চিন্তক অনুপ সাদি: সমাজ বিশ্লেষণ ও মানুষের লড়াইয়ে এক অবরুদ্ধ সময়ের কবি

অনুপ সাদি আমার পরিচিতদের মধ্যে সেরা ভাবুক। পরিচয়ের পর থেকে আমরা যৌথভাবে অনেক কাজ করেছি, দীর্ঘদিন পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় করেছি। তার সাথে আমার বুঝাপড়া চমৎকার। কর্মসূত্রে তিনি বেশ কয়েক বছর নেত্রকোণায় ছিলেন। এই সময়টা আমরা দারুণ উপভোগ করেছি। আমাদের অনেক স্বপ্ন আমরা পরস্পরের সাথে ভাগ করেছি। কিছু কাজ বাস্তবায়ন করেছি বা করার পথে আছি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে বা পরে তিনি আমার সহযোদ্ধাও বটে। তিনি অবরুদ্ধ সময়ের কবি। চিন্তার সাথে যুক্ত থাকলেও সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সময়টায় আমি সরাসরি মঞ্চে যেতে পারিনি। অনুপ সাদি পেরেছিলেন।

আমরা এমন একটি বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যে ব্যবস্থা পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। দেশে দেশে উদ্বাস্তু বাড়ছে, অস্ত্রের তাণ্ডব চলছে। এই আছে এই নেই অবস্থা। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ভেতর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট। এমনিতেই সাম্রাজ্যবাদের সাথে নিপীড়িত জাতি ও জনগণের দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই চলমান। আগামী পৃথিবীর চিত্র অথবা ভূগোল পাল্টে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে সময়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই জারি রাখাটা খুবই কষ্টকর। এই ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে দালালির সংস্কৃতি। প্রকৃতপক্ষে মানুষের দুঃখ, বেদনা, অন্তর্গত লড়াই, জীবনবোধ, প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ দালাল সংস্কৃতির ধারক বাহকদের মধ্যে অনুপস্থিত। গত পঞ্চাশ বছরে তথাকথিত দালাল বুদ্ধিজীবীদের ছাপিয়ে সামনে আসতে পারেননি প্রকৃত ভাবুক কেউ। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে যাদেরকে আঙ্গুল দিয়ে গণনা করা যাবে।

আমি দীর্ঘদিন ধরে অন্তরাশ্রম নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করি। অন্তরাশ্রমের মূল শ্লোগান হচ্ছে অনন্ত জীবনের গান গাওয়া। এটি নিশ্চিত একটি ভাববাদী শ্লোগান। অন্তরাশ্রম ভাববাদে দীক্ষিত একটি প্রতিষ্ঠান হলেও বস্তুবাদকে অস্বীকার করলে অন্তরাশ্রমের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। অন্তরাশ্রম একটি প্রতিষ্ঠান যেটি বিশ্ববীক্ষায় দীক্ষিত। আন্তর্জাতিকতাবাদকে ধারণ করে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী অবস্থানকে অন্তরাশ্রম সব সময় শ্রদ্ধার চোখে দেখে।

দীর্ঘ সময় নেয়ার পর ২০২২ সালের নভেম্বরে অন্তরাশ্রমের চতুর্থ সংখ্যা বের হয়। সেই সংখ্যাটির বিশেষত্ব ছিল যে সেই পর্বে শুধুমাত্র একজনকে নিয়েই লেখা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেটি ছিল আমাদের একটি বিশেষ আয়োজন এবং সুখের বিষয় হচ্ছে যে সেই সংখ্যাটি করা হয়েছিল অনুপ সাদির উপর বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা নিয়ে। অনুপ সাদি হচ্ছেন অন্তরাশ্রম কর্তৃক পর্যবেক্ষিত দেশি বেতফল, বিলের শাপলা ভেট, উঠোনের কোণে ফুটে ওঠা দোলনচাঁপা, রাস্তার পাশে লড়াই করে বেঁচে থাকা ভাঁটফুল। আর নিজেকে জাহির করার এই যুগে মাকাল ফল এড়িয়ে আমরা খুঁজে দেখব দেশি বরই, বেতফল, লটকনের মতো ফল। এরোমেটিক জুঁই ফুলের বদলে হাতে নিব দোলনচাঁপা আর ভাঁটফুল।

তিনি পেশায় একজন সহযোগী অধ্যাপক। ইংরেজি বিষয়ের মাস্টার। মাস্টারির সুবাদে ইস্কুল খুলে বসেননি। জ্ঞান সমুদ্রে ডুব পাড়তে থাকা এই ডুবুরি জ্ঞান বিজ্ঞানের মণি-মুক্তা আহরণ করেন। তিনি জীবনকে বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানের ভাষায় খুবই সাবলীলভাবে। তিনি প্রাণ-প্রকৃতি পাঠে মগ্ন একজন মানুষ।

অনুপ সাদি এই সমাজের একজন মানুষ। এখানে বাস করেই লড়াই জারি রেখেছেন নতুন সমাজ নির্মাণের। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তকমা গায়ে লাগিয়ে তিনি ঘুরেন না। তিনি মানুষের জন্য বেঁচে থাকেন। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মূল জায়গা থেকে মুহুর্তের জন্যও বিচ্যুত হন না। মানুষের লড়াইয়ের কৌশল ও সমাজ বিশ্লেষণের নানান তত্ত্ব ও প্রবন্ধ ভিন্ন ভাষা থেকে তিনি বাংলায় এনেছেন। তিনি নিজেও তার প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় এই বিশ্ব, সমাজ ও অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করেন সাবলীল ভঙ্গিমায়।

