অ্যাংলো-আইরিশ লেখক, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ এডমন্ড বার্ক (১২ জানুয়ারি ১৭২৯– ৯ জুলাই ১৭৯৭) আধুনিক রক্ষণশীল রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবে স্বীকৃত। অষ্টাদশ শতাব্দীর এই প্রভাবশালী চিন্তাবিদ তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন গ্রেট ব্রিটেনে, যেখানে তিনি ১৭৬৬ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত হুইগ পার্টির পক্ষ থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অফ কমন্সে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জনমত গঠনে তাঁর লেখনি সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখেছিল। সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তা ও রক্ষণশীল ঘরানার দর্শনে বার্ক আজও এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হন।
এডমন্ড বার্ক কেবল একজন রাজনীতিক ছিলেন না, বরং তিনি সমাজে নৈতিক গুণাবলি ও শিষ্টাচারের মধ্যে গভীর সংযোগ স্থাপনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের নৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামষ্টিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিহার্য। এই আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর ১৭৫৬ সালে প্রকাশিত প্রখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক রচনা ‘এ ভিন্ডিকেশন অফ ন্যাচারাল সোসাইটি’-তে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটে উঠেছে।
তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতেও বার্কের প্রজ্ঞা ছিল লক্ষণীয়। তিনি আমেরিকান উপনিবেশগুলোর ওপর ব্রিটিশ সরকারের বিতর্কিত কর আরোপের কঠোর সমালোচনা করেন। যদিও তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অন্যায্য নীতির বিরুদ্ধে উপনিবেশবাসীদের প্রতিরোধের অধিকারকে নৈতিকভাবে সমর্থন করেছিলেন, তবে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের সশস্ত্র প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেননি। এছাড়া, ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রশ্নে ক্যাথলিকদের অধিকার আদায় বা ‘ক্যাথলিক ইমানসিপেশন’-এর প্রতি তাঁর আজীবন সংহতি তাঁকে সমকালীন রাজনীতিতে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বার্কের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। একইসাথে, ফরাসি বিপ্লবের ধ্বংসাত্মক পরিণতির বিষয়ে তাঁর তীব্র সমালোচনা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রেখেছে। উল্লেখ্য যে, ১৭৭৪ সালে তিনি ব্রিস্টল নির্বাচনী এলাকা থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য সংসদীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু করেন।
১৭৯০ সালে প্রকাশিত তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিফ্লেকশনস অন দ্য রেভোলিউশন ইন ফ্রান্স’-এ এডমন্ড বার্ক অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ফরাসি বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি সুশীল সমাজের দীর্ঘদিনের কাঠামো এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানসমূহকে সমূলে বিনাশ করছে। বিশেষ করে, বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ক্যাথলিক চার্চের ওপর যে পরিকল্পিত নিপীড়ন ও অবমাননা চালানো হয়েছিল, তিনি তার কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেন। বার্কের এই আপসহীন অবস্থান তৎকালীন হুইগ পার্টির অভ্যন্তরে একটি আদর্শিক মেরুকরণ সৃষ্টি করে। এর ফলে তিনি দলটির রক্ষণশীল অংশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, যাদেরকে তিনি ‘ওল্ড হুইগস’ (Old Whigs) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এই গোষ্ঠীটি চার্লস জেমস ফক্সের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবপন্থী ‘নিউ হুইগস’ (New Whigs) উপদলের সরাসরি বিরোধী ছিল।
ব্যক্তিজীবনেও বার্ক ছিলেন অত্যন্ত বিদগ্ধ এবং তাঁর সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের সাথে তাঁর সখ্য ছিল প্রবাদপ্রতিম। বিশেষ করে স্যামুয়েল জনসন, ডেভিড গ্যারিক, অলিভার গোল্ডস্মিথ এবং জোশুয়া রেনল্ডসের মতো কিংবদন্তিদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ বৌদ্ধিক সম্পর্ক ছিল। রাজনৈতিক বিতর্ক ও সংসদীয় বক্তৃতায় বার্ক সর্বদা অনিয়ন্ত্রিত ও লাগামহীন শাসনক্ষমতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে একটি নীতিভিত্তিক ও শক্তিশালী বিরোধী দলের রাজনৈতিক সক্ষমতা থাকা অপরিহার্য। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কেবল সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক দলই পারে স্বেচ্ছাচারী শাসনের হাত থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে।
