পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই যার দ্বন্দ্ব নেই। এমনকি প্রাণহীন বস্তু বলতে যা বুঝি দেখি উপলব্ধি করি, সেগুলোও প্রাণের অস্তিত্বের অংশীদার। সে অর্থে দ্বন্দ্ব স্বাস্থ্যকর। অনেকে দ্বন্দ্ব আর বিরোধ দুটোকে এক অর্থে ব্যবহার করেন। অথচ দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের পার্থক্য আকাশপাতাল। বিরোধ বিরোধী বিরোধিতা—এগুলো জবরদস্তি; কিন্তু দ্বন্দ্ব স্বাভাবিক।
তো এসব শব্দ কথা, শব্দের ব্যবহার, কথার উচ্ছ্বলতা, ভাষায় স্বকীয় বিকাশের ক্ষেত্রে বন্ধুর কেন? কারণ, শরীরটা বাংলাদেশে, মনটা ইউরোপে, প্রাণটা ইউএসএ। ফলে রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্রে বারবার ফিরে যেতে হয়। ফিরে যেতে হয় মধুসূদন দত্তের কালে।
দেশপ্রেম যার আছে থাক, যার নাই—না থাক; মানুষ তো! কিন্তু দুপায়া প্রবঞ্চক হওয়ার কী দরকার! কবি সাহিত্যিক কখনো কখনো রাজার সান্নিধ্য পান, সান্নিধ্যে থাকেন; খুবই ভালো কথা। ঐ সান্নিধ্যের কালে চাটাচাটিটা ভালো কথা না, ভালো দেখায়ও না।
“বাঙলা ভাষা সপ্তাহ” নামে মুহম্মদ আবদুল হাই-এর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের আইয়ুব খানের কালে যে নীরব বাংলা ভাষা বিপ্লব হয়েছিল, তারই ফলাফল স্বাধীন বাংলাদেশ। অতএব, ভাষার শক্তি অপরিমেয়। ভাষার বিবর্তন আরও গভীরে। কবি সেই বিবর্তনের বাহক। কবিতা সেই বিবর্তনের রূপায়ন।
অনুপ সাদি’র কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে আমি ভাষা ব্যাকরণের দ্বারস্থ হতে চাই না। কেননা, বৈয়াকরণবিদ ভাষার ছেলেমানুষি গ্রহণ করেন না। এ জন্যে ছন্দ অলংকার উপমা উৎপ্রেক্ষা অনুপ্রাস খুঁজে বের করা হতে বিরতি নিলাম।
অনুপ সাদি “পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশগতি” কাব্যগ্রন্থে নিজের দেহমনকে উপস্থিত করছেন এভাবে—
“শুধু গভীর রাতে হঠাৎ ঘুমের মধ্যে টের পাই
অবয়বহীন আমি ভেসে ভেসে
চলেছি আমার খুলি ও কংকাল হাতে
নিয়ে শূন্যতার পথে বেঁচে থাকার সন্ধানে।”
(দেশ বিচিত্রা)
“শূন্যতার পথে বেঁচে থাকার সন্ধানে” মানে কি? মানে দুর্ভিক্ষে কবলিত বাংলাদেশে একজন লোক অন্নাভাবে ক্ষুধার যন্ত্রণায় মগজহীন খুলি মাংসপেশীহীন কংকাল নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন। অবশ্য, আজকাল ঘুমানোর বড়ি, না ঘুমানোর ট্যাবলেট, এয়ারকন্ডিশন ওয়াশরুমের আয়োজনে বাংলা একাডেমি এশিয়াটিক সোসাইটি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র শিল্পকলা একাডেমি সজ্জিত করা হয়েছে। যেনো শুধু রাতে কেনো, দিনের বেলাতেও কবি সাহিত্যিকেরা একটু আরাম করে কুকুরের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। এবং তাই হচ্ছে। কবিরা এখন বলে না, “ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো।”
