‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে কোথা তুমি এসো ফিরে’—বিখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমর সৃষ্টিগুলোর মধ্যে একটি। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী অখিলবন্ধু ঘোষের দরদী কণ্ঠে গাওয়া এই বিরহী গানটি আধুনিক বাংলা গানের ভুবনে এক অনন্য সম্পদ। দীপালি ঘোষের সুরারোপিত এই গানটিতে বর্ষার অন্ধকার রাতে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং গভীর স্মৃতিকাতরতা অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
গানের কথা
শ্রাবণ রাতি বাদল নামে, কোথা তুমি এসো ফিরে—
কেতকী ঝরে পথের ’পরে বাঁধন ছিঁড়ে।।
বেতস বনে বাতাস কাঁদে সে শুধু সুরে বেদন সাধে,
অকূল আঁধার জাগিয়ে মম পরাণ ঘিরে।।
হে মেঘ, জানো কি তুমি প্রিয়া কোথায় আছে,
বিরহ ব্যথা কহিব বলো কাহার কাছে।
বোঝে না সে কি কেন যে কাঁদি,
মালায় বলো কাহারে বাঁধি—
স্মরণে জ্বালা প্রদীপখানি নিভিল ধীরে।।
গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
গানের চরণে বেতস বন, কেতকী ফুল আর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের যে চিত্রকল্প আঁকা হয়েছে, তা বিরহী হৃদয়ের গূঢ় বেদনাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। প্রকৃতির এই অনুষঙ্গগুলোর মাধ্যমে প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আকুলতা এবং একাকীত্বের হাহাকার অত্যন্ত সুচারুভাবে ব্যক্ত হয়েছে।গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় এবং দীপালি ঘোষের সুরে এই গানটি বিরহ এবং প্রকৃতির এক গভীর মেলবন্ধন। এর কাব্যিক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রকৃতি ও বিরহের একাত্মতা: কবিতার শুরুতেই ‘শ্রাবণ রাতি’ এবং ‘বাদল’ বা বৃষ্টির অনুষঙ্গ বিরহের আবহ তৈরি করে। বাংলা সাহিত্যে বর্ষা সব সময়ই অদর্শন ও অপেক্ষার ঋতু। এখানে বাইরের বৃষ্টি আর মনের ভেতরের কান্না মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।
২. প্রতীকী শব্দের ব্যবহার:
- কেতকী ও বেতস বন: ‘কেতকী’ (কেয়া ফুল) ঝরে পড়া এবং ‘বেতস বনে’ (বেত বাগান) বাতাসের হাহাকার কবির একাকীত্ব ও যন্ত্রণার প্রতীক। প্রকৃতির এই চঞ্চলতা আসলে কবির অস্থির মনেরই প্রতিফলন।
- বাঁধন ছিঁড়ে: কেতকী ফুল যেমন বৃন্তচ্যুত হচ্ছে, কবির জীবনের ছন্দ বা প্রিয়তমার সাথে বাঁধনও তেমনি ছিঁড়ে গেছে।
৩. অকূল আঁধার ও শূন্যতা: ‘অকূল আঁধার’ বলতে এখানে শুধু রাতের অন্ধকার নয়, বরং প্রিয়জনহীন জীবনের দিশাহীনতাকে বোঝানো হয়েছে। এই অন্ধকার কবির ‘পরাণ’ বা প্রাণকে ঘিরে ধরেছে, যা চরম একাকিত্বের প্রকাশ।
৪. মেঘের কাছে আকুতি: কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর মতো এখানেও মেঘকে বার্তাবাহক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। কবি মেঘের কাছে জানতে চেয়েছেন তাঁর প্রিয়া কোথায় আছে। এই জিজ্ঞাসার মধ্যে এক ধরণের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে।
৫. স্মৃতির দহন: শেষ চরণে ‘স্মরণে জ্বালা প্রদীপখানি নিভিল ধীরে’ অংশটি অত্যন্ত মরমী। প্রদীপ সাধারণত আশার আলো দেখায়, কিন্তু এখানে স্মৃতির দহনে সেই আশার আলোটুকুও নিভে যাচ্ছে। প্রিয়তমার স্মৃতি এখন আর সুখের নয়, বরং তা জ্বালা বা যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল উপজীব্য: গানটি মূলত বিপ্রলম্ভ শৃঙ্গার বা বিরহ রসের। প্রকৃতি এখানে শুধু পটভূমি নয়, বরং কবির বেদনার একজন নীরব সাক্ষী ও সহমর্মী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
আরো পড়ুন
- পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে একফালি চাঁদ: কালজয়ী এক বাংলা গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- শিপ্রা নদীর তীরে সন্ধ্যা নামে: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও অখিলবন্ধু ঘোষের এক অমর সৃষ্টি
- গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমূল্য সৃষ্টি: অখিলবন্ধু ঘোষের ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’ গানের সার্থকতা
- একটি দুটি তারা করে উঠি উঠি: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এক অমর সৃষ্টি
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
গানটি অখিলবন্ধু ঘোষের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে
১. লেখাটি ২৮ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ২৪ পৃষ্ঠা থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।