মহাকবি কালিদাস ছিলেন একজন ধ্রুপদী সংস্কৃত লেখক

কালিদাস (দেবনাগরী: कालिदास; ৪র্থ-৫ম শতাব্দী) ছিলেন একজন ধ্রুপদী সংস্কৃত লেখক যাকে প্রায়শই প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার এবং পালাকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর নাটক ও কবিতা মূলত বেদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণ ভিত্তিক। তার তিনটি নাটক, দুটি মহাকাব্য এবং দুটি ছোট কবিতা কালের গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন কবিদের মধ্যে বাল্মীকিবেদব্যাসের পরেই নাম করা হয় মহাকবি কালিদাসের। ইদানিং কালে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গবেষকগণ ও এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে পৃথিবীতে সর্ব দেশে সর্বকালে যত কবি আবির্ভূত হয়েছেন মহাকবি কালিদাস তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে স্থান পাবার যোগ্য। কালিদাসের কাব্যই তাকে এই দুর্লভ গৌরবের অধিকারী করেছে।

কাল পরিক্রমার দরুন, কালিদাসের ব্যক্তিগত জীবন এবং তার কাল সম্বন্ধে খুব অল্পই জানা সম্ভব হয়েছে। ভারতে ও বাংলাদেশে কালিদাস সম্বন্ধে লোকশ্রুতিতে অনেক গল্প প্রচলিত। কিন্তু কেবল লোকশ্রুতি নির্ভর করে কোনো মানুষের জীবনচরিত জানা যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হয় না।

মহাকবি কালিদাসের জীবনচরিত

মহাকবি কালিদাসকে নিয়ে যেসব কাহিনী, কথা ও কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে তাতে এরকম একটা ধারণা স্পষ্ট হয় যে নিতান্ত অজ্ঞ অবস্থা থেকে তিনি নিজের চেষ্টায় কবি প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

কালিদাস শিপ্রা নদীর কুলে উজ্জয়িনী নগরের কাছে বাস করতেন। তার এমনই জ্ঞান বুদ্ধির বহর যে কাঠের সন্ধানে গাছে উঠে, যে ডালে বসতেন তারই গোড়া কাটতে শুরু করতেন। কাটা ডালের সঙ্গে একসময় যে তাঁকেও মাটিতে ছিটকে পড়তে হবে সেই সামান্য বোধটুকুও নাকি তার ছিল না।

বাস্তবে যাই হোক, ঘটনাচক্রে এই কালিদাসের সঙ্গে এক বিদুষী রাজকন্যার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের রাতেই রাজকন্যা তার স্বামীর মুর্খতার পরিচয় পেয়ে গেলেন। সকালে তিনি অপমান করে কালিদাসকে তাড়িয়ে দিলেন।

বোকা এবং অজ্ঞ হলেও স্ত্রীর কাছ থেকে অপমান পেয়ে কালিদাস যে খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন তা বলাই বাহুল্য। তিনি রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে নদীর ধারে গিয়ে বসলেন। নদীর পাথর বাঁধানো ঘাটে মেয়েরা জল নিতে আসে।

আরো পড়ুন:  অনিল ভট্টাচার্য ছিলেন বিশতকের গীতিকার, সুরকার

সে সময় কেবল দিন শুরু হয়েছে। ঘাটে গ্রামের মেয়েদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। কালিদাস খেয়াল করলেন, ঘাটের উপরে একটি পাথর ক্ষয় হয়ে গেছে। মেয়েরা জল তুলে কলসীটা কাঁখে তুলে নেবার আগে ওই পাথরে একবার রাখে। কলসীর এই সামান্য ছোঁয়াতেই পাথর ক্ষয় হয়ে গেছে।

এরকম দৃশ্য কালিদাসের বোধোদয় ঘটাল। তার হঠাৎ মনে হল, তাহলে তো চেষ্টা করলে তিনিও নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। বিদ্যাবুদ্ধি নেই বলেই আজ তাকে অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হতে হয়েছে। এখন থেকে চেষ্টা করলে তার পক্ষেও বিদ্যা অর্জন করা অসম্ভব নয়।

অপমানের প্রতিক্রিয়া থেকেই কালিদাস বিদ্যাশিক্ষায় ব্রতী হলেন এবং দীর্ঘ দিনের শ্রম, একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় বলে তিনি রামায়ণ, মহাভারত, অন্যান্য পুরাণ, ছন্দ, অলঙ্কার প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করলেন। সেই যুগে রামায়ণ এবং মহাভারতের বাইরে সংস্কৃত সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা লিখিত হয়নি। কালিদাস স্থির করলেন, তিনি কাব্য রচনা করবেন। সেইভাবে চেষ্টা করতেই তাঁর ভেতরের সুপ্ত কবিত্ব প্রতিভা জেগে উঠল।