উনিশ শতকের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এডমন্ড বার্কের চিন্তাধারা রক্ষণশীল ও উদারপন্থী—উভয় শিবিরের কাছেই সমানভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছিল। তবে বিশ শতকে এসে তাঁর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আরও ব্যাপকতা লাভ করে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বৌদ্ধিক মহলে। ফরাসি বিপ্লবের কট্টর বিরোধী এবং রাজতন্ত্র ও ঐতিহ্যের চরম সমর্থক জোসেফ ডি মাইস্ত্রের সমান্তরালে বার্ককেও আধুনিক রক্ষণশীল দর্শনের অন্যতম পথিকৃৎ ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বার্কের অনন্য লেখনশৈলী এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কেবল ব্রিটিশ রক্ষণশীল চিন্তাধারাকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেনি, বরং আধুনিক রক্ষণশীলতা ও উদারনৈতিক গণতন্ত্রের (Liberal Democracy) প্রাথমিক তাত্ত্বিক ভিত্তি স্থাপনেও এটি এক অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মূল নির্যাস—ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংস্কারের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—আজও সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অপরিহার্য অধ্যায় হয়ে আছে।
জন্ম ও শৈশব ও শিক্ষাজীবন
এডমন্ড বার্ক ১৭২৯ সালের ১২ জানুয়ারি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন অত্যন্ত সফল ও স্বনামধন্য আইনজ্ঞ এবং অ্যাটর্নি। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তাঁর পিতার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল যে, বার্ক নিজেও আইনের পেশায় নিয়োজিত হয়ে একজন দক্ষ আইনজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে বার্ক এক সমৃদ্ধ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যা তাঁর শৈশবকে এক স্থিতিশীল ও সুখকর রূপ প্রদান করেছিল।
বার্কের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বাল্টিমোর গ্রামার স্কুলে, যেখান থেকে তাঁর মেধার প্রথম বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ডাবলিনের বিখ্যাত ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর অধ্যয়ন করলেও কোনো নির্দিষ্ট প্রথাগত বিষয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং গ্রিক ও ল্যাটিন ধ্রুপদী সাহিত্যের গভীরে নিমগ্ন হন। বিশেষ করে রোমান দার্শনিক ও বাগ্মী সিসেরোর লেখনী তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তিনি সিসারোকে নিজের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৭৪৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী আইন পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান।
সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ
তবে আইনের জটিল মারপ্যাঁচের চেয়ে সাহিত্যের সৃজনশীল জগত তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করে। পিতার অসম্মতি সত্ত্বেও তিনি আইন পেশা ত্যাগ করে সাহিত্যচর্চাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেন এবং বিভিন্ন স্থান ভ্রমণে বের হন। এই সিদ্ধান্তের কারণে তাঁর পিতা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর মাসোহারা বা আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেন। জীবনযুদ্ধের এই কঠিন সময়ে তিনি দুটি গবেষণাধর্মী পুস্তিকা (Pamphlet) রচনা করেন, যার মধ্যে দ্বিতীয়টি সুধীসমাজের ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্রখ্যাত পণ্ডিত ড. স্যামুয়েল জনসনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা অর্জন করে। অতঃপর তিনি তাঁর এক বন্ধুর সহায়তায় ‘অ্যানুয়াল রেজিস্টার’ (Annual Register) নামক একটি সাময়িকী প্রকাশ শুরু করেন, যেখানে সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করা হতো। এই কাজের সূত্রে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে।
রাজনৈতিক জীবনের উত্থান ও সংসদীয় সংগ্রাম
১৭৫৯ সালে তিনি আয়ারল্যান্ডের তৎকালীন মুখ্যসচিব ডব্লিউ. জি. হ্যামিলটনের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। হ্যামিলটন তাঁর জন্য আইরিশ রাজকোষ থেকে বার্ষিক ৩২০ পাউন্ডের একটি পেনশনের ব্যবস্থা করেন। তবে হ্যামিলটনের সংকীর্ণ মানসিকতা ও আদর্শিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে বার্ক কেবল তাঁর সচিবের পদই ত্যাগ করেননি, বরং তাঁর সুপারিশে বরাদ্দকৃত পেনশনটিও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।
১৭৬৩ সালে লন্ডনে ফিরে আসার পর বার্কের রাজনৈতিক জীবনে নতুন মোড় আসে। ১৭৬৫ সালে গ্রেনভিল মন্ত্রিসভার পতনের পর লর্ড রকিংহামকে সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হলে বার্ক তাঁর ব্যক্তিগত সচিব নিযুক্ত হন এবং পরবর্তী ১৭ বছর তাঁর সান্নিধ্যে অতিবাহিত করেন। যদিও রকিংহাম সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও সেই বছরের ডিসেম্বরেই বার্ক ওয়েন্ডওভার নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের এক বর্ণাঢ্য সংসদীয় পরিক্রমা।