অনুপ সাদির কবিতা একেবারেই সাধারণ। এই সাধারণ হওয়ার ভেতর থাকে না অসাধারণ খ্যাতির মোহে ডুবে পুরস্কারের আশায় ঘুরে বেড়ানোর আয়োজন। ফলে ছন্দবদ্ধ রাজকবি হয়ে শাসকের দৃষ্টি আকর্ষণের খেয়াল বর্জনের কারণে মানুষের মুখ মুখের রেখা, মানুষের চোখ চোখের দৃষ্টি দেখা যায় অনুভব করা যায়। হা, গাছপালা কীটপ্রাণ শূন্য বায়ু এসবই মানুষ আয়োজনের অংশীদার। এবং “আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ” বাক্য বস্তুবাদী দর্শনে কার্ল মার্কস আর ফ্রিডরিখ হেগেলের চটি বইয়ের পাতা উল্টে অস্বীকার করতে পারেন না।
মানুষের দীর্ঘ শ্রম অসম দুর্গতি সীমাহীন প্রাণের আকাঙ্ক্ষার ফলাফল সভ্যতার এই আয়োজন। এই শত শত হাজার হাজার লক্ষ কোটি বছরের আয়োজন এখন লুটেরাদের হাতে কুক্ষিগত। এর সহায়কও এই দোপায়া সুবিধাবাদী সুবিধাবাদীভোগী প্রবঞ্চকেরা। ফলে মানুষ স্বস্তির নামে যে শান্তি প্রত্যাশা করেছিল, তাকে বারবার লুট হতে সহায়তা করে বারবার লুটেরারাই। “কিল্লার মোড়ে চিল্লা মারে হায়েনা শয়তান” কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“শুধু পতাকার স্বাধীনতা নিয়ে কেউ একজন মনে মনে কাঁদে
আর মোটাভূঁড়ি লোকগুলো বিদেশি চক্রবলয়ে যোগাযোগ রেখে
সারা গায়ে দুহাতে মাখে সুশোভিত শান্তির তেল
আর কুটুম্বিতা পাতে ভিনদেশি ব্যবসায়ীর সাথে।”
পরশ্রীকাতরতা বাঙালি স্বভাব। বাঙালির স্বভাবেই বাঙালি! আচরণে বিলেতি হতে না পেরে বলে, আমি বাংলাদেশী; অথচ গায়ে বাঙালি গন্ধ ঘামে। কাক কখনো কোকিল হয় রঙ কালো হলে? একজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর স্বভাবেই বাঙালি। অথচ বর্তমান বড়ই কুটিল। অনুপ সাদি “উন্মাদনামা” কাব্যগ্রন্থে লিখেন—
“এসে গেছে টাকার যুগ, বিদেশি ডলারের যুগ
বিদেশি গাছের ব্যবসা রমরমা
তাই দেশি হরিতকি গাব কড়ইয়ের বদলে
এসে গেছে ইপিল ইপিল, ইউক্যালিপটাস, রেইনট্রি
ইত্যাকার সাম্রাজ্যবাদী গাছ;
হারালো শালিক দোয়েল মাছরাঙা
এলো বিদেশি কুকুর, ডগ স্কোয়াড
আর স্বদেশী ঠাকুরের অবস্থা ভালো নয়,
ভূষি পেয়েই খুশি দেশি দালালেরা
তাদের মাঝে ইয়েস বস, জ্বি হুযুর;”
পাঠ একটি প্রধান বিষয়, যদি কেউ পাঠক হন। যদি কেউ দুই বছর হতে আট বছরের শিশু মনের অধিকারী হন। না হয় পাঠ সময়ক্ষেপনমাত্র। আর বাংলাদেশের মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রধান উপাদান হচ্ছে এই সময়ক্ষেপন করা। এজন্য প্রয়োজন শিশুকাল হতে কৌতূহলী অনুসন্ধিৎসু মন গঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই কৌতূহলী অনুসন্ধিৎসু মন গঠনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বরং আমাদের শিক্ষাক্রম, শিক্ষা পদ্ধতি এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যাতে কোনো হালারপো কোনোদিন কৌতূহলী অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে গড়ে উঠতে না পারে। অনুপ সাদি’র “উন্মাদনামা” তারই সাক্ষী। যে গ্রন্থে তিনি কবিতাকে স্লোগানস্বরূপ মানবমনের সীমাবদ্ধতার সংকীর্ণ চিত্রের মুখোশ উন্মোচনের মধ্যদিয়ে নতুন এক আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেছেন।
