নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা: বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী রাজনীতির ধারা

নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী রাজনীতির ইতিহাসে একটি তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ধারা হিসেবে পরিচিত। এই প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনটি মূলত সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের আমূল বিরোধিতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সংগঠনটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, শ্রেণিশত্রু ও শোষক গোষ্ঠীর কবল থেকে এদেশের শোষিত জনগণের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মুক্তির জন্য একটি সামগ্রিক ‘নয়াগণতান্ত্রিক’ বিপ্লব সাধন অপরিহার্য।

সংগঠনটি প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকার ও গণআকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে সুসংগঠিতভাবে কাজ করে এবং বিদ্যমান বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিপ্লবী রূপান্তরের দাবি জানায়। জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুসংহত রাখা, কোনো প্রকার সংশোধনবাদ বা আপসকামিতার ধার না ধারা এবং শোষিত প্রলেতারিয়েত শ্রেণির রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই এই মোর্চার মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য। বিভিন্ন জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন এবং রাজপথে অগ্রগামী ও সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের আদর্শিক চেতনার প্রাসঙ্গিকতা সফলভাবে প্রচার করে।

গঠনের ইতিহাস

নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা ২০০৪ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শোষিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে একটি বলিষ্ঠ প্লাটফর্ম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই সংগঠনটি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদী দর্শনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় এবং একটি শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। সংগঠনটির মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এর নিবেদিতপ্রাণ ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা ও দূরদর্শিতার মধ্যে, যারা আমৃত্যু প্রলেতারিয়েত শ্রেণির রাজনৈতিক মুক্তির সোপান তৈরিতে কাজ করেছেন।

এই ঐতিহাসিক যাত্রায় সমমনা অন্যান্য বামপন্থী দল ও প্রগতিশীল সংগঠনের সাথে আদর্শিক জোটবদ্ধ হয়ে তারা একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের নিরন্তর শ্রেণিসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত আমৃত্যু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও আপসহীন তাত্ত্বিক অবস্থান এবং রাজপথের অবিচল ও সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমেই এই মোর্চা বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।

রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আদর্শিক ভিত্তি

সংগঠনটি মূলত মাওবাদী চিন্তাধারা এবং নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ও আদর্শিক ধারা অনুসরণ করে। সংগঠনটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, বর্তমান সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার কোনো স্থায়ী ও বৈপ্লবিক সমাধান সম্ভব নয়। বরং একটি মজবুত গণভিত্তি তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী এবং ধারাবাহিক সংগ্রামের বন্ধুর পথকেই তারা বেছে নিতে বদ্ধপরিকর। তাদের এই রাজনৈতিক দর্শনে জনগণের গণচেতনা জাগ্রত করা এবং গণবিপ্লব ত্বরান্বিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পায়। তাদের মূল রাজনৈতিক ব্রত হলো জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুসংহত রাখা এবং শোষিত প্রলেতারিয়েত শ্রেণির রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক সংহতি প্রকাশ করা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং একটি শোষণহীন সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম প্রধান ও বলিষ্ঠ দিক। সমমনা অন্যান্য বামপন্থী দল ও প্রগতিশীল সংগঠনের সাথে আদর্শিক জোটবদ্ধ হয়ে তারা গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে এক অবিচল ও অপ্রতিরোধ্য শ্রেণিসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা নিয়মিতভাবে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, শিল্প-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সোচ্চার থাকে। এছাড়া তাদের নেতৃত্বের সঠিক দিকনির্দেশনা ও তৃণমূল পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ফলে সংগঠনটি দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সম্মেলন ও ভবিষ্যৎ পথচলা

বিগত ১২ আগস্ট, ২০২৩ তারিখে বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী ধারার গণসংগঠন নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চার ২য় জাতীয় সম্মেলন অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলা ও আদর্শিক লড়াইয়ের এক নতুন সাংগঠনিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এই সম্মেলনে সারাদেশের নিবেদিতপ্রাণ প্রতিনিধিগণ উপস্থিত হয়ে আগামী দিনের শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দৃপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী চেতনার এই সম্মেলনে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই সংগঠনের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রবহমান। বিশেষ করে মাহমুদুল আমীন খাঁন এবং বিকাশ ভৌমিকের মতো প্রাজ্ঞ বিপ্লবীদের সুযোগ্য নেতৃত্বে এই জেলা শাখাটি জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এসেছে। ২০০৪ সালে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত হওয়ার পর অতি দ্রুতই ময়মনসিংহ জেলা শাখা গঠিত হয়, যার প্রথম সারির সংগঠক ছিলেন মাহমুদুল আমীন খাঁন (সহ-আহ্বায়ক) এবং শ্রমিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব বিকাশ ভৌমিক (আহ্বায়ক)। তাঁদের সুযোগ্য নির্দেশনায় ময়মনসিংহের চর কালীবাড়ি বস্তি আন্দোলন এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষার জাতীয় আন্দোলন এক অনন্য মাত্রা লাভ করেছিল।

সংগঠনটি কেবল রাজপথের আন্দোলন নয়, বরং তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাতেও বিশেষ জোর দেয়। নিয়মিত মার্কসবাদী পাঠচক্র পরিচালনা এবং রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মকে সমাজতান্ত্রিক ও শ্রেণিচেতনায় দীক্ষিত করে আসছে। সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চার আপসহীন অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।বর্তমানে আবুবকর সিদ্দিক রোমেলের মতো বিপ্লবী ও প্রগতিশীল নেতাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্বে এই সংগঠনটি তাঁদের পূর্বসূরীদের আদর্শিক উত্তরাধিকার বহন করে সম্মুখপানে অগ্রসর হচ্ছে।

আরো পড়ুন

Leave a Comment