অনুপ সাদি চিন্তা এবং কর্মে নিজের সততা বজায় রাখেন। মানুষ ও পৃথিবীর ইতিহাসের যে দশ লক্ষ বছরের দলিল আছে তাতে অনুপ সাদির মতো ব্যক্তিরাই অংশীদার। তিনি উইকিপিডিয়াতে নিবন্ধ লেখেন। উইকিমিডিয়াতে ছবি যুক্ত করেন। অজানা-জানা অনেক বিষয় তিনি অনলাইন প্লাটফর্মে যুক্ত করেছেন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ সম্পাদনা করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। এদেশের জীববৈচিত্র্য, প্রাণ-প্রকৃতি, নদী, বনাঞ্চল রক্ষায় নিজের চিন্তা ও কর্ম প্রকাশের মাধ্যমে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

অনুপ সাদি রোদ্দুরে নামের একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করেন যেখানে ঢুঁ মারলেই দেখা যায় তার কাজের পরিধি। তার অনেকগুলো প্রকাশনা আছে। প্রথম জীবনে তিনি কবিতা লিখেছেন এবং তার পাঁচটি কবিতার বই আছে। তাছাড়াও তার প্রবন্ধ ও সম্পাদনার বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। সকল বই নিয়ে এখানে আলোচনা সম্ভব নয়। তার জীবন-কর্ম ও প্রকাশিত বই নিয়ে বহু গুণিজন অন্তরাশ্রমের সেই সংখ্যায় লিখেছিলেন। তাদের সকলের লেখা পাঠ করলে অনুপ সাদি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। যদিও প্রতিটি মানুষের জীবন মহাগ্রন্থের এক একটি প্রবন্ধ আর সমগ্র মানব জাতির জীবন একটি মহাগ্রন্থ। আমরা মহাজীবনের একটি অর্ধ সমাপ্ত প্রবন্ধ পাঠ করব, যে প্রবন্ধ শুরু হয়েছিল ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার দামোল গ্রাম থেকে আর অসমাপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে আছে পরবর্তী দৃশ্যায়নের জন্য নিমগ্ন অথচ মাথা উঁচু ভাঁটফুলের গাছের মতো সারা বাংলাদেশে।

জীবনের ভাঁজে ভাঁজে যার চিন্তা এবং লড়াই আমাদের ভেতর এক একটি চেতনার দুয়ার খুলে দিবে সেই মানুষটিকে নিয়ে অন্তরাশ্রমের একটি সংখ্যা করতে পেরে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম।

অনুপ সাদির ব্যাপ্তি শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, বরং তার চিন্তা ও বন্ধুত্ব ছড়িয়ে আছে নানান জাতি ও ভাষার মধ্যে। আমাদের অন্তরাশ্রমের সেই সংখ্যায় অনুপ সাদি সম্পর্কে বাংলা, ইংরেজি ও নেপালি ভাষায় লেখা পেয়েছিলাম। আন্তর্জাতিকতাবাদে দীক্ষিত অনুপ সাদির জীবন ও কর্মকে বুঝতে সেই সংখ্যাটি তাকে আন্তর্জাতিক পোশাকে সজ্জিত করেছিল।

আসলে একটি লেখার মাধ্যমে অনুপ সাদিকে ব্যখ্যা করা যে কারও পক্ষে সহজ ও সম্ভব নয়। সাদি আপাদমস্তক গণমানুষের, একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। সাদি যতোটা প্রাণ, প্রকৃতি ও মানুষের লড়াইকে ধারণ করেন, আমি হয়তো ততোটা পারি না। নেত্রকোণায় বসবাসের স্মৃতি হিসেবে রেখে গেছেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। তিনি এবং দোলন প্রভা যৌথভাবে নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ রচনা করেছেন। এই চরিতকোষের মাধ্যমে তিনি এই অঞ্চলে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এই কাজটা করার সময় আমি তাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছি। দোলন প্রভাও অসাধারণ প্রজ্ঞার অধিকারী।

অনুপ সাদি আমার বন্ধু। এমন বন্ধু পেয়ে আমি গর্বিত। আমার এই লেখক, সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, ভাবুক বন্ধুর আজ জন্মদিন। তার সম্পর্কে আমি আরো বিস্তারিত কোনো একদিন লিখব। ভালো থাকবেন সাদি ভাই। পারলে আবার চলে আসেন নেত্রকোণায়। ভাবির হাতে মাসকালাইয়ের রুটি খাবো আবার কোনো একদিন।

১৬ জুন, ২০২৪
স্থলপদ্ম, নাগড়া, নেত্রকোণা

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির কয়েকটি বক্তৃতা দেখুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এনামূল হক পলাশ রচিত অন্তরাশ্রমের চতুর্থ সংখ্যার সম্পাদকীয়টিকে তিনি অনুপ সাদির পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিতব্য বইয়ের জন্য লেখাটি পুনরায় সংস্কার করেন। লেখাটি সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশিত।

Leave a Comment