১৭৬৬ সালের ২৭শে জানুয়ারি সংসদে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণটিই সমকালীন বিদগ্ধ সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই সাফল্যের পর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আমৃত্যু তিনি স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচারের একনিষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন। নিজের এই সুউচ্চ আদর্শ ও নৈতিকতা বজায় রাখতে গিয়ে তাঁকে অনেক প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্য হারাতে হয়েছে এবং তৎকালীন উচ্চবর্গের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির রোষানল সহ্য করতে হয়েছে, তবুও তিনি তাঁর নীতি থেকে বিচ্যুত হননি।
উপনিবেশবাদ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বার্কের ভূমিকা
প্রধানত তিনটি বিশেষ অবদানের জন্য এডমন্ড বার্ক ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। প্রথমত, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনি ‘ভারত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। দীর্ঘ পনেরো বছর তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকাণ্ড নিয়ে নিবিড় তদন্ত পরিচালনা করেন এবং ভারতে কোম্পানির সীমাহীন অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় তাঁর বলিষ্ঠ ও অগ্রণী ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার উপনিবেশগুলোর সমস্যার প্রতি বার্কের গভীর সংবেদনশীলতা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি টেকসই ও সম্মানজনক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বিশেষ করে আমেরিকার ওপর ব্রিটিশদের অন্যায় কর আরোপের বিরোধিতা এবং একটি সুষ্ঠু মীমাংসার লক্ষ্যে দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ ও লেখনীসমূহ আজও বিশ্বজুড়ে গবেষকদের কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়।
তৃতীয়ত, ফরাসি বিপ্লব উত্তর পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতি তাঁর গভীর উদ্বেগ ও সহানুভূতি প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর অমর ধ্রুপদী সৃষ্টি ‘Reflections on the Revolution in France’ রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক অনন্য দলিল। এতে তিনি দাবি করেন যে, বিপ্লব একটি সুশীল সমাজের কাঠামো এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ফলে তিনি হুইগ পার্টির রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মধ্যে একজন জনপ্রিয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, যাদেরকে তিনি ‘ওল্ড হুইগস’ নামে অভিহিত করেন।
অমর কীর্তি হিসেবে রচনাসমূহ
এডমন্ড বার্কের অমরত্ব টিকে আছে তাঁর অনন্য ও প্রভাবশালী কিছু রচনার মধ্য দিয়ে। তাঁর বিখ্যাত এই লেখনীসমূহ কেবল তৎকালীন রাজনীতিকে প্রভাবিত করেনি, বরং আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ও নন্দনতত্ত্বের (Aesthetics) ভিত্তি হিসেবে আজও স্বীকৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সাহিত্যকর্ম হলো:
১. A Vindication of Natural Society (১৭৫৬): এটি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা, যেখানে বার্ক সমকালীন অতি-যুক্তিবাদী রাজনৈতিক চিন্তার অসারতা তুলে ধরেন।
২. A Philosophical Enquiry into the Origin of Our Ideas of the Sublime and Beautiful (১৭৫৭): নন্দনতত্ত্বের ওপর লেখা এই গ্রন্থটি বার্কের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এখানে তিনি ‘বিউটিফুল’ বা সুন্দর এবং ‘সাবলাইম’ বা মহানুভবতার মধ্যে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক পার্থক্য নিরূপণ করেন।
৩. Impeachment of Warren Hastings: ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে তাঁর সংসদীয় বক্তৃতা ও দলিলসমূহ কেবল একটি বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল না, বরং তা ছিল সাম্রাজ্যবাদী দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক নৈতিক ইশতেহার।
৪. Thoughts on the Cause of the Present Discontents (১৭৭০): এই পুস্তিকায় বার্ক দলীয় রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা এবং তৎকালীন রাজতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করেন।
৫. Reflections on the Revolution in France (১৭৯০): এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে গণ্য। ফরাসি বিপ্লবের বিধ্বংসী পরিণতির পূর্বাভাস দিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি আধুনিক রক্ষণশীলতার মূল আধার হিসেবে আজও সমাদৃত।
৬. Letters on a Regicide Peace: এই পত্রাবলীতে তিনি ফরাসি বিপ্লবীদের সাথে কোনো প্রকার আপস না করার পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ যুক্তি তুলে ধরেন।