এই বাঙালিদের মধ্যে বহু শুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে নিজের উন্নতির কথা না ভেবে ইউরোপ আম্রিকা যায় হোটেল বয়ের কাজে, টেক্সি চালাতে, সুইপার হতে। অথচ নিজেদের উন্নতির তাগিদে কেউ কৃষক মজুর শ্রমিক হতে ডিগ্রীর সনদে লজ্জা লাগে। যদিও বিদেশ গিয়ে নিম্ন শ্রেণির জীবনযাপন করে। এতে দেশ পরিণত হচ্ছে মূর্খের খোয়াড়ে। ফলাফল, মূর্খরাই দেশ শাসন করে। তবুও অনুপ সাদি স্বপ্ন দেখেন—
“যে নেতা এখনো আছে আমাদের অনুভবে,
যে বাড়েনি ভোরের আলোর মতো,
যে মিশেছে জনতার সাথে,
যে চিহ্ন রেখে চলে গেছে নিজের গন্তব্যে,
সেই তাকে আমি দেখতে চাই হাজারো মানুষের ভিড়ে;”
রাষ্ট্র পরিচালনায় যখন অযোগ্য ব্যক্তিরা আসেন তখন জনগণের ভোগান্তির নাভিশ্বাস টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে নাগরকদের স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটে। আর এর প্রথম শিকার হন জিজ্ঞাসুরা; তারপর শিশু, কিশোর, তরুণ, বালিকা— সবাই। আর এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকেন প্রত্যেক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী জঙ্গি আর্মিরা। পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হচ্ছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে পালিত আর্মি বাহিনী বিলুপ্ত করা। কেননা, গোটা দুনিয়ার অশান্তির মূলেই এই আর্মি ও অস্ত্র। অনুপ সাদি তার “আমার হৃদয় কোনো দেয়াল মানে না” কাব্যগ্রন্থে আর্মিদের তৎপরতার বর্ণনা করেছেন এভাবে—
“জরুরি খবর আমরা রাত এগারটার আগেই জানলাম
এসেছে শক্তিধরের পুরনো হুকুম
হাঁটবে না রাস্তা, হাঁটা নিষেধ
তোমার প্রিয় পথটি জলপাই রঙের দখলে
তোমার প্রিয় হাতব্যাগটি ছিনিয়ে নিল জলপাই রঙ ট্রাক
তোমার প্রিয় মাঠে এখন অস্ত্রধারী খেলা করে;”
(জরুরি নির্দেশ: এক)
আইনস্টাইন বলতেন, কতগুলো মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন লেফট-রাইট, লেফট-রাইট করার মতো মগজহীনতা পৃথিবীতে আর কিছু নেই।
অনুপ সাদি “জরুরি নির্দেশ: দুই” লিখছেন—
“আজ সন্ধ্যা সাতটা হতে বাংলাদেশ অন্ধকার,
আজ সন্ধ্যা আটটা হতে কর্মক্ষেত্রে তালা,
আজ সন্ধ্যা সাতটা হতে সাঁঝবাতি জ্বালাবে না কেউ, …
প্রতিদিন যেখানে বসতাম আমরা সন্ধ্যায়,
সেখানে আজ হতে সেনাক্যাম্প লেফট-রাইট,”
যে কোনো ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন রোমান্স মুহূর্তে দাঁড়িয়ে পূ্র্বরাগের উপস্থিতি টের পান। অনুভব করেন বংশগতির আকাঙ্ক্ষা। আমরা স্বাভাবিকভাবে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যে আকর্ষণ অনুভব করি, তাকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলছেন কামনাবাসনা!
রোমান্টিকতা কাব্যের আরেক সৌন্দর্য। “বৃষ্টির ফোঁটায় আসে আমাদের ঠোঁটে ঠোঁটে কবিতাগান” কাব্যগ্রন্থে আমরা সেই প্রেমবার্তা দেখতে পাই—
“তোমার সাথে ইচ্ছে করে হাজারো কথা বলতে
সারাটা পথ ইচ্ছে করে তোমার সাথে চলতে”
“আমরা দুজন হারাবো না মাঝপথে
যাবো তাদের কাছে
যারা আজও ভালোবাসার স্বপ্নে বেঁচে আছে।”
“আমরা দুজনে গতকাল সারাদিন ঘুরেছি রাজপথে….
আমরা দুজনে কথা বলেছি মিছিলে স্লোগানে
আমরা দুজনে কথা বলেছি স্বপ্নের স্নিগ্ধ শিহরণে….”
