বলে।
আর কবে নিতাই চাঁদের করুণা হইবে।
সংসার বাসনা আমার কবে তুচ্ছ হবে।।
বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন।
কবে হাম হেরইব মধুর বৃন্দাবন।।
কবে বা হবে এ জীবনে আমার কবে বৃন্দাবনে প্রবেশিব
হকৃষ্ণ হকৃষ্ণ বলে।।
রূপ রঘুনাথ পদে হইবে আকুতি।
কবে হাম বুঝব সে যুগল পীরিতি।।
রূপ রঘুনাথ পদে রহু মোরে আশ।
প্রার্থনা করয়ে সদা নরোত্তম দাস।।
আমি আর কিছু চাই না,
ওহে নিতাই গৌরহরি আর কিছু চাই না
এজন্মে নয় জন্মে জন্মে আর কিছু চাই না।
সে অবধি কারো গৃহে আর কিছু চাই না।।
এজন্মে নয় জন্মে জন্মে আর কিছু চাই না।।
অন্য আরেকটি লিখিত রূপ
গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর।
হরি হরি বলিতে নয়নে ব’বে নীর।।
আর কবে নিতাইচাঁদের করুণা হইবে
সংসার বাসনা মোর কবে তুচ্ছ হবে।।
বিষয় ছাড়িয়া কবে শুদ্ধ হবে মন।
কবে হাম হেরিব শ্রীবৃন্দাবন।।
রূপ রঘুনাথ পদে হইবে আকুতি।
কবে হাম বুঝব সে যুগল পীরিতি।।
রূপ রঘুনাথ পদে রহু মোর আশ।
প্রার্থনা করয়ে সদা নরোত্তম দাস।।
আরো পড়ুন
- গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর কবি নরোত্তম দাস ঠাকুর রচিত বৈষ্ণব পদাবলী
- আলকাপ হচ্ছে গঙ্গা-ভাগীরথী-মহানন্দা অববাহিকার এক অনন্য লোকজ ঐতিহ্য
- সঙ্গীত হলো নিনাদের বিন্যাস যা রূপ, ঐকতান, সুর, ছন্দের মাধ্যমে সমন্বিত হয়
- তোরসা নদীর ধারে ধারে ওই, দিদিগো মানসাই নদীর ধারে
- শুক-শারী সংবাদ হচ্ছে গোবিন্দ অধিকারী রচিত লোকসংগীত ও বৈষ্ণব পদাবলির গান
- শাহেরা খাতুনের গাওয়া তিনটি মেয়েলী গীত বা সহেলা গীত
- একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি — পীতাম্বর দাসের রচিত বাংলা দেশপ্রেমের গান
- আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও: হীরেন বসুর গানের লিরিক্স ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ
- প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডে ছিলেন আসামের গোয়ালপাড়িয়া লোকগানের রাজকন্যা
- প্রতিমা বড়ুয়ার গান হচ্ছে উত্তরবঙ্গের এমন ধরন যার মূল বিষয় শ্রম, বেদনা, প্রেম
- গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জীবনী ও জনপ্রিয় গানের তালিকা
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের রচিত বাংলা গান হচ্ছে প্রেম, স্বদেশী ও হাসির গান
- অতুলপ্রসাদ সেনের রচিত বাংলা গান হচ্ছে দেশপ্রেম, ভক্তিমূলক ও প্রেমের সংগীত
- গীতিকা বা গাথা হচ্ছে লোকসাহিত্যের সর্বশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবর্গ
- ভাদু মূলত কৃষি বা ফসল তোলার উৎসবকে কেন্দ্র করে আচার অনুষ্ঠানের গান
গানটি নিচে ক্লিক করে ইউটিউব থেকে শুনুন
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ৫ জুলাই, ২০২০; রোদ্দুরে.কম, ঢাকা; “গৌরাঙ্গ বলিতে হবে পুলক শরীর। হরি হরি বলিতে নয়নে ব’বে নীর”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/art/music/gourango-bolite/
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