৭. Letter to the Sheriffs of Bristol: জনপ্রতিনিধির স্বাধীনতা এবং ভোটারদের সাথে তাঁর সম্পর্কের ধরণ নিয়ে লেখা এই পত্রটি আজও সংসদীয় গণতন্ত্রের এক দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত।
বার্কের এই সকল পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য ও অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
ব্যক্তিজীবনে এডমন্ড বার্ক ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী, নীতিবান এবং পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী একজন মানুষ। ১৭৫৭ সালে তিনি জেন মেরি নুজেন্টকে বিবাহ করেন, যাঁর সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সুখ ও শান্তির। বার্কের পাণ্ডিত্য কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি শিল্প, সাহিত্য এবং দর্শনের প্রতিও ছিলেন সমান অনুরাগী। তাঁর বন্ধু তালিকায় যেমন ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক স্যামুয়েল জনসন, তেমনি ছিলেন চিত্রশিল্পী জোশুয়া রেনল্ডস। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চরম শোকের সম্মুখীন হন যখন তাঁর দুই পুত্রই অকালে মৃত্যুবরণ করেন। বিশেষ করে তাঁর প্রিয় পুত্র রিচার্ডের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
জীবনাবসান ও শেষ দিনগুলো
জীবনের শেষ দিনগুলোতে বার্ক অনেকটা নিভৃতে অতিবাহিত করেন। ১৭৯৪ সালে সংসদীয় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি তাঁর বাকি সময়টুকু লেখালেখি ও দর্শনেই নিমগ্ন ছিলেন। ১৭৯৭ সালের ৯ই জুলাই বাকিংহামশায়ারের বিকনসফিল্ডে এই মহান চিন্তাবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে সেখানেই সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তাঁর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি অটল ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব রাজনীতি ও রাষ্ট্রদর্শন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারায়, যাঁর বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার আজও সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।
আরো পড়ুন
- এডমন্ড বার্ক: আধুনিক রক্ষণশীল দর্শনের পথিকৃৎ ও মহান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ
- বাংলা গানের স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি: গীতিকার প্রণব রায়ের জীবন ও সৃষ্টি
- চিনুয়া আচেবে ছিলেন আফ্রিকান সাহিত্য জগতের খ্যাতিমান পুরুষ
- প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক
- ল. ন. তলস্তয়
- হার্বার্ট মারকুস মার্কসবাদবিরোধী আবর্জনা সৃষ্টিকারী জার্মান-মার্কিন দার্শনিক
- হাসান ফকরী বাংলাদেশের একজন কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
- শামসুল ফয়েজ বাংলাদেশের একজন কবি, লেখক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক
- মার্কো পোলো একজন ভেনিসীয় বণিক, অনুসন্ধানকারী এবং লেখক
- বারট্রান্ড রাসেল ছিলেন একজন ব্রিটিশ মহাজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মনীষী
- আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় উপন্যাসিক এবং বাংলা ভাষায় কবি
- দোলন প্রভা বাংলাদেশের কবি, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পর্যটক
- দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার বাংলা রূপকথার গল্প ও শিশুসাহিত্যের একজন লেখক
- রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক এবং যাদুঘর বিশেষজ্ঞ
- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক
- কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ লেখক, নাট্যকার ও সমাজসেবী
- নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি ও লেখক
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় উনবিংশ শতকের কবি, সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা
- গিরিশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন নাট্যকার, কবি, অভিনেতা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ইংরেজি সাহিত্যের কবি
- পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি
- জন কিটস ছিলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি
- ডি এইচ লরেন্স ইংরেজ কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক
- আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মার্কিন সাংবাদিক, উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও ক্রীড়াবিদ
তথ্যসূত্র
১. খন্দকার মেহবুব আলম, এডমান্ড বার্ক, স্পিচ অন দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া বিল, ফ্রেন্ডস বুক কর্নার ঢাকা, প্রথম প্রকাশ জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা vii-viii.
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।