একের পর এক তাঁর কলম থেকে কবিতার মত ছন্দে সৃষ্টি হলো অভিজ্ঞান শকুন্তলম, রঘুবংশম, কুমারসম্ভবম, মেঘদূতম প্রভৃতি অসাধারণ রচনা। এ সকল জনশ্রুতি ছাড়া কিছুই নয়। তবে একটিমাত্র জনশ্রুতি পন্ডিতদের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছে। সেটি হলো কালিদাস বিক্রমাদিত্যের রাজসভার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি ছিলেন।

ছোট এই সূত্রটিই মহাকবি কালিদাসের জীবনকাল নির্ণয়ের একমাত্র সহায়ক হয়ে উঠেছে। ভারতের পণ্ডিতগণ মনে করেন যে খ্রিস্ট পূর্ব ৫৭ অব্দে বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকালে কালিদাস বেঁচে ছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, ঐতিহাসিকগণ উক্ত সময়ে কোনো বিক্রমাদিত্যের সন্ধান পাননি। অথচ লোকশ্রুতি বলে, সম্রাট বিক্রমাদিত্যেরই নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন ছিলেন মহাকবি কালিদাস।

ভারতের ইতিহাসে শকারী বিক্রমাদিত্য নামে যিনি খ্যাত হয়ে আছেন তিনি শক আক্রমণকারীদের বিতাড়ন করে শকারী নাম গ্রহণ করেছিলেন ৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি তার ছয়শো বছর পূর্ববর্তী কালকে আরম্ভ ধরে নিজের নামে ভারতবর্ষে বিক্রমাব্দ প্রতিষ্ঠা করেন।

আরো পড়ুন:  সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের এই মত বিচারে টিকল না। কেননা, পঞ্চম শতকে পশ্চিম ভারত গুপ্তসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাজেই ষষ্ঠ শতকে হূণ বিতাড়নের প্রশ্ন অবান্তর। এই শতকের গোড়ায় যিনি হূণদের ভারত থেকে বিতাড়িত করেছিলেন, তিনি কোনো বিক্রমাদিত্য নন। তার নাম যশোবর্মন বিষ্ণুবর্মন।

পন্ডিতগণ মনে করেন যে, গুপ্তযুগের চরম সমৃদ্ধি যার রাজত্বকালে সম্ভব হয়েছিল, তিনি হলেন সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৩ খ্রিঃ)। ইনিই বিক্রমাদিত্য উপাধি গ্রহণ করেছিলেন এবং রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে উজ্জয়িনীতে স্থানান্তরিত করেছিলেন। কবি কালিদাস ছিলেন এই বিক্রমাদিত্যেরই সভাকবি। ইনি সম্ভবত বিক্রমাদিত্যের পুত্র কুমারগুপ্ত (৪১৩-৪৪৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং তার পুত্র স্কন্দগুপ্তের কালেও বর্তমান ছিলেন।

কালিদাস রচনাবলী

প্রাচীন ভারতের সাহিত্য রচিত হয়েছে সংস্কৃত ভাষায়। মহাকবি কালিদাসের রচনা সংস্কৃত সাহিত্যের কাব্য গীতিকাব্য ও নাটক এই তিনটি ধারাকেই পুষ্ট ও সমৃদ্ধ করেছে। কালিদাসের রচিত গীতিকাব্য মেঘদূত, মহাকাব্য কুমারসম্ভব এবং রঘুবংশ এবং নাটক অভিজ্ঞান শকুন্তলম, মালবিকাগ্নিমিত্র এবং বিক্রমোর্বশী। অপর একটি গীতিকাব্য ঋতুসংহার সাধারণ ভাবে তার রচনা বলে স্বীকৃত হলেও কেউ কেউ ভিন্নমত পোষণ করেন। এছাড়াও কালিদাসের রচনা নয় অথচ তার নামে প্রচারিত এমন কিছু গ্রন্থও রয়েছে, যেমন নলোদয়, পুষ্পবাণবিলাস, শৃঙ্গারতিলক, চিদ্গগনচন্দ্রিকা, ভ্রমরাষ্টক, শ্রুতবোধ, শৃঙ্গারসার, মঙ্গলাষ্টক প্রভৃতি।

প্রাচীনকালের ভারতের সভ্যতা সংস্কৃতি, রাজাদের রাজ্যশাসন প্রণালী এমন কি বিভিন্ন স্থানের নিখুঁত ভৌগোলিক বিবরণ কালিদাসের বিভিন্ন রচনা থেকে পাওয়া যায়। তার রচনায় ব্যবহৃত অনুপম উপমাও তার কৃতিত্বের পরিচায়ক। তাই দেশে বিদেশে কালিদাস বিদগ্ধজনের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছেন।

তথ্যসূত্র

১. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৯-১১।

Leave a Comment

error: Content is protected !!