(সমতা আর আমি, আমরা দুজনে)
মহাপ্রলয়ের পরবর্তী শান্তাবস্থার প্রকাশই কবিতা। অবশ্য মহানন্দভাবও কবিতায় প্রকাশ হয়ে থাকে। তবে উৎকৃষ্ট শব্দগুচ্ছের অপূর্ব গাঁথুনিকে কেউ কেউ কবিতা বলে থাকেন। তাতে সারবস্তু খুঁজে পাওয়া যায় কি? প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষের ভাবের আদানপ্রদানের ফলাফলই বর্তমানের এতো আয়োজন। অর্থাৎ নৃত্য সঙ্গীত চিত্রকলা কবিতা গল্প,—যা আমরা কালচার হিসাবে উপস্থিত করতে চাই, তার মূলই হচ্ছে ভাব এবং ভাবের প্রকাশ।
এখন এই ভাব এবং ভাবের প্রকাশের কি কোনো সীমাবদ্ধতা আছে? কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন আছে কী? কবিতা বলতে কি বুঝতে পারি? এমন প্রশ্নও উত্থাপন জরুরি। এবং এসব প্রশ্নের মীমাংসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অতীব জরুরি। আমরা যদি কালচারকে রাজনীতির বাইরের অংশ মনে করি; এবং সাহিত্যকে বিজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করি, তাহলে পৃথিবীতে কালচার বা সাহিত্য সংস্কৃতি বলতে যে সৌন্দর্যবৃত্তি মানব কল্পনায় বিরাজ করে, সেই মাধুকরী বৃত্তির দ্রুত বিলুপ্তি ঘটবে।
“মনোজগতে মঙ্গা উপরিকাঠামোতে লেহেঙ্গা” কাব্যগ্রন্থে প্রেমের আকুতি শুনতে পাই—
“আকাশে হালকা দুটুকরো সাদা মেঘ, বরুফে সৌন্দর্য
অসভ্য চাঁদের আলো আমাকে দিলো উৎসবের জয়যাত্রা,
আজ কোজাগরি পূর্ণিমা, আজ প্রেমিক ও প্রেমিকার
সতেজ আবেগের পূর্ণতার মতো আন্দোলিত রাত,
আমার গভীরে একটি সত্য হানা দিলো, মনস্কামনা
এক বুকে মাথা রেখে ঘুমোতে চাই,…
তোমাকেই বলছি শোনো, জাগো; ব্যাকুল ইন্দ্রানী,
ইন্দ্রও এ জীবন এতবেশি ভালোবাসেনি।”
(কোজাগরি পূর্ণিমায় আকাঙ্ক্ষার রাত)
“যিনি কবি তিনি সৎ হবেন,”—এমন একটি ভাবনা অদৃশ্যে ছড়ানো আছে। পৃথিবীতে সৎ বলতে কী বোঝায়, তারও কোনো মাপকাঠি নেই। মহাকবি কালিদাস, উইলিয়াম শেকসপিয়র, লিও তলস্তয়, চার্লস ডিকেন্স, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ এমন অনেক বিখ্যাত কবির জীবন পর্যালোচনা করতে আমরা শুধু অসততা পাবো না, দূর্নীতিবাজ বলে, শোষিত বলেও এদের চিহ্নিত করা যায়। যেমন কালীদাস রাজকবি, তিনি রাজার স্তুতি গাবেন। উৎপাদন করবে রাজার নিয়োজিত পেয়াদা দ্বারা চাবুকের আঘাত খাওয়া কৃষকগণ।
উইলিয়ম শেকসপিয়র জীবিকার প্রয়োজনে শহরে এসে মানুষের স্বভাবের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে তার পরিবারের শিশুরা? ফেরদৌসী বাদশার স্তুতি করতেন। তলস্তয় সারাজীবন জমিদারী ভোগ করে শেষ জীবনে এসে প্রজাদের দান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ গরীব দুঃস্থ কৃষকদের খাজনা আদায় করতেন!! বঙ্কিম এক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম। তিনি কৃষকদের দুর্গতি তুলে ধরতে পত্রিকা প্রকাশ করলেন।
সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে উপমহাদেশের এলিট শ্রেণি। এই এলিট শ্রেণি মোগল শাসনের পর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন পর্যন্ত যে শিক্ষা পেয়েছে, সে শিক্ষা আধুনিক নয়। ইংরেজ ভারতবর্ষে শিক্ষার নামে যে মাদক বীজ ছিটিয়ে গেছে তার নাম প্রতারণা। ফলে এই শিক্ষা অর্জন করা প্রায় সবাই প্রতারক। বাংলাদেশ এবং ভারতের এলিট তথা শিক্ষিত শ্রেণি আপাদমস্তক ভদ্রপ্রতারক।
একজন জীবনানন্দ দাশ ইংরেজ কর্তৃক আরোপিত শিক্ষাব্যবস্থার যাঁতাকলে নিমজ্জিত হয়ে সারাজীবন একটা বিশুদ্ধ চাকরির সন্ধান করেছিলেন। তিনি প্রতি মুহূর্তে ভারতবর্ষের শিক্ষিত শ্রেণি দ্বারা প্রতারিত হতে হতে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
অতএব, সততা বলতে পৃথিবীতে কিছুই নেই। কবি হতে সততার কোনো দরকার নেই; শুধু প্রয়োজন অনুভব উপলব্ধি বিচারবিবেচনাবোধ—প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানবোধ। তবে একজন কবি খুনি হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের খুবই উপকার হয়; —অন্ততঃ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হয়। কারণ, শোষণ পীড়ন অপেক্ষা খুন নিরাপদ।
এক্ষেত্রে সুকান্ত ভট্টাচার্যের দ্বারস্থ হই—“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি”।
এখন সভ্যতা বলতে বোঝায়, গরীব তুমি গরীব থাকো—ধনী তুমি শোষণ বন্ধ করো না। সভ্যতার কথা ছিলো মানুষের বাঁচার অধিকার হবে সমান। এখন সভ্যতা শিখিয়েছে, তোমরা খাবার উৎপাদন করো আর আমরা টাকার কল বানিয়ে বিনিময়ের নামে আরাম করে খারাম। আমাদের আরাম, তোমাদের ব্যারাম; আমাদের সেক্স, তোমাদের বংশগতি; আমাদের আনন্দ, তোমাদের মৃত্যু…।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রায় সকল পর্যায়ের সাংস্কৃতিক কর্মী এবং কবিদের সংকীর্ণ মনে একটা চাকুরির সন্ধানই জীবনের উদ্দেশ্য!! ফলে মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় এরা রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলের ইচ্ছা পূরণে ব্যস্ততম জীবন অতিবাহিত করেন।
বাংলাদেশের লোকজন সাধারণত ভাত খায়। পাকিস্তান আফগানিস্তানের জনগোষ্ঠী রুটিতে অভ্যস্ত। ফলে বাংলাদেশের একজন কবির ভাত খাওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ মানুষরূপী এই গিনিপিগের দেশে কবিসাহিত্যিক শিল্পীরা উন্নত জীবনের লক্ষ্যে সূক্ষ্ম চিন্তার যে বৃহৎ সমাহারের স্বপ্নে সুদূর অতীতে যে নির্মোহ জীবন কাটিয়েছিলেন, সেই সৌন্দর্য সেই তিলোত্তমাকে হত্যা করেছে এই রাষ্ট্রের নষ্ট রাজনীতি। এই অবস্থায় যেখানে কবি সাহিত্যিকের প্রধান কাজ খুনি হওয়া, সেখানে কবিরা হচ্ছেন দলদাস। অনুপ সাদি’র আত্মক্ষরণ সেখানেই। তাঁর কবিতা ছন্দবদ্ধ আবৃত্তিকারের মঞ্চায়নের তামাশা নয়; বরং এক একটি বক্তব্য।
আরো পড়ুন
- অনুপ সাদির কবিতা: সাহিত্য ভ্রমের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক
- অনুপ সাদির কবিতায় দ্রোহ, স্বদেশ ও বিশ্বমানবের জয়গান
- একজন গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠের পঞ্চাশ: অনুপ সাদিকে নিয়ে আমার ভাবনা
- অনুপ সাদি ও সমকালীন মার্কসবাদ: একজন সবিশেষ কর্মীর জীবন ও দর্শন
- চিন্তক অনুপ সাদি: সমাজ বিশ্লেষণ ও মানুষের লড়াইয়ে এক অবরুদ্ধ সময়ের কবি
- সমাজ বিপ্লব ও প্রগতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর অনুপ সাদি
- সুবিধাবাদমুক্ত দ্রোহের শিল্প ও গণমানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা: উন্মাদনামা
- কাব্যের কোমলতা ও বক্তব্যের কঠোরতা: অনুপ সাদির ‘উন্মাদনামা’ গ্রন্থে শ্রেণি ঘৃণা ও দ্রোহ
- রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বুননের বিদ্রুপ কবিতাগ্রন্থ ‘উন্মাদনামা’
- অনুপ সাদির কবিতা তুলে এনেছে শ্রমঘনিষ্ঠ রাজনীতির স্বপ্নকাহন
- কবি অনুপ সাদি বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সমাজের মূর্ত ছবি আঁকেন
রচনাকাল: ফেব্রুয়ারি-মার্চ, ২০২৬

লোকমান ফরাজী বাংলাদেশের কবি, লেখক, ও উপন্যাসিক। তিনি ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ ( The Outspoken Daily) পত্রিকায় দীর্ঘদিন সম্পাদকীয় ও অনলাইন বিভাগে কাজ করেন। তার প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে — অকবিতা (২০০৯), রুখে দাঁড়াবি কবে (২০১০) ও সীমাবদ্ধতার সীমালঙ্ঘন (২০১১); গল্পগ্রন্থ — রুগ্ন সমাজ এবং উপন্যাস — তোমাকে ভালোবসে (২০১০)। তিনি ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৮৫ তারিখে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।